প্রচেত গুপ্ত
খুন হয়েছেন এক গায়িকা। সেই তদন্ত করতে গিয়ে উন্মোচিত আরও দু’টি খুন। আর সেই খুনের বৃত্তান্তের মাঝে উঠে এল মেঘমল্লার রাগ আর একটা রিভলভার। অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর প্রথম আদ্যোপান্ত ডিটেকটিভ উপন্যাস। মানুষের সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ আর তার শরীরের ভেতরে ঢুকে চলছে অপরাধীর সন্ধান। একেবারে আলাদা। প্রাপ্তমনস্ক। দ্য ওয়ালের ধারাবাহিক। আজ ষোড়শ পর্ব।
বিলু (মধুমালতীর স্বামী, প্রাক্তনও হতে পারে।)
প্রশ্ন: মধুমালতী আপনার কে হত?
বিলু: স্ত্রী।
প্রশ্ন: আপনি তো এক সময়ে গুন্ডামি করে বেড়াতেন।
বিলু চুপ।
প্রশ্ন: মধুমালতী আপনাকে কেন তাড়িয়ে দিয়েছিল?
বিলু: তাড়িয়ে তো দেয়নি। একটা ভুল খবর পেয়ে রাগারাগি করেছিল।
প্রশ্ন: কী খবর?

বিলু: আমি নাকি আবার বিয়ে করেছি।
প্রশ্ন: করেছেন?
বিলু: পাগল! আমি মধুকে ভালবাসতাম। এখনও বাসি। সে-ও আমাকে ভালবাসে। ক'দিনের জন্য আমি সরে যাই। বউয়ের রাগ কমলে সে আমাকে নিয়ে আসে।
প্রশ্ন: কোথায় ছিলেন?
বিলু: স্থায়ী কোথাও নয়। রোজগারপাতির ধান্দায় এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতাম। এক রাতে হাইওয়ের ধারের দোকানে বসে খাচ্ছিলাম। মধু কোথাও থেকে ফাংশন করে ফিরছিল। দেখা হয়ে যায়। আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনে।
প্রশ্ন: আপনার স্ত্রীকে কে খুন করতে পারে বলে আপনার মনে হয়।
বিলু: মনে হয় না, আমি জানি কে করেছে। পিনাকী নামের একটা ছেলে মধুর সঙ্গে লটরঘটর করতে যায়। এক দিন মধুর হাতে চড়ও খেয়েছে। সেই রাগে খুন করেছে। আপনারা শুয়ারের বাচ্চাকে ধরে ধোলাই দিন, সব স্বীকার করবে। নইলে আমার হাতে ছেড়ে দিন।
প্রশ্ন: আর কাকে সন্দেহ হয়?
বিলু: পুরো হয় না, অর্ধেক হয়। ওই বলাকা মেয়েটা একটা হারামজাদা মাগি। ম্যাডাম, ওর সঙ্গে পিনাকী ছেলেটার কোনও সাট ছিল না তো? ওকে ধরে একটু রগড়ে দেখুন না। বলাকা সেদিন ছুটি নিয়েছিল কেন? জিজ্ঞেস করুন ওকে।
প্রশ্ন: আমরা কী করব আমাদের বুঝতে দাও। আর এক বার যদি গালি দিয়ে কথা বলো, দাঁত ফেলে দেব।
বিলু: ক্ষমা চাইছি ম্যাডাম।
প্রশ্ন: ঘটনার সময় তুমি কোথায় ছিলে।
বিলু: বাড়িতে। জ্বর হয়েছিল।
প্রশ্ন: তোমার কোনও অস্ত্র আছে?
বিলু: না। মধু্মালতী কোথা থেকে একটা রিভলভার জোগাড় করেছিল। আমি তখন ওর সঙ্গে ছিলাম না। সেই রিভলভারটা তো আমি আপনাদের কাছে জমা করেছি।
নীচে রঞ্জনার নোট: ব্যালাস্টিক রিপোর্টে বলছে, এই রিভলভার থেকে গুলি করে গায়িকাতে হত্যা করা হয়নি। গায়িকার পেট থেকে পাওয়া গুলির সঙ্গে এই রিভলভারের গুলির মিল নেই।
বিষ্ণু দাম ( মধুমালতীর সঙ্গে সিনথেসাইজার বাজাত)
প্রশ্ন: মধুমালতী মেয়েটি কেমন ছিল?
