Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
TB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তানসরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রীছত্তীসগড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! মৃত অন্তত ৯, ধ্বংসস্তূপের নীচে অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কা

প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছিলেন জুনকো তাবেই, পর্দা কেটে প্যান্ট বানিয়ে

রূপাঞ্জন গোস্বামী টোচিগির মাউন্ট নাসুর দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল ১০ বছরের রোগা পাতলা জাপানি বালিকা জুনকো ইশিবাশি। স্কুল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জুনকো পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নিতে। ট্রেকিং পিক, সেরকম ভয়ের কিছু নেই। তাই, ছাত্রীরা একে একে উঠে

প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছিলেন জুনকো তাবেই, পর্দা কেটে প্যান্ট বানিয়ে

শেষ আপডেট: 13 April 2020 05:02

রূপাঞ্জন গোস্বামী
টোচিগির মাউন্ট নাসুর দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল ১০ বছরের রোগা পাতলা জাপানি বালিকা জুনকো ইশিবাশি। স্কুল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জুনকো পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নিতে। ট্রেকিং পিক, সেরকম ভয়ের কিছু নেই। তাই, ছাত্রীরা একে একে উঠে গিয়েছিল শিখরের দিকে, প্রশিক্ষকদের সঙ্গে। কিন্তু জুনকো ভয় পাচ্ছিল। জীবনে প্রথম পাহাড় দেখেছিল সে। বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল পাহাড়টার দিকে। প্রশিক্ষক জুনকোকে বুঝিয়েছিলেন শিখরের ওপর থেকে চারদিক দেখতে আরও সুন্দর লাগবে। জুনকো যেন তাঁর সঙ্গে শিখরে ওঠে। জুনকোর কোনও ভয় নেই, প্রশিক্ষক জুনকোর হাত ধরে থাকবেন। তাতেও ভয় কাটছিল না জুনকোর। শেষে প্রশিক্ষক বলেছিলেন, জুনকো তাহলে একাই থাকুক পাহাড়ের নীচে, তিনি পাহাড়ে উঠে যাবেন।
ভীতু জুনকো চেপে ধরেছিল প্রশিক্ষকের হাত
ধীরে ধীরে কখন যেন জুনকো উঠে পড়েছিল মাউন্ট নাসুর ( ৬২৮৯ ফুট ) শিখরে। শিখরে বসে অবাক বিস্ময়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল। পাহাড়ের নীচে শুয়ে ছিল ফুলের মতো সুন্দর একটি উপত্যকা। নীল আকাশ আর সাদা মেঘ জুনকোর খুব কাছে চলে এসেছিল। উপত্যাকায় চরে বেড়ানো ভেড়ার পালকে মনে হচ্ছিল হলদে পিঁপড়ের সারি। পাহাড়ের ওপরে উঠে প্রশিক্ষকেরা ছাত্র ছাত্রীদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, কাকে বলে ঢাল (Glacis), ফলক (Slab), শৈলপ্রাচীর (wall), চিড় (crack), ফাটল (fissures) চিমনি (chimney), খাঁজ( groove)। কেউ চিনিয়ে দিচ্ছিলেন পর্বতারোহণের ব্যবহৃত বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট। কেউ শিখিয়ে দিচ্ছিলেন বিভিন্ন ধরনের ফাঁস (Knot) বাঁধার কৌশল। কিন্তু জুনকো ছিল আনমনা। সে ভাবছিল, কীভাবে সে এতটা ওপরে উঠে এল। এই ছোট পাহাড়ের ওপর থেকে যদি এত সুন্দর লাগে পৃথিবীকে, আরও উঁচু পাহাড়ে উঠলে পৃথিবীকে আরও কত না সুন্দর লাগবে। [caption id="attachment_208106" align="aligncenter" width="768"] জাপানের মাউন্ট নাসু।