
শেষ আপডেট: 6 December 2020 02:26
রূপাঞ্জন গোস্বামী
ছেচল্লিশ বছরের পিটার ডায়ামন্ডিস অবাক চোখে দেখছিলেন তাঁর স্বপ্নের নায়ককে। কথাটা ঠিক শুনছেন তো! হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন ডায়ামন্ডিস। তাঁর স্বপ্নের নায়কের গলা ভেসে আসছিল স্পিচ সিন্থেসাইজার থেকে, "তুমি কি আমাকে মহাকাশে নিয়ে যেতে পারবে?"। ডায়ামন্ডিসের স্বপ্নের নায়ক মাত্র একুশ বছর বয়সে আক্রান্ত হয়েছিলেন Amyotrophic lateral sclerosis (ALS) রোগে। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, যুবকটি আর মাত্র দু'বছর বাঁচবেন। কিন্তু চিকিৎসকদের অনুমান মেলেনি। বেঁচে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে জন্ম নেওয়া যুবকটি। প্রাণে বাঁচলেও, শরীরের একের পর এক পেশি তাদের কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছিল। চার দশকেরও বেশি সময় হুইলচেয়ারে বন্দি থেকেও, ডায়ামন্ডিসের স্বপ্নের নায়ক স্টিফেন হকিং আজ বিংশ শতাব্দীর সেরা মহাকাশবিজ্ঞানী, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, গবেষক ও চিন্তাবিদ হিসেবে সমাদৃত। [caption id="attachment_283421" align="aligncenter" width="1024"]
স্টিফেন হকিং[/caption]
চলার ক্ষমতা ও সম্পূর্ণ বাকশক্তি হারিয়ে ফেলা হকিংয়ের শৈশবের স্বপ্নের কথা শুনে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন ডায়ামন্ডিস। পরক্ষণেই তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁর স্বপ্নের নায়ক তো মনের উড়ানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চষে বেড়িয়েছেন দশকের পর দশক ধরে। অবাধে ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রহ নক্ষত্র নীহারিকা থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোলের নিকষ অন্ধকারে। মানুষটি যদি সুস্থ থাকতেন তাহলে তিনি কবেই নভোচারী হয়ে ছায়াপথে লিখে আসতেন নিজের নাম।
পিটার ডায়ামন্ডিস এরপর হকিংকে বলেছিলেন,"আমি এই মুহুর্তে হয়ত আপনাকে মহাকাশে নিয়ে যেতে পারব না। কিন্তু জিরো-গ্র্যাভিটিতে ভাসবার ব্যবস্থা করতে পারব।" ডায়ামন্ডিসের কথা শুনে হকিংয়ের চোখ দুটি আনন্দে চক চক করে উঠেছিল।
হুইলচেয়ারে চার দশক কাটানো মানুষটিকে ২০০৭ সালেই জিরো-গ্র্যাভিটিতে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জটা নিয়ে নিয়েছিলেন পিটার ডায়ামন্ডিস। তাঁর প্রতিভাও নেহাত কম নয়। গ্রীক-আমেরিকান পিটার ডায়ামন্ডিস একাধারে উদ্যোগপতি, ইঞ্জিনিয়ার ও চিকিৎসক। এক্স-প্রাইজ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা। যে সংস্থাটি মানবসভ্যতার স্বার্থে প্রযুক্তি সংক্রান্ত প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে।
তিনি সিঙ্গুলারিটি ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়াও Abundance: The Future Is Better Than You Think এবং BOLD: How to Go Big, Create Wealth and Impact the World নামে দুটি বেস্টসেলার বইয়ের লেখক। স্পেস অ্যাডভেঞ্চার লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান। রকেট রেসিং লিগের প্রতিষ্ঠাতা। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস ইউনিভার্সিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বিভিন্ন বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা সংস্থার মালিক।
