
শেষ আপডেট: 9 July 2022 10:01
রথসচাইল্ড (Rothschild)। পরিবারটির নাম শুনলেই চমকে ওঠেন অনেকে। কারণ ষড়যন্ত্র-তাত্ত্বিকদের (conspiracy theorist) মতে এই পরিবারটিই নাকি বিশ্বের সবথেকে ক্ষমতাশালী পরিবার। বিশ্বের অর্ধেক সম্পদের মালিক তারাই। এই পরিবারটিই নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বের অর্থনীতি। নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব বাজারে খনিজ তেল ও সোনার দাম। হেলায় ভাঙে ও গড়ে, বিভিন্ন দেশের সরকার। গত দুশো বছর ধরে যুদ্ধ ও শান্তি নির্ভর করে, পরিবারটির স্বার্থের ওপর। এককথায় এই রথসচাইল্ড পরিবারের নির্দেশেই চলে গোটা বিশ্ব। ষড়যন্ত্র-তাত্ত্বিকদের অভিযোগগুলির সত্যতা জানা সম্ভব হয়নি আজও। তাই অভিযোগগুলি সত্য না মিথ্যা, সে বিতর্কে না গিয়ে, চলুন বরং জেনে নেওয়া যাক রহস্যময় এই পরিবারটির বিস্ময়কর কাণ্ড কারখানা।

তখনও জন্ম নেয়নি আজকের জার্মানি। ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরটি তখন ছিল হেসে-কাসেল (Hesse-Kassel) নামে এক রাজ্যের অন্তর্গত। শহরের ইহুদি মহল্লায়, ১৭৪৪ সালে জন্ম নিয়েছিলেন মেয়ার আমসচেল রথসচাইল্ড। বাবা আমসচেল মোজেস রথসচাইল্ড ছিলেন ব্যবসায়ী। সিল্ক ব্যবসার পাশাপাশি, প্রাচীন শিল্প সামগ্রী কেনাবেচার ব্যবসাও করতেন।
সেই যুগে শহরের বাড়িগুলিকে সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করার চল ছিল না। বিভিন্ন চিহ্ন বা সংকেত ব্যবহার করা হত। মেয়ারদের পৈত্রিক বাড়িটির দেওয়ালে গাঁথা ছিল একটি লাল রঙের ঢাল। তাই বংশের পূর্বপুরুষ এলচানান বাচারাচের ১৫৬৭ সালে বানিয়ে যাওয়া বাড়িটির নাম হয়েছিল Rothen Schild (লাল ঢাল)। পরবর্তীকালে জার্মান শব্দ দু'টি জুড়ে তৈরি হয়েছিল রথসচাইল্ড (Rothschild) শব্দটি। যে শব্দটিকে পারিবারিক পদবী হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন পরিবারের আর এক পূর্বপুরুষ আইজ্যাক এলচানান রথসচাইল্ড।

আঠেরো বছর বয়সে মেয়ার আমসচেল রথসচাইল্ড চলে গিয়েছিলেন পাঁচশো কিলোমিটার দূরের হামবুর্গ শহরে। শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন সেখানকার একটি ব্যাঙ্কে। এক বছর ধরে ব্যাঙ্কিং ব্যবসার নাড়িনক্ষত্র জেনে, আবার ফিরে এসেছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্টে। ইহুদি মহল্লাতেই খুলে ফেলেছিলেন ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ব্যাঙ্ক। নিজেই মালিক, নিজেই কর্মী। ইহুদিদের টাকা জমা রাখতেন। সেই টাকা বাজারে খাটিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে সুদসহ ফেরত দিতেন। একইসঙ্গে বাবার মতই প্রাচীন সামগ্রীর ব্যবসাও চালাতেন।
মেয়ার রথসচাইল্ড যৌবনে যেমন সুন্দর দেখতে ছিলেন, তেমনই ছিলেন বুদ্ধিমান ও সপ্রতিভ। ছিল অচেনা কোনও মানুষকে দ্রুত মুগ্ধ করে দেওয়ার মত ব্যক্তিত্ব। সবসময় সমাজের ধনী ও অভিজাত সম্প্রদায়কে নিজের ব্যাঙ্কের গ্রাহক করার চেষ্টায় থাকতেন মেয়ার। পরিচয় হওয়ার পরই সম্ভাব্য গ্রাহকের পরিবারে মেয়ার ঢুকে পড়তেন বন্ধু হয়ে। অল্পদিনের মধ্যেই ধনী ব্যক্তিটির টাকা নিয়ে আসতেন নিজের ব্যাঙ্কে। তবে গ্রাহকদের উচ্চ সুদসহ আসল ফেরত দিতে ভুলতেন না মেয়ার। ফলে ক্রমশই ফুলে ফেঁপে উঠতে শুরু করেছিল ধুরন্ধর ইহুদি মানুষটির ব্যবসা।

