
শেষ আপডেট: 15 December 2020 14:20
সমস্যার সমাধান খুঁজতে এগিয়ে এলেন মায়েরাই। ১৯৮০ থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে খোলা হল মাতৃস্তন্য সঞ্চয়ের ব্যাঙ্ক। মায়েরা নিজের সন্তানের পেট ভরার পর উদ্বৃত্ত দুধটুকু জমিয়ে রাখতে শুরু করলেন এইসব ব্যাঙ্কে। এই পৃথিবীর বুকে জন্মানো কোনও শিশুরই যেন মায়ের দুধের অভাব না হয়, এমনটিই চেয়েছিলেন তাঁরা। আজকের ভারতেও 'মিল্ক-ব্যাঙ্ক' খুব পরিচিত একটা শব্দ। মায়েদের মধ্যে ধীরে ধীরে বাড়ছে বুকের দুধ দান করার আগ্রহ। অনেক নতুন মায়েরাই এগিয়ে আসছেন 'ডোনার' হিসাবে। আগলে রাখতে চাইছেন নিজের শিশুর পাশাপাশি, অন্যের সন্তানটিকেও। এ বিশ্বকে শিশুদের বাসযোগ্য করে যাওয়ার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও।
এদিকে যত দিন যাচ্ছে আমাদের জীবনযাপন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। অনিয়মিত ঘুম, অস্বাস্থ্যকর খাবারদাবারের প্রতি আগ্রহ, মানসিক চাপ, টেনশন - এসব থেকে অনেকসময়ই নানা শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়, যার ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় শিশুজন্মের পর নতুন মায়েদের ব্রেস্ট-মিল্ক আসছে না, বা যে পরিমাণে এলে তা শিশুটির পেট ভরাতে পারে, সেই পরিমাণ ক্ষরণ হচ্ছেনা। অর্ধেক খাবার বা অর্ধেক পুষ্টি সবে জন্মানো একটা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য খুবই খারাপ। তাতে অদূর ভবিষ্যতে অপুষ্টিজনিত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর তখনই ব্রেস্ট-মিল্ক ডোনেট করার দরকার পরে। সোজা কথায়, মায়ের বুকের দুধের ঘাটতি মেটাতে অন্য কোনও মায়ের থেকে কিছুটা দুধ ধার করে এসব ক্ষেত্রে শিশুটিকে খাওয়ানো হয়। এর ফলে একদিকে যেমন সদ্যোজাতর পেটও ভরে, পাশাপাশি সন্তানের পুষ্টি নিয়ে অভিভাবকেরাও অনেকাংশে নিশ্চিন্ত থাকেন। মাতৃদুগ্ধের এর থেকে ভালো বিকল্প আর কিছু হতেই পারে না। তাই আপনি যদি সবে সবে মা হয়ে থাকেন, এবং আপনার ব্রেস্ট-মিল্ক ক্ষরণ যদি সুস্থ আর স্বাভাবিক হয়ে থাকে, তাহলে তাকে নষ্ট করবেন কেন! নিজের সন্তানের পুষ্টির পাশাপাশি আপনার বুকের দুধ পারে আরও একটি শিশুর পেট ভরাতে, তাকে অপুষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে।
ইদানীং অনেকেই বুকের দুধ ডোনেট করছেন সদ্যোজাতদের জন্য। সেই দুধ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার জন্য বিভিন্ন শহরে তৈরি হয়েছে একাধিক মিল্ক-ব্যাঙ্ক। দুএকজন বলিউড সেলেব ব্রেস্টমিল্ক ডোনেট করার পর এবং বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি শুরু হতে এদেশেও ধীরে ধীরে সচেতনতা বাড়ছে মানুষের মধ্যে। অনেক নতুন মা'ই চাইছেন তাদের বুকের অতিরিক্ত দুধটুকু সঞ্চয় করতে, যাতে সেটা কোনও প্রি-ম্যাচিওর বাচ্চার খিদে মেটাতে পারে।
