শেষ আপডেট: 11 April 2020 03:32
সুন্দরী মিঠি।[/caption]
পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের মরুভূমি অঞ্চলে থাকা, থর-পার্কার জেলার সদর শহর এই মিঠি। মিঠি পাকিস্তানের একমাত্র শহর, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যালঘু, হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। মরুভুমি লাগোয়া শহরটির জনসংখ্যা প্রায় তিন লাখ। তার আশি শতাংশই হিন্দু। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই ভারত সীমান্তের কাছে থাকা এই মরু-শহরে হিন্দু ও মুসলিমরা শান্তিতে বসবাস করে আসছেন। হিন্দু ও মুসলিম জনগণ একসাথে মৌলবাদকে প্রতিরোধ করে আসছেন যুগের পর যুগ। ফলে মিঠিতে মৌলবাদের সামান্যতম প্রভাব কোনওদিন পড়েনি।
মিঠির মারুফ হায়দর সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন,“ আমাদের শহরে হিন্দু মুসলিমরা একসাথে যুগের পর যুগ শান্তিতে বাস করছে। একদিনের জন্যও হিন্দু মুসলিমের মধ্যে ধর্ম নিয়ে দাঙ্গা হয়নি। মন্দিরে পূজার সময় আমরা মসজিদের লাউডস্পিকার বন্ধ রাখি। নামাজের সময় মিঠির মন্দিরে কোনও ঘন্টা বাজে না। রমজানের সময় কোনও হিন্দু ভাই বাইরে খান না। শিবরাত্রির দিন মাংস বিক্রেতা মুসলিমরা দোকান খোলেন না। হোলির দিন আমরা মুসলিমরা, সব হিন্দুভাইদের বাড়িতে বাড়িতে মিঠাই পাঠাই। হিন্দু ভাইদের সঙ্গে হোলি খেলি।”
[caption id="attachment_207371" align="aligncenter" width="3648"]
মিঠি শহরের রাস্তাঘাট।[/caption]
মিঠির হিন্দু বাসিন্দা চাঁদরাম বলেছিলেন," সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেরা উদাহরণ আমাদের মিঠি। আমরা হিন্দুরা জানি মহরম দুঃখের মাস। মিঠির হিন্দুরা সেই মাসে বিয়ে শাদি বা কোনও আনন্দ অনুষ্ঠান করেন না। খুশির ঈদ যখন আসে, আমরা হিন্দুরা মুসলিমদের সঙ্গে খুশিতে মেতে উঠি। অনেক হিন্দু নিয়মিত রোজা রাখেন। ইফতার দেন ,ইফতার করেন মুসলিম ভাইদের সঙ্গে। আমরা এক সঙ্গে মহরম, ঈদ ও দীপাবলী পালন করি।”
মিঠি শহরের হিন্দু কাপড় ব্যবসায়ী রাজবীর সোনকার। তিনি জানিয়েছিলেন," আমাদের কেউ মারা গেলে সবার আগে মুসলিম ভাইরা চলে আসেন। শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করেন। সারাক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে থাকেন। আবার কোনও মুসলিমের মৃত্যু ঘটলে আমরা হিন্দুরা ছুটে যাই। সমাধির সব কাজে সাহায্য করি। আসলে মিঠি নিজেই একটা পরিবার। এখানে হিন্দু মুসলিমেরা, সবাই সবার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।"
[caption id="attachment_207373" align="aligncenter" width="800"]
হোলিতে মাতোয়ারা মিঠি।[/caption]
মিঠির স্কুল শিক্ষক রহমত আলি বলেছিলেন," শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি, মুসলিমরা ঈদে গরু কুরবানি করেন না মিঠিতে এবং এই রীতি পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই মেনে আসা হচ্ছে। মিঠিতে ঈদে বকরি কুরবানি করা হয়। গরুকে মিঠিতে মুসলিমরাও শ্রদ্ধার চোখে দেখেন।"
থর-পার্কার জেলার হৃদপিণ্ড এই মিঠি। অর্থনৈতিক দিক থেকে মিঠি ভাল অবস্থায় থাকার জন্য, জেলার বিভিন্ন অংশ থেকে মানুষেরা জীবিকার সন্ধানে আসেন মিঠিতে। মিঠি কাউকে ফেরায় না। শিক্ষার হারে পাকিস্তানের অনেক জেলা সদরের চেয়ে মিঠি এগিয়ে। ছোট্ট শহর হলেও স্কুলের সংখ্যা প্রচুর। এর মধ্যে মেয়েদের স্কুলই সাতটি। সবচেয়ে বিখ্যাত স্কুলটির নাম অমর জোগেশ কুমার মালানি হাইস্কুল। আছে তিনটি ডিগ্রি কলেজও। আছে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আর ইউনিভার্সিটিও।
[caption id="attachment_207372" align="aligncenter" width="1000"]
মিঠির মিঠাই,। দোকানের ক্যালেন্ডারে মা সরস্বতী।[/caption]
অবাক লাগবে শুনতে, মিঠিতে অপরাধের হার পাকিস্তানের যেকোনও জায়গার চেয়ে কম। মাত্র ০.২%। এর অর্থ, পাকিস্তানের মধ্যে অপরাধের সংখ্যা সবচেয়ে কম এই শহরে। তাই বলা যেতে পারে, হিন্দুপ্রধান মিঠিই পাকিস্তানের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ শহর। এখানে ধর্মীয় দাঙ্গা হয়নি কোনও দিন। জোর করে ধর্মান্তরিত করার ঘটনা ঘটেনি কোনও দিন। চেষ্টা করেও কোনও পাকিস্তানি মৌলবাদী সংগঠন মিঠিতে জাল বিছাতে পারেনি। হিন্দু মুসলিমরা যৌথভাবে সেই জাল কেটে দিয়েছেন।
সম্প্রতি পাকিস্তানের কোল মাইনিং অথরিটি, থর-পার্কার জেলার ৯৬০০ স্কোয়ার কিলোমিটার জুড়ে ১২ ব্লকের কয়লা খনি আবিষ্কার করেছে। যার মধ্যে ৭৫০ বিলিয়ন টন কয়লা আছে বলে অনুমান করছে সরকার। চিন থেকে বিশেষজ্ঞরা আসছেন। এরপর প্রায় ৩০০০ চিনা টেকনিশিয়ান আসবেন এই জেলায়। প্রস্তাবিত কয়লা খনিগুলির কয়েকটা ব্লকের অবস্থান মিঠি থেকে কয়েকশো মিটার দূরে। তাই পাকিস্তান সরকার বাড়াতে চায় মিঠি শহরের পরিধি। তৈরী করতে চায় রাস্তাঘাট, পরিকাঠামো।
[caption id="attachment_207374" align="aligncenter" width="1024"]
দীপাবলির রাতে ,মায়াবী মিঠি।[/caption]
কিন্তু মিঠির বাসিন্দারা এককাট্টা। সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভাঙতে পারে ,এমন কিছুই করা চলবে না। বাইরের লোকের মিঠিতে থাকা চলবে না। মিঠির বাসিন্দারা চান, বাইরের লোকেরা মিঠি শহরে, সকালে আসুন, কাজ করুন, বিকেলে শহরে ছাড়ুন। তাঁরাও চান এলাকার উন্নতি হোক। কিন্তু উন্নয়নের নামে মিষ্টি মিঠিতে মৌলবাদের আমদানি চলবে না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অস্ত্রেই মৌলবাদকে ঘায়েল করে আসছে মিঠি, মৌলবাদের আঁতুড় ঘরে বসে।