
শেষ আপডেট: 7 May 2020 08:53
মিথিলেশ শ্রীবাস্তব ওরফে আসল নটবরলাল।[/caption]
মিথিলেশ থেকে নটবরলাল
এরপর প্রায় ৬৬ বছর ধরে, ভারতের আট রাজ্যে পঞ্চাশটি ছদ্মনাম ব্যবহার করে, প্রায় ৪০০ লোককে ঠকিয়ে, কোটি টাকা উপার্জন করেছিলেন মিথিলেশ শ্রীবাস্তব। এই প্রতারক মোট বাহান্নটি ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন। তার মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল মিস্টার নটবরলাল নামটি। এতই বিখ্যাত হয়ে যায়, আজ হিন্দি ভাষায় প্রতারকের সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে 'নটবরলাল' শব্দটি।
ছদ্মবেশ ধরাতেও অসম্ভব পটু ছিলেন নটবরলাল। মানুষকে ঠকাবার জন্য নিত্যনতুন আইডিয়া আবিষ্কার করতেন। যেমন তুখোড় ইংরেজি বলতে পারতেন, তেমনই ছিল তাঁর ব্যাক্তিত্ব ও আইনের বিষয়ে অগাধ জ্ঞান। এছাড়াও মানুষদের সই হুবহু জাল করায় ওস্তাদ ছিলেন তিনি। একবার কারও সই দেখেই সেই সইটা নিঁখুতভাবে নকল করতে পারতেন। বেশিরভাগ লোককে নটবরলাল ঠকিয়েছিলেন তাঁদের সই জাল করে।
[caption id="attachment_218218" align="alignleft" width="190"]
যৌবনে নটবরলাল[/caption]
ঠকিয়েছিলেন টাটা বিড়লা ধীরুভাই আম্বানিদেরও
নটবরলাল সমাজসেবী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সেক্রেটারি বা কোনও বড় দলের নেতা সেজে বড় অঙ্কের চাঁদা বা ডোনেশন নিয়ে আসতেন টাটা বিড়লা এবং ধীরুভাই আম্বানিদের কাছ থেকে। সঙ্গে নিখুঁত নথি থাকায় ও অসামান্য বাকপটু হওয়ায় তাঁরা সন্দেহই করেননি কখনও। দশকের পর দশক ধরে অর্থ দিয়ে গেছেন নটবরলালকে।
নিজের পরিচয় দিতেন কোনও কেন্দ্রীয় স্তরের নেতা বা মন্ত্রীর সেক্রেটারি হিসেবে। সেরকম সাজ পোষাক করতেন। প্রমাণ হিসেবে সঙ্গে রাখতেন জাল সরকারি কাগজপত্র ও স্ট্যাম্প। এসব দিয়ে দেশের বিখ্যাত বিখ্যাত স্বর্ণব্যবসায়ীদের বোকা বানিয়ে তাঁদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকার হিরে-জহরৎ, সোনাদানা কিনে জাল চেক বা ড্রাফট দিতেন। তারপর সেই তল্লাটে তাঁর আর টিকির দেখাও মিলত না।
রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নারায়ণ দত্ত তিওয়ারির সেক্রেটারি সেজে দিল্লির এক নামী এক ঘড়ির দোকানে গিয়েছিলেন নটবরলাল। মালিক ভদ্রলোককে বলেছিলেন, ভারতে সফররত বিদেশী অতিথিদের প্রধানমন্ত্রী ৯০টি দামী ঘড়ি উপহার দেবেন। সেই জন্য ঘড়ি কিনতে তাঁকে পাঠিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী।
অশোকস্তম্ভের ছাপ মারা সরকারী প্যাডে মন্ত্রীর সই করা চিঠি দেখে, দোকানদার ৯০ টি ঘড়ি নিয়ে নর্থ ব্লকে অর্থমন্ত্রীর দফতরের সামনে গিয়েছিলেন। সেখানে ঘড়ি ডেলিভারি নিয়ে দোকানদার সরকারি ড্রাফট দিয়েছিলেন প্রতারক নটবরলাল। ড্রাফট ভাঙাতে গিয়ে দোকানদার বুঝেছিলেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন। ততক্ষণে পাখি হাওয়া।
তিনবার তাজমহল, দুবার লালকেল্লা বেচে দিয়েছিলেন নটবরলাল
আইনজীবী হওয়ায় জমি জমার কাগজপত্রের খুঁটিনাটি জানতেন নটবরলাল। নকল সরকারি নথি বানিয়ে সে হয়ে গিয়েছিল তাজমহলের একমাত্র মালিক। সরকারি নথিতে সই ছিল বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর। অবশ্যই জাল সই। তারপর সেই কাগজ দেখিয়ে বিদেশিদের কাছে তিন তিনবার বেচে দিয়েছিলেন তাজমহল। শুধু তাজমহল নয়, একইভাবে লালকেল্লাও বেচে দিয়েছিলেন দু’বার। এছাড়াও প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদের সই নকল করে, রীতিমতো সরাকারি নির্দেশ জারি করে ও প্রয়োজনীয় নিঁখুত নথিপত্র দেখিয়ে বেচে দিয়েছিলেন লোকসভা ভবনও। পুলিশ ও আদালতের কাছে থাকা মামলার নথিপত্র দেখলে বোঝা যাবে এইসব অভিযোগ একবর্ণ মিথ্যে নয়।
[caption id="attachment_218220" align="alignnone" width="600"]
নটবরলালের দেওয়া একটি জাল ড্রাফট।[/caption]
