পুজোর ভিড়ের মাঝেও দৃষ্টিহীন স্বপ্না দাস সাবওয়েতে গান শুনিয়ে, পেন বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁর সংগ্রাম ও অনুপ্রেরণামূলক কাহিনি অনেকের অনুপ্রেরণা।

এআই দিয়ে তৈরি ছবি
শেষ আপডেট: 26 September 2025 15:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে, এই কথা আজ অনেকটাই পরিচিত। সংসার সামলে চাকরি করা নতুন কথা নয়। মিলেনিয়াল, জেন জি-দের বেশিরভাগই এই প্রবাদ প্রমাণ করেছেন। কিন্তু বার বার হেরে যাওয়া, উঠে দাঁড়ানো, আবার পড়ে যাওয়া এবং তাও প্রতিবন্দ্বী অবস্থায়, এমন নিদর্শন কার্যত বিরল। লড়াই কম-বেশি সকলেরই থাকে, আর পাঁচটা লড়াইয়ের চেয়ে স্বপ্না দাসের বেঁচে থাকার কষ্টগুলো একটু আলাদা।
দমদম রেল স্টেশনের শিয়ালদহ-মুখী সাবওয়ে। মাঝে কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও বসে থাকেন স্বপ্না দাস। প্রবল বৃষ্টি, রোদ, ঝড়, ধাক্কাধাক্কি, কিছুই তাঁকে টলাতে পারে না। ঠায় একই জায়গা থেকেই স্বপ্ন বুনে চলেছেন। চোখে দেখেন না, হাজারো প্রতিবন্ধকতা। তাতে কী! হাত-পা আছে, সংসার আছে, কাজ তো করতেই হবে।
হাতের সাদা ব্যাগে ভরা রুমাল-পেন, ভাঙা গলায় অনুরোধ করে চলেছেন, 'ও ভাই, ও মা, একটা রুমাল নাও না! একটা পেন নাও অন্তত!' পুজো তাঁর জীবনেও এসেছে, আসে যেমন প্রতি বছর। কিন্তু ছুটি নেই। একদিন ছুটি মানেই তো পেটের ভাত জোগাতে হিমশিম অবস্থা। মস্ত টানাটানির সংসার। আর ভার কে জোগাবে?
বাড়িতে ছেলে-মেয়ে, স্বামী রয়েছেন। স্বামীও প্রতিবন্ধী, ফলে সংসারের হাল তাঁর হাতেই। কাউকে জোর করেন না তাঁর থেকে কিছু কেনার জন্য। যদি ইচ্ছে হয় সংগ্রহ করতে পারেন। তাঁকে ভালওবাসেন তাই সকলে।
প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাবওয়েতে এসে ব্যাগপত্র খুলে বসেন। দ্রুতগতির ট্রেন এবং পথচারীদের ব্যস্ততার মাঝেই তিনি জিনিসপত্র ফেরি করে চলেন। বিক্রি ভাল হলে বাড়ির লোকেদের ভাল খাবার দাবার জোটে। আর না হলে সবটা ফিকে হয়ে যায়!
কেমন বিক্রি বাট্টা হয় পুজোর সময়? স্বপ্না দাসের কথা, 'পুজোর সময় বৃষ্টি হলে সমস্যা বাড়ে, আসলে এখনই তো বেশি ভিড়, কিন্তু যা বৃষ্টি চলছে, তাতে কী হবে জানি না। সব সময় বিক্রিও সমান হয় না।'
গত পুজোর স্মৃতি তাঁকে এখনও তাড়া করে বেড়ায়। ১০ হাজার টাকার জিনিস এনে পসরা সাজিয়েছিলেন। ব্যাগ রেখে একটু সরতেই কেউ সেটা নিয়ে যায় চুরি করে। বলতে বলতে কেঁপে ওঠে মহিলার গলা, 'চোখে দেখি না বলে সুযোগ নিল। খুব কেঁদেছিলাম সেদিন...।'
থেমে থাকা তাঁর কাজ নয়। ক্ষত সারিয়ে তাই আবার সাবওয়েতে দাঁড়িয়ে গান শুনিয়ে, জিনিস বেচে লড়াইয়ে ফেরেন। পায়ের মাটি সরে গেলেও চুপ করে বসে থাকতে জানেন না এই মহিলা। তাঁর জেদের কাছে হার মানে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা।
অনেকে দেখে ভাবেন ভিক্ষুক, কিন্তু ভিক্ষা তিনি মোটেও করেন না। করুণা তাঁর পছন্দ নয়। বলেন, 'মায়ের কাছে কোনও জিনিস চাই না, শুধুই চাই লড়াই করার শক্তি। ব্যাস, বাকিটা হয়ে যাবে।'