Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বিজেপির কথায় চললে আমাদের কাছেও তালিকা থাকবে', পুলিশ কর্তাদের চরম হুঁশিয়ারি ব্রাত্য বসুর!একসময় নীতীশকেই কুর্সি থেকে সরানোর শপথ নিয়েছিলেন! তাঁর ছেড়ে যাওয়া পদেই বসলেন শকুনি-পুত্র‘একজনকে ধরলে হাজার জন বেরোবে...’, আইপ্যাক ডিরেক্টর গ্রেফতারের পরই নাম না করে হুঁশিয়ারি মমতারনববর্ষে বাঙালিয়ানার ষোলো আনা স্বাদ! ঢাকাই কালো ভুনা থেকে আম পেঁয়াজির যুগলবন্দি, মিলবে এই রেস্তরাঁয়‘কোভিড ভ্যাকসিনই হার্ট অ্যাটাকের কারণ!’ শেন ওয়ার্নের মৃত্যু নিয়ে ছেলের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক এবার রক্তদান শিবিরেও কমিশনের ‘নজরদারি’! রক্তের আকাল হলে কী হবে রোগীদের? প্রশ্ন তুললেন কুণালমারাঠি না জানলে বাতিল হবে অটো-ট্যাক্সির লাইসেন্স! ১ মে থেকে কড়া নিয়ম মহারাষ্ট্রেআশা ভোঁসলেকে শ্রদ্ধা জানাতে স্থগিত কনসার্ট, গায়িকার নামে হাসপাতাল গড়ার উদ্যোগউৎসবের ভিড়ে হারানো প্রেম, ট্রেলারেই মন কাড়ছে ‘উৎসবের রাত্রি’‘বাংলাকে না ভেঙেই গোর্খা সমস্যার সমাধান’, পাহাড় ও সমতলের মন জিততে উন্নয়নের ডালি শাহের

আজকের দিনেই ভারতে পা রেখেছিলেন বাংলা থিয়েটারের রুশ জনক

মণিমেখলা মাইতি আজকের যে বাংলা নাটক বা থিয়েটারকে আমরা জানি, তার ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং নাটকের ইতিহাসের সঙ্গে রঙ্গমঞ্চের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রাচীন নাট্যশাস্ত্রের ইতিহাসে তিনপ্রকার প্রেক্ষাগৃহের কথা শোনা যায়। হিন্দু রাজাদের আমলে বিভিন্

আজকের দিনেই ভারতে পা রেখেছিলেন বাংলা থিয়েটারের রুশ জনক

শেষ আপডেট: 27 July 2020 10:22

মণিমেখলা মাইতি

আজকের যে বাংলা নাটক বা থিয়েটারকে আমরা জানি, তার ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং নাটকের ইতিহাসের সঙ্গে রঙ্গমঞ্চের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রাচীন নাট্যশাস্ত্রের ইতিহাসে তিনপ্রকার প্রেক্ষাগৃহের কথা শোনা যায়। হিন্দু রাজাদের আমলে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে নাচ, অভিনয় হত রাজানুগ্রহে। হিন্দু রাজাদের রাজত্বের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে নাট্যশালার অবসান হয়। আবার মুসলিম শাসকেরা নাট্যশালার বিরোধী ছিলেন। তাই কলকাতা নগরী পত্তনের পরে ইংরেজদের আনুকূল্যে ১৭৭৫ সালে পুনরায় রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এই বাংলায়। কিন্তু বাংলা নাটকের অভিনয় এবং বাংলা নাট্যমঞ্চের প্রতিষ্ঠা বাংলায় যাঁর হাত ধরে হয়েছিল তিনি কোনও বাঙালি নন। তিনি একজন রুশদেশীয় ব্যক্তি। তাঁর নাম গেরাসিম স্তেফানভিচ লিয়েবেদেফ। লেবেদেফ নামে যিনি সবচেয়ে পরিচিত আমাদের কাছে। শুধু তাই নয়, লিয়েবেদেফ (১৭৪৯-১৮১৭) রাশিয়াতে ভারতচর্চার পথপ্রদর্শক। তাঁর হাত ধরেই ঘটেছে রাশিয়া ও ভারতের সংস্কৃতির সার্থক মেলবন্ধন। তাঁর কাছে আমরা অনেকাংশে ঋণী। [caption id="attachment_244316" align="aligncenter" width="600"] গেরাসিম স্তেপানভিচ লিয়েবেদেফ।