স্বাধীনতা সংগ্রামী ননীগোপালের পুত্র অমর গোপাল বসু বদলে দিয়েছিলেন শব্দের জগৎ। রেডিও সারানো কিশোর থেকে বিশ্বখ্যাত ‘বোস কর্পোরেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা হয়ে ওঠার অনন্য কাহিনি।

অমর গোপাল বোস।
শেষ আপডেট: 2 November 2025 11:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ধ্বনির জগতে তিনি যেন এক অন্তহীন প্রতিধ্বনি।
তিনি মিউজিক সিস্টেমের সীমানা ভেঙে সাউন্ডকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর নাম— অমর গোপাল বসু। তিনি একজন বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামীর পুত্র, যিনি মার্কিন মাটিতে থেকেও বহন করেছেন বাংলার এক অনমনীয় উত্তরাধিকার।
অমরের গল্প শুরু হয় তাঁর বাবা ননীগোপাল বসু থেকে। সেই ননীগোপাল বিশ শতকের গোড়ায় ব্রিটিশ পুলিশের চোখ এড়িয়ে কলকাতা থেকে পালিয়ে পৌঁছেছিলেন সুদূর আমেরিকায়। পেশায় সেলসম্যান, মনে বিপ্লবের আগুন। নতুন দেশে তিনি বিয়ে করেন এক আমেরিকান স্কুলশিক্ষিকাকে। তাঁদের সংসারে ১৯২৯ সালের ২ নভেম্বর জন্ম নেন এক ছেলে, অমর গোপাল বসু।
শৈশব থেকেই অমরের কৌতূহল ছিল বিদ্যুৎ আর যন্ত্রপাতি নিয়ে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ফিলাডেলফিয়ার এক দোকানে রেডিও সারিয়ে আয় করতেন। সেই সময় তাঁর বাবা যেসব দোকানে জিনিসপত্র বিক্রি করতেন, সেখানে ছাপানো থাকত ছোট ছোট্ট পোস্টার—“We repair radios.”

গ্রাহকেরা সেই দোকানে রেডিও জমা রাখতেন, অমর বাড়ি নিয়ে গিয়ে তা মেরামত করতেন। দোকান পেত ১০ শতাংশ কমিশন। পড়াশোনার ফাঁকেও কাজ চলত, বাবার সঙ্গে এক চুক্তি ছিল, যদি ফল ভাল হয়, সপ্তাহে একদিন স্কুলে না গিয়ে কাজ করা চলবে। শিক্ষকরা জানতেন সবই, এমনকি জিজ্ঞেসও করতেন, “এই সপ্তাহে কয়টা রেডিও ঠিক করলে, বোস?”
এই ছোটবেলার হাতেকলমে অভিজ্ঞতাই পরের জীবনের ভিত্তি।

অ্যাবিংটন সিনিয়র হাই স্কুল শেষে তিনি ভর্তি হন Massachusetts Institute of Technology (MIT)-এ। সেখান থেকেই স্নাতক ও পিএইচডি। পাঁচের দশকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে এমআইটি-তে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে একটি দামি স্টেরিও স্পিকার কেনেন, কিন্তু সেটির শব্দে মন ভরেনি। ভাবলেন, অডিটোরিয়ামে যেমন প্রতিফলিত ধ্বনি মিশে এক প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতা দেয়, ঘরের সিস্টেমে তা নেই কেন?
এই প্রশ্ন থেকেই শুরু তাঁর অনুসন্ধান।
অমর দেখলেন—অডিটোরিয়ামে শ্রোতার কানে পৌঁছানো শব্দের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে দেওয়াল আর ছাদের প্রতিফলনে। পদার্থবিদ্যার এই সূত্রকে কাজে লাগিয়ে তিনি তৈরি করেন এক অনন্য সাউন্ড সিস্টেম, যা পরে হয়ে ওঠে ‘Bose Corporation’-এর মূল ভিত্তি।

১৯৬৪ সালে তাঁর প্রিয় অধ্যাপক Y. W. Lee তাঁকে উৎসাহ দেন নিজের কোম্পানি গড়তে। নাম নিয়ে এক পরামর্শও দেন। "It should be simple, pronounceable in many languages, and not tied to one technology." নামটাও তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়—Bose। সে শুনে অবশ্য তখন সবাই হেসেছিল। এটা আবার কোনও নাম হল নাকি!
প্রথম দিকে কোম্পানি মূলত সামরিক সরঞ্জাম, বিশেষ করে noise-cancelling headphones তৈরিতে মন দেয়। পরে সেই প্রযুক্তিই বদলে দেয় বেসামরিক অডিয়ো ইন্ডাস্ট্রির চেহারা। ১৯৬৮ সালে বাজারে আসে কিংবদন্তি Bose 901 Direct/Reflecting Speakers—যা বিশ্বব্যাপী বিপুল সাড়া ফেলে।

পরের কয়েক দশকে “Bose” হয়ে ওঠে মান, মুগ্ধতা ও নিখুঁত শব্দের প্রতীক। কারণ অমর গোপাল বসু শুধু এক বিজ্ঞানী বা উদ্যোক্তা ছিলেন না, তিনি ছিলেন শব্দের স্থপতি। তাঁর হাত ধরেই অডিও ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ে ওঠে এক শিল্পরূপ।

তবে জীবনের মঞ্চে তাঁর এক পা সবসময় ছিল এমআইটি-তে। প্রায় ৪৫ বছরের বেশি সময় তিনি সেখানে অধ্যাপনা করেছেন। ২০১১ সালে নিজের কোম্পানির বেশির ভাগ শেয়ার দান করেন এমআইটি-কে, যেন ভবিষ্যতের গবেষণার আলো কখনও নিভে না যায়।

ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর দুটি সন্তান, বানু ও মায়া। প্রথম স্ত্রী প্রেমার সঙ্গে বিচ্ছেদ হলেও, জীবনের বাকি সময় তিনি কাটিয়েছেন বিজ্ঞান ও সংগীতের মেলবন্ধনে। ২০১৩ সালের ১২ জুলাই, ম্যাসাচুসেটসে ৮৩ বছর বয়সে অমর গোপাল বসুর মৃত্যু হয়।

কিন্তু তাঁর তৈরি সাউন্ড এখনও বাজে বিশ্বজুড়ে বহু ঘরের প্রতিটি কোণে, মানুষের প্রতিটি অভিজ্ঞতায়। এক বিপ্লবীর রক্তে জন্ম নেওয়া এক বিজ্ঞানীর হাতে ধ্বনি পেয়েছে অনন্ত জীবন।
অমর গোপাল বসু— নামে অমর, কাজেও অমর।