এ বছরের শুরুতে একটি ঐতিহাসিক তদন্তে উঠে এসেছে, কোরিয়ার একাধিক সরকার বেসরকারি এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক শিশুকে বিদেশে দত্তক দেওয়ার প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।

ছবিটি প্রতীকী
শেষ আপডেট: 25 May 2025 10:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাজারে গিয়ে হারিয়েছিলেন মেয়েকে। এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে ফিরে পেলেন ৪৪ বছর পর। কিন্তু যাকে কাছে পেলেন, তাঁর এখন আলাদা ঘর-সংসার। ফলে কাছে পেয়েও যেন পাওয়া হল না। এর প্রেক্ষিতে হল মামলাও।
ঘটনাটি দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিওলের। ১৯৭৫ সালের মে মাসে। হান তে-সুন নামের ওই মহিলা মেয়েকে পাশের বাড়িতে রেখে বাজারে গিয়েছিলেন। খুব দূরে বাজার নয়, ফলে দ্রুতই ফিরেছিলেন কিন্তু মেয়েকে আর দেখতে পাননি। হন্যে হয়ে খুঁজেও কোথাও পাওয়া যায়নি তাকে। পুলিশ-আদালত, সবই বিফলে যায়। মেয়ে কিয়ং হার যে কোথায় গেল, তা ভাবতে ভাবতেই অনেকগুলো বছর কেটে যায়।
একসময় যখন প্রায় সব আশা শেষ, তখন ২০১৯ সালের শুরুর দিকে এক সংস্থা, যারা মূলত ডিএনএ মিলিয়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষকে কাছে এনে দেয়, তাদের সাহায্য আশা আলো দেখতে পান হান তে-সুন। ‘৩২৫ কামরা’ নামে ওই সংস্থার মাধ্যমে ডিএনএ মেলানোর প্রক্রিয়ায় অংশ নেন তিনি। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে হান তে-সুনের সঙ্গে লরি বেন্ডার নামে একজন নার্সের মিল পাওয়া যায়। যিনি বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকেন। কয়েক দফা ফোনালাপ ও পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর লরি কোরিয়ায় উড়ে যান দক্ষিণ কোরিয়ায়। তারপর সিওলে মা-মেয়ের দেখা হয় ৪৪ বছর পর।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হান বলেন, 'আমি ৩০ বছর ধরে হেয়ারড্রেসার পেশার সঙ্গে যুক্ত। চুল ছুঁয়ে বলে দিতে পারি কার। তাই সহজেই বলে দিতে পারি এটা আমার মেয়ে কি না। এর আগেও একবার ভুল করেছিলাম, তাই এবার স্পর্শ করে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম।'
দেখা হওয়ার পর তাঁরা একে একে ঘটনাগুলো জোড়া লাগাতে শুরু করেন। লরি, যিনি ছোটবেলায় কিয়ং ছিলেন, জানান, এক অচেনা মহিলা ওইদিন এসে তাঁকে বলেছিলেন তাঁর মা আর তাঁকে চায় না। এই শুনে ছোট্ট কিয়ঙের খুব স্বাভাবিকভাবে মন খারাপ হয়। তখন ওই মহিলা কিয়ংকে রেলস্টেশনে নিয়ে যান। এরপর ট্রেন ধরে কোথাও একটা নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে এবং একটি অনাথ আশ্রমে পাঠায়। এরপর তাঁকে আমেরিকায় পাঠানো হয় এবং ভার্জিনিয়ার এক দম্পতি দত্তক নেয়।
গোটা ঘটনা শোনার পর তাজ্জব হয়ে যান হান তে-সুন। তিনি মেয়েকে ফিরে পেতে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের কাছে আবেদন জানান। একটি মামলাও করেন। সরকারের বিরুদ্ধে মেয়েকে জোর করে আলাদা করা এবং অবৈধভাবে বিদেশে দত্তক পাঠানোর অভিযোগ এনেছেন তিনি। মনে করা হচ্ছে, এটি দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে প্রথম মামলা, যেখানে বিদেশে দত্তক প্রক্রিয়া নিয়ে সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। হান বলেন, 'আমি ৪৪ বছর ধরে নিজের শরীর-মন শেষ করে মেয়েকে খুঁজেছি। কিন্তু কোনওদিন কেউ ক্ষমা চেয়েছে? একবারও না।'
এ বছরের শুরুতে একটি ঐতিহাসিক তদন্তে উঠে এসেছে, কোরিয়ার একাধিক সরকার বেসরকারি এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক শিশুকে বিদেশে দত্তক দেওয়ার প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। সেই তদন্তে বলা হয়েছে, শিশুদের বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানি করা হয়েছিল, যা একেবারে অমানবিক এবং বেআইনি। এই ঘটনাও তারই অংশ কিনা তা সময় বলবে।
তবে, এই ঘটনার জেরে দক্ষিণ কোরিয়ার শিশুদের বিদেশে দত্তক দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।