শেষ আপডেট: 30 April 2020 10:39
নাঙ্গা পর্বত[/caption]
২০১৩ সালের জুন মাস। বসন্ত মরসুমের আরোহণ জোর কদমে শুরু হয়ে গিয়েছিল নাঙ্গা পর্বতে। বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫১ জন পর্বতারোহী নাঙ্গা পর্বতের তিনটে ফেস (রাখিয়ট, দিয়ামির, রূপাল) দিয়ে শৃঙ্গে আরোহণের জন্য রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। ১৪০০০ ফুট উঁচু দিয়ামির বেসক্যাম্পে অপেক্ষা করছিল, বিভিন্ন দেশের আরোহীদের নিয়ে গড়া আর একটি টিম। দিয়ামির বেসক্যাম্পের গালচের মতো সবুজ ঘাসে, নীল হলুদ লাল ফুলের মতো ফুটে উঠেছিল অভিযাত্রীদের টেন্টগুলি। টিমটি অপেক্ষা করছিল আর একটু ভাল আবহাওয়ার জন্য।
কারা ছিলেন অভিশপ্ত অভিযাত্রী দলটিতে!
১৩ সদস্যের দলটিতে ছিলেন ইউক্রেনের তিন পর্বতারোহী, ইগর স্বোয়েহান (৪৭), বাদাভি কাশায়েভ(৫৪), দিমিত্র কনিয়ায়েভ(৪৩)। এঁদের মধ্যে ইহর স্বোয়েহান ছিলেন পুরো দলটির লিডার। যিনি নাঙ্গা পর্বতে আসার আগে ৮০০০ মিটারের ৬টি শৃঙ্গ আরোহণ করে এসেছিলেন। দু’জন পর্বতারোহী এসেছিলেন স্লোভাকিয়া থেকে। তাঁদের নাম অ্যান্টন ডবেস(৫০), পিটার স্পারকা(৫৭)। তিন জন এসেছিলেন চিন থেকে। তাঁরা হলেন চুংফেং ইয়াং (৪৫) এবং রাও জিয়াংফেং (৪৯) ও ঝাং জিংচুয়ান (৩৫)। চুংফেং ১১টি এবং জিয়াংফেং ১০টি ৮০০০ মিটারের শৃঙ্গ আরোহণ করে এসেছিলেন নাঙ্গা পর্বতে।
[caption id="attachment_215077" align="aligncenter" width="600"]
নাঙ্গা পর্বতের দিয়ামির ফেস, নীচে দিয়ামির বেসক্যাম্প, যেখানে ঘটেছিল নারকীয় হত্যাকাণ্ড।[/caption]
টিমটিতে ছিলেন একজন আমেরিকান, তাঁর নাম ছিল হংলু চেন(৫০)। টিমটিতে ছিলেন লিথুয়ানিয়ার বিখ্যাত পর্বতারোহী আর্নেস্টাস মার্ক্সাইটিস (৪৪)। যিনি ২০১২ সালে পাকিস্তানের ব্রড পিক (৮০৫১ মিটার) আরোহণ করেছিলেন। ছিলেন নেপালের সোনা শেরপা (৩৫)। যিনি ২০১২ সালে পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কে-টু (৮৬১১ মিটার) আরোহণ করেছিলেন। দলে ছিলেন শের খান (৫০) নামে পাকিস্তানের এক পর্বতারোহী এবং আলি হুসেইন (২৮) নামে স্থানীয় এক গাইড কাম কুক।
২২ জুন, রাত ১০ টা
দিনভর কন্ডিশনিং ও শেষ মুহূর্তের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সেরে, সবাই একটু আগে ভাগেই ডিনার করে নিয়েছিলেন সেদিন। ডিনারের শেষে কফির পেয়ালা নিয়ে টেন্টের বাইরে বসে গল্প করছিলেন পর্বতারোহীরা। সবার অলক্ষে আকাশের চাঁদটাকে ঢেকে দিচ্ছিল মেঘ। হয়তো শুনতে পেয়েছিল এক অভিশপ্ত রাতের আগমনবার্তা। যে রক্তাক্ত রাত আগে কখনও দেখেনি নাঙ্গা পর্বত। টেন্ট থেকে ১০০০ গজ দূরে, হঠাৎ দেখা গিয়েছিল অনেকগুলি টর্চের আলো। অভিযাত্রীরা ভেবেছিলেন নতুন কোনও অভিযাত্রী দল আসছে। ১৬-২০ জনের দলটি একটু কাছে এলে বোঝা গিয়েছিল দলটি পাকিস্তানি সেনাদের। কারণ প্রত্যেকের গায়ে ছিল গিলগিট প্যারামিলিটারি অফিসারদের ইউনিফর্ম।
[caption id="attachment_215079" align="alignnone" width="610"]
