অঞ্জুশ্রী দে

“ নিজের হাতে কাজ করো/ কাজ তো ঘৃণার নয়/ কাজের মাঝে হয় মানুষের/ সত্য পরিচয় /” । আবদুল লতিফের লেখা এই গান বলে দেয় বেঁচে থাকার জন্য কোনো পেশাই ছোট নয়। আশির দশকে কলকাতা শহরে মহিলারা বিচিত্র এক পেশায় যুক্ত ছিলেন। যার নাম টেলিফোন ক্লিনার । এ পেশায় পুরুষের সংখ্যা নিতান্তই কম। যেহেতু জন গণনায় এই পেশার লোককে আলাদা করে দেখানো হয়নি, ফলে এর সঠিক জন্ম তারিখ বলা কঠিন। তবে বিদেশে এই পেশা অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। একসময় এই পেশায় যুক্ত মনিদীপা ঘোষ বলছিলেন "চাকরির খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক বয়স্ক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি বললেন সিঙ্গাপুরে মেয়েরা সুন্দর পেশায় নেমেছে, নাম - টেলিফোন ক্লিনার। চাকরির পিছনে না ঘুরে এই পেশায় যুক্ত হন।“ ১৯৭৪ সালে ২ টাকা রেটে ১৮ টা টেলিফোন পরিস্কার করার বরাত নিয়ে এই পেশা শুরু করি। মাসে চারবার টেলিফোন পরিষ্কার। একটি টেলিফোন একাধিক লোকে ব্যবহার করত। ফলে, রোগ জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকত । এই জীবাণু নষ্ট করাই টেলিফোন ক্লিনারের কাজ। ডাস্টার, তুলো, মিন পালিশ, স্যাভলন ও কেমিক্যাল লোশন ব্যবহার করে টেলিফোন সেটটিকে পরিস্কার করে শেষে সেন্ট লাগানো। পুরো কাজটা করতে মিনিট ৫ সময় লাগত। তবে এ-পেশা একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট ছিল না। যেহেতু মহিলাদের কাজ, অনেক সময় তাদের কুপ্রস্তাবের সম্মুখীনও হতে হয়েছে। টেলিফোন ক্লিনারের পেশায় ন্যূনতম লেখাপড়ার প্রয়োজন হত। একটু ইংরেজি লিখতে বা বলতে না জানলে এখানে টিকে থাকা কঠিন ছিল। সরকারি কোনও স্বীকৃতি না থাকলেও, সমাজ এই পেশা মেনে নিয়েছিল। গ্রহণ করেছিল। আজ সবার হাতে মুঠোফোন। কোনও বাড়িতে ল্যান্ড লাইন বা টেলিফোন নেই বললেই চলে। টেলিফোন- ই যখন নেই, টেলিফোন ক্লিনার থাকবেন না এটাই তো স্বাভাবিক।
“ আঁতুড়ঘরে আমার মুমূর্ষু মায়ের কোল থেকে উনি / একদিন আমাকে বুকে তুলে নিয়েছিলেন।/ এর ডাটো শরীরের স্তন্য পান করেছিলুম / প্রতিদিন শুষে নিয়েছি রক্ত / ধাইমার কুঁড়োর গন্ধ মাখা বুকে শুয়ে আমি চিল- কান্না কেঁদেছি ।“ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ধাত্রী কবিতার এই লাইন থেকে আমরা ধাই বা দাইকে খুঁজে পাই। এঁরাই বাড়িতে প্রসব করাতেন। আজকের দিনে বসে, কল্পনা করা কঠিন – ‘প্রসব করানো’ একটা পেশা । কিন্তু ৫০-৬০ বছর আগে গ্রামের দিকে বাড়িতে প্রসব করানোর রেওয়াজ ছিল। বিশেষ করে, প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে গর্ভবতী মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে এনে সন্তান প্রসব করানো হত। গর্ভবতী মেয়ে বাপের বাড়ি এলে, গ্রামের দাইকে খবর দেওয়া হত। তিনি গর্ভবতী নারীর লক্ষণ দেখেই বলতে