[/caption] ভয়টা হঠাৎই কেটে গিয়েছিল। পাহাড়ের গায়ে হাত রেখেছিল জুনকো। শিশির ভেজা পাহাড়ে নাক ঠেকিয়ে পাহাড়ের ঘ্রাণ নিয়েছিল। জুনকোর নাকে এসেছিল খুব মিষ্টি একটা গন্ধ। অনেকটা তার মায়ের গায়ের গন্ধর মত।  জুনকো সাগর দেখছে জন্ম থেকেই। কারণ জুনকোর বাড়ি জাপানের ফুকুশিমা শহরের মিহারু এলাকায়। কিন্তু ভিতু জুনকো সাগরে নামতে ভয় পেত। কিন্তু পাহাড়কে দেখে ততটা ভয় লাগছিল না জুনকোর। জীবনে প্রথম পাহাড় চড়ে, পাহাড়কে ভালোবেসে ফেলেছিল ছোট্ট জুনকো। যে ভালোবাসা তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অটুট ছিল।
সামনে বাধার সাগর,তবু ডাকছিল পাহাড়
জুনকো’রা সাত ভাইবোন। সংসারের সর্বত্র ছিল অভাবের ছাপ। খাবারটুকুই কেবল জুটত অতিকষ্টে। জুনকোর ইচ্ছা আরও উঁচু পাহাড় চড়ার। বন্ধুরা বলেছিল, “পাহাড় চড়া বড়লোকদের খেলা। অত পয়সা তোদের কই”! বাড়ির লোকেরা বলেছিলেন, “হয় পড়াশুনা করো, না হয় হাতের কাজে মন দাও। আমাদের খেটে খাবার জোগাড় করতে হয়”। কিন্তু জুনকোকে হাতছানি দিয়ে ডাকত পাহাড়। রোগা-পাতলা মেয়েটা আস্তে আস্তে যেন পালটে গিয়েছিল। যত বড় হচ্ছিল, জেদি হয়ে যাচ্ছিল জুনকো। সে পাহাড়ে চড়বেই। বরফ ঢাকা দুধসাদা পাহাড়। তার ওপর থেকে দেখবে এই সুন্দর পৃথিবীকে। [caption id="attachment_208107" align="aligncenter" width="860"] কিশোরী জুনকো।[/caption] স্কুল শেষ করে 'শোয়া ওমেনস ইউনিভার্সিটি' থেকে ইংরেজি ভাষায় স্নাতক হয়ে গিয়েছিলেন জুনকো। টিউশানি করে সামান্য কিছু টাকা জমিয়েই ছুটে গিয়েছিলেন পাহাড়ে। পর্বতারোহণের সরঞ্জাম কেনার সামর্থ্য ছিল না, কিন্তু জাপানের কয়েকটি শৃঙ্গ আরোহণ করে ফেলেছিলেন বন্ধুদের থেকে ধার নেওয়া স্কি-পোল নিয়ে। সে সময়ে পুরুষরাই সাধারণত পর্বতারোহণে আসতেন। এক গরিব যুবতীর পর্বতারোহণে এ হেন দাপট, মেনে নিতে পারেননি জাপানের পুরুষ পর্বতারোহীরা। পর্বতারোহণের আঙিনায় তাই পদে পদে হেনস্থা হতে হয়েছিল জুনকোকে। কখনও সখনও কোনও পুরুষ অভিযাত্রীদল জুনকোকে তাঁদের দলে নিয়েছিলেন। অভিযানে পয়সা দিতে পারতেন না জুনকো। কিন্তু অভিযানের দিনগুলিতে ক্যাম্পে ক্যাম্পে রান্না করে, বাসন মেজে, মোট বয়ে দলকে কিছুটা প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তাতেও বাধা দিয়েছিল সমাজও। ফুকুশিমা শহরে চাউর হয়ে গিয়েছিল জীবনসঙ্গী খোঁজার লোভেই নাকি পুরুষদের সঙ্গে পাহাড়ে যান জুনকো। চরিত্রে কলঙ্কের কালি লাগানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল, তাঁকে ঘরে আটকে রাখবার জন্য। [caption id="attachment_208110" align="aligncenter" width="948"] কে আটকে রাখবে জুনকোকে![/caption]
কিন্তু জুনকো ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া
