Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তানসরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রী

এক দুঃসাহসিক অভিযান, যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়

রূপাঞ্জন গোস্বামী মাঝ সমুদ্রে টেলিগ্রাম মারফৎ খবরটা পেয়েছিলেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী ও রয়াল নেভির ক্যাপ্টেন রবার্ট ফ্যালকন স্কট। ৩ জুন অসলো থেকে ‘ফ্রাম’ নামের এক জাহাজে করে দক্ষিণ-মেরু রওনা হয়ে গিয়েছেন নরওয়ের অভিযাত্রী রোয়াল আমুন্ডসেন। ক্যাপ্টেন

এক দুঃসাহসিক অভিযান, যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়

শেষ আপডেট: 27 April 2020 05:50

রূপাঞ্জন গোস্বামী
মাঝ সমুদ্রে টেলিগ্রাম মারফৎ খবরটা পেয়েছিলেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী ও রয়াল নেভির ক্যাপ্টেন রবার্ট ফ্যালকন স্কট। ৩ জুন অসলো থেকে ‘ফ্রাম’ নামের এক জাহাজে করে দক্ষিণ-মেরু রওনা হয়ে গিয়েছেন নরওয়ের অভিযাত্রী রোয়াল আমুন্ডসেন। ক্যাপ্টেন স্কটের চেয়ে ১২ দিন আগেই। গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। তাঁর দক্ষিণ মেরু অভিযানের কথা বিশ্বের সবাই জেনে গেছে। কিন্তু আমুন্ডসেন যে একই উদ্দেশ্যে গোপনে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন তা কাকপক্ষীতেও টের পায়নি। ১২ দিনে অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়েছেন আমুনসেন। কিন্তু জাতিতে ব্রিটিশ, তাই ক্যাপ্টেন স্কট পণ করেছিলেন কোনও মতেই দক্ষিণ-মেরুতে ব্রিটেনের আগে নরওয়ের পতাকা গাঁথতে দেবেন না আমুন্ডসেনকে। ধূর্ত একজন নরওয়েবাসীর কাছে হেরে যাবে ব্রিটিশরা! না কোনও মতেই নয়। তাই উদ্দামগতিতে সাগরের জল তোলপাড় করে ছুটেছিল ক্যাপ্টেন স্কটের জাহাজ 'টেরা নোভা'। [caption id="attachment_213451" align="alignnone" width="467"] রয়াল নেভির ক্যাপ্টেন রবার্ট ফ্যালকন স্কট।[/caption]
১৭ জানুয়ারি,১৯১২
আজই হয় এসপার নয় উসপার। ভৌগলিক দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছাবার এটাই স্কটের দলের শেষ চেষ্টা। আর মাত্র কয়েক মাইল। ক’দিন ধরে আটকে আছেন তাঁবুর ভেতর। বাইরে প্রবল তুষারঝড় চলছে। কিন্তু আর দেরি করা ঠিক হবে না। চোয়াল শক্ত করে তাঁবুর ভেতর উঠে দাঁড়িয়েছিলেন ক্যাপ্টেন রবার্ট ফ্যলকন স্কট। অ্যান্টার্কটিকার 'কেপ ইভানস' থেকে ভৌগলিক দক্ষিণ-মেরুর দিকে যাত্রা শুরুর সময় ক্যাপ্টেন স্কটের দলে ছিলেন ১৬ জন অভিযাত্রী। সঙ্গে ছিল ২৩ টি সাইবেরিয়ান হাস্কি কুকুর, ১৮ টি ঘোড়া ও ১৩ টি স্লেজ-গাড়ি ভর্তি অভিযানের রসদ। এরপর কেটে গেছে ১০৪ দিন। ১৭৮৩ কিমি পথ পেরিয়ে আজ ক্যাপ্টেন স্কট তাঁর স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে। [caption id="attachment_213452" align="aligncenter" width="600"] কেপ ইভানস থেকে যাত্রা শুরুর আগে ক্যাপ্টেন স্কটের দল।