Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ইরানের সব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে‌ দেওয়া হয়েছে, দাবি আমেরিকার, চিন্তা ইরানি ল্যান্ডমাইনও Poila Baisakh: দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাট, নববর্ষে অগণিত ভক্তের ভিড়, পুজো দিতে লম্বা লাইনপয়লা বৈশাখেই কালবৈশাখীর দুর্যোগ! মাটি হতে পারে বেরনোর প্ল্যান, কোন কোন জেলায় বৃষ্টির পূর্বাভাসমেয়েকে শ্বাসরোধ করে মেরে আত্মঘাতী মহিলা! বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে জোড়া মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত রহস্য UCL: চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ চারে পিএসজি-আতলেতিকো, ছিটকে গেল বার্সা-লিভারপুল‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?১৮০ নাবালিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোষণ! মোবাইলে মিলল ৩৫০ অশ্লীল ভিডিও, ধৃতের রয়েছে রাজনৈতিক যোগ ৩৩ বছর পর মুখোমুখি ইজরায়েল-লেবানন! ওয়াশিংটনের বৈঠকে কি মিলবে যুদ্ধবিরতির সমাধান?ইউরোপের আদালতে ‘গোপনীয়তা’ কবচ পেলেন নীরব মোদী, জটিল হচ্ছে পলাতক ব্যবসায়ীর প্রত্যর্পণ-লড়াইইরানের সঙ্গে সংঘাত এবার শেষের পথে? ইঙ্গিত ভ্যান্সের কথায়, দ্বিতীয় বৈঠকের আগে বড় দাবি ট্রাম্পেরও

আইআইটির ইঞ্জিনিয়ার আজ 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট', লাঞ্ছিতা কিশোরীদের 'ভাইয়া'

রূপাঞ্জন গোস্বামী মুজফফর নগরের সরু গলি দিয়ে আসছিল সাদা গাড়িটা। গাড়ির ভেতরে ছিল কুখ্যাত তিনজন দুস্কৃতি। ফাঁকাই ছিল রাস্তাটা। রাস্তার একদিকে সারাইয়ের কাজ করছিল কয়েকজন শ্রমিক। গাড়িটি শ্রমিকদের কাছে আসতেই, শ্রমিকদের হাতে উঠে এসেছিল বন্দুক। মুহূ

আইআইটির ইঞ্জিনিয়ার আজ 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট', লাঞ্ছিতা কিশোরীদের 'ভাইয়া'

শেষ আপডেট: 16 July 2022 08:39

রূপাঞ্জন গোস্বামী

মুজফফর নগরের সরু গলি দিয়ে আসছিল সাদা গাড়িটা। গাড়ির ভেতরে ছিল কুখ্যাত তিনজন দুস্কৃতি। ফাঁকাই ছিল রাস্তাটা। রাস্তার একদিকে সারাইয়ের কাজ করছিল কয়েকজন শ্রমিক। গাড়িটি শ্রমিকদের কাছে আসতেই, শ্রমিকদের হাতে উঠে এসেছিল বন্দুক। মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল গাড়ির ভেতর থাকা তিন দুস্কৃতি।

গুলির আওয়াজ শুনে দ্রুত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আশেপাশের বাড়ির জানলা দরজা। সাইরেন বাজিয়ে গলিতে ঢুকেছিল পুলিশের গাড়ি। দুস্কৃতিদের লাশ নিয়ে এলাকা ছেড়েছিল। স্থানীয় লোকেরা জানতেও পারেনি তাদের বাড়ির সামনেই শ্রমিকের বেশে কাজ করছিল উত্তরপ্রদেশ পুলিশের টিম। যার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এক দোর্দন্ডপ্রতাপ আইপিএস নভনীত সেকেরা (IPS Navniet Sekera)। যাঁকে দেশ চেনে এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট হিসেবে।