টিউশানি ও সেলাইয়ের কাজের সঙ্গেই চালিয়ে যাচ্ছিলেন শরীরচর্চা ও পর্বতারোহণ। একই সঙ্গে চলছিল পিয়ানো বাজানো। অনবদ্য পিয়ানো বাজাতেন জুনকো। একটি স্কুলে পিয়ানো শিক্ষকের চাকরিও পেয়ে গিয়েছিলেন। একদিন সত্যি সত্যিই পাহাড় জুনকোর জীবনে এনে দিয়েছিল প্রেম। জুনকোর জীবনে এসেছিলেন জাপানের পর্বতারোহী মাসানোবু তাবেই। জুনকোর জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা হয়ে। মাসানোবু তাবেইও গরীব বাড়ির ছেলে, তিনিও অনেক ঝড় ঝাপটা সয়ে চালিয়ে যাচ্ছিলেন পর্বতাভিযান। ১৯৬৫ সালে জুনকোর সঙ্গে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল মাসানোবু তাবেইয়ের। জুনকো ইশিবাশি হয়ে গিয়েছিলেন 'জুনকো তাবেই'। যে নাম ইতিহাসের পাতায় সোনার জলে লেখা হয়েছিল একদিন। মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন বলে পর্বতারোহণে প্রচুর বাধা পেয়েছিলেন জুনকো। এত বাধা তাকে তাঁকে কোনও পর্বত আরোহণ করতে গিয়েও পার হতে হয়নি। তাই কেবলমাত্র মেয়েদের জন্যই, ১৯৬৯ সালে জুনকো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন লেডিস ক্লাইম্বিং ক্লাব (LCC)। যাতে আর কোনও গরীব জাপানি মেয়েকে পাহাড় চড়তে গিয়ে তাঁর মতো লাঞ্ছিত না হতে হয়। ১৯৭০ সালের ১৯ মে, সেই লেডিস ক্লাইম্বিং ক্লাবের এক অভিযানে অংশ নিয়ে, সম্পূর্ণ নতুন রুটে অন্নপূর্ণা-৩ শৃঙ্গ আরোহণ করে সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন দুঃসাহসী জুনকো তাবেই ও হিরোকো হিরাকাওয়া। রাতারাতি জাপান সহ সারা বিশ্ব চিনে গিয়েছিল, পর্বতারোহণের আঙিনায় একদা উপেক্ষিতা জুনকো তাবেইকে।
হাতছানি দিয়েছিল মাউন্ট এভারেস্ট
পৃথিবীর সমস্ত পর্বতারোহীর জীবনের সেরা স্বপ্ন হল, মাউন্ট এভারেস্টের চুড়ায় দাঁড়িয়ে দেশের পতাকা তুলে ধরা। জুনকোকেও দিনে রাতে তাড়া করছিল সেই স্বপ্ন। এভারেস্ট অভিযান মামুলি কোনও অভিযান নয় সেটা জানতেন জুনকো। তবুও স্বপ্ন দেখতেন। ক্লাবের সদস্যাদের বলতেন তাঁর স্বপ্নের কথা। কিন্তু ক্লাবের সদস্যারা বলতেন,"সে যে অনেক টাকার ব্যাপার! এতো টাকা আসবে কোথা থেকে!" প্রত্যয়ী জুনকো মৃদু হেসে একদিন বলেছিলেন,“একবার আপ্রাণ চেষ্টা করেই দেখা যাক না”। জাপানের লেডিস ক্লাইম্বিং ক্লাবের ১৫ জন সদস্য পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট আরোহণের সংকল্প নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন ১৯৭৪ সালে। টাকার জন্য ঘুরতে শুরু করেছিলেন বিত্তবানদের দরজায় দরজায়। সবাই পত্রপাঠ ফিরিয়ে দিয়েছিল আকাশ ছুঁতে চাওয়া জুনকো ও তাঁর সঙ্গীদের। মাসের পর মাস, এ দরজায় ও দরজায় ঘুরে, একটাও টাকা জোগাড় করতে না পেরে সঙ্গীদের সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। এভারেস্ট আরোহণের স্বপ্ন যখন ফিকে হতে শুরু করেছিল, জুনকোর অনমনীয় জেদ দেখে এগিয়ে এসেছিল 'ইয়োমিউরি শিমবান' নামে এক জাপানি পত্রিকা। পত্রিকাটি অভিযানের জন্য কিছু অর্থ সাহায্য করেছিল জুনকোকে। এরপরে এগিয়ে এসেছিল নিপ্পন টেলিভিশন। কিন্তু যে টাকা পাওয়া গিয়েছিল, সেই টাকায় এভারেস্ট অভিযান হবে না। কিন্তু অভিযানের সদস্যরা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। এরপর সদস্যরা নিজেদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে টাকা জোগাড় করার চেষ্টা শুরু করেছিলেন। বেশ কিছু টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছিলেন তাঁরা। জুনকো বাড়ি বাড়ি গিয়ে পিয়ানো শিখিয়ে, হাসপাতালের ইউনিফর্ম রাত জেগে সেলাই করে কোনওমতে কিছু টাকা জোগাড় করতে পেরেছিলেন। জুনকো তখন তিন বছরের ফুটফুটে কন্যা সন্তান নোরিকোর মা। কী ভাবে তাকে ফেলে এভারেস্টে যাবেন! জুনকোকে অভয় দিয়েছিলেন স্বামী মাসানোবু ও জুনকোর চার বোন। স্বামীর ভরসায় বোনেদের কাছে মেয়েকে রেখে জুনকো রওনা দিয়েছিলেন এভারেস্ট অভিযানের কন্ডিশনিং ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।
এক সময় শুরু হয়ে গিয়েছিল কাউন্ট ডাউন
অভিযানের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন জুনকো। কিন্তু তখনও জোগাড় হয়নি স্লিপিং ব্যাগ, ওয়াটারপ্রুফ গ্লাভস, ট্রাউজার আর ব্যাকপ্যাক। এভারেস্ট অভিযানের উপযুক্ত, বিশ্বমানের এই সরঞ্জামগুলি কিনতে যে টাকা লাগবে সে পরিমান টাকা জুনকোর কাছে ছিল না। জাপানের কোনও পর্বতারোহী কোনও অজানা কারণে জুনকোকে ধারও দিতে চাইলেন না সরঞ্জামগুলি। হয় তো তাঁদের আঁতে ঘা দিয়েছিল গরীব জুনকোর এভারেস্ট অভিযান। না, তাতেও ভেঙে পড়েননি জুনকো। পোলট্রি থেকে সস্তায় হাঁসের পালক কিনে নিজেই সেলাই করে তৈরি করে নিয়েছিলেন স্লিপিংব্যাগ। পুরনো পর্দার কাপড় কেটে বানিয়ে নিয়েছিলেন নিজের ট্রাউজার। সমস্যায় পড়েছিলেন গ্লাভস আর ব্যাকপ্যাক নিয়ে। কিন্তু হাল ছাড়ার মানুষ ছিলেন না জুনকো। প্রতিবেশীর বাতিল গাড়ির সিট-কভারের রেক্সিন দিয়ে তৈরি করে নিয়েছিলেন ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ আর দস্তানা। হাতের কাজের শিক্ষা বিপদের মূহূর্তে কাজে লেগেছিল। এভারেস্টের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় নিজের বানিয়ে নেওয়া সরঞ্জাম নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিলেন জুনকো। যা আজকের যুগে অকল্পনীয়। [caption id="attachment_208113" align="aligncenter" width="300"] এভারেস্ট বেসক্যাম্পে জুনকোর লেডিস ক্লাইম্বিং ক্লাবের ১৫ জন সদস্যা।[/caption]
জুনকো এসেছিলেন এভারেস্টে
১৯৭৫ সালের মার্চে সঙ্গীদের নিয়ে এভারেস্ট বেসক্যাম্প চলে এসেছিলেন জুনকো। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলেছিল এভারেস্টের খামখেয়ালি আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া। এপ্রিলের শেষ নাগাদ শুরু হয়ে গিয়েছিল অভিযান। ১৯৫৩ সালে হিলারি আর তেনজিং নোরগে যে রুট ধরে এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহণ করেছিলেন, সেই খুম্বু আইসফল-ওয়েস্ট চিমনি-সাউথ কল রুট ধরেছিলেন জাপানের লেডিস ক্লাইম্বিং ক্লাবের ১৫ জন সদস্যা। সঙ্গে ছিলেন ৯ জন শেরপা। দলের একেবারে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জুনকো। নিজেই আইসঅ্যাক্স দিয়ে বরফ কাটতে কাটতে পথ তৈরি করে নিচ্ছিলেন। প্রয়োজনে অপরের লোড বইছিলেন। ওপরের ক্যাম্পে পৌঁছে নিজেই টিন কেটে স্টোভ জ্বালিয়ে খাবার তৈরি করছিলেন। সবাইকে খেতে দিচ্ছিলেন। অসুস্থ্য সদস্যদের হাসি মুখে শুশ্রুষা করছিলেন। শেরপারা তাঁকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের অর্ধেক কাজই করে দিচ্ছেন অবিশ্বাস্য জীবনীশক্তি নিয়ে এভারেস্টে আসা জুনকো। [caption id="attachment_208115" align="aligncenter" width="1024"] ক্যাম্প-২ এর পথে জুনকোর টিম।[/caption]
