
শেষ আপডেট: 4 September 2022 17:54
দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: আরব্য রজনীর সেই রাজপুত্তুর আর রাক্ষুসে পাহাড়ের গল্পটা মনে আছে নিশ্চয়ই। সেই পাহাড়ের টানে পথ হারাত বড় বড় নৌবহর। তার আকর্ষণে ছিটকে পড়ে চুরমার হয়ে যেত কত সপ্তডিঙা মধুকর। এমনকি সেই পাহাড়ের পাল্লায় পড়ে কী হালটাই না হয়েছিল ছোট্ট দ্বীপের সেই দুঃসাহসী রাজপুত্রের। শুধু রূপকথার গল্পেই নয়, বাস্তবের মাটিতেও দেখা মেলে এমন রহস্যময় রাক্ষুসে পাহাড়ের। রাক্ষুসে কথাটায় অবশ্য যথেষ্ট আপত্তি আছে বিজ্ঞানীদের। এই পাহাড়গুলোর আকর্ষণ ক্ষমতা যে আসলে তাদের চৌম্বক বল মাত্র, এই বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে সেকথা আর নতুন করে বলে দিতে হয় না। (Magnetic Hill)

বিজ্ঞান যাই বলুক, এই আশ্চর্য পাহাড়গুলোর রহস্য এখনও পর্যটক আর ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে এক দুর্বোধ্য আকর্ষণবিন্দু। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে এমন বেশ কয়েকটি চুম্বক পাহাড় বা গ্র্যাভিটি হিল। আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা বা সাইপ্রাস দ্বীপে এরকম একাধিক ম্যাগনেটিক হিল বা চুম্বক পাহাড়ের দেখা মেলে। কিন্তু যে তথ্যটি অনেকেই জানেন না তা হল, আমাদের দেশেও রয়েছে এমনই এক রহস্যময় চুম্বক পাহাড়। আর সেই পাহাড় ঘিরে আজও ভেসে বেড়ায় নানারকম আশ্চর্য কাহিনি। (Magnetic Hill)
উত্তরে কুনলুন পর্বতশ্রেণী এবং দক্ষিণে হিমালয়, এর মাঝে রয়েছে ভারতের অন্যতম জনবিরল এলাকা, লাদাখ। উত্তরে কুনলুন পর্বতশ্রেণী এবং দক্ষিণে হিমালয় অবধি পরিসরে রহস্যময়ী প্রকৃতি যেন ধরা দিয়েছে নানা রূপে নানা ছন্দে। মধ্যযুগে ইসলামিক পণ্ডিতরা এই অঞ্চলকেই ডাকত 'গ্রেট তিব্বত' বলে। প্রাকৃতিক দুর্গমতা সত্ত্বেও এই এলাকায় মানুষ বসবাসের নিদর্শন মেলে নিওলিথিক যুগ থেকেই। এহেন লাদাখের লেহ অঞ্চল থেকে কারগিলের পথে যেতে মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার এগোলেই দেখা মিলবে কালো পাথরের প্রাচীরের মতো এক পাহাড়ের। এই পাহাড়ই লাদাখের বিখ্যাত ম্যাগনেটিক হিল বা চুম্বক পাহাড়। শ্রীনগর-লেহ মূল সড়ক দিয়ে গেলে খুব সহজেই চোখে পড়ে এই ধূসর কালোরঙা চুম্বক পাহাড়। (Magnetic Hill)

হ্যাঁ, চুম্বক পাহাড়। তার উপর দিয়েই চলে গেছে রাস্তা। রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে গিয়ার নিউট্রালে দিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে দিন। আর তারপর যা ঘটবে, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে চাইবেন না! চড়াই রাস্তা অথচ আপনার গাড়ি আপনা থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! যেন কোনও এক অদৃশ্য শক্তি আপনার গাড়িটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। গাড়ির গতিও নেহাত কম নয়। প্রায় বিশ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার গতিতে এগিয়ে চলেছে চড়াই বেয়ে, আপন ছন্দে ! এ এক অদ্ভুত রহস্য! এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া সব গাড়ির সঙ্গেই এমন ঘটে। তাই গাড়ির চালকরাও এই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি নিউট্রালে দিয়ে স্টার্ট বন্ধ করে দেন ৷ ব্রেক থেকে পা সরিয়ে শুধু স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকেন। আর গাড়ি এগিয়ে চলে প্রকৃতির রিমোট কন্ট্রোলে!
শুধু গাড়ি নয়, যে বিমানগুলি এখান দিয়ে যায়, তার পাইলটরাও ম্যাগনেটিক হিল অতিক্রম করার সময় সতর্ক থাকেন । নজর রাখেন যাতে বিমানের গতিপথ কোনওভাবে বদলে না যায়।

