
শেষ আপডেট: 23 August 2020 05:18
রূপাঞ্জন গোস্বামী
অপারেশন ব্লুস্টারের বদলা হিসেবে শিখ উগ্রপন্থীরা ১৯৮৮ সালে দখল করে নিয়েছিল অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল স্বর্ণমন্দিরকে দখলমুক্ত করার জন্য চালানো হবে মিলিটারি অপারেশন 'ব্ল্যাক থান্ডার-টু'। এর আগে ১৯৮৪ সালে অপারেশন ব্লুস্টারে নিহত হয়েছিল ৪৮৯ জন শিখ উগ্রপন্থী ও আটক থাকা দর্শনার্থী। সেই অভিযানে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৮৩ জন সেনা ও পুলিশ জওয়ান। উগ্রপন্থীদের বিষয়ে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ না করে অপারেশন চালাতে গিয়ে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার। [caption id="attachment_252606" align="aligncenter" width="600"]
স্বর্ণমন্দির[/caption]
১৯৮৮ সালেও ঘটেছিল একই ঘটনা। জঙ্গিদের বিস্তারিত তথ্য রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ছিল না। অথচ 'ব্ল্যাক থান্ডার-টু' অপারেশন শুরু করার আগে, জানা দরকার জঙ্গিদের সংখ্যা, অস্ত্রশস্ত্রের পরিমাণ ও স্বর্ণমন্দির চত্বরে তাদের সঠিক অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য। সমস্যা ছিল আরও এক জায়গায়। জঙ্গিরা স্বর্ণমন্দিরের ভেতর আটকে রেখেছিল বেশ কিছু দর্শনার্থীকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রোমানিয়ার কূটনীতিক লিভিউ রাদু। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যখন স্বর্ণমন্দিরের ভেতরের তথ্য সংগ্রহ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ঠিক সেই সময় স্বর্ণমন্দিরের সামনের রাস্তায় একজন অচেনা রিক্সাওয়ালার আবির্ভাব হয়েছিল।
[caption id="attachment_252582" align="aligncenter" width="473"]
স্বর্ণমন্দির দখল করে নেওয়া জঙ্গিরা।[/caption]
অচেনা লোক দেখে সতর্ক হয়ে গিয়েছিল জঙ্গিরা। দিন দশেক নজরে রাখার পর রিক্সাওয়ালাকে জঙ্গিরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল স্বর্ণমন্দিরের ভেতর। ভারতীয় সেনার গুপ্তচর হিসেবে অত্যাচার শুরু করেছিল। কিন্তু রিক্সাওয়ালা চোস্ত উর্দুতে জানিয়েছিল সে পাকিস্তানের এজেন্ট। ভারতীয় সেনার নজর এড়াতেই রিক্সাওয়ালার ছদ্মবেশ নিয়ে এলাকায় ঢুকেছে সে। খালিস্তানি আন্দোলনকে সাহায্য করার জন্য পাকিস্তানের আইএসআই পাঠিয়েছে তাকে। লুঙ্গি কুর্তা পরা রিক্সাওয়ালা এরপর পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গা, শিখ মহল্লা ও গুরুদ্বারের বিশদ বিবরণ দিয়েছিল। আইএসআই-এর শীর্ষে থাকা কিছু লোকের নাম বলেছিল। শিখ উগ্রপন্থীরা বিশ্বাস করে নিয়েছিল রিক্সাওয়ালা পাকিস্তানেরই মানুষ ও আইএসআই এজেন্ট। তারা রিক্সাওয়ালাকে নিয়ে স্বর্ণমন্দির চত্বর ঘুরে দেখিয়েছিল। দেখিয়ে ছিল কীভাবে ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে তারা।
