
শেষ আপডেট: 17 October 2022 16:49
দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: সে এক কুয়াশাচ্ছন্ন দিন। কান্নার বাষ্পে যেন মুখ ঢেকেছে সূর্য। ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই। এই দিনটাই স্থির করা হয়েছিল অলিন্দ যুদ্ধের তিন মহানায়কের অন্যতম দীনেশের ফাঁসির জন্য। তার আগে অবশ্য ট্রাইব্যুনালের নামে চলেছে নির্লজ্জ প্রহসন। ঘটনার পরের দিন ৮ তারিখ সকালে খবরের কাগজের শিরোনামে লেখা হল 'Dauntless Dinesh Dies at Dawn'… ব্রিটিশ প্রভুদের আস্পর্ধা দেখে সেদিন ফুঁসে উঠেছিল বাংলার তরুণ দেবতারা।
কানাইলাল ভট্টাচার্য। উনিশ বছরের এক চনমনে যুবক। বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত শত শত তরুণের মধ্যে থেকে তাঁকেই বেছে নেওয়া হল এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে দীনেশের ফাঁসির ঘটনার মূল চক্রী রেনল্ডস গার্লিক সাহেবকে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্নেল জেমস পেডির পর বিপ্লবীদের খতম তালিকার শীর্ষে তখন গার্লিক। ঠিক করা হল, এজলাসের মধ্যেই গুলি চালিয়ে খুন করা হবে নরপিশাচ গার্লিককে। নিজের প্রাণের বিনিময়ে সেদিন নিজের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছিলেন তরুণ বিপ্লবী কানাইলাল। সফল হয়েছিল প্রতিশোধ। আর এই সমস্ত ঘটনাটির মাস্টারমাইন্ড ছিলেন বারুইপুরের এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। আজীবন দেশের জন্য নীরবে আত্মত্যাগ করে যাওয়া সেই মানুষটির নাম সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। বিপ্লবীদের 'সাতদা' (Satkari Bandyopadhyay)।

পরাধীন ভারতে অবিভক্ত চব্বিশ পরগনা জেলায় জন্মেছিলেন বিপ্লবী সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বাবার নাম মন্মথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাত্রাবস্থাতেই বিপ্লবী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন সাতকড়ি। হরিনাভি স্কুলে পড়ার সময় ১৯০৫ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সংবর্ধনা জানাবার কারণে মানবেন্দ্রনাথ রায় সহ যাঁরা স্কুল থেকে বিতাড়িত হন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন এই সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় (Satkari Bandyopadhyay)। দেশকে স্বাধীন করার মন্ত্রে তাঁর দীক্ষা হয় কিশোরবেলাতেই। তরুণ বয়সে গেরিলা যুদ্ধের রণনীতি আয়ত্ত করেছিলেন তিনি। বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন বিপ্লবী বাঘা যতীনের।

১৯৩০ সালে অত্যাচারী পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টকে খুন করে বিপ্লবীরা। এই কাজে বেশ বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। সে যাত্রা কারাবাসের হাত থেকে বেঁচে যান তিনি। ততদিনে গোটা চব্বিশ পরগণার বিপ্লবীরা তাঁকে চেনে 'সাতদা' নামে। পরের বছরই কানাইলালের হাতে খুন হলেন গার্লিক। ব্যাপক ধরপাকড়ের পর ১৯৩৬ সালে দেশদ্রোহিতার অপরাধে কারাবাস হয় সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Satkari Bandyopadhyay)। প্রথমে আলিপুর আর পরে নৈনি জেলে থাকাকালীনও বিপ্লবীদের মন্ত্রণাদাতা হিসেবে গোপনে কাজ করে গেছেন সাতকড়ি। নৈনি জেলে থাকাকালীন রাজবন্দীদের ওপর দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে ৬৭ দিন অনশনও করেন তিনি।
সাতকড়ির মতো বিপ্লবীদের জেলে ভরা যায়। কিন্তু আটকে রাখা যায় না। ব্রিটিশ পুলিশ কোনওদিনই ঠিক বাগে আনতে পারেনি তাঁকে। বারবার কারারুদ্ধ করেছে। বেরিয়ে এসে আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছেন স্বাধীনতা আন্দোলনে। শেষবার তাঁকে বন্দি করে পাঠানো হল রাজস্থানের দেউলিতে। শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। তার উপর পুলিশি অত্যাচার তো ছিলই। ১৯৩৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এক জীবনের কারাশৃঙখল থেকে নিজেকে চিরকালের মতো স্বাধীন করে নেন সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়।