দুধ ডোনেট করার জন্য প্রয়োজনীয় বোতল, পাম্প এবং অন্যান্য জিনিসপত্রের ব্যবস্থা সাধারণত মিল্ক-ব্যাঙ্কগুলোই করে দেয়। তবে চাইলে ডোনার মা নিজেও সেগুলো কিনে নিতে পারেন।
দ্বিতীয় আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল নিজের জন্য একটি ভালো মানের, যথাযথ ব্রেস্ট পাম্প কেনা। ব্রেস্ট পাম্পের সাহায্যে মায়ের দুধ শোষণ করে তা সংরক্ষণ করা হয়। ব্যাপারটা প্রাথমিকভাবে আপনার জন্য খানিক অস্বস্তির হতে পারে। আর তাই সবার আগে দরকার নিজের জন্য সঠিক ব্রেস্ট-পাম্প খুঁজে পাওয়া। বাজারচলতি অনেক প্রোডাক্টই আছে, কম দাম বা বেশি দামের। আপনার সাধ্য অনুসারে তার মধ্যে একটা বেছে নিতে পারেন। শুধু খেয়াল রাখবেন, ব্রেস্ট-পাম্পটি এমন নির্বাচন করবেন যাতে রোজকার ব্যবহারেও কোনওভাবে ব্যথা না লাগে। বাকি প্রাথমিক অস্বস্তি বা খারাপ লাগা দুদিন পরই কেটে যাবে।
প্রতিদিন একাধারে ব্রেস্টফিডিং আর পাম্পিং কিছুটা শারীরিক কষ্ট তৈরি করে অনেকসময়। নিপলে ব্যথা হতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে লাল হয়ে ফুলে যেতেও পারে। কিছু নিপল-ক্রিম আছে, যেগুলো ব্যথা উপশমে বেশ কাজ দেয়। আরও ভালো হয়, যদি এসময় স্তনে একটু গরম সেঁক দেওয়া যায়। ব্যথা উপশমে এর চেয়ে ভালো দাওয়াই আর হয় না। সেঁক দেওয়ার একটা ঘরোয়া আর উপকারী টোটকা আছে। খুব সহজও। কিছু সর্ষেদানা শুকনো তাওয়ায় সেঁকে রুমাল বা পরিচ্ছন্ন একটুকরো কাপড়ের মধ্যে সেগুলো ঢেলে একটা পুঁটলি বানিয়ে নেওয়া যায়। এই সর্ষেপুঁটলির সেঁক খুব দ্রুত ব্যথা নিরাময় করে। আরেকটা সহজ আর কমফোর্টেবল টোটকা আছে, যেটা খুব কম মানুষ জানেন। ব্যথা বা ফোলাভাব কমাতে সামান্য পরিমাণে নিজের বুকের দুধ নিজেরই নিপলের আশেপাশে মাখিয়ে রাখুন। শুকিয়ে গেলে গরম জলে ধুয়ে নিন। এতেও খুব তাড়াতাড়ি আরাম হয়।
ব্রেস্টফিডিং বা দুধ ডোনেট করার সময় অবশ্যই নিজের ডায়েটের উপর নজর দিন। মায়ের দুধ যেহেতু শিশুদের পুষ্টির প্রাথমিক উপাদানগুলি যোগান দেন, তাই এসময় ডোনারের শারীরিক পুষ্টির দিকটিও অবহেলা করা যাবে না। তাই বুকের দুধ ডোনেট করার সিদ্ধান্ত নেবেন যখন, তখন থেকেই নিজের প্রতিও যত্ন নিন। কী খাবেন? এই প্রশ্নটা সন্তান জন্মের আগে হবু মায়েদেরও ভাবিয়ে তোলে। আর দুধ ডোনেট করা মানে তো শুধু নিজের সন্তান নয়, আরও এক বা একাধিক শিশুর পুষ্টির দায়িত্ব নেওয়া। তাই নিজের রোজকার খাবারদাবার নিয়ে বাড়তি সতর্কতা নিন। রঙিন সবজি বিশেষত বিটের স্যুপ নতুন মায়েদের জন্য খুব উপকারী। এতে বুকের দুধের ঘনত্ব আর পরিমাণ দুইই বাড়ে। গাজর আর সবুজ শাকসবজি খেতে হবে রোজ। স্যামন মাছ আর ডিমও বুকের দুখের ঘনত্ব বাড়ায়। জল গরম করে তাতে একটু মৌরি, মেথি বা জিরে ভিজিয়ে সেই ভেজানো জলটা সারাদিন ধরে অল্প অল্প করে খেলেও এসময় দারুণ উপকার পাওয়া যায়।