[/caption] কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে স্কটের সঙ্গে সেই মুহুর্তে ছিলেন মাত্র চারজন সদস্য। ঘোড়াগুলি অপরিচিত পরিবেশের অসহনীয় আবহাওয়ায় খাপ খাওয়াতে না পেরে মারা গিয়েছে। বেয়ার্ডমোর হিমবাহ থেকে হাস্কি কুকুরের দলকে নিয়ে ফিরে গিয়েছেন হাল ছেড়ে দেওয়া ১১ সদস্য। হাল ছাড়েননি ক্যাপ্টেন স্কট এবং তাঁর চার বিশ্বস্ত সঙ্গী, লেফটেন্যান্ট হেনরি বোয়ার, ডঃ এডওয়ার্ড উইলসন, ক্যাপ্টেন টাইটাস ওয়াটেস ও অফিসার এডগার ইভানস। চূড়ান্তভাবে অসহযোগিতা করছিল আবহাওয়া। তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। অভিযাত্রীদের সামনে ছিল হাঁটার পক্ষে অসম্ভব ও ভয়ঙ্কর তুষারাচ্ছাদিত মালভূমির শেষ ও কঠিনতম অংশ। কখনও তুষারঝড় ওঠে, তো কখনও বরফে পড়ে ছিটকে আসা সূর্যের প্রখর রশ্মি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এরই মধ্যেই অভিযাত্রীরা শুরু করেছিলেন ভৌগলিক দক্ষিণ-মেরুর জিরো-পয়েন্টের দিকে তাঁদের অন্তিম পর্বের অভিযান। [caption id="attachment_213453" align="aligncenter" width="959"] দক্ষিণ মেরুর দিকে এগিয়ে চলেছেন ওঁরা পাঁচজন।[/caption]
আর মাত্র কয়েক মিটার
কিন্তু ও কী! ভৌগলিক দক্ষিণ মেরুতে তো একটা পতাকা উড়ছে। কাদের পতাকা ওটা! কাছে গিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন স্কটের চার সঙ্গী। হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছিলেন বরফে। ক্যাপ্টেন স্কট যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। স্কটরা দক্ষিণ-মেরু পৌঁছাবার চার সপ্তাহ আগেই, ১৯১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, দক্ষিণ-মেরুতে বিজয় পতাকা উড়িয়ে দিয়ে গিয়েছেন নরওয়ের প্রতিদ্বন্দী রোয়াল আমুন্ডসেন। সেই আমুন্ডসেন, যিনি মাঝ সমুদ্রে এসে নিজের জাহাজের ক্যাপটেন ও সহ অভিযাত্রীদের জানিয়েছিলেন তিনি দক্ষিণ মেরু জয়ের জন্য বেরিয়েছেন। আমুন্ডসেনের পরিকল্পনা ও কৌশলের কাছে হার মেনে মানসিক দিক থেকে শোচনীয়ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল ক্যাপ্টেন স্কটের দল। তবুও পরের দিন সকাল সাড়ে সাতটায় স্কটের দল বেরিয়ে পড়েছিল। রাতে তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ২২ ডিগ্রি। আকাশ মেঘলা হয়ে আসছিল। সারা রাত ঘুমাননি চারজন। পরাজয়ের গ্লানি তাঁদের গ্রাস করেছিল। তবুও ক্যাপ্টেন স্কট, আমুন্ডসেনের দলের স্থাপন করা  নরওয়ের পতাকাটি থেকে বেশ কিছুটা দূরে, স্থাপন করেছিলেন ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক। পতাকাটি নিজে হাতে বানিয়ে দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রাণী স্বয়ং ভিক্টোরিয়া। তাঁকে অসম্মানিত হতে দেননি ক্যাপ্টেন স্কট। দিনটা ছিল ১৮ জানুয়ারি। [caption id="attachment_213454" align="aligncenter" width="575"] দক্ষিণ মেরুতে স্কটের দলের সেলফি। বাম দিক থেকে দাঁড়িয়ে ওয়াটেস,স্কট ও ইভানস। বসে বাম দিক থেকে বোয়ার ও উইলসন।[/caption] দক্ষিণ মেরুতে ব্রিটিশ পতাকা স্থাপনের পর, কেপ ইভানসে ফেরার পথ ধরেছিল স্কটের টিম। নাকি ধরেছিল ‘না ফেরার’ দেশের পথ। পথ ছিল তুষারাচ্ছাদিত, মাঝে মধ্যেই হাঙ্গরের মতো হাঁ করে ছিল তুষারফাটল। একঘেয়ে, ওঠা আর নামা। বাড়ি ফেরার জন্য প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন স্কটের চার সঙ্গী। এডগার ইভানস একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তবুও উপায় নেই ফিরতে হবে। হাঁটতে হবে প্রায় ৮০০ মাইল পথ।
