Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
অভিষেক ও তাঁর স্ত্রীর গাড়িতে তল্লাশির নির্দেশ! কমিশনের ‘হোয়াটসঅ্যাপ নির্দেশ’ দেখাল তৃণমূল৪২-এ বেবি বাম্প নিয়েও ওয়েট লিফটিং! স্বামী বরুণের সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে রোম্যান্স করিশ্মারIPL 2026: হেরেও শীর্ষে রাজস্থান! কমলা ও বেগুনি টুপি আপাতত কোন দুই তারকার দখলে? প্রকাশ্যে আয়-সম্পত্তির খতিয়ান, রাজ না শুভশ্রী! সম্পত্তির নিরিখে এগিয়ে কে? অ্যাপল ওয়াচ থেকে ওউরা রিং, কেন একসঙ্গে ৩টি ডিভাইস পরেন মুখ্যমন্ত্রী? নেপথ্যে রয়েছে বড় কারণপ্রসবের তাড়াহুড়োয় ভয়াবহ পরিণতি! আশাকর্মীর গাফিলতিতে দু'টুকরো হল শিশুর দেহ, মাথা রয়ে গেল গর্ভেই২০ বছরের 'রাজ্যপাট'! ইস্তফা বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ‘সুশাসন বাবু' নীতীশ কুমারের, উত্তরসূরির শপথ কবেমুম্বইয়ের কনসার্টে নিষিদ্ধ মাদকের ছড়াছড়ি! 'ওভারডোজে' মৃত্যু ২ এমবিএ পড়ুয়ার, গ্রেফতার ৫IPL 2026: ‘টাইগার জিন্টা হ্যায়!’ পাঞ্জাবকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভাইরাল মিমের স্মৃতি উসকে দিলেন সলমন আইপ্যাকের ডিরেক্টর গ্রেফতারের পর এবার পরিবারের পালা! ইডির নজরে প্রতীক জৈনের স্ত্রী ও ভাই, তলব দিল্লিতে

টেনিসে বিশ্বসেরা,অথচ কালো চামড়ার জন্য অপমানিত হয়েছেন, গর্ভাবস্থাতেও শুনেছেন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ

সেই কালোচামড়ার মেয়ে, যে টেনিসের মাঠে শ্বেতাঙ্গ, ধনী, তথাকথিত অভিজাত শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার উচ্ছেদ করে নিজের নাম খোদাই করে দিয়েছেন চিরকালের মতো, সোনার অক্ষরে। তিনি সেরেনা উইলিয়ামস।

টেনিসে বিশ্বসেরা,অথচ কালো চামড়ার জন্য অপমানিত হয়েছেন, গর্ভাবস্থাতেও শুনেছেন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ

শেষ আপডেট: 3 April 2024 12:06

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: সর্বকালের অন্যতম সেরা টেনিস তারকা তিনি, এককভাবে ২৩টি গ্রান্ডস্লাম জয় করার সর্বকালের রেকর্ড তাঁর পকেটে। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ক্রিড়াপ্রেমী মানুষ তাঁর গুণমুগ্ধ। ২০০২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে আটটি পৃথক অনুষ্ঠানে এককভাবে বিশ্বের ১ নাম্বার পেশাদার টেনিস খেলোয়ারের খেতাব- হ্যাঁ সেটিও তাঁরই পকেটস্থ। এই পরিচয়টুকুও যথেষ্ট নয়। আদতে তিনি সেই কালোচামড়ার মেয়ে, যে টেনিসের মাঠে শ্বেতাঙ্গ, ধনী, তথাকথিত অভিজাত শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার উচ্ছেদ করে নিজের নাম খোদাই করে দিয়েছেন চিরকালের মতো, সোনার অক্ষরে। তিনি সেরেনা উইলিয়ামস। (Serena Williams)

সেরেনা জামেকা উইলিয়ামসের জন্ম আমেরিকায়, আরও স্পষ্ট করে বললে লস অ্যাঞ্জেলেসের এক হতদরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারে। ওরেসিন প্রাইস আর রিচার্ড উইলিয়ামসের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবথেকে ছোট সেরেনা। ছেলেবেলা থেকেই টেনিসের প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ। টেনিসকে তখন বলা হত শ্বেতাঙ্গ অভিজাতদের খেলা। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একটা কালো চামড়ার মেয়ে সে খেলায় ভাগ বসাবে এ কথা বোধহয় দুঃস্বপ্নেও ভাবা যেত না। অথচ সেই আকাশকুসুম কল্পনাকেই নিজের জীবন দিয়ে বাস্তব করে তুললেন সেরেনা। আত্মবিশ্বাস, জেদ আর চোয়াল শক্ত করা লড়াই দিয়ে ছিনিয়ে আনলেন একের পর এক জয়ের মুকুট। কিন্তু তারপর? অখ্যাত পরিবারের এক কৃষ্ণকলির কাছে বারবার পরাজয় কি খুব সহজে মেনে নিয়েছিল বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সমাজ? টেনিস-কোর্টের ভিতরে-বাইরে ঠিক কতটা প্রতিকূল ছিল এক একা মেয়ের লড়াই? (Serena Williams)

