
'পিকল ফ্যাক্টরি'। ছবি: 'পিকল ফ্যাক্টরি' ফেসবুক পেজ
শেষ আপডেট: 30 March 2025 20:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে কিছু করে দেখানো- এই প্রথম না ‘দ্য পিকল ফ্যাক্টরি’-র ১২ বছরের ইতিহাসে। নৃত্য ও শিল্পের মধ্যে ছকভাঙা, প্রগতিশীল এক ‘আন্দোলনে’র নজির গড়ে তোলাই ‘দ্য পিকল ফ্যাক্টরি’র (The Pickle Factory) উদ্দেশ্য। তারা সবসময় চেষ্টা করে চলেছে কীভাবে শিল্পকে (Art) সহজতর ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। ফ্লাইওভার (Flyover) থেকে শুরু করে বাজারের অলিগলি, পরিত্যক্ত সিনেমাহল, ট্রাম ডিপো, খোলা ছাদ বা বাড়ির অন্দরমহল- যে কোনও জায়গায় হতে পারে নৃত্য পরিবেশনার প্রাঙ্গণ, যা এককথায় অভাবনীয়।
পারফর্মেন্সের (Performance) ক্ষেত্রে বরাবরই স্থানমাহাত্ম্যের এক গুরুত্ব রয়েছে, যা একজন শিল্পীর (Performer) শিল্পকে অন্যমাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। কিছুটা এমনই মতপোষণ করেন পিকল ফ্যাক্টরির নির্মাতা বিক্রম আইয়েঙ্গার, যিনি প্রখ্যাত কত্থক নৃত্যশিল্পী (Dancer) রানি কর্ণের শিষ্য। তাঁর মতে, ‘পাবলিক স্পেসে যখন কেউ পারফর্ম করেন, তিনি জানেন না সেই জায়গাটার কী প্রভাব পড়তে চলেছে শিল্পীর শিল্পকলায় (Art)। জায়গা বিশেষে, শিল্পীকে সেই ধাঁচে ফেলে নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে হয়। আমরা সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে নৃত্য পরিবেশনে এতটাই মগ্ন ছিলাম এতবছর, তাই কোথাও সেই সংযোগটা হারিয়ে ফেলছিলাম। কিন্তু মানুষের কাছাকাছি পৌঁছতে না পারলে শিল্পের বৃত্ত অসমাপ্তই থেকে যাবে।’
বিক্রম আরও যোগ করেন, সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নৃত্য পরিবেশনার সময় শিল্পীর মাথায় এটা চলতে বাধ্য যে কীসের আশায় তাঁরা পারফর্ম করছেন যেখানে তাঁরাই একমাত্র আকর্ষণ নন সবার মাঝে? আর এই প্রশ্ন মনে আসাটা এক শিল্পীর ইগোর ক্ষেত্রে খুব জরুরি।
প্রেক্ষাপট ক্ল্যাসিকাল হলেও পরে ধীরে ধীরে সবরকম ফর্মকেই আপন করে নিয়েছে পিকল ফ্যাক্টরি। সে ফিজিক্যাল থিয়েটার হোকই বা পাপেট শো। মূল ধারণা (Tradition) এক রেখে শুধু স্থান বিশেষে বদ্ধ অডিটোরিয়ামের বদলে খোলা হাওয়ার পরিবর্তন এসেছে এই ক্ষেত্রে।
View this post on Instagram
বিশিষ্ট নাট্যশিল্পী উৎপল দত্তের সৌজন্যে জনসমক্ষে স্ট্রিট থিয়েটার (Theatre) পারফর্মেন্স নিয়ে মানুষের ধারণা আগে থেকেই ছিল। বাদল সরকার নিয়ে এলেন ‘থার্ড থিয়েটার’ যা প্রসেনিয়ামের গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে ইন্ডোর স্পেসেই অল্পসংখ্যক কিছু দর্শক নিয়ে পরিকল্পনা। থিয়েটার (Theatre) নিয়ে কিছু এক শ্রেণীর মানুষের উন্মাদনা কাজ করলেও একটা সময়ে নৃত্যশিল্পের ক্ষেত্রে সেই পরিসর বেশ কম ছিল মনে করেন কিছু শিল্পী। সেই অমোঘ সময়ে পিকল ফ্যাক্টরির এই নিবেদন সামনে আসে।
অনেকসময় থিয়েটারকর্মী বা নৃত্যশিল্পীদের (Dancer) কাছে অডিটোরিয়ামের মতো দামি বিলাসিতা থাকে না। সেখানেও সহায় পিকল ফ্যাক্টরির এই অভিনব প্রয়াস। বিক্রম আইয়েঙ্গারের মতে, কলকাতাতেই এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে অসাধারণ সব পারফর্মেন্স হতে পারে। একই সঙ্গে পিকল ফ্যাক্টরি নিজেদের ‘সমসাময়িক’ তকমা দিয়ে নারাজ, কারণ শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে ক্ল্যাসিক্যালের গভীরে, সেখান থেকেই তারা যাবতীয় রস আস্বাদনে বিশ্বাসী।
কোভিডের সময়ে পিকল ফ্যাক্টরির দু’টো বার্ষিক পরিকল্পনা অনলাইনে হওয়ার পর ২০২৪-এর তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে নিউ টাউনের ফ্লাইওভারের নিচে সাধারণ মানুষের ঢল নেমেছিল। কোনও অডিটোরিয়ামে যাঁদের জায়গা হয় না, শহরের প্রান্তিক সেই মানুষরাও এসে জড়ো হয়েছিলেন একে একে।
সম্প্রতি, কপিলা ভেনু, প্রখ্যাত কুড়িয়াত্তম নৃত্যশিল্পী তাঁর নতুনতম সৃষ্টি ‘শৈব কুথু’ সবার সামনে আবারও তুলে ধরার জন্য আলিপুর সংশোধনাগার তথা অধুনা আলিপুর মিউজিয়ামের মতো অভাবনীয় এক জায়গা বেছে নিয়েছিলেন। নেপথ্যে, দ্য পিকল ফ্যাক্টরি।
কলকাতার শিরায় মিশে আছে শ্রমিকশ্রেণীর ঘাম-রক্ত-চোখের জল। তাই এমন একটা উদ্ভাবনী শক্তির নাম যে এমন কিছুই হবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রাখেননি ‘দ্য পিকল ফ্যাক্টরি’র স্রষ্টা বিক্রম আইয়েঙ্গার।