"কীভাবে ঠকাও লোকদের?" কানপুর আদালতের জজসাহেবের মুখ থেকে এই প্রশ্ন শুনে, জজের কাছ থেকে একটাকা চেয়েছিলেন নটবরলাল। টাকা নিয়ে পকেটে পুরে নিয়ে নটবরলাল উত্তর দিয়েছিলেন, “ আমি কাউকে কোনওদিন বন্দুক দেখিয়ে বা মারধোর করে লুঠ করিনি। আমি লোকেদের কাছে চাই, আপনারই মতো লোকেরা আমাকে টাকা দিয়ে দেন। আমি চেয়েছি তাঁরা দিয়েছেন।"
জেলের গাড়ি থেকে নেমে আদালতে যাচ্ছেন নটবরলাল[/caption]
শেষবার নটবরলালকে দেখা গিয়েছিল, ১৯৯৬ সালে
৬৬ বছর ধরে প্রতারণা চালিয়ে মোট ন’বার গ্রেফতার হয়েছিলেন নটবরলাল। জেলে মোট কাটিয়েছিলেন ২০ বছর। তাঁর নামে আট রাজ্যে দেড়শোর বেশি প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মাত্র প্রথম ১৪ টি মামলার রায়েই নটবরলালের ১১৩ বছরের জেল হয়েছিল। তবে ন’বারই জেল থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন নটবরলাল। একবার সাংবাদিকরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী করে প্রতিবারই জেল থেকে পালিয়ে যান নটবরলাল। মুচকি হেসে নটবরলাল বলেছিলেন, গার্ডেরা জেলের আর জেলভ্যানের দরজা খুলে আমাকে চলে যেতে বলে, আমি তখন কী করব বলুন, চলেই যাই।
১৯৯৬ সালে শেষবারের মতো গ্রেফতার হন নটবরলাল, সেই সময় তাঁর বয়েস ছিল ৮৪ বছর। তাঁকে পাঠানো হয়েছিল কানপুর জেলে। চলার ক্ষমতা হারানো নটবরলালের সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল হুইল চেয়ার। তাঁকে দিল্লির এইমস-এ ভর্তি করার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। কানপুর থেকে ট্রেনে করে নটবরলালকে দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়েছিল। ট্রেন থেকে নামিয়ে বসানো হয়েছিল হুইল চেয়ারে। জেল পুলিশরা রেলপুলিশের সঙ্গে কথা বলতে বলতে পিছন ঘুরে দেখেছিল হুইল চেয়ার ফাঁকা। চিরকালের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিলেন নটবরলাল। দিনটি ছিল ১৯৯৬ সালের ২৪ জুন। তারপর আর তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
[caption id="attachment_218226" align="aligncenter" width="195"]
জেলবন্দি নটবরলাল[/caption]
ভারতের সেরা ঠগ, কিন্তু নিজের গ্রাম বাঙ্গরায় ‘রবিনহুড’
আজও বিহারের বাঙ্গরা গ্রামের অধিবাসীরা নটবরলালকে ভগবান মানেন। তাঁকে শুধু ‘নটবরলাল’ বলা যাবে না। বলতে হবে ‘মিস্টার নটবরলাল’ বা ‘মিথিলেশ বাবু’। গ্রামের লোকেরা আজও বলেন, গরীবদের লুটে যারা বড়লোক হয়েছিল, তাদের লুটে মিথিলেশ বাবু সেই টাকা আবার গরীবদের ফিরিয়ে দিতেন। আশির দশকে দশটি গাড়ির কনভয় নিয়ে শেষবার গ্রামে গিয়েছিলেন নটবরলাল। সামিয়ানা টাঙিয়ে সারা গ্রামের জন্য বিশাল ভুরিভোজের ব্যবস্থা করেছিলেন। খাওয়ার পর গ্রামবাসীদের প্রত্যেককে একশো করে টাকা দিয়েছিলেন। পুলিশ জানতেই পারেনি।
[caption id="attachment_218228" align="aligncenter" width="482"]
নটবরলালের শেষ ছবি[/caption]
২০০৯ সালে নটবরলালের উকিল আদালতে জানিয়েছিলেন, ২০০৯ সালের জুলাই মাসের ২৫ তারিখে নটবরলাল মারা গিয়েছেন। তাই বকেয়া শতাধিক মামলা খারিজ করে দেওয়া হোক। মামলাগুলি খারিজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নটবরলালের ভাই গঙ্গাপ্রসাদ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ১৯৯৬ সালে দিল্লি স্টেশন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরে, ওই বছরই নটবরলাল রাঁচিতে মারা গিয়েছিলেন। নিজের মৃত্যু নিয়ে নিজের স্টাইলেই রহস্যের পর্দা বিছিয়ে গিয়েছিলেন প্রতারক নটবরলাল।
যে জিরাদাই এলাকায় নটবরলালের জন্ম, সেই একই এলাকাতে জন্ম হয়েছিল ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদের। ভাবতেই অবাক লাগে, যে জিরাদাই স্টেশন থেকেই ট্রেনে চড়ে রাজেন্দ্রপ্রসাদ গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতিভবনে। একই স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছিল মিস্টার নটবরলালও, দেশের জনগণকে প্রতারণা করার উদ্দেশ্য নিয়ে।