উত্তরপ্রদেশের ইটা জেলার একটি ছোট গ্রাম

সেই গ্রামে ছিল একটি স্কুল। স্কুলের এক শিক্ষক একদিন লুনা মোপেড চড়ে স্কুলে এসেছিলেন। সেদিন প্রথম স্কুলের বাচ্চারা যন্ত্রচালিত কোনও যান দেখেছিল। শিক্ষক চলে গিয়েছিলেন ক্লাসে। একটি ছেলে ক্লাসে ঢোকেনি। সে অবাক হয়ে লুনা মোপেডটির গায়ে হাত বুলিয়ে চলেছিল। ছেলেটি তাঁর মোপেডটিকে খারাপ করে দেবে, এই আশঙ্কায় ফিরে এসেছিলেন শিক্ষক।

তাঁর মোপেডে হাত দেওয়ায় নিমের ডাল দিয়ে পিটিয়েছিলেন ছেলেটিকে। সারা গায়ে চাকা চাকা দাগ হয়ে গিয়েছিল। মার খাওয়ার পরে ছেলেটি শিক্ষককে বলেছিল, আমিও একদিন এরকম গাড়ি কিনব। চাষির ছেলের আস্পর্ধা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন শিক্ষক। মারা শুরু করেছিলেন নতুন করে। মার খেয়েও ছেলেটি সেদিন শিক্ষকের ক্লাস করেছিল মনে দিয়ে।

ছেলেটির বাবা মনমোহন সিং সেকেরা সারাদিন জমিতে ঘাম ও রক্ত ঝরাতেন ছেলেটাকে মানুষের মত মানুষ করে তোলার জন্য। জাতপাতে বিভক্ত গ্রামে জমিজমা নিয়ে কাজিয়া লেগেই থাকত। তাই তিনি একরোখা ছেলেটিকে গ্রামে রাখতে চাননি। চেয়েছিলেন মেধাবী ছেলে শহরে গিয়ে পড়াশুনা করুক। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ছেলেটি পৌঁছে গিয়েছিল দিল্লির হংসরাজ কলেজে। বিএসসিতে ভর্তি হওয়ার জন্য।

[caption id="attachment_2316847" align="aligncenter" width="600"] দিল্লির হংসরাজ কলেজ[/caption]

ফর্ম নেওয়ার জন্য কলেজের অফিসের কাউন্টারে বাড়িয়ে দিয়েছিল মার্কশিট। ছেলেটিকে দেখে ভিনগ্রহের প্রাণী দেখার মত চমকে উঠেছিল কাউন্টারের ক্লার্ক। তারপর কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেছিল ছেলেটির ঠিকানা। ঠিকানা জানার পর, পকেট থেকে পাঁচ টাকা বের করে ক্লার্ক বলেছিল গ্রামে ফিরে যেতে। ছেলেটি বুঝেছিল বিত্তবান ছাত্রদের ঝাঁ চকচকে কলেজে তার মত অতিসাধারণ চেহারার, হিন্দি মিডিয়ামে পড়া গ্রাম্য ছেলের ঠাঁই হবে না। অপমান সহ্য করে গ্রামে ফিরে এসেছিল জেদি ছেলেটি। বাবা ছেলের মুখ দেখে বুঝেছিলেন সব। কিন্তু কোনও প্রশ্ন করে ছেলেকে বিব্রত করেননি।

ছেলেটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে বিএসসি পড়বে না

তার বদলে সতেরো বছরের ছেলেটি ঠিক করেছিল সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। পুরোনো বই ও খবরের কাগজকে সম্বল করে দিনরাত এক করে ফেলেছিল ছেলেটি। গোটা গ্রামকে অবাক করে পাশ করেছিল আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষায়। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ভর্তি হয়েছিল রুরুকি আইআইটিতে।

[caption id="attachment_2316849" align="aligncenter" width="600"] রুরুকি আইআইটি[/caption]

১৯৯৩ সালে বিটেক পাশ করার পর এমটেক করার জন্য যুবকটি ভর্তি হয়েছিলেন দিল্লি আইআইটিতে। সেখানে কলেজের দাদাদের মুখে শুনেছিলেন, বেশিরভাগ ছাত্রই এমটেক করে পাড়ি দেয় বিদেশে। সেদিন যুবকটি ডেকেছিলেন ঈশ্বরকে। বলেছিলেন ঈশ্বর যেন তাঁকে এই দুর্মতি না দেন। তিনি দেশেই থাকতে চান। কৃষক বাবা যে তাঁর জীবন। কীভাবে থাকবেন তিনি বাবাকে ছেড়ে!