বিষ্ণু: মানে! আমি তার সঙ্গে বাজনা বাজাতাম। ঠিক সময়ে পেমেন্ট দিত, ব্যস! মিটে গেল। এর বেশি কিছু জানি না।
প্রশ্ন: সত্যি জানেন না? নাকি বলতে চান না?
বিষ্ণু: সত্যি জানি না।
প্রশ্ন: দেখুন, এটা কোনও টিভি চ্যানেলের ইন্টারভিউ হচ্ছে না। এটা পুলিশের ইন্টারোগেশন। সত্যি কী ভাবে বলাতে হয় আমরা জানি?
বিষ্ণু: কী করবেন? মারবেন?
প্রশ্ন: দরকার হলে তার থেকেও কঠিন পথ আমাদের জানা আছে। আজ থেকে ছ’মাস আগে পেমেন্ট নিয়ে আপনার সঙ্গে মধুমালতীর গোলমাল হয়। আপনি ওর টিম থেকে বেরিয়ে যাবেন বলে হুমকি দেন।
বিষ্ণু: আমাদের প্রফেশনে এ রকম হয়েই থাকে। হ্যান্ডসদের পেমেন্টে নিয়ে আর্টিস্টের সঙ্গে গোলমাল হওয়াটা নরমাল ব্যাপার।
প্রশ্ন: যা নরমাল, আপনি তার থেকে খানিক বেশিই দূর গিয়েছিলেন। আর্টিস্টকে আপনি হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ঠিক মতো টাকা না পেলে দেখে নেবেন।
বিষ্ণু চুপ করে থাকে। মাথা নামায়।
প্রশ্ন: এবার বলুন মধুমালতী কেমন ছিল? তার চরিত্র?
বিষ্ণু: আমি কখনও গোলমাল দেখিনি। মধু প্রফেশনাল ছিল। আমাদের ঝগড়া কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি মিটেও যায়। আর হাজার দুয়েক টাকার জন্য কেউ কাউকে খুন করে না।
প্রশ্ন: রেগে গেলে মানুষ দশ টাকার জন্যও খুন করতে পারেন।
নাম কঙ্কন পাত্র ( মধুমালতীর সঙ্গে গিটার বাজাত)
প্রশ্ন: মধুমালতী কেমন মেয়ে?
কঙ্কন: ভাল।
প্রশ্ন: আর কিছু জানেন না?
কঙ্কন: আর কিছু জানা আমার কথা নয়। উনি ডাকতেন, আমি গিয়ে বাজাতাম। আর পাঁচটা সিঙ্গারের সঙ্গে যা সম্পর্ক, ওর সঙ্গেও তাই ছিল।
প্রশ্ন: বিলু নামের ছেলেটাকে তো অনেকদিন ধরে দেখছেন। ছেলেটা কেমন?
কঙ্কন: জানি না। আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বিশেষ ছিল না।
প্রশ্ন: তার পরেও কেমন মনে হতো।
কঙ্কন: কী আর মনে হবে? একটা ফালতু লোক। মধু যে কেন ওকে বিয়ে করেছিল...
প্রশ্ন: আপনারা মধুমালতীর অতীত নিয়ে কিছু জানতেন?
কঙ্কন: খুব ডিটেলসে নয়, খানিকটা জেনেছি। শুনেছি, ওই লোকটা মধুমালতীকে এক সময়ে হেল্প-টেল্প কিছু করেছিল, তার পরে বিয়ে হয়। এক সময়ে মধুমালতী লোকটাকে বাড়ি থেকে বার করেও দেয়। কেন যে আবার ফিরিয়ে নিল!
প্রশ্ন: আপনি বিলুকে কতটা জানেন?
কঙ্কন: মনে হয় ফালতু লোক। বেশি জানতে চাই না। তবে ওই লোকটাকে জড়িয়ে এক বার একটা মজার ঘটনা শুনেছিলাম।
প্রশ্ন: কী মজা?
