রূপাঞ্জন গোস্বামী
পৃথিবীর বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরীর স্বপ্ন থাকে মহাকাশচারী হওয়ার। রকেটে করে মহাকাশে উড়ে যাওয়ার। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখার। অভিকর্ষশূন্য পরিবেশে উড়ে বেড়ানোর। গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকার রহস্যময় জগতকে চাক্ষুস করার। কিন্তু মহাকাশচারী হওয়া আদৌ সহজ কাজ নয়, বরং পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজগুলির মধ্যে একটি।
খুবই কম লোক জানেন, ভয়ঙ্কর কঠিন নির্বাচন পদ্ধতির সাহায্যে প্রতি ৬০০০ বিজ্ঞানীর মধ্যে থেকে মাত্র ৮ জনকে বেছে নেয় নাসা, প্রতিটি মিশনের জন্য। মহাকাশে মহাকাশচারীদের জীবন সুখের মনে হলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে তা চরম দুঃসহ। এমনকি, পৃথিবীতে আর ফেরা নাও হতে পারে। তাই মহাকাশচারীদের জন্য বিশাল অঙ্কের জীবন বিমা করানো হয়। মহাকাশচারীরা মহাকাশে যাওয়ার আগে উইল করে যান, বা পরিবারের লোকজনদের সম্পত্তি বুঝিয়ে দিয়ে যান।
মহাকাশে গিয়ে কী করেন মহাকাশচারীরা!
সংক্ষেপে বলা অসম্ভব, তবুও জেনে রাখুন, প্রত্যেক মহাকাশচারীকে আলাদা আলাদা দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। মহাকাশচারীর প্রতি মিনিটের রুটিন একটি লগবুকে লেখা থাকে, লগবুকটি লেখা হয় মহাকাশে উড়ে যাওয়ার অনেক আগেই। মহাকাশে পৌঁছে কেউ করেন গবেষণা, কেউ করেন মহাকাশযান বা স্পেস স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। গবেষণা বা মহাকাশযান বা স্পেস স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মহাকাশচারীদের কখনও কখনও মহাকাশযানের বাইরে মহাশুন্যে হাঁটতে হয় বা স্পেস ওয়াক করতে হয়। প্রতি আধ ঘন্টা অন্তর অন্তর প্রত্যেক মহাকাশচারীকেই নাসার পৃথিবীস্থিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষে তাঁর কাজের রিপোর্ট পাঠাতে হয় কিংবা ভিডিও ইন্টারভিউ দিতে হয়।
[caption id="attachment_208455" align="aligncenter" width="879"]

স্পেস স্টেশনের বাইরে কাজে ব্যস্ত মহাকাশচারীরা।[/caption]
মহাকাশযানে বাস করা আদৌ সহজ নয় কেন!
কারণ, মহাকাশে মহাকাশচারীদের প্রতিনিয়ত লড়তে হয় নিজের শরীর ও মনের সঙ্গে।
● মহাকাশে খাবার স্বাদহীন লাগে। ঢেকুর তোলা যায় না, কারণ মহাকাশে ওজনশুন্য পরিবেশে পাকস্থলীতে থাকা গ্যাস ওপরে ওঠে না। সারাক্ষণ গা বমি লাগে।
● মহাকাশযানের ভেতর ভাসতে ভাসতে প্রতি মুহূর্তেই ধাক্কা খেতে হয় দেওয়ালে। অসতর্ক হলে গুরুতর চোট লাগে মাথায়।
● অভিকর্ষ না থাকার ফলে মহাকাশে মহাকাশচারীদের উচ্চতা দুই ইঞ্চি বেড়ে যায়। অবশ্য, পৃথিবীতে ফেরার পর উচ্চতা আবার কমে যায়।
● মহাকাশে বায়ুত্যাগের পরিণতি মারাত্মক হতে পরে। মহাকাশচারীদের ক্ষুদ্রান্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়া দাহ্য গ্যাস তৈরি করতে পারে। তাই মহাকাশচারীদের স্পেস স্যুটে বিশেষ একটি ফিল্টার লাগানো আছে, যেটি দাহ্য গ্যাস ও কার্বনডাই অক্সাইড বের করে দেয়।
● পৃথিবীতে, আমাদের পা আমাদের শরীরের ভার বহন করে। এই ভার সামাল দেওয়ার জন্য আমাদের পায়ের হাড় আর পেশী শক্ত হয়। কিন্তু মহাকাশে মহাকাশচারীরা খুব একটা বেশি পায়ের ব্যবহার করেন না। কারণ তাঁরা শূন্যে ভেসে ভেসে ঘুরে বেড়ান মহাকাশ যানের ভেতর। এর ফলে তাঁদের কোমর ও পায়ের পেশী ক্রমশ ক্ষমতা হারাতে থাকে। হাড় ক্রমশ পাতলা ও দুর্বল হতে থাকে। তাই মহাকাশচারীদের রোজ দু'ঘন্টা ব্যায়াম করা বাধ্যতামূলক করেছে নাসা।
[caption id="attachment_208456" align="aligncenter" width="625"]