মেয়ারের বয়স যখন চল্লিশ, হেসে-কাসেলের রাজপরিবারে ঢুকে পড়েছিলেন মেয়ার। রাজা উইলিয়াম হয়ে উঠেছিলেন মেয়ারের বন্ধু। রাজপরিবারের কাছে অযত্নে পড়ে থাকা প্রাচীন শিল্প সামগ্রী কিনে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চমূল্যে বেচতে শুরু করেছিলেন মেয়ার। কিন্তু তাঁর পাখির চোখ ছিল, রাজপরিবারের অগাধ অর্থ।
মেয়ার রথসচাইল্ডের বয়স যখন ষাট, পাঁচ ছেলে আমসচেল, সলোমন, নাথান, কার্ল ও জ্যাকবকে (জেমস) নিয়ে এসেছিলেন ব্যবসায়। পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ইউরোপের পাঁচ জায়গায়। ফ্র্যাঙ্কফুর্টের ব্যবসা দেখতেন আমসচেল। সলোমন দেখতেন ভিয়েনার। নাথান দেখতেন লন্ডনের। জেমস দেখতেন প্যারিসের। কার্ল দেখতেন নেপলসের ব্যবসা।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ফ্রান্সের সঙ্গে ধারাবাহিক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ব্রিটেন ও তার জোটসঙ্গীদের। ১৮০৩ সাল থেকে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত চলেছিল এই ভয়াবহ যুদ্ধ। ইউরোপকে গ্রাস করতে শুরু করেছিল নেপোলিয়নের ফ্রান্স। নেপোলিয়নের হাত থেকে নিজের সম্পদ রক্ষা করার জন্য, হেসে-কাসেলের রাজা উইলিয়াম বিশাল পরিমাণ অর্থ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বন্ধু মেয়ারের কাছে। সুযোগসন্ধানী মেয়ার সেই অর্থরাশি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন লন্ডনে। তৃতীয় পুত্র নাথান রথসচাইল্ডের কাছে। নাথান তখন লন্ডনের পরিচিত ব্যাঙ্কার। ১৮১১ সালে তিনি লন্ডনে খুলে ফেলেছিলেন 'এন এম রথসচাইন্ড অ্যাণ্ড সন্স' নামে একটি অর্থলগ্নি সংস্থা।