কঙ্কন: আমার মাসতুতো দিদি থাকে সুতাহাটে। সেই দিদি একবার উত্তরপাড়ায় এসে মধুমালতীর প্রোগ্রাম দেখে। আমি বাজাচ্ছিলাম বলে এসেছিল। প্রোগ্রাম হয়ে গেলে মধুমালতীর সঙ্গে দিদির আলাপ করিয়ে দিই। মধুমালতীর পাশে সেই সময় বিলুও ছিল। দিদি তাকে দেখে। পরে আমাকে জিজ্ঞেস করল, লোকটা কে? আমি বলেছিলাম, মধুমালতীর বর। দিদি অবাক হয়ে বলেছিল, সে কী! লোকটাকে তো এক সময়ে সুতাহাটায় দেখতাম। একটা মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। আমি বললাম, ধুস! ও তো এখানেই থাকে। তুমি নিশ্চয় ভু্ল দেখেছো। দিদি বলল, তাই হবে। খুব কমন চেহারা।
প্রশ্ন: বিলুর মহিলাঘটিত দোষ আছে?
কঙ্কন: মনে হয় না। কখনও মেয়েদের দিকে নজর দিচ্ছে বলে দেখিনি। অন্তত আমাদের সঙ্গে থাকার সময়ে তো নয়ই। মধুমালতীর বডিগার্ড তো এক জন মেয়েই ছিল। বলাকা। তার সঙ্গে আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল।
জাজু (মধুমালতীর সঙ্গে ড্রামস্ বাজাত।)
প্রশ্ন: আপনি বিলুকে এক বার মারতে তেড়ে গিয়েছিলেন?
জাজু: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: কেন?
জাজু: আমাকে গাঁজাখোর বলেছিল।
প্রশ্ন: আপনি গাঁজা খান?
জাজু: খাই। আপনাদের এখান থেকে বেরিয়েই খাব। মধুমালতী মারা যাওয়ায় আমার মন খুব খারাপ। মেয়েটা ভাল ছিল। অনেক খেটে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিল। খুব পরিশ্রম করত। যে বাস্টার্ড এই কাজড করছে, তাকে যদি হাতের সামনে পেতাম...
নন্দিনী ভট্টাচার্য ( পিনাকী ভট্টাচার্যের বোন)
প্রশ্ন: তোমার দাদা কোথায়?
নন্দিনী: বিশ্বাস করুন ম্যাডাম, আমি জানি না।
প্রশ্ন: বিশ্বাস করলাম। এই খাতাটা তোমার?
নন্দিনী: হ্যাঁ, চাকরির পরীক্ষা জন্য পড়ছি।
প্রশ্ন: তুমি বাঁশি বাজাও?
নন্দিনী চমকে উঠে বলে, ‘না না।’
প্রশ্ন: অঙ্কুশ নামে কাউকে চেনও?
নন্দিনী আরও চমকে উঠে বলে, ‘না না। চিনি না।’
প্রশ্ন: নন্দিনী তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছি, তুমি কিন্তু আমাকে করছো না। তুমি মিথ্যে কথা বলছো। তুমি চেনো। আমার হাতে প্রমাণ রয়েছে নন্দিনী।
নন্দিনী: দাদার খুব বন্ধু। মধুমালতীর সঙ্গে বাঁশি বাজাতেন...এই বাড়িতেও এসেছেন...আমি ওকে...উনিও জানেন না...উনি বিবাহিত ম্যাডাম...কেউ জানলে...।
রঞ্জনী নোটে লিখেছে, এই কথা বলে মেয়েটি মুখে হাত চাপা দিয়ে কেঁদে ফেলে।
অঙ্কুশ মুখার্জি (মধুমালতীর সঙ্গে বাঁশি বাজাত)
প্রশ্ন: আপনাকে দেখেই মনে হচ্ছে, আপনার আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। বাঁশি বাজিয়ে আপনার উপার্জন কী রকম?
অঙ্কুশ: ভাল না। কিন্তু মধুমালতীর খুনের সঙ্গে আমার উপার্জনের কী সম্পর্ক?