সেই সকালটা বদলে দিয়েছিল যুবকটিকে

দিল্লি আইআইটিতে থাকাকালীন, একদিন সকালে বাবার ফোন এসেছিল। ফোনের ওপারে বাবার কান্নাভেজা গলা শুনতে পেয়েছিলেন যুবকটি। বাবা ছেলেকে বলেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখলের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি স্থানীয় পুলিশ চৌকিতে গিয়েছিলেন। পুলিশেরা তাঁকে প্রায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। যুবকটির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল সেই সকালটি।

এমটেক ছেড়ে মাঝপথেই গ্রামে ফিরে এসেছিলেন জেদি যুবক। শুরু করেছিলেন ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসার প্রস্তুতি। এবারও তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথমবারের চেষ্টাতেই সফল হয়েছিলেন ইউপিএসসি পরীক্ষায়। র‍্যাঙ্ক এতটাই  ভালো হয়েছিল, যে চাইলেই তিনি আইএএস হতে পারতেন। কিন্তু যুবকের বুকে তখনও জ্বলছিল বাবার অপমানের বদলা নেওয়ার আগুন।

নভনীত সেকেরা বেছে নিয়েছিলেন আইপিএসের পদ। গ্রামে ফিরে বাবাকে নিয়ে একবার গিয়েছিলেন সেই চৌকিতে। উঠে দাঁড়িয়ে যুবক নভনীতকে স্যালুট করেছিলেন সেই পুলিশেরা, যাঁরা তাঁর বাবাকে একদিন চৌকি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন।

[caption id="attachment_2316852" align="aligncenter" width="600"] নভনীত সেকেরা[/caption]

আইপিএস হওয়ার পর ট্রেনিং নিতে নভনীত ১৯৯৬ সালে চলে গিয়েছিলেন হায়দ্রাবাদের ন্যাশনাল পুলিশ অ্যাকাডেমিতে। ট্রেনিং শেষে, ১৯৯৮ সালে এএসপি হয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন গোরখপু্র। সেখানে দু'বছর থাকার পর হয়েছিলেন এএসপি মেরঠ। অসামান্য কর্মদক্ষতার জন্য ২০০১ সালে এসপি হয়ে গিয়েছিলেন নভনীত। প্রথমে রেলওয়ে পুলিশের এসপি, তারপরে টেকনিক্যাল সার্ভিসের এসপি। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এসএসপি হয়ে নভনীত পৌঁছে গিয়েছিলেন মুজফফর নগরে।

আতঙ্কের নাম মুজফফর নগর

উত্তরপ্রদেশের মানুষেরা তখন বলতেন, "ভারতের দুটি রাজধানী। প্রথমটি দিল্লি যেখানে আইন তৈরি করা হয়। আর দ্বিতীয়টি মুজাফফর নগর, যেখানে আইন ভাঙ্গা হয়।" অপহরণ, হত্যা, লুঠ ও ডাকাতির আঁতুড়ঘর হিসেবে মুজফফর নগর তখন উত্তরপ্রদেশ সরকারের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মুজাফফর নগরে এসেই নভনীত চেয়ে নিয়েছিলেন দাগী অপরাধীদের তালিকা।

শুরু করেছিলেন তাঁর নিজস্ব রণনীতি। যে রণনীতি তিনি নেটওয়ার্ক টেনের ভাসি জাইদিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেও ফেলেছিলেন। তাঁর নীতি হল, "যাঁহা পে ক্রাইম ওঁহি পে রোখ দো। ওঁহি পে ঠোক দো।" পেশাদার অপরাধীদের হাড় কাঁপিয়ে দিয়েছিল 'ঠোক দো' শব্দদুটি। ২০০৪ সালের নভেম্বরে মুজফফর নগর ছেড়ে লক্ষ্ণৌ চলে যাওয়ার আগে, মাত্র পনেরো মাসে পঞ্চান্ন জন দাগ অপরাধীকে এনকাউন্টার করে খতম করেছিলেন নভনীত। বরফের থেকেও ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল মুজাফফর নগর।