৪ মে, রাত ১২টা ৩০ মিনিট
জুনকোর টিম উঠে এসেছিল এভারেস্টের ওয়েস্ট চিমনির শেষে অবস্থিত ক্যাম্প-২ (২১৩২৬ ফুট ) তে। টিমের সবাই সুস্থ ছিলেন। সারাদিনের ক্লান্তিকর আরোহণের শেষে অভিযাত্রীরা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন টেন্টের ভেতর। হঠাৎ বাজ পড়ার মত আওয়াজ হয়েছিল। বিশ্ব যেন কেঁপে উঠেছিল। টন টন বরফ নিয়ে নেমে এসেছিল মৃত্যুরুপী তুষারধস। অভিযাত্রীরা কিছু বোঝার আগেই, জুনকো আর তাঁর সঙ্গীরা ডুবে চাপা পড়ে গিয়েছিলেন তুষারধসের নীচে। বরফের নীচে ঘন অন্ধকার। গায়ে লেপ্টে গিয়েছিল টেন্ট। শরীরে অসহনীয় চাপ দিচ্ছিল বরফ। তুষারসমাধি অনিবার্য। মৃত্যু আসন্ন, জ্ঞান হারাতে বসেছিলেন জুনকো। তবুও বাঁচবার শেষ চেষ্টা করেছিলেন তিনি। পকেট ছুরিটা হ্যাঁচকা টানে বের করে ফাঁসিয়ে দিয়েছিলেন টেন্টের কাপড়। বরফের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাইরে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল। বরফ ভেদ করে ছুরির ফলা বেরিয়ে এসেছিল বাইরে। সেই ফাঁক দিয়ে অক্সিজেন গিয়েছিল বরফের নিচে। শেরপাদের টেন্টের কোনও ক্ষতি হয়নি। তাই তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকার্য শুরু করে দিয়েছিলেন। জুনকোর ছুরির ফলা দেখে শেরপারা জুনকোকে বরফের নীচ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। বরফের নিচে প্রায় ছয় মিনিট অজ্ঞান ছিলেন জুনকো। [caption id="attachment_208116" align="aligncenter" width="800"] তুষারধসে বিধ্বস্ত ক্যাম্প-২।[/caption]
বাকি টিম ফেরার পথ ধরলেও হাল ছাড়েননি জুনকো
একে একে দলের সবাইকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেছিলেন শেরপারা। আকস্মিক এই দূর্ঘটনায় পুরো টিম মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। টিমে বাকি ১৪ জন সদস্য ফেরার পথ ধরতে চেয়েছিলেন। জুনকো তাঁদের বুঝিয়েছিলেন, “এভারেস্ট আরোহণের এটাই প্রথম ও শেষ সুযোগ আমাদের কাছে। আর কেউ টাকা দেবেন না। একবার চেষ্টা করো তোমরা, আর মাত্র একবার”। তবুও সবাই নিরুত্তর ছিলেন। জুনকো বুঝেছিলেন এই মানসিকতা নিয়ে আরও ওপরে উঠলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটবে। জুনকোর পায়ের গোড়ালিতেও ভালোই আঘাত লেগেছিল। কিন্তু তাতে কী! জীবনে অনেক লড়াই লড়েছেন। এই লড়াইটা ছেড়ে পালাবেন না। শেরপা আং শেরিংকে নিয়ে রয়ে গিয়েছিলেন নির্জন তুষার সমুদ্রে। শৃঙ্গে তিনি উঠবেনই। ইতিমধ্যে আবহাওয়া খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবুও প্রতীক্ষায় ছিলেন জুনকো। তিনি জানতেন তাঁর দিন আসবেই।
১৬ মে, ১৯৭৫