১৯৮৮ সালের ৯ মে, পাঞ্জাব পুলিশের প্রধান কেপিএস সিং গিলের নেতৃত্বে শুরু করেছিল 'অপারেশন ব্ল্যাক থান্ডার-টু'। অপারেশনটি চলেছিল ১৮ মে পর্যন্ত। অপারেশনে প্রাণ হারিয়েছিল একচল্লিশ জন উগ্রপন্থী। আত্মসমর্পণ করেছিল দুশো জন। অপারেশন শুরু হওয়ার মুহূর্তে উধাও হয়ে গিয়েছিল সেই আইএসআই এজেন্ট। মন্দির চত্বরে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্বর্ণমন্দিরের ভেতর থেকে উগ্রপন্থী সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য পাঞ্জাব পুলিশকে নিখুঁতভাবে সরবরাহ করার পর, অপারেশনের দিন অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিলেন, রিক্সাওয়ালার ভেক ধরা ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর অফিসার অজিত ডোভাল।
কেরালা ক্যাডারের আইপিএস
উত্তরাখন্ডে আছে অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পৌড়ি গাড়োয়াল। জেলাটির প্রত্যন্তে লুকিয়ে আছে আছে ঘিরি বানেলসিউন গ্রাম। ১৯৪৫ সালের ২০ জানুয়ারি, গ্রামটিতে জন্মেছিলেন ভারতের বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত কুমার ডোভাল। বাবা গুণানন্দ ডোভাল ছিলেন সেনাবাহিনীর মেজর। খুব বেশিদিন গ্রামে থাকার সুযোগ হয়নি অজিত ডোভালের। শৈশবেই চলে গিয়েছিলেন আজমেঢ়। ভর্তি হয়েছিলেন কিং জর্জ রয়াল ইন্ডিয়ান মিলিটারি স্কুলে। স্নাতক স্তর পর্যন্ত সেখানেই পড়াশুনা করার পর, ১৯৬৭ সালে আগ্রা ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিক্সে মাস্টার ডিগ্রি করেছিলেন।
স্নাতক হওয়ার পর থেকেই পড়াশুনা শুরু করেছিলেন আইপিএস হওয়ার জন্য। ১৯৬৮ সালে সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় পাশ করে কেরালা ক্যাডারের আইপিএস হিসাবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ডোভাল। কোট্টায়ামের অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপারের পদে প্রথম পোস্টিং ছিল তাঁর। সেই সময়ে একা হাতে থামিয়ে দিয়েছিলেন থ্যালাইসারির দাঙ্গা। পরবর্তীকালে যোগ দিয়েছিলেন ইন্টালিজেন্স ব্যুরোতে। ভারতের সর্বকনিষ্ঠ আইপিএস হিসেবে পুলিশ পদক পেয়েছিলেন ডোভাল। পেয়েছিলেন 'প্রেসিন্ডেন্ট পুলিশ পদকও। তিনিই ভারতের প্রথম পুলিশ অফিসার যিনি কীর্তিচক্র সম্মান পেয়েছিলেন। তাঁর আগে পদকটির প্রাপকেরা ছিলেন সেনাবাহিনীর অফিসার।
মোট সাঁইত্রিশ বছর পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীতে কাজ করার পর, ২০০৫ সালে অবসর গ্রহণ করেছিলেন ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর চিফ হিসেবে। এই সাঁইত্রিশ বছরের মধ্যে উর্দি গায়ে চাপিয়েছিলেন মাত্র সাত বছর। বাকি তিরিশ বছর কখনও কুর্তা পাজামা, কখনও লুঙ্গি পাঞ্জাবি, কখনও অন্য কোনও পোশাকে মিশে গিয়েছিলেন জনসমুদ্রে। ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর আন্ডারকভার এজেন্ট হিসেবে ভারত ও বিদেশে গোপন মিশন চালিয়েছেন যুগের পর যুগ। অজিত কুমার ডোভাল হয়ে উঠেছেন ভারতের একমাত্র সুপার স্পাই। যাঁর মুকুটের পালকগুলি আজ কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছে।