হতভাগ্য অভিযাত্রী দলের হতভাগ্য নেতা ইউক্রেনের ইগর স্বোয়েহান।[/caption]
অভিযাত্রীদের টেন্টগুলির কাছে এসে দলটির নেতা চেঁচিয়ে বলেছিল, “সবাই স্যারেন্ডার করো। আমরা আল-কায়দা, আমরা তালিবান।” মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল অভিযাত্রীদের মুখ। অভিযাত্রীরা বুঝতে পেরেছিলেন, এরা সেনা নয়, সেনার পোশাক পরা সন্ত্রাসবাদী। দলটির নেতা পাকিস্তানি পর্বতারোহী শের খানকে বলেছিল, “আমরা জানি তোমরা ইংরেজি জানো, ওদের (বিদেশী পর্বতারোহীদের) জিজ্ঞেস করো, কাদের কাছে টাকা আছে কিনা।” শের খান সবাইকে সে কথা বলতেই, বিদেশী পর্বতারোহীরা বলে ওঠেন, “হ্যাঁ আমাদের কাছে টাকা আছে।” কেউ বলেন তাঁর কাছে ডলার আছে, কেউ বলেন তাঁর কাছে ইউরো আছে। সন্ত্রাসবাদীরা একে একে প্রত্যেক পর্বতারোহীকে তাঁর টেন্টে নিয়ে গিয়ে টাকা সংগ্রহ করেছিল।তারপরেই জঙ্গিরা ভেঙে ফেলেছিল অভিযাত্রীদের সেলফোন এবং টু-ওয়ে রেডিও। কেড়ে নিয়েছিল স্যাটেলাইট ফোন, পাসপোর্ট ও ক্যামেরা।
সন্ত্রাসবাদীদের দলনেতা এর পর শের খানকে জিজ্ঞেস করেছিল, পর্বতারোহীদের মধ্যে আমেরিকার কে আছে। শের খান বলে ছিলেন তিনি জানেন না কে কোথা থেকে এসেছেন, তিনি শুধু অভিযাত্রী দলের নেতাকে চেনেন। নেতা ইউক্রেনের লোক। দলটিতে থাকা আমেরিকার পর্বতারোহী হংলু চেন (৫০) চুপ করে ছিলেন। হংলু চেন জন্মসূত্রে চিনা, তাই চেহারা দেখে সন্ত্রাসবাদীরা তাকে আমেরিকান বলে ভাবতে পারেনি। কেউ কোনও সাড়া না দেওয়ায় সন্ত্রাসবাদীরা একে একে সমস্ত পর্বতারোহীকে পিছমোড়া করে বাঁধতে শুরু করেছিল।
[caption id="attachment_215080" align="aligncenter" width="471"]
নাঙ্গা পর্বতের মায়াবী রাত সেদিন ছিল রক্তাক্ত।[/caption]
আতঙ্কিত পর্বতারোহীরা চিৎকার করে বলছিলেন, “আমরা আমেরিকান নই, আমাদের ছেড়ে দাও, দয়া করো।", "আমি ইউক্রেনের।", "আমি লিথুয়ানিয়ার।" "আমি স্লোভাকিয়ার।” নিজেদের ভাষায় গালাগালি দিতে দিতে ও লাথি মারতে মারতে জঙ্গিরা হাত পা বাঁধা পর্বতারোহীদের হাঁটু মুড়ে বসিয়ে দিয়েছিল। আমেরিকার নাগরিক হংলু চেন’কে বাঁধতে গিয়েই বেঁধেছিল বিপত্তি। মার্শাল আর্ট বিশেষজ্ঞ হংলুর পালটা আক্রমণে হকচকিয়ে গিয়েছিল দলটি। কিন্তু তা কয়েক মুহূর্তের জন্য। এক সন্ত্রাসবাদীর অটোমেটিক রাইফেলের গুলি, নিমেষেই ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল হংলু চেনের শরীর। ঘাসে লুটিয়ে পড়েছিলেন, সেই অভিশপ্ত রাতের প্রথম বলি হংলু চেন।
হংলু চেনের ঘটনায় ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাসবাদীরা। হাঁটুমুড়ে বসে থাকা পর্বতারোহীদের লক্ষ্য করে পিছন থেকে গর্জে উঠেছিল খান পনেরো একে-৪৭। বেসক্যাম্পের মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিল দশ পর্বতারোহীর নিষ্প্রাণ শরীর। মিনিট খানেকের মধ্যে কয়েকশো রাউন্ড গুলি চালাবার পর শান্ত হয়েছিল জঙ্গিদের রাইফেলগুলো। এর পরেও শেষ হয়নি নৃশংসতা, এগিয়ে এসেছিল জঙ্গিদের নেতা। দায়ামির বেসক্যাম্পের সবুজ ঘাস আঁকড়ে শুয়ে থাকা প্রাণহীন অভিযাত্রীদের কাছে গিয়ে, প্রত্যেকেরর মাথায় আরও একবার করে গুলি করেছিল পৈশাচিক আনন্দে।
