
শেষ আপডেট: 4 December 2022 14:03
দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের দখল নিয়ে ১৯৮২ সালে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনা আর ব্রিটেনের মধ্যে। ২ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে আমেরিকার সমর্থন ও সাহায্য পাওয়া ব্রিটিশরা শোচনীয়ভাবে হারিয়ে দিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন সেনা প্রাণ হারিয়েছিলেন।
ব্রিটেনের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল আর্জেন্টিনা-সহ সারা লাতিন আমেরিকা। ফকল্যান্ড যুদ্ধের চার বছর পর ১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ ছিল। মুখোমুখি হয়েছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের দুই প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুটছিল আজটেক স্টেডিয়ামের গ্যালারি।
[caption id="attachment_2549707" align="aligncenter" width="600"]
দুই পক্ষের অধিনায়ক মারাদোনা ও শিলটন[/caption]
ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশুন্য ভাবে শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের ছ'মিনিটের মাথায় মারাদোনা ইংল্যান্ডের হাফলাইন থেকে বল ধরেন। বিপক্ষের একের পর এক খেলোয়াড়কে ডজে বিভ্রান্ত করতে করতে একটু বাঁ দিক ঘেঁষে দ্রুত ঢুকতে থাকেন ইংল্যান্ডের বক্সের দিকে।
ইংল্যান্ড বক্সের বাইরে, ডানদিকে ছিলেন আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড জর্জ ভালদানো। বলটা মারাদোনা তাঁকে পাস দেন। ভালদানো বলটা ঠিক মত ট্র্যাপ করতে পারেননি। ইংলিশ ডিফেন্ডার স্টিভ হজ বলটা ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজের গোলের দিকে পাঠিয়ে দেন।
[caption id="attachment_2549715" align="aligncenter" width="600"]
শুরু হয়েছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই[/caption]
আজটেক স্টেডিয়ামের দর্শকরা ভেবেছিলেন মারাদোনা হেডে গোল করেছেন, কিন্তু ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা হ্যান্ডবলের দাবিতে ঘিরে ধরেছিলেন রেফারি আলি বেন নাসেরকে। টিভি ক্যামেরাতেও বোঝা যাচ্ছিল না গোলটি কীভাবে হয়েছে। মাত্র চার মিনিট পরেই মারাদোনা আরেকটি গোল করেছিলেন। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতে নিয়েছিল। ম্যাচের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মারাদোনা বলেছিলেন, "গোলের পিছনে আছে কিছুটা আমার মাথা আর কিছুটা ভগবানের হাত ( The hand of God)। সেদিন থেকে এই গোলটির নামই হয়ে গিয়েছিল 'হ্যান্ড অফ গড'।
[caption id="attachment_2549717" align="aligncenter" width="600"]
গোলের পর মারাদোনা[/caption]
অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে মারাদোনার দেওয়া দ্বিতীয় গোলটা যদি হয় শতাব্দীর সেরা গোল, অনেকের কাছে প্রথম গোলটা ছিল শতাব্দীর সবচেয়ে নিন্দনীয় গোল। অবশ্য মেক্সিকোর ফটোগ্রাফার আলেজান্দ্রো ওজেডা কার্বাজালের তোলা একটা ছবি 'হ্যান্ড অফ গড' গোলের পিছনে থাকা রহস্য ফাঁস করে দিয়েছিল। ছবিটিতে দেখা গিয়েছিল ভলিবলের স্ম্যাশারের ভঙ্গিতে মারাদোনা বাম হাত দিয়ে বল ইংল্যান্ডের জালে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর মাথা বল থেকে বেশ কিছুটা নীচে।
[caption id="attachment_2549720" align="alignnone" width="600"]
এই সেই মুহূর্ত[/caption]
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মারাদোনা বলেছিলেন ‘ম্যাচের আগেও বলেছি ফুটবলের সঙ্গে মালবিনাস (ফকল্যান্ড) যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। যদিও আমরা জানি, ওরা প্রচুর আর্জেন্টিনার সেনাকে মেরেছে। ছোট্ট পাখিকে যেভাবে মারা হয়, সেভাবেই আমাদের সেনাকে মেরেছে। আজকের এই ম্যাচ ছিল তারই প্রতিশোধ।"