১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯১২
মেঘলা আকাশের নীচে তুষার সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে, অভিযাত্রীরা অবসন্ন দেহে স্লেজ টেনে নিয়ে চলেছিলেন। স্লেজের ওপরে থাকা খাবার ও জ্বালানি অনেকটা কমে গেছে। খারাপ আবহাওয়ার জন্য অভিযানে দিন বেশি লেগে যাওয়ায়। অভিযাত্রীরা জানেন কয়েকশো কিলোমিটার দূরের ডিপোতে খাবার আর জ্বালানি বোঝাই করা আছে। খাবার ফুরোনোর আগে যেভাবেই হোক সেই ডিপোতে পৌঁছাতে হবে। তাই অভিযাত্রীদের দ্রুত চলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে, কিছুক্ষণ পথ চলার পর ইভানস তাঁর স্লেজ টানা ছেড়ে দিয়েছিলেন। স্কি দুটি বার বার তাঁর পা থেকে খুলে যাচ্ছিল। লেফটেন্যান্ট হেনরি বোয়ারের কাছ থেকে বুটের সঙ্গে স্কি দুটিকে ভালোভাবে বাঁধবার জন্য ধাতব তার চেয়ে নিয়েছিলেন ইভানস। কিন্তু সদ্য পড়া তুষার স্কিয়ের তলায় জমে গিয়ে চলায় বাধা সৃষ্টি করছিল। পাঁচ অভিযাত্রীকে ক্রমশ ঘিরে ধরছিল জমাট কুয়াশা। [caption id="attachment_213455" align="aligncenter" width="303"] পেটি অফিসার এডগার ইভানস।[/caption] একঘন্টা চলার পর মনুমেন্ট আকৃতির একটি পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। কারণ ইভানস অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। লাঞ্চের জন্য তাঁবু ফেলতে বলেছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। এত তাড়াতাড়ি তাঁবু না ফেললেও চলত। ইভানসের জন্যই ক্যাপ্টেন স্কট সময়ের আগেই তাঁবু ফেলতে বলেছিলেন। লাঞ্চ বানানো হয়েছিল, ইভানসের জন্য খাবার রেখে দিয়ে বাকিরা খেয়ে নিয়েছিলেন। প্রায় দু’ঘন্টা অপেক্ষার পর স্কট ও বাকি তিনজন ইভানসকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। অনেকটা দূর গিয়ে পাওয়া গিয়েছিল এডগার ইভানসকে। হাটুর ওপর ভর দিয়ে বসেছিলেন বরফের ওপর। হাতে দস্তানা ছিল না। হাতের আঙ্গুলগুলিতে তুষারক্ষত হয়ে গিয়েছিল। জামাকাপড় ছিল অবিন্যস্ত। “কী হয়েছে ইভানস”, জিজ্ঞেস করেছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। ঘোলাটে চোখে দলনেতার দিকে তাকিয়ে ইভানস আস্তে আস্তে উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি জানি না।” প্রমাদ গুণেছিলেন অভিজ্ঞ অভিযাত্রী স্কট। তাঁর মনে হয়েছিল, ইভানস অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। ইভানসকে দাঁড় করবার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েক পা গিয়ে ইভানস আবার পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে সামান্য জীবনীশক্তিও আর অবশিষ্ট ছিল না। ওয়েটেসকে ইভানসের সঙ্গে রেখে