[caption id="attachment_215082" align="aligncenter" width="450"]
সেই অভিশপ্ত দল, এই দশ জনের একজনও বেঁচে ফেরেননি।[/caption]
এর পরেই উপত্যকা কাঁপিয়ে উঠেছিল স্লোগান, “সালাম জিন্দাবাদ। ওসামা বিন লাদেন জিন্দাবাদ। আজকের হত্যা ওসামা বিন লাদেনের হত্যার বদলা।” তারপর নিজেদের মধ্যে হাসি মশকরা করতে করতে মিলিয়ে গিয়েছিল উপত্যকার অন্ধকারে। ঘড়িতে তখন বেজেছিল রাত ১২টা। নক্ষত্রখচিত গিলগিটের আকাশে তখনও মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছিল চাঁদ। নির্জন প্রাণহীন প্রান্তরে পড়েছিল ১১টি গুলিবিদ্ধ লাশ। সবুজ ঘাসে মিশে যাচ্ছিল বিভিন্ন দেশের রক্ত।
বেঁচে গিয়েছিলেন দু’জন
সেদিনের সেই হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন দলটির ১১ সদস্য। বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছিলেন চিনের এক পর্বতারোহী ঝাং জিংচুয়ান। গনহত্যার সময় টেন্টগুলি থেকে কিছুটা দূরে প্রাকৃতিক কাজ সারতে গিয়েছিলেন তিনি। বিপদ বুঝে একটি অগভীর খাদে ঝাঁপ মেরেছিলেন। জঙ্গিরা চলে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা পর সেখান খাদ থেকে উঠে এসেছিলেন। জঙ্গিদের গুলি থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন পাকিস্তানী পর্বতারোহী শের খান।
সন্ত্রাসবাদীরা শের খানের নাম শুনে নিজেদের ধর্মমতের লোক ভেবেছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন ইসমাইলি শিয়া সম্প্রদায়ের। সন্ত্রাসবাদীরা তা জানতে পারলে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। কারণ পাকিস্তানে ইসমাইলি শিয়াদের কাফের বলে মনে করা হয়। সেদিনের হামলায় শের খান বেঁচে গেলেও, মারা গিয়েছিলেন দলের পাকিস্তানি গাইড কাম কুক, হাসিখুশি যুবক আলি হুসেইন। তাঁর নাম শুনে সন্ত্রাসবাদীরা আন্দাজ করেছিল তিনি শিয়া। তাই তাঁকে নির্দ্বিধায় মেরে ফেলছিল।
[caption id="attachment_215091" align="aligncenter" width="534"]
পাকিস্তানের আলি হুসেইন, ভাগ্য সেদিন সহায় ছিল না তাঁর।[/caption]
এই নির্মম গণহত্যার হত্যার দায় প্রথমে নিয়েছিল তালিবান থেকে বেরিয়ে আসা জুন্দুল হাফসা নামে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। কিন্তু তার কয়েকদিনের মধ্যেই তেহরিক-ই- তালিবান-পাকিস্তান (TTP) হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছিল। তারা বলেছিল নাঙ্গা পর্বত বেসক্যাম্পের গণহত্যা হচ্ছে আমেরিকার ড্রোন হামলায় নিহত তালিবান কমান্ডার ওয়ালিউর রহমানের মৃত্যুর বদলা।
যুগযুগ ধরে শত শত পর্বতারোহীর মৃত্যু দেখেছে হিমালয়, সে সব মৃত্যু ঘটেছে পর্বতারোহণ করতে গিয়ে। কিন্তু হিমালয়ের আঙিনায় বুলেটে পর্বতারোহীর মৃত্যু এর আগে কখনও দেখেনি হিমালয়। তাই রক্তাক্ত সেই রাত আজও ভুলতে পারেনি হিমালয়। ভুলতে পারেনি নাঙ্গা পর্বতের অভিশপ্ত দিয়ামির বেসক্যাম্প।