শেষ আপডেট: 27 April 2020 05:50
রয়াল নেভির ক্যাপ্টেন রবার্ট ফ্যালকন স্কট।[/caption]
কেপ ইভানস থেকে যাত্রা শুরুর আগে ক্যাপ্টেন স্কটের দল।[/caption]
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে স্কটের সঙ্গে সেই মুহুর্তে ছিলেন মাত্র চারজন সদস্য। ঘোড়াগুলি অপরিচিত পরিবেশের অসহনীয় আবহাওয়ায় খাপ খাওয়াতে না পেরে মারা গিয়েছে। বেয়ার্ডমোর হিমবাহ থেকে হাস্কি কুকুরের দলকে নিয়ে ফিরে গিয়েছেন হাল ছেড়ে দেওয়া ১১ সদস্য। হাল ছাড়েননি ক্যাপ্টেন স্কট এবং তাঁর চার বিশ্বস্ত সঙ্গী, লেফটেন্যান্ট হেনরি বোয়ার, ডঃ এডওয়ার্ড উইলসন, ক্যাপ্টেন টাইটাস ওয়াটেস ও অফিসার এডগার ইভানস।
চূড়ান্তভাবে অসহযোগিতা করছিল আবহাওয়া। তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। অভিযাত্রীদের সামনে ছিল হাঁটার পক্ষে অসম্ভব ও ভয়ঙ্কর তুষারাচ্ছাদিত মালভূমির শেষ ও কঠিনতম অংশ। কখনও তুষারঝড় ওঠে, তো কখনও বরফে পড়ে ছিটকে আসা সূর্যের প্রখর রশ্মি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এরই মধ্যেই অভিযাত্রীরা শুরু করেছিলেন ভৌগলিক দক্ষিণ-মেরুর জিরো-পয়েন্টের দিকে তাঁদের অন্তিম পর্বের অভিযান।
[caption id="attachment_213453" align="aligncenter" width="959"]
দক্ষিণ মেরুর দিকে এগিয়ে চলেছেন ওঁরা পাঁচজন।[/caption]
দক্ষিণ মেরুতে স্কটের দলের সেলফি। বাম দিক থেকে দাঁড়িয়ে ওয়াটেস,স্কট ও ইভানস। বসে বাম দিক থেকে বোয়ার ও উইলসন।[/caption]
দক্ষিণ মেরুতে ব্রিটিশ পতাকা স্থাপনের পর, কেপ ইভানসে ফেরার পথ ধরেছিল স্কটের টিম। নাকি ধরেছিল ‘না ফেরার’ দেশের পথ। পথ ছিল তুষারাচ্ছাদিত, মাঝে মধ্যেই হাঙ্গরের মতো হাঁ করে ছিল তুষারফাটল। একঘেয়ে, ওঠা আর নামা। বাড়ি ফেরার জন্য প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন স্কটের চার সঙ্গী। এডগার ইভানস একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তবুও উপায় নেই ফিরতে হবে। হাঁটতে হবে প্রায় ৮০০ মাইল পথ।
পেটি অফিসার এডগার ইভানস।[/caption]
একঘন্টা চলার পর মনুমেন্ট আকৃতির একটি পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। কারণ ইভানস অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। লাঞ্চের জন্য তাঁবু ফেলতে বলেছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। এত তাড়াতাড়ি তাঁবু না ফেললেও চলত। ইভানসের জন্যই ক্যাপ্টেন স্কট সময়ের আগেই তাঁবু ফেলতে বলেছিলেন। লাঞ্চ বানানো হয়েছিল, ইভানসের জন্য খাবার রেখে দিয়ে বাকিরা খেয়ে নিয়েছিলেন। প্রায় দু’ঘন্টা অপেক্ষার পর স্কট ও বাকি তিনজন ইভানসকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। অনেকটা দূর গিয়ে পাওয়া গিয়েছিল এডগার ইভানসকে। হাটুর ওপর ভর দিয়ে বসেছিলেন বরফের ওপর। হাতে দস্তানা ছিল না। হাতের আঙ্গুলগুলিতে তুষারক্ষত হয়ে গিয়েছিল। জামাকাপড় ছিল অবিন্যস্ত।
“কী হয়েছে ইভানস”, জিজ্ঞেস করেছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। ঘোলাটে চোখে দলনেতার দিকে তাকিয়ে ইভানস আস্তে আস্তে উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি জানি না।” প্রমাদ গুণেছিলেন অভিজ্ঞ অভিযাত্রী স্কট। তাঁর মনে হয়েছিল, ইভানস অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। ইভানসকে দাঁড় করবার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েক পা গিয়ে ইভানস আবার পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে সামান্য জীবনীশক্তিও আর অবশিষ্ট ছিল না। ওয়েটেসকে ইভানসের সঙ্গে রেখে উইলসন, বোয়ার ও ক্যাপ্টেন স্কট গিয়েছিলেন, ইভানসকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্লেজ আনতে।