■ মিশন নর্থ ইস্ট (১৯৮৬)
■ মিশন নর্থ ইস্ট (১৯৮৬)
১৯৬৬ সাল থেকে মিজোরামে শুরু হয়েছিল মিজো বিদ্রোহ। মিজো বিদ্রোহ যখন মধ্যগগনে, অজিত ডোভাল তখন ভারতের উত্তর-পূর্বে, ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর মাঝারি মাপের অফিসার। মিজো ন্যাশনাল ফন্টের অবিসংবাদী নেতা লালডেঙ্গাকে কিছুতেই শান্তি চুক্তিতে সই করানো যাচ্ছিল না। এগিয়ে এসেছিলেন অজিত ডোভাল। লালডেঙ্গা তখন ঘাঁটি গেড়েছিলেন মায়ানমারের আরাকান এলাকার পার্বত্য অঞ্চলে। জঙ্গল পাহাড় পেরিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অজিত ডোভাল পৌঁছে গিয়েছিলেন জঙ্গিদের ক্যাম্পে। মিজো নেতাকে রাজি করানোর জন্য।
জঙ্গিদের ক্যাম্পে কাটিয়েছিলেন বেশ কিছু দিন। পরের কাহিনি শুনুন খোদ লালডেঙ্গার মুখ থেকে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "ক্যাম্পে আমার সঙ্গে ছিল মিজো ন্যাশনাল ফন্টের সাত বিশ্বস্ত কমান্ডার। অজিত ডোভাল ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সময় আমার সাত কমান্ডারের মধ্যে ছ'জনই চলে গিয়েছিল অজিত ডোভালের সঙ্গে। আমার কাছে আর কোনও উপায় ছিল না। চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হয়েছিলাম।" অজিত ডোভাল লালডেঙ্গাকে নির্বিষ করে দেওয়ার পর, ১৯৮৬ সালের জুলাই মাসে হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক চুক্তি। নিভেছিল কুড়ি বছর ধরে চলা বিদ্রোহের আগুন। লালডেঙ্গা হয়েছিলেন মিজোরামের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী।
কুকা পারে[/caption]
লাহোরের এরকমই কোনও মহল্লায় অজ্ঞাতবাসে ছিলেন দোভাল।[/caption]
অজিত ডোভাল জাতীয়স্বার্থে অজ্ঞাতবাসের দিনগুলির কথা কখনও বিস্তারিতভাবে জানাননি। তবে একটি ঘটনার কথা তিনি উল্লেখ করেছিলেন। অজ্ঞাতবাসকালে একবার প্রায় ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছিলেন ডোভাল। একদিন তিনি মসজিদে নামাজ পড়ে ফিরছিলেন। মসজিদের বাইরে বসেছিলেন বৃদ্ধ মৌলবী। তিনি ডেকেছিলেন অজিত ডোভালকে। নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর ঘরে। দরজা বন্ধ করে বলেছিলেন, 'তুমি হিন্দু'। চমকে উঠেছিলেন অজিত ডোভাল। মৌলবীকে দোভাল বলেছিলেন, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, আমি নিষ্ঠাবান মুসলিম। মৌলবী বলেছিলেন, তোমার কানের লতিতে থাকা ছিদ্র প্রমাণ করছে তুমি হিন্দু।
অজিত ডোভাল যে গ্রামে জন্মেছিলেন, সেখানে পুত্র সন্তানদেরও কানের লতিতে ছিদ্র করার প্রথা ছিল। একটুও না ঘাবড়ে অজিত ডোভাল বলেছিলেন, আমি মুসলমান। ছিদ্রটি জন্ম থেকেই কানের লতিতে আছে। তখন মৌলবী বলেছিলেন, ছিদ্রটা প্লাস্টিক সার্জারি করে বন্ধ করে দাও। নাহলে তোমাকে পাকিস্তানে বিপদে পড়তে হবে। মৌলবীর কথা শুনেছিলেন অজিত দোভাল। প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন কানের লতির ছিদ্র। অজিত ডোভাল যে পাকিস্তানের লাহোরে এক বছর লুকিয়ে ছিলেন, তা পাকিস্তান জানতে পেরেছিল ডোভাল পাকিস্তান ছাড়ার পর।