আপনি যদি দুঃস্থ নবজাতকদের জন্য দুধ ডোনেট করার জন্য মনস্থির করে থাকেন তাহলে মিল্ক ব্যাগের স্টক রাখুন। বুকের দুধ স্টোর করে রাখাটা খুব জরুরি একটা স্টেপ। আর তার জন্য প্রয়োজনীয় বিপিএ-ফ্রি দুধের ব্যাগ আপনি পিজিয়ন, অ্যামাজন সহ যেকোনও অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মগুলিতে পেয়ে যাবেন।
এই স্টেরিলাইজড মিল্ক-ব্যাগগুলো বিশেষ উপায়ে তৈরি করা হয় বুকের দুধ জমিয়ে রাখার জন্যই। তবে এই ব্যাগ ব্যবহারের আগে পরে কিছু পরিচ্ছন্নতা আর সতর্কতা মেনে চলতে হবে আপনাকে। সবার আগে খুব ভালো করে নিজের হাত ধুয়ে নিন। হাত না ধুয়ে ব্রেস্ট পাম্প করা বা সঞ্চিত দুধ মিল্ক ব্যাগে ঢোকানো খুবই বিপজ্জনক হতে পারে৷ এক সঙ্গে এক বা একাধিক সদ্যোজাত শিশুর স্বাস্থ্য জড়িয়ে আছে, এটা ভুললে চলবে না। আপনার ব্রেস্ট পাম্প বোতল,কানেকটর, দুধের ব্যাগ- এগুলোকে রোজ পরিষ্কার করে স্টেরিলাইজ করতে ভুলবেন না। খুব ভালো হয় যদি ব্যবহারের আগে জিনিসগুলোকে ফুটন্ত গরমজলে মিনিট ৫ রেখে দেন, এতে সংক্রমণের ভয় অনেকটাই কেটে যায়। তবে প্লাস্টিক বোতল তো, খেয়াল রাখবেন যেন পুড়ে না যায়। আপনার বুকের দুধ স্টোর করার জন্য যা যা ব্যবহার করছেন তার সবগুলোকে পরিষ্কার আর জীবানুমুক্ত হতেই হবে। বুকের দুধ ভরা মিল্ক-ব্যাগগুলো সংরক্ষণের সেরা উপায় নিঃসন্দেহে আপনার ফ্রিজারে ঢুকিয়ে রাখা। ফ্রিজারে ঠিকঠাক সংরক্ষণ করা গেলে বুকের দুধ দু' থেকে তিন মাস অব্দি দিব্যি থাকে।
করোনা আবহে অনেকেই সুস্থতা নিয়ে নানা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। বিশেষ করে যারা সদ্য সদ্য মা হয়েছেন, তাঁদের চিন্তা একটু বেশিই। শুধু নিজের নয়, নবজাতকের সুস্থ থাকার জিম্মাটিও যে তাঁরই। তবে বুকের দুধ ডোনেট করার সঙ্গে কোভিড-১৯ নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। যে সব মায়েরা ডোনার হতে চান তাঁদের আলাদা করে কোনও বিশেষ সতর্কতা নেওয়ার দরকার নেই। তবে স্বাভাবিক সুরক্ষাবিধি, যেমন মাস্ক বা ফেসশিল্ড পরা, হাত স্যানিটাইজ করা- এগুলো মেনে চললেই হবে। আর ব্যাঙ্কে যাওয়ার সময় পিপিই কিট পরে নিতে পারেন।
সামান্য ১০০ মিলিলিটারের একটা ছোট দুধের পাউচও একটা ছোট্ট পেট ভরিয়ে তুলতে পারে। নিজের সন্তানের পেট ভরিয়ে তাই কিছুটা ব্রেস্ট মিল্ক বাঁচিয়ে রাখুন না, আরেকটা ছোট্ট প্রাণের জন্য, যাতে, অতিরিক্ত দুধটুকু ডোনেট করে মনে মনে আরেকটি শিশুর মাতৃত্বের আনন্দের ভাগীদার হতে পারেন আপনিও।