[caption id="attachment_213456" align="aligncenter" width="431"]
ডঃ উইলসন[/caption]
স্কটেরা যখন স্লেজ নিয়ে ফিরে এসেছিলেন, ইভানস তখন ছিলেন অচৈতন্য। স্লেজে করে ইভানসকে আনা হয়েছিল তাঁবুতে। বরফ গলিয়ে গরম জল করে, কফি আর ব্র্যান্ডি খাইয়ে, ইঞ্জেকশন দিয়ে ইভানসকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন ডঃ এডওয়ার্ড উইলসন। বিফল হয়েছিল সব প্রচেষ্টা। রাত ১২.৩০ মিনিটে অভিযান ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে গিয়েছিলেন ইভানস। ভোরবেলায় তুষার সমাধিতে ইভানসকে শুইয়ে দিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন বাকি চারজন। স্কট ডাইরিতে লিখেছিলেন, “আগামী দিনগুলি সুখের হবে বলে মনে হচ্ছে না।”
ক্যাপ্টেন লরেন্স টাইটাস ওয়াটেস।[/caption]
সেই রাতে স্কট তাঁর ডাইরিতে লিখেছিলেন, ওয়াটেস সেই রাতে তাঁর মায়ের কথা বলেছিলেন। ওয়াটেস বলেছিলেন তাঁর বীরত্বপূর্ণ মৃত্যুর কথা জেনে তাঁর রেজিমেন্ট হয়ত গর্ব অনুভব করবে। প্রলাপ বকতে বকতে মাঝ রাতে অচেতন হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াটেস। স্কটরা ভেবেছিলেন এটাই ওয়াটেসের শেষ ঘুম হতে চলেছে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে ওয়াটেস উঠে পড়েছিলেন ১৬ মার্চ সকালে।
বাইরে তখন মারাত্মক তুষার ঝড় চলছিল। ক্যাপ্টেন স্কটকে ওয়াটেস বলেছিলেন, “আমি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাচ্ছি।” ক্যাপ্টেন স্কট বাধা দেওয়ার আগেই তাঁবু থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ওয়াটেস। আর তাঁবুতে ফিরে আসেননি। দলের বোঝা হতে চাননি এই সুদক্ষ অভিযাত্রী। তাই তুষার ঝড়ের সুযোগ নিয়ে অ্যান্টার্কটিকার তুষার সমুদ্রে চিরকালের জন্য স্বেচ্ছায় হারিয়ে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন টাইটাস ওয়াটেস।
[caption id="attachment_213458" align="alignnone" width="956"]
ক্যাপ্টেন স্কটের সেই ঐতিহাসিক ডাইরি।[/caption]
ক্যাপ্টেন স্কট[/caption]
২৯ মার্চ ক্যাপ্টেন স্কট ডাইরিতে শেষবারের মত লিখেছিলেন,
“২১ মার্চ থেকে আমাদের জ্বালানি ছিল না। যেটুকু আছে তাতে বরফ গলিয়ে হয়ত দু'কাপ চা হবে। খাবার শেষ। উইলসন আর বোয়ার ১১ মাইল দূরের ডিপো থেকে জ্বালানি আনার জন্য রোজ চেষ্টা করেছেন। প্রত্যেকদিন তৈরি হয়েছেন যাওয়ার জন্য। কিন্তু টেন্টের বাইরে যেন প্রলয় চলছে। ভালো কিছুর আশা করছি না। আমরা জানি আমরা মৃত্যুর জন্য আটকে রয়েছি। দুর্বল হয়ে পড়ছি। শেষের আর বেশি দেরি নেই। আমার মনে হয়, আমি আর লেখার সুযোগ পাব না।”
বরফ জমা সেই তাঁবু, যার ভেতরে ছিল হেনরি বোয়ার, এডওয়ার্ড উইলসন ও ক্যাপ্টেন স্কটের দেহ।[/caption]
তাঁবুর ভেতর শেষশয্যায় শুয়ে ছিলেন তিন ব্রিটিশ অভিযাত্রী। স্লিপিং ব্যাগের ভেতর নিখুঁত ভাবে শোয়ানো ছিল লেফটেন্যান্ট হেনরি বোয়ার ও ডঃ এডওয়ার্ড উইলসনের শরীর। ক্যাপ্টেন স্কটের স্লিপিং ব্যাগের ফিতেগুলি খোলা ছিল। খোলা ছিল ক্যাপ্টেন স্কটের কোটের সব বোতামও। স্লিপিং ব্যাগের বাইরে শুয়ে জমে কাঠ হয়ে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট।
গবেষকেরা বলেছিলেন তিন অভিযাত্রীর মধ্যে সব শেষে মারা গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। দুই সঙ্গী চলে যাওয়ার পর, মৃত্যুকে এগিয়ে আনার জন্যেই কি তিনি স্লিপিং ব্যাগের চেন ও কোটের বোতাম খুলে দিয়েছিলেন! প্রবাদপ্রতিম অভিযাত্রী ক্যাপ্টেন স্কটের একটা হাত রাখা ছিল ডঃ এডওয়ার্ড উইলসনের দেহের ওপর। যখন উইলসনকে মৃত্যুকুয়াশা ঘিরে ফেলছিল সেই মুহূর্তেও উইলসনের গায়ে ভরসার হাত রেখেছিলেন দলনেতা ক্যাপ্টেন স্কট, নিজের মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে শুনতে।