
শেষ আপডেট: 10 January 2024 14:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেনস্ট্রিমের বাইরে হলেও ‘টুয়েলভথ ফেল’ ঢি ঢি ফেলে দিয়েছে টিনসেল টাউনে। ওটিটিতেও রিলিজ করেছে। বিক্রান্ত ম্যাসির অভিনয় মুগ্ধ করেছে দেশকে। যাঁর জীবনী নিয়ে বিধু বিনোদ চোপড়ার এই সিনেমা সেই ডাকাবুকো আইপিএস অফিসার মনোজ কুমার শর্মার লড়াই সহজ ছিল না। স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে অন্ধকারে শুয়েছেন, রাস্তায় ভিখারিদের পাশেও থেকেছেন, টয়লেট পরিষ্কার করেছেন, বারবার ব্যর্থ হয়েও লড়াই থামাননি। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আইপিএস হওয়ার লক্ষ্য তাঁকে একসময় টেনে নিয়ে গেছে সাফল্যের দিকে। বিক্রান্ত ম্যাসি এমন লড়াকু মানুষের জীবনের কঠিনতম পর্যায়গুলো খুব পরিণতভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন।
'জিততে গেলে লড়তে হবে’—আইপিএস মনোজ কুমার শর্মা জীবনবোধ এটাই। দ্বাদশের পরীক্ষায় টুকলি করেননি। তাই পাশও করতে পারেননি। তাঁর গ্রামে দ্বাদশ ফেল ছেলেদের জীবনের পরিণতি তাঁর ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। টুকলি বন্ধ করে গ্রামে মহকুমা শাসকের নির্দেশে অভিযান চলেছিল। মনোজ ও তাঁর ভাইয়ের অটোকে আটক করা হয়।
অটো ছাড়াতে মহকুমা শাসকের অফিসে যান মনোজ। তাঁর আশা ছিল, মহকুমা শাসকই পারবেন, সাহায্য করতে। কারণ এই মহকুমা শাসকই গ্রামের নেতাদের তোয়াক্কা না করেই বোর্ড পরীক্ষায় নকল করে পরীক্ষা দেওয়া বন্ধ করে দেন। তবে মহকুমা শাসকের কাছে গিয়ে আর অটো ছাড়ানো নিয়ে কথা হয়নি। বরং ওই সাক্ষাৎই বদলে দেয় মনোজের জীবনের গতিপথ।
সৎ পথে থেকেই জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার অদম্য বাসনা চেপে বসে তাঁর মন ও মস্তিষ্কে। কোনও অসাধু কাজ করতে দেবেন না, অন্যায় বন্ধ করবেন, আইনের পথে থেকেই আইনকে বদলাবেন—এই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাই প্রত্যন্ত গ্রামের হিন্দি মিডিয়ামে পড়া ছেলে স্বপ্ন দেখেন একদিন সাহসী আইপিএস অফিসার হবেন। কঠিনতম সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ইউপিএসসি-র ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে তিনি সফল হবেন।
পরিবারের নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে শহরে আসেন মনোজ। পথে অনেক বাধা পার হতে হয়। গোয়ালিয়রে পৌঁছে টেম্পো চালিয়ে, ছোটখাট কাজ করে নিজের লড়াই শুরু করেন। পরিবারে অভাব। তাই একদিকে রোজগার, অন্যদিকে পড়াশোনা—এই দুইই হয়ে ওঠে তাঁর লক্ষ্য। মনোজের জীবন যে চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল তার প্রতিটা মুহূর্ত বর্ণনা করে বই লিখেছিলেন তাঁরই বন্ধু অনুরাগ পাঠক। ‘টুয়েলফথ ফেল, হারা ওহি জো লড়া নেহি’-তে অনুরাগ লিখেছেন, গোয়ালিয়রে এতটাই কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে মনোজকে যেতে হয়েছিল, যে সেই সময় তাঁর মাথার উপর ছাদটুকুও ছিল না। ফুটপাথে ভিখারিদের সঙ্গেও ঘুমাতে হয়েছে তাঁকে। এক সময় লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিতে কাজ করেন। সেখানে পিয়নের কাজ থেকে টয়লেট পরিষ্কার—সবই করতে হয়েছে তাঁকে। এই লাইব্রেরিতে কাজ করার সময় প্রচুর বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন মনোজ কুমার শর্মা। গোয়ালিয়র থেকে একসময় মনোজ চলে আসেন দিল্লিতে।
শোনা যায়, দিল্লিতে এক ধনী পরিবারের কুকুরের দেখভালের কাজ করতেন তিনি। তবে লড়াই বন্ধ হয়নি। রোজগারের টাকা বাড়িতে পাঠাতেন, পড়াশোনাও করতেন। প্রথম প্রচেষ্টাতেই প্রিলিমিনারি পরীক্ষা উতরে যান। কিন্তু সমস্যা হয় মেইন পরীক্ষায়। দিনে ১৫ ঘণ্টা কাজ, রাতভর পড়াশোনা, মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা ঘুমে শরীর ভাঙছিল মনোজের। তাই মেইন পরীক্ষায় বিপুল চাপ নিতে পারেননি। পরপর তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পর চতুর্থবারের চেষ্টায় সফল হন তিনি। প্রথম থেকে মনোজ কুমার শর্মাকে প্রতি পদক্ষেপে সমর্থন করেছিলেন তাঁর প্রেমিকা, যিনি এখন বর্তমানে আইআরএস অফিসার।
২০০৫ সালে মহারাষ্ট্র ক্যাডারের আইপিএস হন মনোজ। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হিসাবে মহারাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে নিযুক্ত হন। মনোজ বলেন, “তাঁর জীবনে দু’জনের বই খুব প্রভাব ফেলেছিল। এক জন হলেন ম্যাক্সিম গোর্কি এবং অন্য জন হলেন, আব্রাহম লিঙ্কন। আর এই দু’জনের ভাবধারাই আমার জীবন বদলে দিতে সাহায্য করেছিল।”