প্রশ্ন: আছে। মার্ডার হয় ফর গেইন অথবা মার্ডার ফর রিভেঞ্জ। যাক, পিনাকী কোথায়?
অঙ্কুশ: পিনাকী কে?
প্রশ্ন: আচ্ছা বাদ দিন। আপনি কি জানেন, ঘটনার দিন স্টেজে গাইতে ওঠার আগে পিনাকী নামের আপনার ওই বন্ধুটির সঙ্গে মধুমালতীর দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে।
অঙ্কুশ: আবার আপনারা ভুল করছেন, পিনাকী নামে আমি কাউকে চিনি না।
প্রশ্ন: আচ্ছা আবারও না হয় মেনে নিচ্ছি। নন্দিনী নামের কোনও মেয়েকে আপনি চেনেন?
অঙ্কুশ: কে নন্দিনী?
প্রশ্ন: ও, তা-ও চেনেন না! আচ্ছা, দেখুন তো এই খাতাটা চিনতে পারছেন কি না।
অঙ্কুশ: না চিনতে পারছি না। এটা কার খাতা?
প্রশ্ন: নন্দিনী নামের একটি মেয়ের খাতা। মেয়েটি চাকরির পরীক্ষা দেবে। এই খাতায় সে লিখে পড়া প্র্যাকটিস করে।
অঙ্কুশ: এ সব আমায় বলছেন কেন! কোনও মেয়ের চাকরির খাতা নিয়ে আমি কী করব?
প্রশ্ন: এবার এই পাতাটা দেখুন। পেনে আঁকিবুকি করা একটা বাঁশির ছবি।
অঙ্কুশ: কে খাতায় বাঁশির ছবি এঁকেছে, তার জন্য আমি কী করতে পারি! তার মানেই তাকে আমি চিনি?
প্রশ্ন: ভাল করে আঁকিবুকিটা দেখুন। ভিতরে অঙ্কুশ কথাটা লিখে কাটা হয়েছে। দেখুন, দেখলেই বুঝতে পারবেন, আমি ভুল বলছি না। এই নিন, খাতাটা হাতে নিন। এই মেয়েটি পিনাকীর বোন। আপনি জানেন। মধুমালতীর ফোন কল থেকে আমরা পিনাকীর বাড়ির ঠিকানা পাই। তার বাড়িতে যাই। পিনাকী নেই। তার অসুস্থ মা এবং বোনকে রেখে সে উধাও। তখন তার বাড়ি সার্চ করেছি। নন্দিনীর খাটের ওপরে এই খাতাটা দেখি। নিছকই কৌতূহলে খাতাটা উল্টোই। বাঁশির ছবি দেখে থমকাই। মন দিয়ে দেখি। ভিতরের লেখাটা পড়তে পারি। একেবারেই আনমনে লেখা। সামান্য বাঁশির ছবি ইগনোর করাই হয়তো উচিত ছিল। আমি আবার গান–বাজনা পছন্দ করি...যাই হোক নন্দিনী সব বলেছে। খুবই ভাল মেয়ে। বিবাহিত কোনও পুরুষের প্রেমে পড়াটা অপরাধ নয়, তাকে সংযমের মধ্যে রাখাটাই আসল কাজ। নন্দিনী সেটা পেরেছে।
অঙ্কুশ মাথা নামিয়ে চুপ করে থাকে।
প্রশ্ন: আপনি বাঁশি বাজান। আপনার গুণকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমায় এমন কিছু করতে বাধ্য করাবেন না, যা আপনার মতো মানু্ষের মর্যাদার পক্ষে হানিকর। আপনার ফোন থেকে এখনই আপনার বন্ধুকে এখানে আসতে বলুন।
অঙ্কুশ: বলছি।
প্রশ্ন: থাক বলতে হবে না। কোথায় আছে বলুন। আমি লোক পাঠাচ্ছি।
অঙ্কুশ: আমার বাড়িতে। ম্যাডাম, ও খুন করেনি। বিশ্বাস করুন, আমার মতোই, কিছু করতে না পারলেও ...।
অঙ্কন : দেবাশীষ সাহা