মারাদোনাকে তাঁর কবর খননকারী (gravedigger) আখ্যা দিয়েছিলেন সেই ম্যাচের এক লাইন্সম্যান বোগদান ডচেভ। যিনি তাঁর দিকের সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন 'হ্যান্ড অফ গড' গোলটি। অত্যন্ত কুশলী এই বুলগেরিয়ান রেফারি ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে ইটালি-ক্যামেরুন ম্যাচ এবং ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে বেলজিয়াম ম্যাচ খেলিয়েছিলেন। এছাড়াও বিশ্বকাপের দু'টি বিখ্যাত ম্যাচে তিনি ছিলেন লাইন্সম্যান। ১৯৮২ সালের ব্রাজিল-ইটালি ম্যাচ এবং ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত ইংল্যান্ড -আর্জেন্টিনা ম্যাচ।
[caption id="attachment_2549726" align="aligncenter" width="600"]
ম্যাচের আগে তোলা ছবির ডানদিকে লাইন্সম্যান বোগদান ডচেভ।মাঝখানে রেফারি আলি বিন নাসের ,বামদিকে লাইন্সম্যান বার্নি[/caption]
ইংল্যান্ড -আর্জেন্টিনা ম্যাচটির পর ডচেভের জীবনে নেমে এসেছিল অন্ধকার। তাঁর অপরাধ ছিল কেন তিনি হ্যান্ডবলের সিগন্যাল দেননি। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন ডচেভদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। 'ঘুষখোর' বদনাম দিয়ে বাড়ির সামনে পোস্টার পড়েছিল। চেনা দোকানদার অচেনা হয়ে গিয়েছিলেন। জিনিস বেচতেন না ডচেভদের কাছে। অনেক দূরে গিয়ে নিত্যসামগ্রী কিনতে হতো। পুরোপুরি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন ডচেভ ও তাঁর স্ত্রী এমিলি। শেষ জীবনে চরম অর্থকষ্টেও পড়তে হয়েছিল দু'বার বুলগেরিয়ার জাতীয় দলের হয়ে খেলা ডচেভকে।
একবুক কষ্ট নিয়ে, উপেক্ষিত অবস্থায় প্রয়াত হন বোগদান ডচেভ। ২০১৭ সালের ২৯ মে ৮১ বছর বয়েসে। মৃত্যুর কয়েকবছর আগে সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন," দিয়েগো আমার জীবন শেষ করে দিয়েছিল। সে একজন অসাধারণ ফুটবলার ছিল। কিন্তু আকৃতিতে সে যেমন ছোট ছিল, মানুষ হিসেবে ততটাই ছোট ছিল।"
২০১৪ সালে ডচেভ স্বীকার করেছিলেন, মারাদোনা হাত দিয়ে গোল করেছিলেন এবং রেফারি নাসের তা বুঝেও হ্যান্ডবল না দিয়ে গোল দিয়ে দেন। ডচেভের বিরুদ্ধে তখনও ক্ষোভে ফুটতে থাকা ইউরোপীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নবানের মুখে নির্লিপ্তভঙ্গীতে অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত মানুষটি বলেছিলেন “ আমি দেখেছি আর্জেন্টিনার মানুষটিকে হাত দিয়ে গোল করতে। কিন্তু সেই সময়ে ফিফার নিয়মে বলা ছিল, রেফারি যদি জানতে চান তবেই লাইন্সম্যান রেফারিকে তাঁর মতামত দিতে পারবেন। রেফারি আমার দিকে না তাকিয়ে আগেই গোল দিয়ে দিয়েছিলেন। কোনও যোগাযোগই ছিল না আমাদের দুজনের মধ্যে। নাসের তাঁর দেশের ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা জানতেন না।"
ডচেভ আরও বলেছিলেন,"ফিফা বলেছিল রেফারি ও লাইন্সম্যানের মধ্যে যিনি মাঠে অপেক্ষাকৃত ভালো পজিশনে থাকবেন তাঁর সিদ্ধান্তটিকেই সম্মান দিতে হবে। সেদিন আমার চেয়ে ভালো পজিশনে ছিলেন রেফারি নাসের। বলের কাছেই ছিলেন। তাই আমি তাঁর সিদ্ধান্তকে সম্মান দিয়েছি। তবে ফিফা এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলায় যদি ইউরোপীয় রেফারি ব্যবহার করত তাহলে মারাদোনার প্রথম গোলটা অবশ্যই বাতিল হত।"
[caption id="attachment_2549730" align="aligncenter" width="532"]
মৃত্যুর কয়েক বছর আগে বোগদান ডচেভ[/caption]