[/caption] এক রঙিন ও বর্ণময় জীবনের অধিকারী এই লিয়েবেদেফ। ১৭৪৯-এ রাশিয়ায় ভোলগা নদীর তীরে সুজদালিয়া রাজ্যের ইয়ারস্লাভল শহরে এক সম্ভ্রান্ত যাজকের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা স্তেপান লিয়েবেদেফ এবং মাতা পারাস্কোভিয়া লিয়েবেদেফের পরিবার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে এটা জানা যায় তাঁদের পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত যাজক পরিবার। লিয়েবেদেফ তাঁর জীবনের প্রথম আটাশ বছর নিজের দেশে কাটালেও কোনওদিন তাঁর প্রথাগত বিদ্যাশিক্ষা হয়নি। বরং সঙ্গীতে অনুরাগী হয়ে সঙ্গীতের তালিম নিয়ে রীতিমতো পারদর্শী হয়ে ওঠেন। স্তেপান লিয়েবেদেফ তাঁর পরিবার ছেড়ে রাজধানী সাংকৎ পিতেবুর্গে আসেন রাজবাড়ির চ্যাপেলে গান করার জন্য। গেরাসিমের বয়স যখন পনের বছর তখন তাঁর পিতা তাঁকে পিতেবুর্গে নিয়ে যান এবং প্রায় তের বছর ওখানে থাকেন। সেখানে থাকাকালীন তিনি শেখেন জার্মান, ইতালিয়ান, ইংরেজি, ফার্সি ইত্যাদি নানা ভাষা। সেই অর্থে পিতেবুর্গেও তাঁর কোনও প্রথাগত শিক্ষা হয়নি। সঙ্গীতশাস্ত্রে লিয়েবেদেফের দক্ষতা দেখে সুদক্ষ বেহালাবাদক, মোৎসার্ট, বিটোফেন, হেইডেনের বন্ধু কাউন্ট আন্দ্রেই রাজুমোফস্কি তাঁকে সঙ্গে করে ইতালি নিয়ে যান ১৭৭৭ সাল নাগাদ। লিয়েবেদেফের বয়স তখন আটাশ আর রাজুমোফস্কির পঁচিশ। ততদিনে বাভারিয়া দখলের জন্য অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়ার মধ্যে লড়াই বেধে গেছে। তাই তাঁরা নেপলস না গিয়ে ভিয়েনা পৌঁছান। এরপর দীর্ঘ এগারো বছর লিয়েবেদেফ ইওরোপের এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়ান। ইংল্যান্ডেও বার দুয়েক যাওয়ার সুবাদে ইংরেজি ভাষাও তিনি শিখে ফেলেন। ইংল্যান্ড থেকেই লিয়েবেদেফ শেষ অবধি পাড়ি দেন ভারতের পথে। তাঁর জীবনধারা পাল্টে দেয় এই ঐতিহাসিক যাত্রা। ১৭৮৫-র ১২ ফেব্রুয়ারি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ ‘রডনি’ গ্রেভসেন্ড বন্দর থেকে রওনা হয় ভারত অভিমুখে। না, কোম্পানির কোনও চাকরি নিয়ে নয় বরং অনিশ্চয়তার ভেলায় ভেসে। তখনকার আমলে যে কেউ জাহাজে উঠে ভারতে চলে আসতে পারত না। কোম্পানির বিশেষ অনুমতিপত্র লাগত। লিয়েবেদেফের অন্যতম জীবনীকার হায়াৎ মামুদের মতে, তিনি প্রয়োজনীয় শংসাপত্র জোগাড় করেছিলেন তাঁর নিজের যোগ্যতায়। না হলে ‘রডনি’তে ওঠা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। মাদাগাস্কার ঘুরে ‘রডনি’ মাদ্রাজ বন্দরে এসে পৌঁছায় ২৭ জুলাই। ঠিক পরের দিন মাদ্রাজের টাউন মেজর উইলিয়াম সিডেনহ্যামের আমন্ত্রণে বন্দর থেকে মাদ্রাজ শহরে পদার্পণ করেন। শুরু হয় লিয়েবেদেফের জীবনে অন্যতম বর্ণময় অধ্যায়। [caption id="attachment_244308" align="aligncenter" width="600"] ১৭৯৪-এর জুন, কলকাতায় প্রবেশকারী ইওরোপীয় বাসিন্দাদের তালিকায় লিয়েবেদেফের নাম।