চিনে (China) উচ্চ বেকারত্ব (Unemployment ) তরুণদের মধ্যে ছদ্ম-কর্মসংস্থানের (Fake Jobs) প্রবণতা বাড়াচ্ছে—সামাজিক চাপ এড়াতে চলছে চাকরির ভান।

বেকারত্ব ঢাকতে মরিয়া চিনের তরুণ প্রজন্ম।
শেষ আপডেট: 12 August 2025 17:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চিনে তরুণদের বেকারত্ব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও এক নতুন সংকটের জন্ম দিচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানে বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম দেখালেও, বাস্তবে লাখ লাখ তরুণ চাকরি খুঁজে না পেয়ে ভিন্ন এক পথ বেছে নিচ্ছেন—‘চাকরির ভান’। পরিবার ও সমাজের চোখে ‘বেকার’ তকমা এড়াতে প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার মতো সাজগোজ করে বাসা থেকে বের হন তারা, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের কোনো চাকরি নেই।
শেনজেন, সাংহাই, নানজিং, উহান, চেংডু ও কুনমিংয়ের মতো বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ছে এই ‘ভান অফিসে যাওয়া’ সংস্কৃতি। অনেক তরুণ দিন কাটাচ্ছেন ক্যাফে, রেন্ট করা অফিস স্পেস বা বিশেষভাবে তৈরি ‘নকল অফিসে’। সেখানে রয়েছে ডেস্ক, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মিটিং রুম এমনকি লাঞ্চের ব্যবস্থাও।
ডংগুয়ানের ‘প্রিটেন্ড টু ওয়ার্ক কোম্পানি’-এর মালিক ফেইউ বলেন, “আমি কোনও অফিস ডেস্ক বিক্রি করি না, আমি বিক্রি করি মানুষের সম্মান বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ।” এসব নকল অফিসে একদিনের খরচ ৩০ থেকে ৫০ ইউয়ান পর্যন্ত হতে পারে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে চিনে ১৬–২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ২০.৪%, যা জুনে বেড়ে হয় ২১.৩%। একই বছরে প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও চাহিদা ও সরবরাহের ফারাক পরিস্থিতি আরও কঠিন করেছে।
প্রধান কারণ হল:
কোভিড-১৯ মহামারী ও দীর্ঘ লকডাউন, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধাক্কা দেয়।
কঠোর নিয়মকানুন, বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতা আইন।
শিক্ষা ও চাকরির বাজারের অসামঞ্জস্য, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা তরুণদের দক্ষতা বাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলে না।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ক্ষতি, যেখানে তরুণদের চাকরির সুযোগ বেশি থাকে।
সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি এই সংকট কাটিয়ে উঠতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিনা সমাজে কর্মহীনতা অনেকের কাছে লজ্জার বিষয়। আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের চোখে ‘ব্যর্থ’ না হতে অনেক তরুণ অভিনয় করছেন চাকরিজীবনের। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন অফিসে যাওয়ার ছবি, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখানোর জন্য ইন্টার্নশিপের ভুয়ো প্রমাণ পাঠাচ্ছেন।
৩০ বছর বয়সি শুই ঝোউ, যিনি ২০২৪ সালে ব্যবসায় ক্ষতির পর নকল অফিসে যাওয়া শুরু করেন, বলেন, "আমি এখন ভাল বোধ করি। সম্মান রক্ষার জন্য মিথ্যা বলা কখনও কখনও সত্যের চেয়েও বেশি কার্যকর।”
তবে এই বিষয়টির ব্যক্তিগত প্রভাব পড়ছে সকলের জীবনেই। মানসিক চাপ ও হতাশা বাড়ে, হারায় দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ। আর্থিক চাপ বাড়ে, কারণ নকল অফিসের খরচও নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়। সামাজিক প্রভাবও কম নয়। দেশের অর্থনীতির ওপর আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এর পাশাপাশি, গ্রামে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে তরুণদের মধ্যে, যা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে অর্থনীতি পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। ধর্মীয় আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধিও এর সঙ্গেই জড়িয়ে। কারণ অনেকে চাকরি ও সাফল্যের জন্য মন্দিরে ভিড় করছেন।
চিন সরকার যুব বেকারত্ব কমাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় ভর্তুকি দিচ্ছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে তরুণদের নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। চালু করেছে ‘গ্রামাঞ্চলে ফেরা আন্দোলন ২.০’, যেখানে কলেজ শিক্ষার্থীদের গ্রামীণ উদ্যোগে পাঠানো হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সমস্যা অন্তত আগামী এক দশক স্থায়ী হতে পারে। চায়না ম্যাক্রো ইকোনমি ফোরামের এক যৌথ প্রতিবেদন বলছে—শক্তিশালী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান নেই। ভ্যানগার্ডের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান অর্থনীতিবিদ কিয়ান ওয়াং সতর্ক করেছেন, খুচরা বিক্রি ও রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগের দুর্বলতা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে আটকে দিচ্ছে।