অপরদিকে রেফারি আলি বিন নাসের বলেছিলেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেছিলেন," আমি অপেক্ষা করছিলাম ডচেভের সিগন্যালের জন্য। কিন্তু ডচেভ পতাকা তোলেননি। ম্যাচের আগে ফিফার পরিষ্কার নির্দেশ ছিল যদি কলিগ (লাইন্সম্যান) আমার চেয়ে বেটার পজিশনে থাকে আমি তাঁর মতকে গ্রহণ করব।" রেফারি আলি বিন নাসের অবশ্য জানাননি তিনি কেন লাইন্সম্যানের দিকে না তাকিয়েই গোলের বাঁশি বাজিয়েছিলেন। এও জানাননি, বলের কাছে ছিলেন তিনি অথচ তাঁর কেন মনে হয়েছিল ডচেভ তাঁর থেকে ভালো পজিশনে ছিলেন।
ডচেভের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী এমিলি ডচেভ জানিয়েছিলেন, অনেক কষ্ট পেয়ে তাঁর স্বামী বোগদান ডচেভ মারা গেছেন। এজন্য তিনি কিছুতেই রেফারি আর মারাদোনাকে ক্ষমা করতে পারবেন না। স্ত্রী এমিলি বিশ্বকে জানিয়েছিলেন এক অজানা তথ্য, যা জেনে ফুটবল দুনিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।
তিউনিশিয়ার রেফারি আলি বিন নাসের ম্যাচের আগে নাকি তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন, মাঠের ভেতরে ঘটা সব ধরনের সিদ্ধান্ত তিনি (নাসের) নেবেন। এমিলি বলেন, "রেফারি বলেছিলেন,তোমায় (ডচেভ) কোনও কাজ করতে হবে না, সব ব্যাপারে আমিই সিদ্ধান্ত নেব।" এমিলির কন্ঠে ঝরে পড়েছিল তীব্র ঘৃণা ,"আমাদের কাছে গোলটা 'হ্যান্ড অফ গড' ছিল না, ওটা ছিল আমাদের দাঁতে এসে পড়া একটা লাথি।"
'হ্যান্ড অফ গড' গোলটি দেওয়ার ২৯ বছর পর, ২০১৫ সালের ১৭ আগস্ট সুদূর আর্জেন্টিনা থেকে তিউনিশিয়া উড়ে এসে ছিলেন ফুটবলের রাজপুত্র দিয়াগো আর্মান্দো মারাদোনা। এসেছিলেন সেদিনের 'রিয়েল হিরো' রেফারি আলি বিন নাসেরের সঙ্গে দেখা করে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে। সুদূর বুলগেরিয়ায় থেকেও খবরটা পেয়েছিলেন সেদিনের ম্যাচের অভিশপ্ত লাইন্সম্যান বোগদান ডচেভ। তখনও জীবিত ছিলেন তিনি। সমালোচনার ঝড় উঠেছিল ইউরোপ জুড়ে। ইউরোপীয় ফুটবলপ্রেমীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন,"ঘুষটা তাহলে খেয়েছিল কে?"
আলি বিন নাসেরের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে নাসেরকে তীব্র আবেগে জড়িয়ে ধরেছিলেন মারাদোনা। উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিয়েছিলেন আলির গালে। নাসেরকে উপহার দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার জার্সি, তাতে নিজের হাতে লিখেছিলেন, “For Ali, my eternal friend”, তার নীচে ছিল মারাদোনার সই। ৭১ বছরের আলি বিন নাসের সেদিন মারাদোনাকে উপহার দিয়েছিলেন তাঁর সই করা ম্যাচ শুরুর মূহুর্তের কয়েক মিনিট আগের একটি ছবি।
যে ছবিতে দেখা যাচ্ছে করমর্দনরত মারাদোনা ও পিটার শিলটনের মাঝে বল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেদিনের রেফারি নাসের। ম্যাচের অপর লাইন্সম্যান বার্নি মোরেরাকে ছবিতে দেখা গেলেও, ইংল্যান্ড অধিনায়ক শিলটনের শরীরে আড়ালে চলে গেছেন অভিশপ্ত লাইন্সম্যান বোগদান ডচেভ। কাকতালীয়, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে ছবিটি বেছে নিয়েছিলেন রেফারি নাসের? অনুতাপ, নাকি সেই মানুষটাকে দেখার মত মনের জোর ছিল না নাসেরের? কারণ এখনও অনেক ফুটবলপ্রেমী মানেন, ডচেভের জীবন নষ্ট হওয়ার জন্য নিজের দায়টা পুরোপুরি এড়াতে পারেন না নাসের।
[caption id="attachment_2549743" align="alignnone" width="600"]
সেই ম্যাচের রেফারি নাসের বাড়িতে মারাদোনা[/caption]
বেশিরভাগ ইউরোপীয়দের উত্তর 'হ্যাঁ' হলেও, বেশিরভাগ লাতিন আমেরিকানের উত্তর হবে," 'না', দিয়েগো দায়ী নয়।" তাঁরা তাঁদের আবেগ থেকেই একথা বলেন। তবে তাঁরা অনেকেই জানেন না বিখ্যাত ইংরেজ কবি জন লিলি তাঁর Euphues: The Anatomy of Wit (১৫৭৮) নামক বিখ্যাত উপন্যাসে লিখে গিয়েছিলেন বিশ্ব বিখ্যাত একটি লাইন,"All is fair in love and war"।
হ্যাঁ, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচটা চে গেভারা'র অন্ধভক্ত মারাদোনার কাছে যুদ্ধ'ই ছিল, ফুটবল ম্যাচ নয়।