দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘন জঙ্গলের ভিতর লুকিয়ে আছে এক আশ্চর্য জীববৈজ্ঞানিক রত্ন—টাইগার মিল্ক মাশরুম।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 4 June 2025 12:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দুর একটি গানই রয়েছে দুধ নিয়ে। দুধ না খেলে হবে না ভাল ছেলে। কিন্তু বাঘের দুধ পেলে?
গরুর দুধেই যদি এত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন থাকে তাহলে বাঘের দুধে (Tigers Milk) কী না কী আছে!
আসলে টাইগারস মিল্ক কিন্তু ঠিক বাঘের দুধ নয়। এ হল এক প্রকার মাশরুম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘন জঙ্গলের ভিতর লুকিয়ে আছে এক আশ্চর্য জীববৈজ্ঞানিক রত্ন—টাইগার মিল্ক মাশরুম। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘চেনডাওয়ান সুসু রিমাউ’, অর্থাৎ ‘বাঘের দুধ মাশরুম’। লোককথা অনুসারে, এই মাশরুম সেই স্থানে জন্মায়, যেখানে একটি বাঘিনী তার ছানাকে দুধ পান করায়। এই কারণেই এর নাম এবং রহস্যময়তা দুইই গভীরভাবে মাটির সঙ্গে জড়িত।
এই বিরল মাশরুমের বৈজ্ঞানিক নাম Lignosus rhinoceros। এটি সাধারণ মাশরুমের মতো ঝাঁক বেঁধে জন্মায় না—একটি করে আলাদা জন্মায়। এটি মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত: ক্যাপ (উপরের ছাতা), স্টেম (ডাঁটা), ও স্ক্লেরোটিয়াম (গোড়ার সাদা দলা)। স্ক্লেরোটিয়ামই হলো মূল ওষধিগুণসম্পন্ন অংশ, যেটি মাটির নিচে থাকে এবং দুধের মতো রস উৎপন্ন করে।
বাঘের দুধ পেলে?#TigerMilkMushroom #TheWallNews #Banglanews #LatestNews pic.twitter.com/UCmveGUi2V
— The Wall (@TheWallTweets) June 4, 2025
এই মাশরুম ঐতিহাসিকভাবে মালয় ও চিনা জনগণের মধ্যে কাশি, হাঁপানি, জ্বর, ক্যানসার, গ্যাস্ট্রিক, হজম সমস্যা এবং পেটের ব্যথার জন্য ব্যবহৃত হত। এমনকি ২০০২ সালে মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মহম্মদ এই মাশরুম ব্যবহারের মাধ্যমে তার দীর্ঘস্থায়ী কাশির উপশম পেয়েছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। তার পরই এর প্রতি আধুনিক চিকিৎসা গবেষণার নজর আরও বেশি করে পড়ে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই মাশরুমে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ—বিশেষ করে বিটা-গ্লুকান, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং দেহের প্রতিক্রিয়াশীল সিস্টেমকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এর পাশাপাশি রয়েছে ফাংগাল ইমিউন-মডুলেটরি প্রোটিন (FIP) এবং লেকটিন, যেগুলি ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, টাইগার মিল্ক মাশরুম হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্তদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। একটি পরীক্ষায় ইঁদুরের শরীরে দেখা গেছে এই মাশরুম ব্যবহারে IgE নামক অ্যালার্জি সংক্রান্ত প্রোটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পাশাপাশি IL-4, IL-5 এবং IL-13 নামক প্রদাহ-সৃষ্টিকারী সাইটোকাইনগুলোর পরিমাণও কমে আসে। এর অর্থ, টাইগার মিল্ক মাশরুম শরীরের প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
বর্তমানে, বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই মাশরুম চাষের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আগে শুধুমাত্র জঙ্গলের মাটির নিচে খুঁজে পাওয়া গেলেও এখন গবেষণাগারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এর স্ক্লেরোটিয়া ও স্পোরোফোর উভয় অংশ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে, যা বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং গবেষণার পথ খুলে দিয়েছে।
এই বিরল ওষধি মাশরুম শুধু লোককথার এক ঐতিহ্য নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানেও এটি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, শ্বাসপ্রশ্বাসের উন্নতি ও অটো ইমিউন রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী বলে বিবেচিত হচ্ছে।