
শেষ আপডেট: 2 January 2024 18:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মনে বিষাদের ছায়া জমলে হৃদয়ও ভেঙে খান খান হবে!
এখনকার সেডেন্টারি লাইফস্টাইলে মানুষের মন-মেজাজ আর বশে থাকছে না। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার কয়েক মন ভারী পাথর চেপে বসছে মনে। অন্দরবাসে হৃদয় যেন ছটফট করছে মুক্তি চেয়ে। মাথা ঘুরছে, চোখের সামনে জগৎ-সংসার দুলছে, এই বুঝি হার্ট অ্যাটাক হয়।
মন আর মাথায় ঠিক বাজ পড়ার মতো জোর একটা ঝটকা। চোখের সামনে লহমায় সব অন্ধকার। বুকে চিনচিনে ব্যথা। মাথার দু’পাশে প্রচণ্ড দপদপানি। ডাক্তাররা বলছেন, হৃদয় ভেঙেছে। ডাক্তারি ভাষায় পোশাকি নাম ‘ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম’।
গবেষণা বলছে, প্রেমের সাগরে ডুব দিয়েছেন এমন মানুষের মস্তিষ্কে ‘ডোপামাইন’ হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ভালবাসায় আঘাত পাওয়া বা মন ভাঙার পোশাকি নাম ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম বা ‘তাকাতুবো’। গবেষণায় বলা হয়েছে, এই রোগ নাকি মহিলাদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। মনোবিদদের মতে, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হওয়ার কারণেই হয়তো মেয়েদের মনে আঘাত লাগে বেশি।
হৃদয় ভেঙেছে মানে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোমে হার্ট অ্যাটাকই যে হবে সবক্ষেত্রে এমনটা নয়। জটিল হার্টের রোগ চোখ রাঙিয়ে তেড়ে আসবে তেমনটাও নয়। হৃদয় ভাঙে মনের চাপে। প্রচণ্ড অবসাদ আর স্ট্রেসে। ডাক্তারি পরিভাষায় একে ‘স্ট্রেস কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ বলে। হার্ট ব্লক হয়ে বা হার্টে রক্ত জমাট বেঁধে এই রোগ হয় না। এই সিন্ড্রোমের বেশিটাই মনের ব্যাপার। মন যদি চিন্তায় চাপে দুমড়ে মুচড়ে যায়, তাহলে সে দুঃখে হৃদয়ও খানখান হয়ে যায়। অর্থাৎ হার্টের উপর চাপ পড়ে। সাময়িকভাবে হলেও একটা ঝটকা লাগে শরীরে।
ভয় বা আতঙ্কেও হৃদয়ে আঘাত লাগতে পারে। বিজ্ঞানীরা উদাহরণ দিয়ে বলছেন, যদি বাঘে তাড়া করে, তাহলে অ্যাড্রেনাল মেডুলা অ্যাড্রিনালিন হরমোন ক্ষরণ করবে। এই অ্যাড্রিনালিন হার্টের সেলগুলোকে নাড়া দেবে। বেড়ে যাবে হার্ট রেট। হার্ট তখন অনেক বেশি ক্যালসিয়াম ক্ষরণ করবে। তখন অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত প্রবাহিত হবে ধমনীতে। পায়ের পেশিগুলোতে অক্সিজেন প্রবাহ বাড়বে। ফলে দৌড়ের গতিও বাড়বে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মনের উপর চাপ বা আতঙ্ক, ভয়, স্ট্রেস হার্টে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অতিরিক্ত স্ট্রেস বা অবসাদে হার্টের গতিও থমকে যেতে থাকে।
ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোমকে ‘টাকো-টু-সুবো কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ বা ‘স্ট্রেস-ইনডিউসড কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ বলা হয়। সোজা কথায় বলতে গেলে, স্ট্রেসের কারণে যদি হৃদপিণ্ডে প্রভাব পড়ে, হার্টের গতি কখনও সটান উপরে আবার কখনও একেবারে নিচে নেমে যায় তাহলে বলা যেতে পারে হৃদয় ভাঙা শুরু হয়ে গেছে। অনেকেই ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম মানে হার্ট অ্যাটাক ভেবে বসেন। সেটা সবসময় নাও হতে পারে। তবে হ্যাঁ, মানসিক চাপের কারণে যদি রক্তের চাপ লাগামছাড়া হয়ে যায় তাহলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থেকে যায়।
ডাক্তাররা বলছেন এই ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম একদিনে হয় না। দীর্ঘ সময় ধরেই যদি উদ্বেগের পাথর জমতে থাকে মনে, তাহলে তার চাপে একদিন হৃদয় সাড়া দেয়। অনেক সময় দেখা যায় প্রেম ভাঙলে, কাছের মানুষের মৃত্যু হলে বা বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যাদি কারণেও ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়েছে রোগী। মনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন ঘটনাও ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোমের জন্য দায়ী।
রোগ বাসা বাঁধে ধীরে ধীরে, তার বহিঃপ্রকাশ হয় আচমকাই। শুরুটা হতে পারে বুকে ব্যথা দিয়ে। অনেক রোগীই বলেছেন তাঁরা হঠাৎ করেই বুকে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করতে শুরু করেন, মনে হয় বুক ধড়ফড় করছে। হৃদগতি বেড়ে গেছে। শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে, দমবন্ধ হয়ে আসছে। তারপর আচমকাই ব্ল্যাক আউট। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। জ্ঞান হারানো এই রোগের আরও একটা লক্ষণ। অনেকেরই রক্ত চাপ হঠাৎ করে কমে যেতেও দেখা যায়। কার্ডিওজেনিক শক লাগে হার্টে অর্থাৎ স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন বাধা পায়, স্ট্রেস হরমোন হৃদপেশিতে প্রভাব ফেলে। এই অবস্থা কিছুক্ষণের জন্য সাময়িকভাবেও হতে পারে আবার এর রেশ কয়েকদিন বা টানা কয়েক সপ্তাহ থাকতে পারে।
মহিলাদের মন বেশি ভাঙে?
গবেষণা বলছে, মেনোপজ হয়ে গেছে এমন মহিলাদের ক্ষেত্রে এই রোগের ঝুঁকি বেশি। অনেকসময়েই ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, রক্ত পরীক্ষায় এই সিন্ড্রোম ধরা পড়ে না। হার্ট অকেজো হয়ে পড়ে এমনটাও দেখা যায় না। ডাক্তাররা বলছেন, ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম সারে খুব তাড়াতাড়ি। ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগানো যায়। তার জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে কাউন্সেলিং করাতে হয়। তবে সবচেয়ে বড় থেরাপি হল নিজের খেয়াল রাখা। মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত যোগ ব্যায়াম বা মেডিটেশন করা। যত বেশি মন খুলে কথা বলা যাবে ততটাই ভাল। কোনও কারণে উৎকণ্ঠায় ভুগলে সবার সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত। মনের মধ্যে উদ্বেগ পুষে রাখলেই বিপদ। রোগ ক্রনিক হয়ে গেলে তার প্রকাশও সাঙ্ঘাতিক হবে। হৃদয় শুধু ভাঙবেই না একেবারে তছনছ হয়ে যাবে। তখন সেই ভাঙা হৃদয়কে জোড়া লাগানো মুশকিল হয়ে পড়বে।