উইলসন, বোয়ার ও ক্যাপ্টেন স্কট গিয়েছিলেন, ইভানসকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্লেজ আনতে। [caption id="attachment_213456" align="aligncenter" width="431"] ডঃ উইলসন[/caption] স্কটেরা যখন স্লেজ নিয়ে ফিরে এসেছিলেন, ইভানস তখন ছিলেন অচৈতন্য। স্লেজে করে ইভানসকে আনা হয়েছিল তাঁবুতে। বরফ গলিয়ে গরম জল করে, কফি আর ব্র্যান্ডি খাইয়ে, ইঞ্জেকশন দিয়ে ইভানসকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন ডঃ এডওয়ার্ড উইলসন। বিফল হয়েছিল সব প্রচেষ্টা। রাত ১২.৩০ মিনিটে অভিযান ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে গিয়েছিলেন ইভানস। ভোরবেলায় তুষার সমাধিতে ইভানসকে শুইয়ে দিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন বাকি চারজন। স্কট ডাইরিতে লিখেছিলেন, “আগামী দিনগুলি সুখের হবে বলে মনে হচ্ছে না।”
১৫ মার্চ, ১৯১২
টানা প্রায় এক মাস হেঁটেছিলেন চার অভিযাত্রী। এদিন লাঞ্চের সময় ক্যাপ্টেন টাইটাস ওয়াটেস তাঁর দলনেতাকে বলেছিলেন, তিনি আর হাঁটতে পারবেন না। দল যেন তাঁকে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে রেখে দিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু ক্যাপ্টেন স্কট, ওয়াটেসকে জানিয়েছিলেন তাঁর পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। বুঝিয়ে শুনিয়ে, কিছুটা বকাবকি করে ক্যাপ্টেন ওয়াটেসকে চলতে বাধ্য করেছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। কিন্তু ওয়াটেসের চলার গতি ক্রমশ মন্থর হয়ে আসছিল। ক্যাপ্টেন স্কট অনুমান করেছিলেন, আসতে চলেছে আরেকটি ভয়ঙ্কর রাত। [caption id="attachment_213457" align="aligncenter" width="211"] ক্যাপ্টেন লরেন্স টাইটাস ওয়াটেস।[/caption] সেই রাতে স্কট তাঁর ডাইরিতে লিখেছিলেন, ওয়াটেস সেই রাতে তাঁর মায়ের কথা বলেছিলেন। ওয়াটেস বলেছিলেন তাঁর বীরত্বপূর্ণ মৃত্যুর কথা জেনে তাঁর রেজিমেন্ট হয়ত গর্ব অনুভব করবে। প্রলাপ বকতে বকতে মাঝ রাতে অচেতন হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াটেস। স্কটরা ভেবেছিলেন এটাই ওয়াটেসের শেষ ঘুম হতে চলেছে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে ওয়াটেস উঠে পড়েছিলেন ১৬ মার্চ সকালে। বাইরে তখন মারাত্মক তুষার ঝড় চলছিল। ক্যাপ্টেন স্কটকে ওয়াটেস বলেছিলেন, “আমি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাচ্ছি।” ক্যাপ্টেন স্কট বাধা দেওয়ার আগেই তাঁবু থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ওয়াটেস। আর তাঁবুতে ফিরে আসেননি। দলের বোঝা হতে চাননি এই সুদক্ষ অভিযাত্রী। তাই তুষার ঝড়ের সুযোগ নিয়ে অ্যান্টার্কটিকার তুষার সমুদ্রে চিরকালের জন্য স্বেচ্ছায় হারিয়ে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন টাইটাস ওয়াটেস। [caption id="attachment_213458" align="alignnone" width="956"] ক্যাপ্টেন স্কটের সেই ঐতিহাসিক ডাইরি।[/caption]
জীবনের পথ  ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল 