নীল আকাশে ভাসতে থাকা ফিনিফিনে সাদা মেঘের দল দেখেছিল, কাক ভোরে এক নারী ও এক পুরুষ আরোহী ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে এভারেস্টের ক্যাম্প-৪ (বর্তমানের) পেরিয়ে। দুর্ঘটনার পর ১২ দিন পর। এভারেস্টের খাড়াই ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে বার বার অবস্থান পাল্টাচ্ছিলেন আরোহীরা। একবার জুনকো আগে, আং শেরপা পিছনে। আরেকবার আং শেরপা আগে জুনকো তাবেই পিছনে। হিলারি স্টেপের আগে এসে একটু থমকে দাঁড়িয়েছিলেন দুজন। সামনে ছুরির ফলার মতো পড়ে আছে প্রাণঘাতী শৈলশিরা। সেই সময় এই জায়গাটিতে এখনকার মতো পাকাপাকি ভাবে দড়ি ফেলা থাকত না, বা বরফ কেটে রাস্তা বানিয়ে রাখা হত না। অমানুষিক পরিশ্রম করে জুনকো আর আং শেরপা রাস্তা বানিয়ে নিয়েছিলেন। অনেকটা অংশ প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলেছিলেন, আইসঅ্যাক্স বরফে গেঁথে নিজেদের শরীরকে বরফের ওপর দিয়ে টানতে টানতে। এক সময় জুনকো দেখেছিলেন সামনে আর চড়াই নেই। খাড়াই ঢাল নেমে গেছে তিব্বতের দিকে। রেক্সিনের গ্লাভসে মোড়া মুষ্টিবদ্ধ হাতদুটি শুণ্যে ছুঁড়েছিলেন জুনকো তাবেই। তৈরি হয়েছিল ইতিহাস। সেই প্রথম এভারেস্টের মাথায় পা রেখেছিলেন কোনও নারী। নাম জুনকো তাবেই। [caption id="attachment_208117" align="aligncenter" width="600"] এভারেস্ট শৃঙ্গে জুনকো তাবেই।[/caption]
জুনকো আজ নেই, তবে ইতিহাসে থাকবেন অমর হয়ে
২০ অক্টোবর, ২০১৬, ক্যানসার কেড়ে নিয়েছিল জুনকো তাবেইকে। এভারেস্ট জয়ের পাশাপাশি, প্রথম নারী হিসেবে জুনকো তাবেই সেভেন সামিট (সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া) আরোহণ সম্পূর্ণ করেছিলেন ১৯৯২ সালে। বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে ওঠার রেকর্ড ছিল জুনকোর নামে। তবু মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত জুনকো ছিলেন বিনয়ী। জুনকো বলতেন, “পাহাড় আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমি বুঝতে পেরেছি আমার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো কতটা নগণ্য, আর পাহাড়ের সামনে আমি কতটা নগণ্য”। [caption id="attachment_208118" align="aligncenter" width="400"] ইতিহাস গড়ে এভারেস্ট শৃঙ্গ থেকে নেমে এলেন জুনকো তাবেই।[/caption] পাঠক, একবার ভাবুন। তখন এভারেস্টের নীচে থেকে ওপর পর্যন্ত দড়ি ফিক্সড করে রাখার ব্যাপার ছিল না। আইসফল ডক্টররা সদা হাজির থাকতেন না, অ্যালুমিনিয়ামের মই নিয়ে। স্যাটেলাইটের পাঠানো ওয়েদার রিপোর্ট ছিল না। এভারেস্টের ক্যাম্পে ক্যাম্পে এজেন্সির ফাইভ-স্টার আতিথেয়তা ছিল না। তাতেই সব বাধা পেরিয়েছিলেন জুনকো। মৃত্যুর কিছুদিন আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জুনকো হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘এখন তো সবাই কত অত্যাধুনিক ইকুইপমেন্ট নিয়ে পাহড়ে ওঠার সুযোগ পায়। আমি যখন এভারেস্টে উঠি, তখন সঙ্গে খাবারের ব্যাগ আর আইসঅ্যাক্স ছাড়া কিছু থাকত না”। ইতিহাস জানে এটা জুনকোর আক্ষেপ নয়। অসম লড়াই জিতে ইতিহাস গড়া এক নারীর আত্মতৃপ্তি। যে লড়াইকে নারীদের বিশ্বজয়ের ভিত হিসেবে মনে রাখবে মানবসভ্যতা।

```