অপরাধের ঝড়ে টালমাটাল ছিল লক্ষ্ণৌ

অপরাধ চক্রের দৌরাত্ম্য ভয়ঙ্করভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল উত্তরপ্রদেশের রাজধানীতে লক্ষ্ণৌয়ে। তখন লক্ষ্ণৌয়ের ত্রাস ছিল গ্যাংস্টার রমেশ কালিয়া। মোটা অঙ্কের তোলা তুলত ঠিকাদার ও প্রমোটারদের কাছ থেকে। রেল এবং পিডব্লিউডির ঠিকা নিয়ে শুরু হয়েছিল গ্যাংস্টারদের মধ্যে কাজিয়া। রমেশ কালিয়া খুন করেছিল উত্তরপ্রদেশের বিধান পরিষদের সদস্য ও সমাজবাদী পার্টির বাহুবলী নেতা অজিত সিংকে।

রমেশ কালিয়ার নামে তখন ১২টি হত্যা ও ১০টি হত্যার চেষ্টার মামলা চলছিল আদালতে। লোকে কালিয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে ভয় পেত। এতটাই আতঙ্ক ছড়িয়েছিল রমেশ কালিয়া। অপরাধদমনে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে উত্তাল হয়েছিল লক্ষ্ণৌ। মুজফফর নগর থেকে নভনীত সেকেরাকে লক্ষ্ণৌ নিয়ে এনেছিলেন ২০০৪ সালে ক্ষমতায় আসা মুলায়েম সিং যাদব।

'অপারেশন কালিয়া'

২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাস। মুজফফর নগরের অফিস থেকে সরাসরি লক্ষ্ণৌয়ের এসএসপির অফিসে ঢুকেছিলেন ৩৫ বছরের নভনীত। অফিসে ঢুকেই চেয়েছিলেন শহরের সেরা দশ অপরাধীর নাম। তালিকায় প্রথম নামটিই ছিল রমেশ কালিয়ার। শুরু হয়েছিল 'অপারেশন কালিয়ার প্রস্তুতি। প্রায় একমাস ধরে অত্যন্ত গোপনে চলেছিল এনকাউন্টারের প্রস্তুতি। অপারেশনের জন্য নভনীত নিজে বেছে নিয়েছিলেন কিছু দুঃসাহসী  মহিলা ও পুরুষ অফিসারকে। টিমের বাইরে কাউকে কিছু জানানো হয়নি। কারণ পুলিশের মধ্যেও ছিল রমেশ কালিয়ার চর।

দিনটা ছিল ২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। নভনীতের কাছে খবর এসেছিল প্রমোটর ইমতিয়াজের কাছে পাঁচ লক্ষ টাকা রংদারি( তোলা) চেয়েছে রমেশ কালিয়া। টাকাটা নিয়ে যেতে হবে শুনশান নীলমাথা এলাকায় একটি নির্মীয়মাণ বাড়িতে। সেদিনই টাকা না দিলে ইমতিয়াজের মৃত্যু অনিবার্য বলে হুমকি দিয়েছে রমেশ কালিয়া। নভনীত ইমিতিয়াজকে বলেছিলেন চল্লিশ হাজার টাকা নিয়ে রমেশ কালিয়ার সঙ্গে দেখা করতে। নভনীতের কাছে খবর এসেছিল পুরো নীলমাথা এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রমেশের গ্যাং। সতর্ক নজর রাখছে সবার গতিবিধির ওপর।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছিল। নীলমাথা এলাকার নির্মীয়মাণ বাড়িটিতে পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রোমোটার ইমতিয়াজ। বাড়িটির সামনের রাস্তা দিয়ে ব্যান্ড বাজাতে বাজাতে কনেকে নিয়ে গ্রামে ফিরছিল বরযাত্রীরা। কনের পাল্কিতে বসেছিলেন মহিলা কনস্টেবল সুমন বর্মা, বরের পোশাকে ছিলেন ইন্সপেকটর এসকে প্রসাদ সিং। বরযাত্রীদের ভিড়ে মিশে ছিলেন নভনীত সেকেরা ও তাঁর বেছে পুলিশ অফিসারেরা।