দীর্ঘ এক দশক ধরে ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধ চলায়, তলানিতে এসে ঠেকেছিল ব্রিটিশ সেনার মনোবল। ব্রিটেনের অর্থনীতি ভেঙে পড়ায়, টান পড়েছিল যুদ্ধের রসদে। সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছিলেন মেয়ারের পুত্র নাথান। যুদ্ধ চালানোর জন্য ১৮১৩ সালে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় জর্জকে ধার দিয়েছিলেন ৯.৮ মিলিয়ন পাউন্ড। পুরো টাকাটাই ছিল হেসে-কাসেলের রাজা উইলিয়ামের। অর্থাৎ মাছের তেলে মাছ ভেজে নিয়েছিলেন নাথান। নতুনভাবে রসদের যোগান শুরু হওয়ায়, খাদের মুখ থেকে আবার লড়াইয়ে ফিরে এসেছিল ব্রিটিশ সেনারা। সেই প্রথম রথসচাইল্ড পরিবারের নাম জড়িয়ে গিয়েছিল যুদ্ধের সঙ্গে।
ব্রিটেনের রাজপরিবারের নয়নমণি হয়ে গিয়েছিলেন নাথান। সুযোগসন্ধানী নাথান যুদ্ধের খরচ তোলার জন্য ব্রিটেনের রাজাকে বাজারে 'বন্ড' ছাড়তে বলেছিলেন। ছাড়া হয়েছিল 'ওয়ার বন্ড'। নাথান নিজেও কিনে নিয়েছিলেন প্রচুর বন্ড। ১৮১৫ সালের ১৮ জুন, ওয়াটারলু (বর্তমানে বেলজিয়ামে) যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল নেপোলিয়ানের ফ্রান্স। ঘটনাচক্রে সেই সময় বেলজিয়ামেই ছিলেন নাথান। ব্রিটিশদের যুদ্ধ জয়ের খবর সবার আগে নাথানের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল নাথানের গুপ্তচর। তখনও এই অবিশ্বাস্য জয়ের খবর পৌঁছায়নি লন্ডনে।
ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই নাথান নৌকা করে পেরিয়েছিলেন রাতের ইংলিশ চ্যানেল। লন্ডনে ফিরেই কম দামে বেচতে শুরু করেছিলেন তাঁর কাছে থাকা ওয়ার বন্ডগুলি। নাথানের কাণ্ড দেখে চমকে গিয়েছিলেন অনান্য লগ্নিকারীরা। যুদ্ধে ব্রিটিশদের পরাজয় আসন্ন ভেবে নিজেদের কাছে থাকা বন্ডগুলি জলের দরে বেচে দিতে শুরু করেছিলেন তাঁরা। সেই সব বন্ড কিনে নিতে শুরু করেছিলেন নাথান ও তাঁর চার ভাই। সেদিনই সন্ধ্যায় লন্ডনে এসেছিল ওয়াটারলু যুদ্ধ জয়ের সংবাদ। উল্লাসে ফেটে পড়েছিল ব্রিটিশেরা। উল্কাগতিতে বেড়ে গিয়েছিল বন্ডের দাম। আকাশছোঁয়া দামে তখন বন্ডগুলি বেচতে শুরু করেছিলেন রথসচাইল্ড ভাইয়েরা। নাথানের কিস্তিমাত করে দেওয়া চালে, রথসচাইল্ড পরিবার একদিনে কামিয়ে নিয়েছিল ১৩০ মিলিয়ন পাউন্ড।
যুদ্ধ জয়ের পর, ব্রিটেনের রাজার কাছ থেকে চড়া সুদসহ ধার দেওয়া অর্থ ফেরত নিয়েছিলেন নাথান। হেসে-কাসেলের রাজা উইলিয়ামকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর প্রাপ্য টাকা। তবে এই লেনদেন থেকে নাথান কামিয়ে নিয়েছিলেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। ব্রিটেনের শাসন ক্ষমতা রাজার হাতে থাকা সত্ত্বেও, ব্রিটেনের বুকে অভূতপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন নাথান। রাজপরিবারের সদস্য না হয়েও। কোনও কারণে একবার রাজার ওপর ক্ষুব্ধ নাথান বলেছিলেন,"ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসে থাকা কোনও পুতুলকে আমি কেয়ার করি না। যে ব্রিটেনের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে।" এতটাই দাপট ছিল তাঁর।
এরপর ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারকে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া শুরু করেছিলেন নাথান ও তাঁর চার ভাই। প্রজা বিক্ষোভে সম্পত্তি বেদখল হওয়ার ভয়ে রথসচাইল্ড পরিবারের কাছে নগদ অর্থ জমা রাখতে শুরু করেছিলেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শাসকেরা। ব্রিটেনে 'ব্যারন' ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যারনের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল মেয়ার রথসচাইল্ডের পাঁচ ছেলেকে। এক কথায় ইউরোপের খ্রিস্টান দেশগুলির অর্থনীতিকে, সম্পূর্ণ নিজের মুঠোয় রেখেছিল ইহুদি 'রথসচাইল্ড' পরিবার।

