
শেষ আপডেট: 2 April 2020 06:13
ফ্রান্সের আবিষ্কার করা ইপিওরনিস ম্যাক্সিমাস এর কঙ্কাল[/caption]
কিন্তু ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সি ডব্লিউ অ্যান্ড্রুজের আবিস্কার করা ইপিওরনিস টাইটান ( Aepyornis titan) নামের আরেকটি এলিফ্যান্ট বার্ড প্রজাতি নিয়ে লেগে যায় ফের তর্কবিতর্ক। কারণ ব্রিটিশরা এ বার দাবি করে তাদের পাওয়া ইপিওরনিস টাইটান বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাখি। কিন্তু ফ্রান্স সেই দাবীকে পাত্তাই দেয়নি। গোঁ ধরে বসে থাকে। তাদের মতে তাদের আবিষ্কার করা ইপিওরনিস ম্যাক্সিমাস হল পৃথিবীতে এ পর্যন্ত সৃষ্টি হওয়া সবচেয়ে বড় পাখি।
কিন্তু বছর দুয়েক আগে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা বুক ঠুকে জানিয়ে দিয়েছেন, বিজ্ঞানীদের মধ্যে চুলোচুলি লাগানো ধাঁধাঁটির সমাধান তাঁরা করে ফেলেছেন। তাঁরা জেনে ফেলেছেন কোনটি ছিল আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাখি। মাডাগাস্কার দ্বীপপুঞ্জের হারিয়ে যাওয়া ভরোম্বে ইপিওরনিস টাইটান প্রজাতির এলিফ্যান্ট বার্ডই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাখি। লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘রয়্যাল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স’ জার্নালের একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়েছিল, ম্যাডাগাস্কারের একটি দ্বীপের মাটির বহু নিচে পাওয়া ইপিওরনিস টাইটান প্রজাতির একটি জীবাশ্ম আগের সব চিন্তা ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।
[caption id="attachment_203381" align="aligncenter" width="460"]
ব্রিটিশদের আবিস্কার করা ইপিওরনিস টাইটানের ফসিল।[/caption]
ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণা পত্রে ইপিওরনিস টাইটান প্রজাতির একটি এলিফ্যান্ট বার্ডের জীবাশ্মের ছবি ও বিবরণ দিয়েছিলেন। বিবরণ অনুযায়ী পাখিটির ওজন ছিল ৮৬০ কেজি। যা একটি পূর্ণবয়স্ক জিরাফের ওজনের সমান। উচ্চতা ছিল প্রায় দশ ফুট। গবেষণাটি ‘ জুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন’ এর প্রধান বিজ্ঞানী জেমস হ্যান্সফোর্ডের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল।
এলিফ্যান্ট বার্ডের উল্লেখ আছে ১৮৯৫ সালে বিশ্বখ্যাত লেখক এইচ জি ওয়েলস–এর লেখা 'অ্যাপিওরনিস আইল্যান্ড‘ বইটিতেও। তবে তিনি কেবলই এলিফ্যান্ট বার্ডের কথা লিখেছিলেন। সেটি ইপিওরনিস ম্যাক্সিমাস না ইপিওরনিস টাইটান সে বিষয়ে আলোকপাত করে যাননি এইচ জি ওয়েলস। তবুও তাঁর উপন্যাস থেকে পাওয়া তথ্য বিজ্ঞানীদের গবেষণার পথে পাথেয় হয়ে উঠেছিল।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রায় ৬ কোটি বছর ধরে মাটিতেই দাপিয়ে বেড়িয়েছে এই এলিফ্যান্ট বার্ড 'ইপিওরনিস টাইটান'। উটপাখিরর মতোই তারা উড়তে পারতো না। বিশালকায় পাখিগুলির আদি বাসভূমি ছিল মাডাগাস্কার দ্বীপের সাভানা তৃণভূমি ও রেনফরেস্ট। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এদের ফসিল পাওয়া গেছে। তবে মাডাগাস্কার দ্বীপেই সবচেয়ে বেশি দিন টিকে ছিল পাখিগুলি। কিন্তু প্রায় হাজার বছর আগে দ্বীপটিতে মানুষের আবির্ভাব হলে পাখিগুলি চিরতরে নিশ্চিনহ হয়ে যায়। মাডাগাস্কার দ্বীপে জঙ্গল কেটে কৃষি জমি তৈরী করা ও খাদ্যের জন্য এলিফ্যান্ট বার্ডদের শিকার করার জন্যই পাখিগুলি পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে।
এলিফ্যান্ট বার্ডের নিকটতম আত্মীয় ছিল নিউজিল্যান্ডের মোয়া (moa) পাখি, তারাও এখন অবলুপ্ত। এ ছাড়াও কিউয়ি,এমু ও অস্ট্রিচ পাখিদের সঙ্গেও এই এলিফ্যান্ট বার্ডদের সম্পর্ক ছিল। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল, ব্রিটেনের সুপরিচিত নিলাম সংস্থা ক্রিস্টিস-এর লন্ডন দপ্তরে এলিফ্যান্ট বার্ডের একটি ডিমের জীবাশ্ম (ফসিল) নিলামে তোলা হয়েছিল। ডিমের ফসিলটি প্রায় এক ফুট লম্বা এবং প্রায় নয় ইঞ্চি চওড়া ছিলো। প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড মূল্যে সেটি বিক্রি হয়েছিল।
ব্রিটিশদের খুঁজে পাওয়া ইপিওরনিস টাইটানের জীবাশ্মটি ওজনে ও উচ্চতায়, ফ্রান্সের আবিষ্কার করা ইপিওরনিস ম্যাক্সিমাসকে হারিয়ে দিয়েছে। অথএব হাতেকলমে প্রমাণিত হল, এখনও পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাখি ইপিওরনিস ম্যাক্সিমাস নয়, ইপিওরনিস টাইটান। ফ্রান্সের বিজ্ঞানীরা খুব একটা কথা বলেননি এ বিষয়ে। তাঁদের মনোভাব হল "দিল্লি বহুত দূর"। তাঁরা বলেছিলেন, কে বলে পারে ইপিওরনিস টাইটানের চেয়ে বড় আকৃতির ইপিওরনিস ম্যাক্সিমাস-এর জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া যাবে না!
সেই আশায় বুক বেঁধে আছেন ফ্রান্সের বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এখন সে সব দেখছেন না ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা। চিরশত্রুকে হারানোর আনন্দে তাঁরা বুঁদ হয়ে আছেন। তবে এটা বলা যায়, প্রায় এক শতাব্দী ধরে চলে আসা মতযুদ্ধের ময়দানে আপাতত ইংল্যান্ড এক গোলে এগিয়ে।