এ প্রসঙ্গে দেখা যাক স্বয়ং সেরেনার অভিজ্ঞতা কী বলে! ২০০১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ইন্ডিয়ান ওয়েলস টুর্নামেন্টের ফাইনালের সময়কার একটি সাক্ষাৎকারে সেরেনা বলেছিলেন- "আমার মনে আছে পুরো স্টেডিয়ামে ৯৯ শতাংশ মানুষই ছিল শাদা চামড়ার, আর তারা সবাই চিৎকার করছিল। উচ্চস্বরে জাতিগত শ্লোগান ব্যবহার করছিল। প্রত্যেকটি স্লোগান একটা প্রতিধ্বনির মতো শোনাচ্ছিল। সেগুলো এত তীব্র আর ঘৃণা মেশানো ছিল, যেন বুকে পিঠে বিঁধে যাচ্ছিল আমার।" মনে রাখতে হবে, এই সেরেনা মধ্য চল্লিশের পোড় খাওয়া টেনিসপ্লেয়ার নন, মাত্র ১৯ বছরের এক সদ্য তরুণী।

কিশোরী সেরেনা উইলিয়মস

সাদা চামড়া-কালো চামড়া নিয়ে সারা পৃথিবীতেই এক অদ্ভুত বৈষম্য চালু ছিল এক সময়। কালো চামড়ার লোকদের দাস হিসেবে ব্যবহার করত, জন্তুজানোয়ারের মতো হাটেবাজারে বেচাকেনা করত শ্বেতাঙ্গ মানুষেরা। গায়ের রংয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠত প্রভু ভৃত্যের সম্পর্ক। নিছক মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্যই দেশে দেশে কম লড়াই করতে হয়নি কালো মানুষদের। বিপ্লব, বিদ্রোহ হয়েছে, সেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে একাধিক উপন্যাস, সিনেমা। কিন্তু তারপরেও 'কালো মানুষ' বা 'ব্ল্যাক পিপল'দের প্রতি সাদা চামড়ার মানুষদের ঘৃণা ও বঞ্চনার অবসান হয়নি। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও জর্জ ফ্লয়েডদের নৃশংস মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয় দাসপ্রথা আর বর্ণবিদ্বেষের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস। এমনকি সেই ঘৃণ্য রেসিজমের হাত থেকে নিস্তার পান না সেরেনা উইলিয়ামসের মতো তারকা খেলোয়ারও।

২০১৪ সালের কথাই ধরা যাক। রাশিয়ান টেনিস ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট সেরেনা আর তাঁর দিদি ভেনাসের পেশিবহুল শরীরী গঠনকে ব্যঙ্গ করে প্রকাশ্যেই অশ্লীল মন্তব্য করলেন, 'উইলিয়ামস ভাই' বলে অভিহিত করলেন দুই কালো চামড়ার মহিলাকে। শুধু তাই নয় বর্ণবাদকে উশকে দিয়ে তিনি এমন কথাও বলেছিলেন যে, কালো মহিলারা পুরুষদের থেকে উদাসীন হয়, আর সেটা উইলিয়ামকে দেখলেই বোঝা যায়। (Serena Williams)

সেরেনা আর তাঁর দিদি ভেনাস

সেরেনার ফুটফুটে মেয়ে অলিম্পিয়া তখনও জন্মায়নি। ২০১৭ সাল, সেরেনা তখন গর্ভবতী। সম্ভাব্য মাতৃত্বের সেই দিনগুলোতেও টেনিস-তারকার অনাগত সন্তানের গায়ের রং নিয়ে তামাশা করতে ছাড়েননি বর্ণবিদ্বেষীরা। প্রাক্তন গ্র্যান্ড স্ল্যাম চ্যাম্পিয়ন ইলি নাস্তাসেম সেসময় সেরেনার গর্ভস্থ সন্তান সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন: "দেখা যাক এর (সেরেনার সন্তানের) রং কী হয়! দুধের সঙ্গে চকোলেট?" সন্তানের বাবা অ্যালেক্সিস ওহানিয়ানের সাদা চামড়া আর কৃষ্ণাঙ্গ সেরেনাকে ইঙ্গিত করেই যে এমন অশালীন ঠাট্টা করা হয়েছিল তা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। (Serena Williams)