তবুও তিন অভিযাত্রী এগিয়ে চলেছিলেন। ২১ মার্চ, ক্যাপ্টেন স্কট তাঁর ডাইরিতে লিখেছিলেন, "ডিপো থেকে আমরা আর মাত্র ১১ মাইল দূরে আছি। কিন্তু প্রবল ঝড়ের জন্য তাঁবুতে আটকা পড়ে গিয়েছি। সারাদিন তাঁবুতে শুয়েই দিন কাটছে আমাদের।" ২৩ মার্চ  ক্যাপ্টেন স্কট লিখেছিলেন, “তুষার ঝড় মারাত্মক আকার নিয়েছে। উইলসন আর বোয়ার জ্বালানি আনতে যাবেন। মাত্র দুটি খাবারের প্যাকেট পড়ে আছে।” ওইদিনই কয়েক ঘন্টা পরে আবার লিখেছিলেন, “আমরা প্রায় শেষের কাছে চলে এসেছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি স্বাভাবিক ভাবেই এটা আসুক। আমরা ডিপোর দিকে এগিয়ে যাব। পথে মৃত্যু এলে আসবে।” [caption id="attachment_213463" align="aligncenter" width="486"] ক্যাপ্টেন স্কট[/caption]  ২৯ মার্চ ক্যাপ্টেন স্কট ডাইরিতে শেষবারের মত লিখেছিলেন, “২১ মার্চ থেকে আমাদের জ্বালানি ছিল না। যেটুকু আছে তাতে বরফ গলিয়ে হয়ত দু'কাপ চা হবে। খাবার শেষ। উইলসন আর বোয়ার ১১ মাইল দূরের ডিপো থেকে জ্বালানি আনার জন্য রোজ চেষ্টা করেছেন। প্রত্যেকদিন তৈরি হয়েছেন যাওয়ার জন্য। কিন্তু টেন্টের বাইরে যেন প্রলয় চলছে। ভালো  কিছুর আশা করছি না। আমরা জানি আমরা মৃত্যুর জন্য আটকে রয়েছি। দুর্বল হয়ে পড়ছি। শেষের আর বেশি দেরি নেই। আমার মনে হয়, আমি আর  লেখার সুযোগ পাব না।”
২৯ অক্টোবর ১৯১২
নিখোঁজ স্কটের টিমকে খুঁজে বার করার জন্য নেমেছিল ১১ সদস্যের এক উদ্ধারকারী দল। নেতৃত্বে ছিলেন স্কটের চরমতম প্রতিদ্বন্দী আমুন্ডসেনের দেশ নরওয়েরই এক অভিযাত্রী ট্রিগভ গ্র্যান। ক্যাপ্টেন স্কটের দল দক্ষিণ মেরুতে নিঁখোজ হওয়ার সাত মাস পর, ১৯১২ সালের ২৯ অক্টোবর, উদ্ধারকারী দলটি খুঁজে পেয়েছিল তুষারসমুদ্র প্রায় ডুবে থাকা ক্যাপ্টেন স্কটের তাঁবু। [caption id="attachment_213461" align="aligncenter" width="944"] বরফ জমা সেই তাঁবু, যার ভেতরে ছিল হেনরি বোয়ার, এডওয়ার্ড উইলসন ও ক্যাপ্টেন স্কটের দেহ।[/caption] তাঁবুর ভেতর শেষশয্যায় শুয়ে ছিলেন তিন ব্রিটিশ অভিযাত্রী। স্লিপিং ব্যাগের ভেতর নিখুঁত ভাবে শোয়ানো ছিল লেফটেন্যান্ট হেনরি বোয়ার ও ডঃ এডওয়ার্ড উইলসনের শরীর। ক্যাপ্টেন স্কটের স্লিপিং ব্যাগের ফিতেগুলি খোলা ছিল। খোলা ছিল ক্যাপ্টেন স্কটের কোটের সব বোতামও। স্লিপিং ব্যাগের বাইরে শুয়ে জমে কাঠ হয়ে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। গবেষকেরা বলেছিলেন তিন অভিযাত্রীর মধ্যে সব শেষে মারা গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্কট। দুই সঙ্গী চলে যাওয়ার পর, মৃত্যুকে এগিয়ে আনার জন্যেই কি তিনি স্লিপিং ব্যাগের চেন ও কোটের বোতাম খুলে দিয়েছিলেন! প্রবাদপ্রতিম অভিযাত্রী ক্যাপ্টেন স্কটের একটা হাত রাখা ছিল ডঃ এডওয়ার্ড উইলসনের দেহের ওপর। যখন উইলসনকে মৃত্যুকুয়াশা ঘিরে ফেলছিল সেই মুহূর্তেও উইলসনের গায়ে ভরসার হাত রেখেছিলেন দলনেতা ক্যাপ্টেন স্কট, নিজের মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে শুনতে।

```