মহাকাশযানের জিমে চলছে এক্সারসাইজ।[/caption]
● মহাকাশে গিয়ে মহাকাশচারীদের হৃদপিন্ড ও রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটে। আমরা যখন পৃথিবীর বুকে দাঁড়াই, মাধ্যাকর্ষণের টানে রক্ত নেমে যায় পায়ে। কিন্তু মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ নেই, ফলে রক্ত উঠে আসে মাথায় ও শরীরের ওপরের দিকে। এর জন্যই মহাকাশচারীদের মুখ ফোলাফোলা লাগে। অতিরিক্ত রক্তচাপ সামলাতে হয় মস্তিষ্ককে।
● মহাকাশে শরীর খারাপ হলে মুশকিল। কারণ মহাকাশযানে ডাক্তার বা হাসপাতাল নেই। শরীর অসুস্থ্য হলেও দ্রুত পৃথিবীতে ফেরার উপায় নেই। তাই আতঙ্কে থাকেন মহাকাশচারীরা, যদিও প্রত্যেক মহাকাশচারীকে কয়েক বছর ধরে প্রশিক্ষণ দিয়ে রীতিমতো চিকিৎসক বানিয়ে দেওয়া হয়।
কীভাবে নিজেদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন মহাকাশচারীরা!
● মহাকাশচারীরা ঘুম থেকে উঠে আমাদেরই মতো দাঁত ব্রাশ করেন এবং প্রাকৃতিক কাজ সেরে ফেলেন। প্রত্যেক মহাকাশচারীর নিজস্ব টুথব্রাশ, পেস্ট, চিরুনি, দাড়ি কামাবার মেশিন আছে। সেগুলি রাখা থাকে একটি হাইজিন কিটে। মহাকাশযানে কোনও বেসিন থাকে না। থাকে না ট্যাপ কল। দাঁত ব্রাশের পর আমাদের মতো কুলকুচি করেন না মহাকাশচারীরা। ভেজা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছে ফেলেন।
● মহাকাশে স্নান করেন মহাকাশচারীরা, কিন্তু ভিন্ন ভাবে। বিশেষ ভাবে প্রস্তুত করা সাবান আর শ্যাম্পু ব্যবহার করেন স্নানের ক্ষেত্রে। এই সাবানের ফেনা ধুতে জল লাগে না। তবে খুব সাবধানে করতে হয় স্নান। যাতে সাবানের ফেনা গা থেকে বেরিয়ে শুন্যে উড়ে মহাকাশযানের ভেতরে ছড়িয়ে না যায়। সাবান মাখার পর ভিজে তোয়ালে দিয়ে গা মুছে নেন মহাকাশচারীরা।
[caption id="attachment_208457" align="aligncenter" width="1024"]

মহাকাশে স্নান করছেন মহাকাশচারী।[/caption]
● স্পেস স্টেশন ও মহাকাশযানগুলিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ জল নিয়ে যাওয়া হয়। পান করার ও অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য। তাই জলের অপচয় রুখতে বিশেষ ভাবে নির্মিত জলের 'পাউচ' ব্যবহার করেন মহাকাশচারীরা। যে পাউচে চাপ দিলে ফিনকি দিয়ে জল বেরিয়ে আসে না, ফোঁটা ফোঁটা জল বেরিয়ে আসে।
● মহাকাশচারীদের মল ও মূত্র ত্যাগ করার জন্য ‘স্পেস টয়লেট’ বা 'জিরো গ্র্যাভিটি' টয়লেট থাকে। আমাদের টয়লেটের চেয়ে এগুলি একদমই আলাদা। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের জন্য আমরা মল মূত্র ত্যাগ করলে তা নীচে চলে যায়। কিন্তু মহাকাশে তা হয় না। তাই মলমূত্র ত্যাগের জন্য 'ভ্যাকুয়াম ক্লিনার' লাগানো কমোড ব্যবহার করা হয়। শোষণক্ষমতা যুক্ত এই কমোড, দূষিত বায়ু, কঠিন ও তরল বর্জ্যপদার্থগুলিকে টেনে নেয়। আমরা একই কমোডে কঠিন-তরল উভয় ধরনের বর্জ্যপদার্থ ত্যাগ করলেও, মহাকাশচারীরা মূত্রত্যাগ করেন আলাদা ভ্যাকুয়াম টিউবে। মূত্রকে ফিল্টার মেশিনের সাহায্যে আবার শুদ্ধ জলে পরিণত করা হয়।
[caption id="attachment_208458" align="alignnone" width="768"]