ব্রিটেনকে হাতের মুঠোয় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রথচাইল্ড পরিবার পা বাড়িয়েছিল আমেরিকার দিকে। গ্রাস করতে শুরু করেছিল আমেরিকার অর্থনীতি। আমেরিকার প্রথম জাতীয় ব্যাঙ্কের নিয়ন্ত্রণ বকলমে ছিল নাথানের রথসচাইল্ডেরই হাতে। প্রথম প্রথম নাথানের ফন্দি ধরতে পারেনি আমেরিকা। কিন্তু বিষয়টি বুঝতে পারার পর অর্থনীতি থেকে নাথানের অদৃশ্য হাত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল আমেরিকা। ক্ষিপ্ত নাথান বলেছিলেন,"আমেরিকা যদি এটা করে, তাহলে আমেরিকাকে তার ইতিহাসের সবথেকে ভয়াবহ যুদ্ধ দেখতে হবে।" আমেরিকার ওপর অখুশি ব্রিটেনকে ক্রুদ্ধ নাথান বলেছিলেন, "এই নির্বোধ আমেরিকানদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে। আমেরিকাকে আবার ব্রিটেনের কলোনি বানিয়ে দেব আমি।" ১৮১২ সালে শুরু হওয়া ব্রিটেন-আমেরিকা যুদ্ধের পিছনেও নাকি ছিল নাথান রথসচাইল্ডের প্ররোচনা ও টাকা।
যুদ্ধে ভেঙে পড়া আমেরিকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ১৮১৬ সালে গঠন করা হয়েছিল আমেরিকার সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক। প্রধান বিনিয়োগকারী ছিলেন এই নাথান রথসচাইল্ডই। এভাবেই এক ঢিলে দুই পাখি মেরে চলেছিলেন নাথান। রাশিয়া-জাপান যুদ্ধের (১৯০৪-০৫) সময়েও রথসচাইল্ড পরিবার বিপুল পরিমাণ টাকা ধার দিয়েছিল জাপানকে। যুদ্ধের বন্ড ছেড়ে পরিবারটি রাতারাতি কামিয়ে নিয়েছিল কোটি কোটি ডলার।

স্বাধীন দেশ হিসেবে ব্রাজিল, রোডেশিয়া (জিম্বাবুয়ে) ও ইজরায়েলের আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে ছিল রথসচাইল্ড পরিবারের টাকা। ব্রিটিশেরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খনি ও রেললাইন তৈরি করেছিল, সেগুলির জন্যেও ব্রিটেনকে চড়া সুদে টাকা দিয়েছিল রথসচাইল্ড পরিবার। একটা সময় বিশ্বের সমস্ত বড় আর্থিক লেনদেন হত রথসচাইল্ডদের হাত দিয়েই।
রথচাইল্ড পরিবারের হাজার হাজার এজেন্ট ছড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্ক ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলিতে। পরিবারটি কিনে নিতে শুরু করেছিল লোকসানে চলতে থাকা ব্যাঙ্কগুলি। এভাবেই তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে নিজেদের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছিল। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পরিবারটি দেশগুলির ক্ষমতার আসনে বসাতে শুরু করেছিল তাদের পছন্দের সরকার।
বিশ্বযুদ্ধগুলিতে থেকেও প্রচুর টাকা কামিয়ে নিয়েছিল রথসচাইল্ড পরিবার। পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা দুটি দেশকেই যুদ্ধের রসদ কেনার জন্য চড়া সুদে ঋণ দিত রথসচাইল্ড পরিবার। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলিকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্যেও আরও ঋণ দিত। ক্রমশ ঋণের জালে জড়িয়ে যেত দেশগুলি। সম্ভব হত না ঋণের টাকা মেটানো। এভাবেই বিভিন্ন দেশের সরকারকে হাতের মুঠোয় রাখত রথসচাইল্ড পরিবার। ষড়যন্ত্র-তাত্ত্বিকদের দাবি, আজও রথসচাইল্ড পরিবারের পাতা ফাঁদ থেকে বেরোতে পারেনি অনেক দেশ।

'এন এম রথসচাইন্ড অ্যাণ্ড সন্স' ব্যবসা শুরু করার পর কেটে গিয়েছে দুশো বছরেরও বেশি সময়। আজ পরিবারটি চালায় প্রায় কুড়িটির মত ব্যাঙ্ক। সুইস ব্যাঙ্কগুলির ওপর আছে এদের একছত্র আধিপত্য। ব্যাঙ্কিং ব্যবসা ছাড়াও, রথসচাইল্ড পরিবার চালায় রিয়েল এস্টেট, সুরা, হিরে, জাহাজ, খনি, হোটেলসহ কয়েকশো ব্যবসা। এই পরিবারের হাতে আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা ১৮০০ স্থাবর সম্পত্তি। যার মধ্যে আছে বিলাসবহুল প্রাসাদ, বহুতল অফিস, স্টেডিয়ামসহ ফুটবল ক্লাব, হোটেল, ক্যাসিনো, কারখানা, খনি ও অসংখ্য ব্যক্তিগত দ্বীপও।
পরিবারটির হাতে আছে অজস্র বিলাসবহুল প্রাইভেট জেট, জাহাজ, ইয়ট ও হেলিকপ্টার। রথসচাইল্ডদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা আছে অ্যাপল, মেটা (ফেসবুক), আমাজন, ভিসা, স্টারবাকস, ব্লুমবার্গ, ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকা, পেপসিকো, জনসন জনসন, ফাইজারের মত অসংখ্য বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানিতে। ব্যবসার পাশাপাশি রথসচাইল্ডদের অর্থানুকুল্যে গড়ে উঠেছে অজস্র বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগার। ইহুদি হয়েও খ্রিস্টানদের পবিত্র ভ্যাটিকান সিটিকে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের অনুদান দেয় পরিবারটি।