[/caption] দু’বছর মাদ্রাজে ছিলেন লিয়েবেদেফ। তাঁর সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে সিডেনহ্যাম তাঁকে বার্ষিক দু’শ পাউন্ড মাইনেতে নিয়োগ করেন অনুষ্ঠান করার জন্য, যখন কোম্পানির অন্যান্য কর্মচারীদের বার্ষিক মাইনে ছিল ষাট থেকে সত্তর পাউন্ড। তবে মাদ্রাজে মন টেকেনি লিয়েবেদেফের। মন টেনেছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতা। তাই মাদ্রাজের জীবন ছেড়ে দু’বছর পর ১৭৮৭-র আগস্টে পৌঁছলেন কলকাতা। কলকাতার শালকেতে পৌঁছানোর বর্ণনা নিজেই দিয়েছেন লিয়েবেদেফ-- ‘In the space of fifteen days we arrived in the month of August, 1787, in the river (Ganges) Ganga; and on passing Fort William, the Captain gave a salute, and dropped anchor at Sulky, exactly opposite the town of Calcutta.’ তাঁর কলকাতায় পদার্পণের খবর ‘কলকাতা গেজেট’-এ প্রকাশিত হয় ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৭৮৭-তে-- ‘We are also happy to announce the arrival of a Gentleman in the Settlement, celebrated for his musical powers...’। নাম না থাকলেও ধরে নেওয়া যায় ইনিই লিয়েবেদেফ। [caption id="attachment_244305" align="aligncenter" width="410"] ২৭ নভেম্বর ১৭৯৫ লিয়েবেদেফের নাটকের প্রথম অভিনয়ের বিজ্ঞাপন।[/caption] কলকাতার জীবন সম্পর্কে কিছু জানা না গেলেও লিয়েবেদেফের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায় তখনকার ‘কলকাতা গেজেট’ থেকে। কলকাতায় পৌঁছানোর চার মাস পরে ১৭৮৭-র ২৪ ডিসেম্বর ‘দি ইন্ডিয়া গেজেট’-এ লিয়েবেদেফের সঙ্গীতানুষ্ঠানের এক বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। ২৮ ডিসেম্বর ওল্ড কোর্ট হাউসে আটটার সময় অনুষ্ঠেয় সেই কনসার্টের টিকিটের দাম ছিল ‘এক সোনার মোহর’। তখন লিয়েবেদেফ থাকতেন ৯ নং লালবাজার স্ট্রিটে। অনুষ্ঠানের তিনদিন পর গেজেটে এক নাতিদীর্ঘ আলোচনা বেরোয় অনুষ্ঠান সম্বন্ধে। আবার ‘কলকাতা গেজেট’-এ পরের বছরের ৩ জানুয়ারি একই অনুষ্ঠানের আলোচনা বেরোয়। দু’টি আলোচনাতেই লিয়েবেদেফের ভায়োলেঞ্চেলো বাজনার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছিল। প্রায় দশবছর কলকাতায় ছিলেন লিয়েবেদেফ। তার মধ্যে দু’বছর তাঁর কেটেছিল নাট্যসাধনা করে। পণ্ডিত গোলকনাথ দাশের কাছে শিখতে শুরু করলেন বাংলা এবং দেবভাষা। বাংলা ভাষা শিক্ষার শেষপর্যায়ে আত্মপ্রত্যয়ী লিয়েবেদেফ দুটো নাটক বাংলায় অনুবাদ করে ফেলেন-- ‘The Disguise’ (সংবদোল) এবং ‘Love is the best Doctor’ (ফরাসি থেকে সম্ভবত মঁলিয়ের দ্বারা অনূদিত)। তবে তাঁর অনূদিত নাটক যে মঞ্চস্থ হতেই পারে সে ব্যাপারে তাঁকে প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিলেন পণ্ডিত গোলকনাথ। ‘Golock nat Dash, my linguist made me a proposal that if I chose to represent this Play publicly he would engage to supply me with Native Actors of both Sexes, and I was exceedingly delighted with the idea.’ তাঁর অনূদিত নাটক ‘সংবদোল’ অর্থাৎ ‘সাজবদল’ (The Disguise) মঞ্চস্থ করার জন্য লিয়েবেদেফ ভাড়া নিতে চাইলেন তখনকার কোম্পানির থিয়েটার ‘নিউ প্লে হাউস’ বা ক্যালকাটা থিয়েটার। অনুমতি পাওয়ার পরিবর্তে পেলেন ব্যঙ্গ। দমলেন না লিয়েবেদেফ। মাসিক ষাট টাকায় ভাড়া নিলেন ২৫ নং ডোমটলা স্ট্রিটে (অধুনা এজরা স্ট্রিট সন্নিহিত) জগন্নাথ গাঙ্গুলীর বাড়ি ১৭৯৫-এর পয়লা জুন। জগন্নাথ গাঙ্গুলীর বাড়িতেই সম্ভবত খালি জমিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিন মাসে গড়ে তুললেন তাঁর সাধের দ্বিতল নাট্যশালা-- ‘Bengallie Theatre’। ‘আমি ছিলাম ইহার স্থপতি, একমাত্র অধিকর্তা, তথা কাঠাম-মিস্ত্রী, ছুতার, রাজমিস্ত্রী, যোগালিয়া ও অন্যান্যদের তদারককারী।’ বিজ্ঞাপনে তিনি বলেন, তাঁর থিয়েটার ছিল ‘decorated in the Bengali style’। অহীন্দ্র চৌধুরী তাই অনুমান করেছিলেন লিয়েবেদেফ হয়তো আলপনা, মঙ্গলঘট, কলাগাছ ইত্যাদি দিয়ে মঞ্চ সাজিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ইওরোপীয় প্রসেনিয়াম মঞ্চের আদলে তৈরি এই নাচঘরে বক্স ও পিট গ্যালারি ছিল। [caption id="attachment_244302" align="aligncenter" width="600"] ‘সংবদোল’-্এর সরকারি অনুমতিপত্র।[/caption] বাংলা নাটকের ইতিহাসে ১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর এক মাইলস্টোন বলা যেতে পারে। তিন অভিনেত্রী ও দশ অভিনেতাকে নিয়ে নিজস্ব মঞ্চে অভিনীত হল ‘সংবদোল’ নামক নাটকটির ‘একাঙ্ক রূপ’। এর কয়েকমাস পরে ১৭৯৬-এর একুশে মার্চ ‘সংবদোল’ নাটকটি তিন অঙ্কে এবং বাংলা, ইংরেজি ও ‘হিন্দুস্তানি’ ভাষায় মঞ্চস্থ হয়। ভারত ও কলকাতাকে লিয়েবেদেফ বিভিন্ন লেখাপত্রে স্বর্গের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই রুশ নাট্যকারের প্রথম বাংলা নাটক প্রযোজনাও অনেকদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ১. মঞ্চে অভিনেত্রীর ব্যবহার। তখন ক্যালকাটা থিয়েটারেও অভিনেত্রীদের প্রবেশ ঘটেনি। ২. ‘ইন্ডিয়ান সেরেনাড’ নামে এক সম্মিলিত সঙ্গীতের ব্যবহার। ৩. তখনকার জনপ্রিয় কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের কবিতায় সুরারোপ। তাছাড়া নট-নটীরা কোনও পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন না। লিয়েবেদেফ অক্লান্ত পরিশ্রমে তাঁদের যোগ্য করে তুলেছিলেন। উল্লেখ্য, নাটকটি তিনি আক্ষরিক অর্থে অনুবাদ করেননি। কুশীলবদের নাম পাল্টে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া দিয়েছিলেন। যেমন-- ডন অ্যান্টোনিও নাম দেন ভোলানাথ, বার্নার্ডোর নাম দেন রামসন্তোষ, বিয়াত্রিচের নাম ভাগ্যবতি, উরসুলাকে করেন রতনমণি ইত্যাদি। নাটকের দ্বিতীয় দিনে দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় খুশি হয়ে চব্বিশে মার্চ লিয়েবেদেফ ‘ক্যালকাটা গেজেটে’ বিজ্ঞাপন দিয়ে তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানান এবং তৃতীয় মঞ্চাভিনয়ের জন্য বিজ্ঞাপনও দেন। না, তাঁর স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হয়নি। ইংরেজদের বাণিজ্যিক চক্রান্তের শিকার হলেন লিয়েবেদেফ। সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয় তাঁর স্বপ্নের ‘নাচঘর’। ভস্মীভূত হয় তাঁর স্বপ্ন। বাংলা নাটকের যাত্রা সূচনালগ্নেই হোঁচট খায়। অষ্টাদশ শতকেই শুরু হয়েছিল ব্রিটেন ও রাশিয়ার ঠান্ডা লড়াই। হয়তো ইংরেজরা লিয়েবেদেফকে গুপ্তচর ভেবেছিলেন। না হলে বেঙ্গলি থিয়েটার কখনওই ক্যালকাটা থিয়েটারের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। একের পর এক মিথ্যে মামলায় লিয়েবেদেফকে জড়িয়ে দেওয়া হয়। কোথাও একজায়গায় থাকেননি তিনি। বার বার ঠিকানা বদল করতে হয়। আদ্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, রুচিবান মানুষটি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে কলকাতা ছাড়তে একপ্রকার বাধ্য হন। ১৭৯৭-এর ১০ ডিসেম্বর ‘লর্ড টার্লো’ জাহাজে উত্তমাশা হয়ে বিলেত যান। সেখান থেকে ১৮০১-এর কোনও একসময়ে রাশিয়া। [caption id="attachment_244294" align="aligncenter" width="447"] লিয়েবেদেফ রচিত ভারতীয় উপভাষার ব্যাকরণ বইয়ের পাতা।