[caption id="attachment_2316866" align="aligncenter" width="600"] প্রতীকী ছবি[/caption]

ইমতিয়াজের হাতে মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা দেখে, ক্রোধে উন্মত্ত রমেশ কালিয়া গুলি চালিয়েছিল ইমতিয়াজের ওপর। দৈবাৎক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন ইমিতিয়াজ। নির্মীয়মাণ বাড়ির ভেতর থেকে গুলির আওয়াজ আসায়, বর-কনে এবং বরযাত্রীদের হাতে উঠে এসেছিল রিভলবার, কার্বাইন ও একে-ফর্টিসেভেন। বরযাত্রী দলটি অতর্কিতে হামলা চালিয়েছিল বাড়িটিতে।

আকস্মিক আক্রমণে হতভম্ভ হয়ে গিয়েছিল রমেশ ও তার সঙ্গীসাথীরা। প্রায় কুড়ি মিনিট চলেছিল গুলির লড়াই। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে আগুন ঝরিয়েছিল দুপক্ষের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি। তারপরে একসময় নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পরিবেশ। দেখা গিয়েছিল বুলেটে ছিন্নভিন্ন দেহ নিয়ে রক্তের মধ্যে ডুবে আছে লক্ষ্ণৌয়ের ত্রাস রমেশ কালিয়া।

[caption id="attachment_2316864" align="aligncenter" width="600"] প্রতীকী ছবি[/caption]

নভনীত সেকারার নাম হয়ে গিয়েছিল নভনীত শিকারি। মুজাফফর নগরের মতই খুঁজে খুঁজে অপরাধীদের খতম করার কাজ শুরু করেছিলেন নভনীত। উত্তরপ্রদেশের বুক থেকে মুছে গিয়েছিল রমেশ কালিয়া, শৈলেশ পাঠক, ছোটা নবাব, আনজার, রোহতাশ গুর্জর, পুস্পেন্দ্র, শৌকিন খান , ডেধা ব্রাদারস, বিট্টু কেল ও নিতু কেল সহ আরও অসংখ্য কুখ্যাত অপরাধীর নাম। উত্তরপ্রদেশের বেশিরভাগ অংশে ফিরে এসেছিল শান্তি।

 শিকারির (IPS Navniet Sekera) নজর পড়েছিল অন্য এক অপরাধ জগতে 

নভনীত দেখেছিলেন সমাজে আর একটি অপরাধ জগত সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। যে অপরাধ জগতের ওপর পুলিশের নজর তেমন পড়ে না। এই অপরাধ জগতের অপরাধীদের টার্গেট হল শিশু কন্যা, বালিকা, কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা। কখনও সমাজে, কখনও নিজের পরিবারে প্রতিনিয়ত এই অপরাধীদের কাছে লাঞ্ছিত অপমানিত ও ধর্ষিত হচ্ছে নারীরা। কিন্তু সে খবর বাইরে আসেনা। কারণ ভারতীয় সমাজে নারীদের জন্ম থেকে শেখানো হয়, "চুপ থাকো সহ্য করে নাও। যা ঘটেছে কাউকে বোলো না। পরিবারের সম্মানহানী হবে।"

নভনীত বলেছিলেন সম্পূর্ণ উল্টোকথা। মেয়েদের স্কুলে স্কুলে গিয়ে নভনীত বলেছিলেন, " কেউ অত্যাচার করলে  চুপ থেকো না। তাতে অপমান বাড়বে বই কমবে না। আজ সহ্য করলে কাল এর থেকেও বেশি অত্যাচার হবে। তোমরা লজ্জা পেও না। লজ্জা পাবে তারা যারা তোমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে। সে ব্যবস্থা আমি করব। এগিয়ে এসো মুখ খোলো। তবেই তোমাদের ওপর হতে থাকা অত্যাচার কমবে।"