‘স্পেস টয়লেট’ বা জিরো গ্র্যাভিটি টয়লেট।[/caption]
● মহাকাশচারীদের খুবই ছোট্ট জায়গার মধ্যে বাস করতে হয়। সেই জন্য জায়গাটি শক্তিশালী ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করে পরিষ্কার রাখতে হয় নিয়মিত। জীবাণুনাশক সাবান ব্যবহার করে মহাকাশযানের জানালা, দেওয়াল ও মেঝে প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হয়। একই ভাবে তাঁদের খাবার ট্রে, কাঁটাচামচ সাফ করতে হয়। নিয়মিত আবর্জনাও ঘাঁটতে হয় মহাকাশচারীদের। সাধারণত, প্রত্যেকটি মহাকাশযানে চারটে ডাস্টবিন থাকে। তিনটে শুকনো আবর্জনার জন্য ও একটা ভিজে আবর্জনার জন্য। দুর্গন্ধযুক্ত যেকোনও বর্জ্যপদার্থ ভিজে আবর্জনার ডাস্টবিনে জমা করা হয়।
কী খান মহাকাশচারীরা!
মহাকাশচারীরা তিন বেলা খাবার খান। সেই খাবারগুলি পৃথিবী থেকে মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হয় অনেক হিসেব করে। কারণ মহাকাশে খাবার নিয়ে যাবার জন্য এবং সেই খাবারকে ভাল রাখার জন্য নাসাকে খরচ করতে হয় লক্ষ লক্ষ ডলার। তাই প্রত্যেক মহাকাশচারীর জন্য নিদিষ্ট পরিমাণ খাবার নিয়ে যাওয়া হয়। নাসার ল্যাবরেটরি গ্রিন সিগনাল দেওয়ার পরই, মহাকাশচারীদের খাবার মহাকাশযানে ওঠে। কারণ, নাসা চায় না দূষিত খাবারের কারণে মহাকাশে অসুস্থ হয়ে পড়ুন মহাকাশচারীরা। মহাকাশযান কিংবা স্পেস স্টেশনে ফ্রিজ থাকে না। তাই খাবার সেখানে শুকনো অবস্থাতেই সংরক্ষণ করা হয়।
[caption id="attachment_208459" align="aligncenter" width="1024"]

