লাল বিহারীর জীবনের এই অদ্ভুত অথচ সত্যি গল্প মনে করিয়ে দেয়, কাগজের খাতায় নাম না থাকলেই মানুষ মরে যায় না, আর নথিতে মৃত হয়ে গেলেও লড়াই করে আবার জীবিত হওয়া যায়।
.jpeg.webp)
‘মৃতক’ লাল বিহারী
শেষ আপডেট: 28 August 2025 17:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পর্দায় পঙ্কজ ত্রিপাঠী যখন কাগজ ছবিতে এক মৃত ঘোষিত মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, দর্শক কখনও হেসেছিলেন, কখনও চোখের জল ফেলেছিলেন, আবার কখনও মাথা নেড়েছিলেন অবিশ্বাসে। কিন্তু সিনেমার পর্দার ওই অদ্ভুত কাহিনির আড়ালে ছিল এক বাস্তব লড়াই, উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলার চাষি লাল বিহারী ‘মৃতক’-এর ১৮ বছরের সংগ্রাম, নিজের অস্তিত্ব ফের প্রমাণ করার জন্য।
১৯৭৬ সালের ৩০ জুলাই। সরকারি রেকর্ডে ‘মৃত’ বলে চিহ্নিত করা হয় লাল বিহারীকে। অথচ তিনি তখন দিব্যি বেঁচে আছেন। এ খবর নিজে তিনি জানতে পারেন অনেক পরে। একদিন ব্যাঙ্ক ঋণ নিতে গিয়ে বুঝলেন, সরকারি নথিতে তিনি বেঁচে নেই! জমির কাগজ চাইতে গেলে জানানো হল, তাঁর নাম কেটে দেওয়া হয়েছে, জমি চলে গিয়েছে কাকার দখলে।
আসলে কাকা জমি দখল করতে ভুয়ো ঘোষণা করেছিলেন যে ভাগ্নে মারা গিয়েছে। সেদিন থেকেই শুরু হয় এক অসম লড়াই, জীবিত থেকেও প্রমাণ করতে হবে যে তিনি মৃত নন।
এরপর শুরু হয় লাল বিহারীর অদ্ভুত সব প্রতিবাদ। তিনি নিজের নামের সঙ্গে জুড়ে নেন ‘মৃতক’ উপাধি। একসময় কাকার ছেলেকে অপহরণ করেন, ভেবেছিলেন পুলিশের খাতায় নাম উঠলেই প্রমাণ হবে তিনি জীবিত। কখনও আবার লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হন ‘মৃতক’ পরিচয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রাজীব গান্ধী, ভি পি সিং-এর মতো নেতাদের। এমনকি নিজের স্ত্রী করমি দেবীর নামে বিধবা ভাতা চেয়ে আবেদনও করেছিলেন তিনি, সরকারি উদাসীনতাকে ব্যঙ্গ করতে।
১৯৮৯ সালে সরাসরি ঢুকে পড়েন উত্তরপ্রদেশ বিধানসভায়। চিৎকার করতে থাকেন, 'আমাকে জীবিত ঘোষণা করো।' অবশেষে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। ১৯৯৪ সালের ৩০ জুন সরকারি খাতায় ফের তাঁকে জীবিত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
কিন্তু তাতেই লড়াই শেষ হয়নি। ২০১৮ সালে লখনউ হাইকোর্টে মামলা করেন লাল বিহারী, ১৮ বছর মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২৫ কোটি টাকা দাবি জানান। এর পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষের একই দূরাবস্থার কথা সামনে আসতে শুরু করে।
জমি দখলের জন্য ভুয়ো মৃত্যু ঘোষণার শিকার হয়েছেন আরও বহু গরিব মানুষ। তাঁদের নিয়েই লাল বিহারী তৈরি করেন ‘মৃতক সংঘ,’ মৃত জীবিতদের সংগঠন। উত্তরপ্রদেশেই সদস্য সংখ্যা ২১ হাজারেরও বেশি।
এত লড়াইয়ের পর লাল বিহারী আজ আশার প্রতীক। ২০২৪ সালে তিনি ফের বিয়ে করেন তাঁর স্ত্রী করমি দেবীকে, গ্রামের বাড়িতে। আর তাঁর এই অদম্য লড়াই উঠে এসেছে পর্দায়ও।
প্রয়াত অভিনেতা-পরিচালক সতীশ কৌশিক কাগজ ছবিতে তাঁর কাহিনি তুলে ধরেছিলেন। আরও একটি বায়োপিকের পরিকল্পনাও ছিল, 'নাম ম্যায় জিন্দা হুঁ।'
লাল বিহারীর জীবনের এই অদ্ভুত অথচ সত্যি গল্প মনে করিয়ে দেয়, কাগজের খাতায় নাম না থাকলেই মানুষ মরে যায় না, আর নথিতে মৃত হয়ে গেলেও লড়াই করে আবার জীবিত হওয়া যায়।