কেন এমন হয়? এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, কোনও অঞ্চলের উচ্চতার পরিমাপ করা হয় সেই জায়গার আশেপাশের গাছপালা দেখে, কিন্তু লাদাখের এই অঞ্চল খুবই ঊষর আর ন্যাড়া, সবুজ তেমন নেই বললেই চলে। মাইলের পর মাইল ন্যাড়া প্রান্তরে দৃষ্টিবিভ্রম হওয়াও খুব স্বাভাবিক। কারণ মানুষের শরীরের ভারসাম্য থাকে দুই কানের মাঝের অংশটিতে কিন্তু যখন চোখ বিভ্রান্ত হয়ে যায় তখন শরীরও সেইদিকেই সায় দেয়। এই এলাকার উপর দিয়ে গেলে অনেকসময় এমন বিভ্রম সৃষ্টি হয়। মনে হয়, যেন মাধ্যকর্ষণকে অস্বীকার করে গাড়ি নিজে থেকেই গড়িয়ে চলেছে উলটো দিকে। উৎরাইয়ের বদলে চড়াইয়ের দিকে।
তবে, আরও অবাক করা ব্যাপার হল, এই সড়কের ধারে বা এই অঞ্চলের যেকোনো জায়গার কিছুটা উঁচু স্থানে দাঁড়ালে তীক্ষ্ণ রকমের এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এইসব কারণেই হয়তো স্থানীয়দের মাঝে এই পাহাড়টিকে ঘিরে প্রচলিত আছে বেশ কিছু মিথ ও উপকথা। স্থানীয় মানুষজন বিশ্বাস করেন এই পাহাড়ের এক ব্যাখ্যাতীত অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে। ও পথে গেলে সেই শক্তির অতিমানবিক আকর্ষণ এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। আবার কারও কারও মতে, এই সড়কের বুকেই লুকিয়ে আছে মহাপ্রস্থানের পথ। সোজা স্বর্গে যায় সেই রাস্তা। যারা পুণ্যবান, কেবল তাদেরই আকর্ষণ করে সেই পথ। যারা এই পুজোয় লাদাখ ভ্রমণে আগ্রহী, তাঁরা কিন্তু বিষয়টা ভেবে দেখতে পারেন। আপনি পাপী না পুণ্যবান, তার টেস্ট রাইড করার জন্য যথোপযুক্ত এই সড়ক।

যদিও বিজ্ঞানীরা হেসে উড়িয়ে দেন এই অতিপ্রাকৃত শক্তির গল্প। এই এলাকায় যেসব অতপ্রাকৃত শব্দ শোনা যায়, তাদের ভৌতিক শব্দ বলতেও নারাজ তাঁরা। আসলে প্রকৃতির অমোঘ খেয়ালে এই পাহাড় আর তার আশেপাশের এলাকা ঘিরে রয়েছে একটা শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র। আর বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে এমন গ্র্যাভিটি হিল আছে সেখানেই কিছু কিছু বিজাতীয় শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এই শব্দ চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের তরঙ্গে ঘর্ষণের ফলে তৈরি হয়। এছাড়াও এই ম্যাগনেটিক হিলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর জলও অনেকসময় গ্র্যাভিটির সূত্র ধরে ভিন্ন দিকে বয়ে চলে, তার দরুণও শব্দ জন্মায়।

গোড়ার দিকে কাশ্মীর কর্তৃপক্ষ এই অঞ্চলের চৌম্বকীয় আকর্ষণের ব্যাপার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করার প্রয়োজন মনে করেনি। যার ফলে এখানে বেশ কিছু মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। বর্তমানে অবশ্য, লাদাখ কর্তৃপক্ষ এই সড়কটির দুই প্রান্তেই সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়েছে। ম্যাগনেটিক হিলের এই চৌম্বকীয় আকর্ষণ শুধু যে লোহার বস্তুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় তা নয়, অন্যান্য যেকোনো বস্তুর ক্ষেত্রেই এই আকর্ষণ সমানভাবে কাজ করে। আর আকর্ষণের কথাই যখন হল, বাঙালির মূল টান তো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ায়। পাহাড়-নদী-সমুদ্র-জঙ্গল দেখে দেখে হাঁপিয়ে উঠলে এবছর নাহয় ঘুরে আসুন এই রহস্যময় চুম্বক পাহাড়ে।