৭৫ বছর আগেই নেপালকে ভারতের অঙ্গরাজ্য করার প্রস্তাবটি এসেছিল সেদেশ থেকেই। কিন্তু, নেহরু প্রায় জেদের বশে তা হতে দেননি বলে অনেক ঐতিহাসিকের মত।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁর আত্মজীবনীতে এই ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন।
শেষ আপডেট: 10 September 2025 18:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সিকিমের মতো নেপালও ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে যেত। যদি না দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এক মুহূর্তের জন্য ‘ঐতিহাসিক ভুল’ না করতেন। ৭৫ বছর আগেই নেপালকে ভারতের অঙ্গরাজ্য করার প্রস্তাবটি এসেছিল সেদেশ থেকেই। কিন্তু, নেহরু প্রায় জেদের বশে তা হতে দেননি বলে অনেক ঐতিহাসিকের মত। তবে এদেশের ‘চাণক্য’ রাজনীতিক হিসেবে খ্যাত তথা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁর আত্মজীবনীতে এই ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, দেশীয় অনেক দস্তাবেজেও সেই ঘটনার সাক্ষী রয়েছে।
ইতিহাসে বলে...
তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং নেপালের হিন্দুরাজা ত্রিভুবন বীর বিক্রম শাহ। সে সময় নেপালের হিন্দুরাজা ত্রিভুবন বীর বিক্রম নিজে থেকে নেপালকে ভারতের অঙ্গরাজ্য করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যা সত্যি হলে দেশের মানচিত্র আজ অন্যরকম হতো এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণও বদলে যেত।
৭৫ বছর আগে নেপালের রাজার কী প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নেহরু। ১৯৫১ সালে নেপালের রাজা হন ত্রিভুবন বীর বিক্রম শাহ। সদ্য স্বাধীনতার মুখ দেখা একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের আর্থ-রাজনীতিক ও সামাজিক সমস্যা তিনি বুঝেছিলেন। তাই নেহরুকে প্রস্তাব দেন যাতে নেপালকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ঘটনার কথাই উল্লেখ করেছিলেন জনতা দলের প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী চৌধুরি চরণ সিং। নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বিপি কৈরালাকে জনতা দলের নেতা চন্দ্রশেখরের সামনেই একথা জানান চরণ সিং।
তেমনই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁর আত্মজীবনী 'The Presidential Years' গ্রন্থে একেকজন প্রধানমন্ত্রীর একেকরকম কাজের ধরনের কথা বিস্তারিতে আলোচনা করেছেন। প্রণববাবু তাঁর গ্রন্থের একাদশতম অধ্যায়ে 'My Prime Minister: Different Styles, Different Temperaments' অংশে লিখেছেন, একেকজন প্রধানমন্ত্রীর কাজের ধরন ছিল নিজস্ব প্রকৃতির। নেহরুর থেকে একেবারে ভিন্ন কার্যপদ্ধতি ছিল লালবাহাদুর শাস্ত্রীর। এমনকী একই দলের হয়েও ভিন্ন প্রধানমন্ত্রীদের দৃষ্টিকোণ পৃথক ছিল। বিদেশনীতি, দেশের সুরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসন, যাই হোক না কেন প্রত্যেকে আলাদা ছাপ রেখে গিয়েছেন।
প্রণববাবু লিখেছেন, নেপালে বছরের পর বছর শাসন করা রানাদের রাজত্ব রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। নেহরুর আপত্তি ছিল রাজতন্ত্রেই। তিনি চেয়েছিলেন নেপালে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক। তাই ত্রিভুবনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়ে দেন, নেপাল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং স্বাধীনই থাক। এখানেই নেহরুর সঙ্গে তাঁর কন্যা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর তুলনা টেনেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তাঁর লেখায় রয়েছে, যদি ইন্দিরা নেহরুর জায়গায় থাকতেন, তাহলে তিনি নিশ্চিত এই প্রস্তাবের সুযোগ নিয়ে নিতেন। যেরকমটা ইন্দিরা করেছিলেন সিকিমের ক্ষেত্রে।
প্রসঙ্গত, ১৮৪৬ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত নেপাল শাসন করত স্বৈরতান্ত্রিক শাসক রানারা। সেই সময় নেপাল গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্যুত-একঘরে হয়ে ছিল। কিন্তু, ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা ও ১৯৪৯ সালে চিনের বিপ্লবের পরই জেগে ওঠে নেপাল। ১৯৫১ সালে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে ত্রিভুবন সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নাম কা ওয়াস্তে গণতন্ত্র স্থাপন করেন। তখনই তিনি নেহরুর কাছে নেপালকে ভারতের অঙ্গরাজ্য করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।