কান্দাহার বিমানবন্দরে ছিনতাই হওয়া বিমান। ঘিরে আছে তালিবানেরা।[/caption]
তাদের দাবি মানা হবে না সন্দেহে জঙ্গিরা বিমানের মধ্যে ছুরি মেরে হত্যা করেছিল রুপিন কাটিয়াল নামে এক সদ্য বিবাহিত যুবককে। আহত করেছিল আরও এক যাত্রী সতনাম সিংকে। আরও কিছু যাত্রীকে হত্যা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল জঙ্গিরা। দোভাল তখন সরাসরি কথা বলেছিলেন তালিবান নেতৃত্বের সঙ্গে। এর পর বিমান ঘিরে রাখা তালিবানেরা বিমানে থাকা হরকত জঙ্গিদের জানিয়েছিল বিমানের ভেতর আর কাউকে হত্যা করা যাবে না। এরপর কাউকে আঘাত করা হলে তারা বিমানে ঢুকে পড়বে। শুধু তাই নয়, যাত্রীদের জন্য খাবার ও জলের ব্যবস্থা করেছিল তালিবানরা।
যাত্রীদের প্রাণ বাঁচানোর স্বার্থে, মৌলানা মাসুদ আজহার ও অন্য দুই জঙ্গিকে নিয়ে ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর কান্দাহার উড়ে গিয়েছিলেন অজিত ডোভাল ও ভারতের বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিং। হরকতুল মুজাহিদিনের হাতে তিন জঙ্গিকে তুলে দেওয়ার পর বিমানের যাত্রীদের মুক্তি দিয়েছিল বিমান ছিনতাইকারীরা। বিমান ছিনতাইয়ের ১৭৩ ঘন্টা পর।
ভিকি মালহোত্রা ও ফরিদ তানাশা।[/caption]
সেই মতো ২০০৫ সালে রাজনের দুই হিটম্যান ভিকি মালহোত্রা আর ফরিদ তানাশা চলে এসেছিল ভারতে। দিল্লি থেকে দুবাই উড়ে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। খবরটা চলে গিয়েছিল মুম্বাই পুলিশের কানে। মুম্বাই পুলিশের কিছু অংশ দাউদের সঙ্গে ছিল। ফলে মুম্বাই পুলিশ দিল্লি এসে গ্রেফতার করেছিল ছোটা রাজনের হিটম্যানদের। ভেস্তে গিয়েছিল দাউদ হত্যার প্ল্যান। বেঁচে গিয়েছিল দাউদ ইব্রাহিম। উইকিলিকস সংস্থা ২০০৫ সালের ৮ আগস্ট জানিয়েছিল, দাউদ ইব্রাহিমকে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেই সময়ের ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর চিফ অজিত ডোভাল। যদিও ডোভাল ও সরকারের পক্ষ থেকে উইকিলিকসের দাবি অস্বীকার করা হয়েছিল। (https://wikileaks.org/plusd/cables/05MUMBAI1682_a.html )।
[caption id="attachment_252605" align="aligncenter" width="600"]
উইকিলিকসের কেবলের একটি অংশ।[/caption]
পাকিস্তানের মাটিতে তেহরিক-ই-তালিবান ও আইসিসের গাঁটছড়া বাঁধার পিছনে ডোভালের হাত দেখে পাকিস্তান। এর কারণ সম্ভবত ডোভালের সেই বহুবিখ্যাত উক্তিটি। ২০১৪ সালে তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুরে শাস্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেওয়ার সময় অজিত ডোভাল বলেছিলেন, "আর একটা মুম্বাই (২৬/১১) হলে কিন্তু পাকিস্তানকে বালোচিস্তান হারাতে হবে।"