সপরিবার সেরেনা

এখানেই শেষ নয়। ২০১৮ সালে ইউএস ওপেনের ফাইনালে ছিলেন সেরেনা ও নোয়ামি ওসাকা। সেই ম্যাচে আম্পায়ারকে গালি দিয়ে প্রবল বিতর্কের জন্ম দেন সেরেনা উইলিয়ামস। এই ঘটনার পর সেরেনার কার্টুন এঁকে বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেন অস্ট্রেলিয়ান কার্টুনিস্ট মার্ক নাইট। ইউএস ওপেনের ফাইনাল চলাকালীন চেয়ার আম্পায়ার র‍্যামোসের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন সেরেনা। রাগের চোটে ছুঁড়ে ফেলেন র‍্যাকেট, মেজাজ হারিয়ে চেয়ার আম্পায়ারকে প্রকাশ্যে ‘চোর, মিথ্যুক’ও বলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। এরপরই কার্টুনিস্ট মার্ক নাইট সেরেনার একটি কার্টুন প্রকাশ করেন মেলবোর্নের হেরাল্ড সান পত্রিকায়। কার্টুনে দেখা যায়, ‘ভারী চেহারার সেরিনা লাফাচ্ছেন কোর্টে। পাশে পড়ে রয়েছে তাঁর ভেঙে ফেলা র‍্যাকেট। আর আম্পায়ার সেরিনার প্রতিপক্ষ জাপানের নেয়োমি ওসাকাকে বলছেন, তুমি কি ওকে জিততে দিতে পারো না?

সেই বিতর্কিত কার্টুন

ফাইনালে নোয়ামি ওসাকা শিরোপা জিতলেও চেয়ার আম্পায়ারের সঙ্গে সেরেনার সেই উত্তপ্ত বাদানুবাদ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তুমুল উত্তেজনা চলে টেনিসমহলে। আচরণবিধি ভেঙে ফেলায় সেরেনাকে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হয়। এ ছাড়াও ম্যাচের একটি গেম প্রতিপক্ষ ওসাকাকে দিয়ে দেন আম্পায়ার। এই ঘটনায় লিঙ্গ এবং বর্ণ বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন ক্ষুব্ধ সেরেনা। টেনিস চ্যাম্পিয়নের মতে, মাঠের মধ্যে এমন ব্যবহারে পুরুষ খেলোয়াড়রা ছাড় পেলেও, তিনি মেয়ে এবং তাঁর গায়ের রং কালো বলেই কঠিন শাস্তির খাঁড়া নেমে এসেছিল তাঁর উপর। বাস্তবিক এই ঘটনায়, গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের স্বপ্ন ফের অধরাই থেকে গিয়েছিল সেরেনার। (Serena Williams)

বছর তিনেক আগেও, ২০১৯ সালে, একজন রোমানিয়ান টিভি হোস্ট রীতিমতো বডি শেমিং করেন বিখ্যাত টেনিস তারকার। লাইভ টিভিতে সেবার রাদু ব্যানসিউ সেরেনাকে চিড়িয়াখানার বানরের লাল পিঠের সাথে তুলনা করেন। তিনি বলেন, "বানররা যদি ট্রাউজার পরে, তাহলে তারা কোর্টে সেরেনা উইলিয়ামসের মতো দেখতে লাগবে."

বর্ণ বিদ্বেষ কোনও নতুন বিষয় নয়। একসময় ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশের শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা তাঁদের আফ্রিকান-আমেরিকান ক্রীতদাসদের মানুষ বলে মনে করতেন না। রাষ্ট্রও মনে করত না। আদমসুমারি হলে বহু দিন অবধি কৃষ্ণাঙ্গদের মাথা গুনত না কেউ। কিন্তু আজও, এই বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও সে ঘৃণার বিষবাষ্প থেকে রেহাই মেলেনি সভ্যতার। প্রথম বিশ্বের বুকে জর্জ ফ্লয়েডদের করুণ পরিণতি সেদিকেই আঙুল দেখায়। অথচ কালো হওয়ার মধ্যে যে কোনও লজ্জা নেই, উলটে গর্ব করা যায় তা নিয়ে, আপামর বিশ্ববাসীর চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দিয়েছেন সেরেনা উইলিয়ামসের মতো কেউ কেউ। শ্লেষ, অপমান, বিদ্রুপের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছেন তাঁরা, ছিনিয়ে নিয়েছেন নিজেদের প্রাপ্য সম্মান। দাপুটে খেলার পাশাপাশি সেরেনার সোজাসাপটা কথাবার্তা, ভনিতাহীন ব্যবহার এবং তাঁর ব্যক্তিত্ব আজ গোটা বিশ্বের মহিলাদের কাছে অনুপ্রেরণা। কালো মেয়েরা উজ্জীবিত হচ্ছে তাঁকে দেখে, প্রোটোটাইপ ভেঙে এগিয়ে আসছে খেলার ময়দানে। বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে এখানেই জিতে গেছেন সেরেনারা।


```