[/caption] চব্বিশ বছর পর যখন দেশে ফিরলেন তখন তিনি জ্ঞানে, অভিজ্ঞতায় এক ভিন্ন মানুষ। তাঁর মৃত্যুর প্রায় উনিশ বছর পর জানা যায় ভারত থেকে ফেরার পর যে পাণ্ডুলিপিগুলি লিয়েবেদেফের কাছে ছিল সেগুলি হল-- ১. সংস্কৃত অভিধান ‘অমরকোষ’। ২. সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘হিতোপদেশ’। ৩. হিন্দিতে রচিত ‘মধুমালতীজৈত প্রসঙ্গকথা’। ৪. নিজের হাতে লেখা চারটি পঞ্জিকা। আর কিছু বই। দেশে ফিরে তিনি সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন। বিয়ে করেন নাস্তাসিয়া ইয়াকফ লিয়েফনাকে। নিজস্ব ছাপাখানা তৈরি করে বই ছাপানো ও প্রাচ্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। প্রচুর খসড়া পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। যেমন-- ১. বাংলা-- রুশ শব্দকোষ (অসম্পূর্ণ)। ২. বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (অসম্পূর্ণ)। ৩. ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর কাব্য’র প্রথম অংশের রুশ অনুবাদ। ৪. আফ্রিকার দিনপঞ্জী। ৫. কলকাতায় ১৭৯৭-তে লেখা আত্মজীবনীমূলক লেখা। ৬. ভারতীয় পাটিগণিতের ওপর লেখা বই ইত্যাদি। [caption id="attachment_244311" align="aligncenter" width="389"] লিয়েবেদেফের অসমাপ্ত বাংলা-রুশ শব্দকোষের পাতা।[/caption] তবে ছাপাখানা তৈরির পর বেশিদিন তিনি বাঁচেননি। সব স্বপ্নপূরণ তাঁর কোনওদিনই হয়নি। ১৮১৭-র ১৫ জুলাই রাশিয়ায় প্রাণত্যাগ করেন গেরাসিম লিয়েবেদেফ। তাঁর স্ত্রী চতুষ্পদী ছন্দে তাঁর মৃত্যুর পর লিখেছিলেন-- ‘‘এই পুরুষ ত্রিভুবন ভ্রমিলেন বটে সকল লোকে সেই বারতা নিশ্চিতই রটে।। ভ্রমণ থাঁহার অবশ্যই ব্যর্থ কভু নয়। দূর সীমানায় যাত্রা তিনি করেন সুনিশ্চয়।। রুষিয়ার সন্তানের মধ্যে তিনিই প্রথম পূর্বভারত অভ্যন্তরে করেন পর্যটন।। হিন্দুস্তানী রীতিনীতির বিস্তারিত বয়ান। তাহাদের ভাষা আরো ভারতীয় জ্ঞান।। আহরণ সকল কিছু পরম মনের সুখে। সঙ্গে করি লৈয়া আসেন রুষিয়ার বুকে।।" নেভা নদীর তীরে এই চৈত্যলিপি নেই। যে লিয়েবেদেফ সুদূর ভোলগা নদীর দেশ থেকে এসে গঙ্গার তীরে বাংলা নাট্যচর্চার বীজবপন করেছিলেন প্রথম বাঙালি নাট্যকার হিসেবে, নাট্যমঞ্চ গড়ে তুলেছিলেন তাঁকেও বাঙালি ভুলে গিয়েছে। তাঁর মৃত্যুর দু’শ বছরও পেরিয়ে গেছে অনেকটাই নিঃশব্দে।
ঋণ: ১. গেরাসিম স্তেপানভিচ্ লিয়েবেদেফ্-- হায়াৎ মামুদ (ঢাকা, বাংলাদেশ)। ২. গেরাসিম লিয়েবেদেফ্-- হায়াৎ মামুদ (১৯৯৫)/ পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি। ৩. বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত-- ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। ৪. বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ।

```