‘হেলথ ইনফ্লুয়েন্সার’-দের সব উপদেশ কি বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে খতিয়ে দেখা হয়? ডিজিটাল যুগের রমরমা, ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা, সবমিলিয়ে ভুল তথ্য বেছে খণ্ডানো একপ্রকার অসম্ভব।

এআই দিয়ে বানানো ছবি
শেষ আপডেট: 3 August 2025 17:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কিছুদিন আগেও কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যেতেন। এখন অনেকেই আগে দেখে নেন ইনস্টাগ্রামে তাঁর সমস্যা সংক্রান্ত কোনও রিল (Instagram reel) আছে কিনা! রিলের মধ্যে যদি বলা হয়, "ওই জিনিসটা পায়ে ঘষে ঘুমোলে শরীর থেকে টক্সিন বেরিয়ে যায়", বা "অমুকটা খেলে চোখের ছানি সেরে যাবে" - তাহলে তো কথাই নেই। কে আর ডাক্তার দেখাবে?
ভারতের নানা প্রান্তে এখন এইসব তথাকথিত ‘হেলথ ইনফ্লুয়েন্সার’-দের (Health Influencers) কথা শুনে জীবনধারা বদলে ফেলছেন বহু মানুষ। কিন্তু সত্যিই কি তাঁদের এই উপদেশগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে (Scientific justification) খতিয়ে দেখা হয়? ডিজিটাল যুগের (Digital space) যে রমরমা, ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা, তাতে এই ভুল তথ্য (truth vs myth) বেছে বেছে খণ্ডানো একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে।
করোনার সময় যেমন খুব স্বাভাবিকভাবে অনেকেই ভয় পেয়েছিলেন। তখনই এক ভিডিও ভাইরাল হল, যাতে বলা হয়েছিল, লেবুর রস নাকে দিলেই ভাইরাস মরবে। গুরুগাঁওয়ের সতীশ শ্রীবাস্তব বলছেন, “আশার শেষ ভরসা ছিল, তাই চেষ্টা করেছিলাম।” ভাগ্য ভাল, কোনও বিপদ হয়নি। কিন্তু এরপর অনেকেই আরও ভয়ংকর সব পরীক্ষায় নামলেন, দারচিনি চিবিয়ে খাওয়া, শুধু জল খেয়ে থাকা – আরও নানারকম ঘরোয়া টোটকা।
তবু সতীশের মতো কিছু মানুষ সাবধান হয়েছেন। কিন্তু সবাই না। কেউ কেউ আবার কেবল ইনস্টাগ্রাম রিল দেখে ওষুধও কিনছেন। রোগ সারাতে ইউটিউব দেখে ডায়েট বদলাচ্ছেন।
ডাক্তারের বদলে রিল, এটাই হয়ে উঠেছে নতুন ভারতের স্বাস্থ্যবোধ। অনেকে মনে করেন, রান্নাঘরের সাধারণ কিছু জিনিস বা প্রাচীন আয়ুর্বেদের জ্ঞানই যথেষ্ট। ‘কোনও রকম ওষুধ নয়, শুধু নিয়ম মেনে চললেই রোগ সেরে যাবে’ - এই ধারণা এখন ভাইরাল। এই মুহূর্তে বহু ইনফ্লুয়েন্সার আছেন যাঁরা বলছেন, "জ্বর হয়েছে? গরম জলে পা ডুবিয়ে রাখুন, ওষুধের দরকার নেই।"
ফ্যাক্টচেকারদের অবস্থা আরও করুণ, ভুল ধরতে ধরতেই ক্লান্ত তাঁরা। সোশ্যাল মিডিয়াকেই হাতিয়ার করে বিভ্রান্তি দূর করতে উদ্যোগী হয়েছেন কিছু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। Liver Doc নামে পরিচিত চিকিৎসক সাইরিয়াক অ্যাবি ফিলিপ, বা ‘মসালা ল্যাব’-এর কৃষ অশোক, বা The Healthy Indian Project (THIP)-এর সুদীপ্ত সেনগুপ্তর মতো অনেকে নিয়মিত ভুয়ো দাবি খণ্ডন করেন। তবু সমস্যা হচ্ছে, গুজব যত সহজে ছড়ায়, সত্য ততটা টিকতে পারে না।
সুদীপ্ত বলছেন, “স্বাস্থ্য বিষয়ে মানুষের জ্ঞান আজও সীমিত। তাই রিল-ফেসবুকের দৌলতে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”
সমস্যা হল, হেলথ ইনফ্লুয়েন্সারদের আয় বেশি, নৈতিক দায় খুব কম। দিনে দশটা ব্র্যান্ড থেকে অফার আসে, লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার। এক ইনফ্লুয়েন্সার তো বলেই ফেলেছেন, কালোজিরে খেলেই চুল পড়া বন্ধ, আবার একজন বলছেন - ওজন কমাতে এক সপ্তাহে এই বিশেষ ‘জাপানি ডায়েট’ মেনে চললেই সমস্যার সমাধান।
পরিস্থিতি এখন এটাই যে, রোগীরা মনেও করেন এটাই যথেষ্ট। অল্প ভুলে বড় ক্ষতি হয়ে যায়। সময়ের আগে বড় রোগ ধরা ডাক্তারদের কাছেও একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন একটাই, এর নিয়ন্ত্রণ কোথায়, শেষটাই বা কী?
২০২৩ সালে সরকার কিছু গাইডলাইন প্রকাশ করেছিল ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য। বলা হয়েছিল, “জল খেলে শরীর ভাল থাকে” - এই ধরনের সাধারণ পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট চিকিৎসার মতো কিছু বললে সতর্ক থাকতে হবে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাস্তব এখন আরও কঠিন, কেউ সেই নির্দেশের তোয়াক্কা করছে না। ছড়িয়ে চলেছে নেটদুনিয়া জুড়ে ভুয়ো তথ্যের জাল।
সাংবাদিকদের আরটিআই জানাচ্ছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সরকার একটাও ভুল বিজ্ঞাপনকে ‘মিসলিডিং’ বলে চিহ্নিত করেনি।
অতএব, কী করণীয়?
ডিজিটাল যুগের এই সময় সতর্ক থাকতে হবে নিজেকেই। যে কোনও স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত তথ্য চোখে পড়লেই সেটা মেনে চলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন আদৌ কি এর কোনও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আছে? থাকলেও তা যাচাই করা প্রয়োজন। শরীরের যেকোনও সমস্যায় তা ফেলে না রেখে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যান। তাঁর পরামর্শ ছাড়া ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট বা ডায়েট শুরু করা বিপজ্জনক।