বোমা বিপ্লব থেকে আন্দামানের নিষ্ঠুরতা, প্রেম থেকে দেশভাগ—উল্লাসকর দত্তের জীবনী নিয়ে দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের নতুন উপন্যাস ‘উল্লাসকর’ এক মহাকাব্যিক ইতিহাসের পুনর্জন্ম।

আসছে উল্লাসকর।
শেষ আপডেট: 2 November 2025 12:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যখন ইতিহাসের পাতা থেকে একের পর এক বাঙালি বিপ্লবীর নাম ঝাপসা হতে শুরু করেছে, এমনকি কিছু কিছু নাম সচেতনভাবেই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখনই সেই দিকে আলো ফেলেছেন লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায়। তাঁর নতুন উপন্যাস ফিরে আসে সেই আলোয়, এক বিস্মৃত বিপ্লবীর অগ্নিগাথা হয়ে— ‘উল্লাসকর’। যে মানুষটি প্রেমে ছিলেন অদম্য, বিপ্লবেও অটল।
চার শতাধিক পৃষ্ঠা জুড়ে, শতাধিক দুষ্প্রাপ্য দলিল ও ছবি-সহ, ‘উল্লাসকর’ যেন সময়ের ফাঁদে আটকে পড়া এক মহাকাব্য। কুমিল্লা থেকে কলকাতা, আন্দামান থেকে শিলচর— দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাসের অজানা অধ্যায়গুলো এক সূত্রে গেঁথে ফেলেছেন দেবারতি। বইটি শুধু একটি বিপ্লবীর কাহিনি নয়, বরং এক অনির্বাণ ভালোবাসা, দেশভাগের যন্ত্রণা আর বাঙালির অস্তিত্বসংগ্রামের দলিল।
প্রেসিডেন্সি কলেজের কেমিস্ট্রি বিভাগের তুখোড় ছাত্র উল্লাসকর দত্ত। বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও তাঁর হাতে প্রথম ভারতীয় বোমার নকশা। শপথ নিয়েছিলেন মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে, বঙ্গভঙ্গের তীব্র প্রতিক্রিয়ায়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন নির্ভয়ে, এমনকি এক অধ্যাপককে জুতোপেটা করার অপরাধে কলেজ থেকে বহিষ্কৃতও হন।
এর পরিণতি অবশ্য হয় ভয়াবহ, আলিপুর বোমা মামলায় গ্রেফতার, আর তারপর নির্বাসন আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে। সেখানে তাঁর শরীরে চালানো হয় অকল্পনীয় নির্যাতন। ইলেকট্রিক শক, অনাহার, একাকী বন্দিত্ব। তাঁকে মানসিকভাবে ভাঙার জন্য মাথায় আঘাত করে পাগল করে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি মাথা নোয়াননি। মুচলেকায় সই করেননি, নিজের আদর্শে অনড় থেকেছেন শেষ পর্যন্ত।
দীর্ঘ কুড়ি বছরের বন্দিজীবন শেষে দেশে ফিরলেও, জীবনের প্রতিটি ধাপ ছিল আরেকটি সংগ্রাম। তাঁর কিশোরবেলার প্রেমিকা লীলা পাল, বিপ্লবী বিপিনচন্দ্র পালের কন্যা, তখন অন্যত্র বিবাহিতা। তবু প্রেমের অগ্নি তাঁকে ছাড়েনি। ষাটোর্ধ্ব বয়সে, যখন লীলা বিধবা ও পক্ষাঘাতে পঙ্গু, উল্লাসকর তাঁকে কোলে তুলে নিয়ে বিয়ে করেন।
দেবারতি মুখোপাধ্যায় বলেন, “উল্লাসকর ছিলেন ভারতের প্রথম বোমামানব। একজন নির্ভীক বিপ্লবী এবং একই সঙ্গে নিঃস্বার্থ প্রেমিক। তাঁর চরিত্রে কোনো ভণ্ডামি ছিল না। তিনি ছিলেন এক সন্ন্যাসী, যিনি প্রেম ও দেশকে একই ভক্তিতে পূজা করেছেন।”
লীলা ও উল্লাসকরের জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয় শিলচরে। দেশভাগের ক্ষত তখনও তাজা। বাংলা ভাগের প্রতিবাদে, বাঙালির ভাষার দাবিতে শিলচর জুড়ে গড়ে উঠছে আন্দোলন, শহিদ হচ্ছেন ১১ জন বাঙালি। উল্লাসকর তখন স্ত্রীকে নিজের হাতে দেখভাল করেন, তাঁর প্রতিটি চাহিদা পূরণে নিবেদিত।
লীলা মারা গেলেও তিনি বিশ্বাস করতেন, সে ফিরে আসবে। দরজা খোলা রেখে ঘুমোতেন, খাবার সাজিয়ে রাখতেন। তাঁর এই অটল প্রেম যেন বাঙালির মননের এক প্রতীক— যে ভালবাসে, ভোগের জন্য নয়, নিবেদন হিসেবে।
‘শাস্ত্রী’ ও ‘স্বস্তিক সংকেত’-এর মতো জনপ্রিয় কাজের পর, দেবারতির এই উপন্যাস একেবারে অন্য পথে হাঁটছে। তিনি বলেন, “আজকের দিনে যখন ইতিহাস থেকে বাঙালির অবদান মুছে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, তখন উল্লাসকরকে স্মরণ করা মানে নিজের শিকড়ে ফিরে যাওয়া। এটি শুধু এক বিপ্লবীর কাহিনি নয়, এটি এক দুঃসাহসী কর্মযোগীর জীবনকাব্য।”

উল্লাসকরের বংশধর কৌশিক দত্তগুপ্ত জানান, দেবারতি শিলচর ও অন্যান্য জায়গায় ঘুরে বহু প্রামাণ্য উপকরণ সংগ্রহ করেছেন। “তাঁর এই উদ্যোগ আমাদের পরিবারের কাছে গর্বের। বহু বিরল ফুটেজ ও নথি তিনি উদ্ধার করেছেন,” বলেন কৌশিক।
উপন্যাসটি শুরু হচ্ছে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে। সেখান থেকেই গল্পের সূত্রে উঠে এসেছে স্বদেশী আন্দোলন, বাঙালির সংগ্রাম, দেশভাগের বিষণ্ণতা, ভাষা আন্দোলনের সুর। লেখিকার ভাষায়, “এই বইতে আমি ধরতে চেয়েছি বাঙালির ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর ইতিহাস— যাঁরা নিজের জীবন দিয়েও দেশকে ভালবেসেছিলেন, তাঁদের কথা।”
একজন বিপ্লবী, এক প্রেমিক, এক নিঃস্বার্থ কর্মযোগী উল্লাসকর দত্তকে হারিয়ে ফেলেছিল ইতিহাস, দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের কলম আবার ফিরিয়ে আনছে সেই নামটাকে— যা বাঙালির আত্মা ও প্রতিরোধের প্রতীক।
‘উল্লাসকর’ প্রকাশিত হতে চলেছে ৮ নভেম্বর, ঐতিহাসিক টাউন হলে জমকালো উদ্বোধনের মাধ্যমে।