২০১২ সালে নভনীত চালু করেছিলেন ‘Women Power Line 1090’। স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিশু কন্যা, বালিকা ও কিশোরীদের বলেছিলেন, তাদের ওপর কোনও  অত্যাচার হলে তা সঙ্গে সঙ্গে ১০৯০ নম্বরে ফোন করে জানাতে। তাদের নাম গোপন রাখা হবে। প্রথম প্রথম মুখ খুলতে ভয় পেত মেয়েরা। কিন্তু ১০৯০ নাম্বারে কোনও মেয়ের ফোন আসার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হত নভনীতের অ্যাকশন। ধীরে ধীরে নভনীতের ওপর ভরসা করতে শুরু করেছিল লাঞ্চিত বালিকা, কিশোরী থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা। 

তিন বছরে ৫ লাখ অভিযোগ লিপিবদ্ধ হয়েছিল। যার মধ্যে ৮০ শতাংশ অভিযোগ সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছিল। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল নভনীতের দফতর। পদক্ষেপ নিয়েই কাজ শেষ হয় না নভনীতের। সাহায্য করার পরেও তিন চারমাস মেয়েটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখে নভনীতের দফতর। নিয়মিত ফোন করে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করা হয় অপরাধী বা তার পরিবার আর তাকে বিরক্ত করছে কিনা। বিরক্ত করলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেন নভনীত। আজ তিনি বালিকা কিশোরী ও নারীদের কাছে ভালোবাসার 'ভাইয়া'।

আজ রোজ দশহাজার কল আসে ১০৯০ নম্বরে। সাংবাদিকেরা নভনীতকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাহলে কি সমাজে নারীদের প্রতি অপরাধ বাড়ছে? নভনীত বলেছিলেন, নারীদের ওপর অত্যাচার আগেও ছিল, এখনও আছে। আগে নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে, পারিবারিক চাপে সহ্য করতেন। এখন সহ্য করছেন না। তাই ফোনের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। নভনীত চান ফোনের সংখ্যা আরও বাড়ুক। একসময় ফোনের সংখ্যা কমতে শুরু করবে। কারণ নভনীতের টিমের কাছে পালিশ হয়ে যাওয়া অপরাধীরা ভুলেও দ্বিতীয়বার কোনও নারীর দিকে চোখ তুলে তাকাবে না। গায়ে হাত দেওয়া তো দূরের কথা।

কর্মক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য নভনীত প্রেসিডেন্টের পুলিশ পদক, মুখ্যমন্ত্রীর পুলিশ পদক, ডিরেক্টর জেনারেলের পুলিশ পদক পেয়েছেন। নভনীতের জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে ওয়েব সিরিজ 'ভাউকাল'। পুলিশে চাকরি করতে করতে এমবিএ করেছেন ইন্ডিয়ান স্কুল অফ বিজনেস থেকে। পুলিশের কাজের পাশাপাশি নভনীত ব্যস্ত থাকেন সমাজসেবায়। নারীদের এমপাওয়ারমেন্ট নিয়ে নিত্যনতুন পরিকল্পনা করেন।

[caption id="attachment_2316876" align="aligncenter" width="474"] বাবা মায়ের সঙ্গে নভনীত সেকেরা[/caption]

২০২০ সালে আইজি থেকে এডিজি হয়েছিলেন নভনীত। বাড়ি ফিরে মাকে প্রণাম করে বলেছিলেন তাঁর পদোন্নতির কথা। মা স্যালুট করে বলেছিলেন, "জয় হিন্দ সাহেব"। মাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' নভনীত। মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে নভনীত বলেছিলেন, "বাবা যদি জানতে পারত।" বাবাকে জানানোর উপায় ছিল না নভনীতের। কারণ নভনীতকে ছেড়ে ২০২০ সালেই চলে গিয়েছিলেন নভনীতের জীবনের সব থেকে প্রিয় মানুষ, বাবা মনমোহন সিং সেকেরা।

আরও পড়ুন: আতঙ্কের মেঘে ঢাকা ‘গ্যাং-ল্যান্ড’, যেখানে বীরের সম্মান পায় নৃশংস গ্যাংস্টারেরা


```