মহাকাশের লাঞ্চ কিট।[/caption]
১৯৬২ সালে আমেরিকার 'মার্কারি স্পেস মিশন'-এর মহাকাশচারী জন গ্লেনকে দিয়ে শুরু হয়েছিল নাসার 'টিউব ফুড' পদ্ধতি। বিশেষ পদ্ধতিতে তরল খাবার ভরে দেওয়া হয় টুথপেস্টের টিউবের মতো দেখতে খালি টিউবের মধ্যে। খাওয়ার সময় মহাকাশচারীরা জল গরম করে ঢুকিয়ে দেন টিউবে। তারপর টিউবে চাপ দিয়ে মুখে খাবার ঢেলে নেন।
এখন অবশ্য মহাকাশচারীরা মহাকাশেও তাদের পছন্দমতো খাবার খেতে পারেন, যেমন, পাস্তা, নুডলস, ম্যাকারোনি, পিৎজা,বার্গার, ফলমূল, মুরগি, বিফ, সি-ফুড, চকোলেট, বাদাম, মাখন-সহ হরেক খাবার। এখনকার মহাকাশযানগুলিতে রান্নাঘরও আছে, যেখানে গরম জল ও বৈদ্যুতিক ওভেন আছে। তাই মহাকাশচারীরা রান্নাঘরে খাবার গরম করে খেতে পারেন। খাবারে স্বাদ আনার জন্য মহাকাশচারীরা খাবারে, সস, সর্ষের কাসুন্দি, কেচাপ, মেয়োনিজ মাখিয়ে নেন। লবণ আর গোলমরিচের গুঁড়ো মহাকাশে নেওয়া হয় তরলাকারে। যাতে এসবের গুঁড়ো মহাকাশযানে ছড়িয়ে পড়ে বিপত্তি না ঘটাতে পারে।
একজন মহাকাশচারী দৈনিক খাদ্য তালিকা
ব্রেকফাস্ট: রান্নাকরা দানাশষ্য, বিফ স্টেক, দুধ ও মাখন মিশ্রিত ফেটানো ডিম, কোকো, ফল ও ফলের রস।
লাঞ্চ: সবজি, পাস্তা, নুডলস, ম্যাকারনি, হট ডগ, পাউরুটি, কলা, আখরোট, আমন্ড, ফলের রস।
ডিনার: স্যুপ অথবা বিভিন্ন ধরণের ফলের মিশ্রণ, চালের পোলাও, পুডিং, ফলের রস ও মহাকাশচারীদের মনপসন্দ চিংড়ির ককটেল।
মনে প্রশ্ন জাগে, মহাকাশচারীরা কী ভাবে বোঝেন, কখন কোন বেলার খাবার খেতে হবে! কারণ মহাকাশে দিন ও রাতের ফারাক বোঝা প্রায় অসম্ভব। আসলে প্রত্যেক মহাকাশচারীর খাওয়ার নির্দিষ্ট সময়, যাত্রা শুরুর আগেই নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে। তাই মহাকাশে একজন মহাকাশচারী তাঁর জন্য নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট খাবারের প্যাকেট খুলে খেয়ে নেন।
[caption id="attachment_208462" align="aligncenter" width="756"]

অবসরে চলছে গান বাজনা।[/caption]
কীভাবে অবসর কাটান মহাকাশচারীরা!
মহাকাশচারীরা শুধু কাজই করেন না, আমাদের মতো তাঁদেরও সপ্তাহে দু’দিন ছুটি থাকে। ছুটির দিনগুলিতে তাঁরা পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। গান শুনে, সিনেমা দেখে, তাস বা দাবা খেলে কিংবা বই পড়ে সময় কাটান। সহকর্মীদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা-আনন্দে মেতে ওঠেন। নয়তো মহাকাশযানের ছোট ছোট জানালা দিয়ে দূরের পৃথিবীকে দেখে সময় কাটান। নাসার মহাকাশযানে মদ্যপান নিষিদ্ধ, তবে রাশিয়ানরা তাঁদের মহাকাশযানে পরিমিত মদ্যপান করে থাকেন। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনটি পৃথিবীকে ৪৫ মিনিট অন্তর একবার পাক ঘুরে আসে বলে, আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে থাকা মহাকাশচারীরা ২৪ ঘন্টায় অনেকবার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে পান। এটাও তাঁদের অন্যতম বিনোদন।
[caption id="attachment_208465" align="aligncenter" width="1024"]

বিচিত্রভাবে ঘুমিয়ে আছেন মহাকাশচারীরা।[/caption]
কীভাবে ঘুমান মহাকাশচারীরা!
মহাকাশে একজন মহাকাশচারী যেভাবে তাঁর ইচ্ছা সেভাবে ঘুমোতে পারেন। কারণ,মহাকাশে কোনটা ‘উপরদিক’ বা কোনটা ‘নীচ’ বোঝা যায় না। তবে ঘুমোনোর আগে মহাকাশচারীরা নিজেকে বিছানার সঙ্গে বেল্ট দিয়ে বেঁধে নেন। যাতে বিছানা থেকে ভেসে গিয়ে দেওয়াল বা কোনো কিছুতে ধাক্কা খেয়ে চোট না লাগে। মহাকাশচারীদের কেবিনগুলোতে গান শোনার এবং হালকা আলোর ব্যবস্থা থাকে। মহাকাশচারীদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা করে ঘুমানো বাধ্যতামূলক। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মহাকাশে দিন রাত বলে কিছুই নেই, তাহলে তাঁরা ঘুমোন কী ভাবে! আসলে মহাকাশচারীদের ঘুমোনোর সময়ও আগে থেকে নির্দিষ্ট করা থাকে।