ইন্টারনেট সার্চ করলে দেখা যাবে, আমেরিকার ওয়ালটন পরিবারকে বলা হয়েছে এইমুহূর্তের বিশ্বের সবথেকে ধনী পরিবার। যাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ২৩৮ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় স্থানে আছে আমেরিকার মার্স পরিবার (১৪২ বিলিয়ন )। তৃতীয় স্থানে আছে আমেরিকার কোচ পরিবার ( ১২৪ বিলিয়ন), চতুর্থ স্থানে ফ্রান্সের ডুমাস পরিবার (১১২ বিলিয়ন)। পঞ্চম স্থানে সৌদি আরবের আল সৌদ পরিবার (১০০ বিলিয়ন)। কিন্তু ইনভেস্টোপিডিয়া জানাচ্ছে, রথসচাইল্ড পরিবারের সম্পদের পরিমাণ দুই ট্রিলিয়ন ডলার। যার ধারে কাছে নেই বিশ্বের কোনও পরিবার।
রথসচাইল্ড পরিবারটিকে আরও বেশি রহস্যময় করে তুলেছে পরিবারের সদস্যদের জীবনযাত্রা। প্রায় দুশো বছর ধরে সমাজ থেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে পরিবারটি। সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠান ছাড়া ক্যামেরার সামনে খুব কমই দেখা যায় পরিবারের সদস্য-সদস্যাদের। পরিবারের অন্দরমহলে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ। পারিবারিক প্রাসাদ্গুলির জন্য কর্মচারী বাছাই করা হয় অতিসন্তর্পণে। সাধারণত প্রাক্তন কর্মচারীদের বংশধরদের নেওয়া হয় বিভিন্ন পদে। তাঁরা পূর্বপুরুষদের মতই মুখে কুলুপ এঁটে রাখেন।

তবুও পরিবারটির অন্দরমহল সম্পর্কিত যেটুকু তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তা যথেষ্ট চমকপ্রদ। রথসচাইল্ডদের ব্যাঙ্কিং ব্যবসায় কন্যা সন্তানদের প্রবেশের অনুমতি নেই। পরিবারের কন্যা সন্তানেরা সাধারণত সমাজসেবামূলক কাজগুলি দেখেন। অগাধ সম্পত্তি ধরে রাখার জন্য মেয়ার রথসচাইল্ডের সময় থেকেই পরিবারের তুতো ভাই বোনদের মধ্যে বিয়ের রীতি ছিল। পরবর্তীকালে পরিবারের বাইরে বিয়ে দেওয়া শুরু হলেও, পাত্র বা পাত্রীর ইহুদি হওয়াটা ছিল বাধ্যতামূলক। ইউরোপের বিভিন্ন অভিজাত পরিবার থেকে পাত্র বা পাত্রী নির্বাচন করা হত। তবে বৈবাহিক সুত্রে আত্মীয় হলেও, পরিবারের বাইরের মানুষদের সঙ্গে ব্যবসা সংক্রান্ত আলোচনার ওপর ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
ষড়যন্ত্র-তাত্ত্বিকদের তত্ত্ব অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স থেকে আজও সারা বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করে রথসচাইল্ড পরিবারের সপ্তম পুরুষ। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বর্তমানে পাঁচশো ছুঁইছুঁই। রথসচাইল্ড পরিবারের সপ্তম পুরুষদের মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত রথসচাইল্ড হলেন, ৩৮ বছরের আলেকজান্দ্রে রথসচাইল্ড। তিনিই এখন রথসচাইল্ড অ্যান্ড সন্সের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান। তবে সব থেকে বড় চমকটি হল, ভারতের সঙ্গেও একটি বিশেষ সম্পর্ক আছে এই পরিবারের। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা, রথচাইল্ড আর্কাইভের ট্রাস্টি, নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের স্ত্রী এমা রথসচাইল্ড, এই পরিবারের কন্যা।