[caption id="attachment_283422" align="aligncenter" width="700"]
পিটার ডায়ামন্ডিস[/caption]
হকিংকে জিরো-গ্র্যাভিটিতে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ পিটার ডায়ামন্ডিস নিয়েছিলেন, তাঁর ZERO-G সংস্থাটির কথা মাথায় রেখে। মহাকাশচারী বায়রন লিচেনবার্গ ও নাসার ইঞ্জিনিয়ার রে ক্রনিসকে সঙ্গে নিয়ে সংস্থাটি তৈরি করেছিলেন পিটার ডায়ামন্ডিস। সংস্থাটি ২০০৪ সাল থেকে অত্যাধুনিক Boeing 727-227F বা জি ফোর্স-ওয়ান বিমানে করে পর্যটক ও গবেষকদের উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩০ হাজার ফুট ওপরে। সেই উচ্চতায় পৌঁছনোর পর, নির্দিষ্ট অধিবৃত্তাকার পথে নির্দিষ্ট কোণে নিজেকে রেখে ঘুরতে শুরু করে বিমানটি।
একসময় পৌঁছে যায় ভারশূন্য অবস্থানে। কয়েক মিনিটের জন্য জিরো-গ্র্যাভিটি বা ভারশূন্যতার অভিজ্ঞতা পান পর্যটকরা। সংস্থাটি ২০০৬ সালের এপ্রিলে, প্রথম বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারের রানওয়ে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিল। কারণ নাসা'ও জি ফোর্স-ওয়ানের মতো বিমান ব্যবহার করে মহাকাশচারীদের জিরো-গ্র্যাভিটির ট্রেনিং দেওয়ার জন্য।
[caption id="attachment_283423" align="aligncenter" width="580"]
শূন্য অভিকর্ষের পথে ডায়ামান্ডিসের জি-ফোর্স-ওয়ান বিমান[/caption]
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন হকিং ও ডায়ামন্ডিস। সাংবাদিক বৈঠকটি শেষ হওয়া মাত্র ডায়ামন্ডিসের সেল ফোন বেজে উঠেছিল। ফোনের ওপ্রান্তে ছিলেন তাঁর ব্যবসার পার্টনার ও বন্ধু। তিনি ডায়ামন্ডিসকে বলেছিলেন, "তুমি কি পাগল হয়ে গেছ! পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানীকে জিরো গ্রাভিটিতে নিয়ে যাবে! তুমি কি মানুষটাকে মারতে চাইছো! তুমি ওঁর শারীরিক অবস্থা জানো!" হেসে ফোনটা নামিয়ে রেখেছিলেন ডায়মন্ডিস।
পরক্ষণেই আবার বেজে উঠেছিল ফোন। এবারে ফোন এসেছিল Federal Aviation Administration (FAA) থেকে। যে সংস্থার আইনের আওতায় ডায়মন্ডিসের ZERO-G ব্যবসা করে। সংস্থাটির আধিকারিক ডায়মন্ডিসকে বলেছিলেন, "না, তুমি স্টিফেন হকিংকে নিয়ে জিরো-গ্র্যাভিটিতে যেতে পারবে না। আমরা তোমায় অনুমতি দিতে পারছি না।"
ভীষণ হতাশ হয়েছিলেন ডায়ামন্ডিস। চোখ গিয়েছিল পাশে বসা হকিংয়ের দিকে। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর চোখে বিষাদের ছায়া দেখেছিলেন ডায়ামন্ডিস। আশৈশবের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার দুঃখ ক্রমশ গ্রাস করছিল হকিংকে। হকিংয়ের সেই শূন্য দৃষ্টি ধাক্কা দিয়েছিল ডায়ামন্ডিসকে। নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, "প্রতিবন্ধকতার হিমালয় পেরিয়ে আজ জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছেন যে মানুষটি, তাঁকে দেখে তাহলে কী শিক্ষা পেলে হে ডায়ামন্ডিস!"
ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অফিসে ছুটে গিয়েছিলেন ডায়ামন্ডিস। বিশ্বমানের ইঞ্জিনিয়ার ও চিকিৎসক ডায়ামন্ডিস কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় যুক্তি দিয়ে কাবু করে ফেলেছিলেন সংস্থাটির আধিকারিকদের। তবুও আধিকারিকরা শর্ত রেখেছিলেন। মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার আগে ৬৫ বছরের হকিংকে বহুস্তরীয় স্বাস্থ্য-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। কারণ তিনি বিশ্বের সম্পদ। তাঁর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে না। এছাড়াও স্বাস্থ্য-পরীক্ষায় হকিং উত্তীর্ণ হলেও, উড়ানে চিকিৎসকদের টিম নিতে হবে।
সব শর্তে রাজি হয়েছিলেন ডায়ামন্ডিস। তিনি জানতেন, জিরো-গ্র্যাভিটিতে হকিংকে নিয়ে যাওয়াটা কতোটা ঝুঁকিপুর্ণ। কারণ জিরো-গ্র্যাভিটিতে মানুষের রক্ত-সংবহনতন্ত্রের কাজে বিরাট পরিবর্তন ঘটে। পৃথিবীর বুকে আমরা যখন দাঁড়াই, মাধ্যাকর্ষণের জন্য রক্ত শরীরের নীচের দিকে নেমে যায়। কিন্তু জিরো-গ্র্যাভিটিতে রক্ত উঠে আসে শরীরের ওপরের দিকে। ফলে মস্তিষ্কে ভীষণ ভাবে বেড়ে যায় রক্তের চাপ। সেই চাপ হকিং নিতে না পারলে, মৃত্যু অবধারিত।
তবুও চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন ডায়ামন্ডিস। কারণ স্বপ্নের নায়কের দৃষ্টিতে দেখা বিষাদের ছায়া তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। এরপর কয়েক মাস ধরে চলেছিল চিকিৎসকদের বিশাল একটি টিমের সঙ্গে হকিং ও ডায়ামন্ডিসের টিমের আলোচনা। একই সঙ্গে চলেছিল হকিংয়ের স্বাস্থ্য-পরীক্ষা। কয়েক মাস পর চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, জিরো-গ্র্যাভিটিতে গিয়ে হকিংয়ের এর সুস্থ থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
[caption id="attachment_283428" align="aligncenter" width="600"]
শূন্যে ভাসছেন হকিং, ডানদিকে ডায়ামন্ডিস[/caption]
২৬ এপ্রিল, ২০০৭
জি ফোর্স-ওয়ান বিমানে চড়ে মহাকাশে উড়ে যাওয়ার আগে, সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী। হকিং বলেছিলেন, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে হুইলচেয়ার বন্দি থাকার পর, শূন্য অভিকর্ষে ওড়ার সুযোগ পাওয়াটা সত্যিই ভীষণ আনন্দের। তিনি বলেছিলেন, তাঁর এই অভিজ্ঞতা ALS আক্রান্ত মানুষদের কাছে, চলার ক্ষমতাহীন মানুষদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
[caption id="attachment_283429" align="aligncenter" width="612"]
উড়ন্ত হকিং হাসছেন ডায়মন্ডিসের দিকে তাকিয়ে[/caption]
ফ্লরিডায় অবস্থিত নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারের রানওয়ে থেকে হকিংকে নিয়ে উড়ে গিয়েছিল জি-ফোর্স ওয়ান বিমান। ভূপৃষ্ঠ থেকে চব্বিশ হাজার ফুট ওপরে, অভিকর্ষ শূন্য পরিবেশে, চার মিনিটের জন্য শূন্যে ভাসার অসামান্য অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন স্টিফেন হকিং। চার দশক পর হুইলচেয়ার ছেড়ে, প্রতিবন্ধকতার মাধ্যাকর্ষণ কাটিয়ে, হকিং মিটিয়েছিলেন মুক্ত বিহঙ্গ হওয়ার সাধ। 'গ্র্যাভিটি স্যুট' পরা উড়ন্ত হকিংয়ের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলেন ডায়ামন্ডিস। ফিনিক্স পাখি হয়ে শিশুর মত হাসছেন তাঁর স্বপ্নের নায়ক। ডায়ামন্ডিসের চোখের কোনায় এসে গিয়েছিল জল। যুদ্ধ জয়ের আনন্দে।