পারতেন, প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ। সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হত। প্রসূতির জন্য একটি বিশেষ ঘরের ব্যবস্থা থাকত, তাকে আঁতুড়ঘর বলত। ওটাই সেই সময়ের ওটি । সন্তান প্রসবের পর নগদ টাকা, চাল-ডাল এবং ক্ষেত্র বিশেষে শাড়ি, চাদর দেওয়া হত দাইকে। বড়লোকের বাড়িতে মন মতো সন্তান হলে গয়না দিতেও দেখা যেত। বর্তমানে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রসার এমন জায়গায় পৌঁছেছে গ্রামের গর্ভবতী মেয়েরা, গর্ভাবস্থায় পুরো সময়টাই স্থানীয় হাসপাতাল বা ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকেন। প্রসবের সময় চিকিৎসালয়ে যান । এখন বাড়িতে প্রসবের ধারণাই নেই, ফলে এই পেশা আজ বিলুপ্ত।
অবনীন্দ্রনাথ লিখছেন, “ তখনও বাড়িতে জলের কল বসেনি। রাস্তার ধারে টানা নহর বয়ে কলের জল আসে। রোজই দেখি এক ভিস্তি, গায়ে তার হাত কাটা নীল জামা, কোমরে খানিক লাল শালু জড়ানো, মাথায় পোস্ট অফিসের গম্বুজের মতো উঁচু সাদা টুপি - নহরের পাশে দাঁড়িয়ে চামড়ার মশকে জল ভরে“ । ওরা ভিস্তিওয়ালা । “এ শহরে এসছো তুমি কবে কোন রাজ্য থেকে….” । ওদের জন্য এই কথাটাই মনে হয় যথাযথ। শহরের আকাশে অন্ধকার কাটতে না কাটতেই দিন শুরু হত ভিস্তিদের। সাত সকালেই পাড়ার টিউবওয়েল বা ট্যাপ কলের সামনে মশক নিয়ে লাইন করে এরা দাঁড়িয়ে পড়ত। আলো ফুটলে এই বারোয়ারি কলে ভিড় বাড়ত। কলতলায় জল আনতে আসা অন্য লোকের সঙ্গে ভিস্তিদের ঝগড়া রোজকার ব্যাপার। সবারই তাড়া। অথচ, ভিস্তিদের বার বার ও অনেকক্ষন ধরে জল নেওয়া মানুষকে অধৈর্য করে তুলত। এরা দিনে দু’ বার জল নিতো। সকালে ভোর পাঁচটা থেকে দশ/ এগারোটা অবধি। আবার বেলা আড়াইটা থেকে সন্ধে পর্যন্ত। পুরনো কলকাতায় আর পাঁচটা পেশার মানুষদের মত এদের নিজস্ব পাড়া ছিল। সেখানেই এরা দল বেঁধে থাকত। এরকমই কাশীপুর, কলিন স্ট্রীটের ভিস্তি পাড়ায় এখন আর এদের পাওয়া যায় না। এদের পরের প্রজন্ম নতুন পেশা নিয়েছে। আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়ির সংস্কৃতিতে এদের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। কলকাতা থেকে ভিস্তি সংস্কৃতিও আজ অবলুপ্ত।
“পালকি চলে ! পালকি চলে!/ গগন-তলে আগুন জ্বলে!/ স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল গায়ে/ যাচ্ছে কারা রৌদ্রে সারা"। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা যাঁদের নিয়ে লেখা বাস্তবে আজ তারা কেউই নেই। না পালকি, না পালকিওয়ালা । পালকি ছিল এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন যান । পালকি কাঁধে হনহনিয়ে যেত বেহারা। সুঠাম শরীর, কোচ দেয়া ধুতি, কোমরে গামছা বাঁধা, হাতে লাঠি-বেহারার চির চেনা রূপ। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও এদের গ্রামাঞ্চলে দেখা যেত। যে অঞ্চলে গাড়ির রাস্তা ছিল না বা পায়ে চলার পথও সংকীর্ণ সেখানে বেহারাদের ডাক পড়তো। সাধারণত ধনী এবং সম্ভান্ত বংশের লোকেরা পালকিতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেত। বিয়ের পর কনেকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যেতে এদের ডাকা হত। ব্রিটিশ আমলে ইউরোপের উচ্চ শ্রেণীর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরাও পালকিতে চলাচল করতেন। তবে উপমহাদেশে রেলগাড়ি চালুর পর ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে পালকির ব্যবহার অনেকটাই কমে আসে। কিন্তু এখন তা পুরোপুরি বিলুপ্ত।
আবার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন "রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম ঘন্টা বাজছে রাতে "। কোন সময় থেকে রানারের এই 'দৌড়', তা সঠিক জানা নেই। তবে মোঘল যুগের সময় থেকেই রানারের যাত্রা শুরু বলে মনে করা হয়। প্রথমদিকে রাজা বাদশাদের প্রশাসনিক কাজে এঁদের ব্যবহার করা হত। পরে, ব্যবসার কাজেও রানারদের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেই কাজ করতেন এই রানাররা। তবে রানারের চেনা ছবি হল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চিঠির বোঝা পৌঁছে দেওয়া । শুধু চিঠিই নয়, টাকা পয়সা বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজও করতেন এই রানাররা । তাই শুধু পরিশ্রম করার ক্ষমতা থাকলেই হত না, পাশাপাশি সততা থাকাটাও ছল জরুরি। আধুনিক দুনিয়া দৌড়চ্ছে সামাজিক মাধ্যমের উপর নির্ভর করে। অফিসিয়াল চিঠি আদান প্রদান হচ্ছে মেইল মারফত। ফলে রানারদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে।
এবার বলি, "বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না, ডাইনে তোমার চাচার বাড়ি, বায়ের দিকে পুকুর ঘাট , সেই ভাবনায় বয়স আমার বাড়ে না...।“ এই বায়োস্কোপের নেশা সত্যি বয়সকে এক জায়গায় থামিয়ে দিতে পারে। চৌকো একটি টিনের বাক্সে গোলাকৃতি ৪ থেকে ৬টি কাচের জানালা। বাক্সের ভেতরে একদিকে একটি দণ্ডে ধারাবাহিকভাবে অনেক রঙিন ছবি বসানো কাগজ রোল করা থাকত। ছবি বসানো কাগজের একটি দিক অন্য প্রান্তের দণ্ডে লাগানো থাকত। এক প্রান্তের দণ্ড ঘোরালে ছবিগুলো ধারাবাহিকভাবে চলে আসত। আতশকাচের কারণে ছবিগুলো বড় আকারে দেখা যেত। এটাই ‘বায়োস্কোপ‘। বাইরে থেকে বায়োস্কোপের স্বচ্ছ কাচের ওপর চোখ রেখে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেত দর্শকরা । শুধু ছোটরা নয় বয়স্করাও এই বায়োস্কোপের দর্শক ছিলেন। তখনও রেডিও, টেলিভিশন আসেনি। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিনোদন বলতে এই বায়োস্কোপ। তাকে পেশা করে এক শ্রেণীর মানুষ সংসার চালাতেন। তাঁরা হলেন বায়োস্কোপওয়ালা । ইনি ক্লাউনের মতো পোশাক পরে গানের ছন্দে ছন্দে বায়োস্কোপের ছবি দেখাতেন। কখনও আবার মাথায় গামছা, হাতে ডুগডুগি। বায়োস্কোপওয়ালারা সাধারণত স্কুলের কাছে, জনবহুল এলাকায়, রাস্তার ধারে বা মেলায়, বায়োস্কোপের বাক্স স্ট্যান্ডে বসিয়ে ডুগডুগি বাজিয়ে ছোটদের আকৃষ্ট করতেন। ডুগডুগির আওয়াজে ছুটে আসত বাচ্চারা। আবার কখনও কোনও বাড়ির উঠোনে বায়োস্কোপের আসর বসত। এক আনা বা দু‘আনা পয়সায় বায়োস্কোপ দেখার সুযোগ যেমন মিলত তেমনই চাল, ডাল, আলু, সবজি দিয়েও দেখা যেত বায়োস্কোপের ছবি। সাতের দশকের শেষ দিকেও, গ্রাম শহর সর্বত্র, বায়স্কোপওয়ালাদের দেখা মিলত। বর্তমানে, বায়োস্কোপ কী, সেটা অনেকেই জানেন না। বায়োস্কোপের নাম শুনেছেন গানে, নয়তো পড়েছেন বইয়ের পাতায়। আধুনিক যুগে সেই বায়োস্কোপও নেই আর বায়োস্কোপওয়ালাও নেই। টিভি, সিনেমা, অন্তর্জাল, স্মার্ট ফোন, ইউটিউব সহ নানা বিনোদন মানুষের হাতে আসায় বায়োস্কোপসহ বায়োস্কোপওয়ালা এখন কেবলই ইতিহাস।
নগর সভ্যতার শুরুতে কৃষিকে ঘিরেই পেশার শুরু l সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পেশার বিকাশ ও পরিবর্তন দু‘ই ঘটে। কিছু পেশা হারিয়ে যায়। নতুন পেশার জন্ম হয়। তবে জোর করে বা ষড়যন্ত্র করে কোনও পেশাকে কেউ বন্ধ করে দিয়েছেন এমনটা নয়। বিকল্প পেশা এসে শক্তভাবে জায়গা করে নেওয়ার ফলেই এমনটা হয়। ভবিষ্যতেও এমনটা ঘটবে । অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভারতের গ্রামীণ কাঠামোর দ্রুত বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকল পেশাও। কিছু পেশা ঊনিশ শতক পর্যন্ত চলেছে। বিংশ শতকে আধুনিকতার জোয়ারে স্বাভাবিকভাবেই সে সব পেশা হারিয়ে গেছে। এই হারিয়ে যাওয়া পেশার কিছু ছিল একেবারেই শহর কলকাতায়, কিছু ছিল মফস্বল শহরের, কিছু আবার একেবারেই গ্রামের। এর মধ্যে শুধুই পুরুষের পেশা যেমন আছে তেমনি আছে শুধু মেয়েদের। এদের বেশিরভাগকেই চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি অনেকেরই। অতীতের পাতায় চোখ রেখে বিলুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় অসংখ্য পেশার কয়েকটিকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করা হল।
প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরেই মূলত বিলুপ্ত হয়েছে পেশা। আজ যে পেশার রমরমা, কাল হয়ত সে অতীত গল্পে পরিণত হবে। হারিয়ে যাওয়া পেশা নতুন করে চালু করা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ঐতিহ্যের খবর রাখা জরুরি। ঐতিহ্য সবসময় ধারণ করতে হয়। আমাদের পূর্বসূরিরা কতটা এগিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের কতটা কৃতিত্ব ছিল তা পরবর্তী প্রজন্মকে জানানো জরুরি। আমাদের যে পেশাগুলি ছিল , আজ হারিয়ে গেছে। তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সরক্ষণ করা জরুরি। উদাহণস্বরূপ , ইংল্যান্ডের ডারহামের কথা বলতে পারি, যেখানে আজও পুরোনো ঐতিহ্যকে অভিনব কায়দায় সংরক্ষণ করা আছে।
অঞ্জুশ্রী দে, শিক্ষিকা, মিত্র ইনস্টিটিউশন (মেইন)