
শেষ আপডেট: 15 September 2021 11:34
রূপাঞ্জন গোস্বামী
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশ। সেই প্রদেশেই হিন্দুকুশ পর্বতশ্রেণি। যাকে গ্রীকরা বলতেন ককেশাস ইণ্ডিকাস। সেই হিন্দুকুশ পর্বতশ্রেণীর দুর্গম একটি এলাকার মধ্যে দিয়ে উন্মত্ত গতিতে বয়ে চলেছে কুনার নদী। পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এই অঞ্চলটির নৈসর্গিক সৌন্দর্য এক অজানা রহস্যের মোড়কে আবৃত। বিশ্বের কাছে সেই রহস্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তুষারাবৃত হিন্দুকুশের ঘন সবুজ গালিচা মোড়া উপত্যকা দিয়ে পাহাড়ি ঝর্না ছুটে চলেছে আপন খেয়ালে। প্রাচীন ওয়াল নাট, অ্যাপ্রিকট, ওক,পাইন,ফার,উইলো গাছের ভিতর দিয়ে উপত্যকায় নেমে আসে শৃঙ্গ ছোঁয়া মেঘের দল। চারদিকে রঙবেরঙের পাহাড়ি ফুলের শোভা। এমনই এক স্বপ্নের পরিবেশে বাস করে স্বাধীনচেতা প্রাচীন শেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী। তাঁদের চুল সোনালী, চোখের মনির রঙ নীল। এই শেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মানুষদের সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। পাকিস্তানের আর কোনও গোষ্ঠীর মানুষদের সঙ্গে তাঁদের চেহারা, ধর্ম, সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থা ও খাদ্যাভাসের বিন্দুমাত্র মিল নেই। তাঁরা হলেন কালাশ। [caption id="attachment_54962" align="aligncenter" width="682"]
এই নয়নাভিরাম উপত্যকায় থাকেন কালাশরা,ডান দিকে কুনার নদী[/caption]
পাকিস্তানের চিত্রাল জেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি উপত্যকাগুলি হল বুম্বুরেট, রুম্বুর ও বিরির। এই তিনটি উপত্যকায় ছড়িয়ে আছেন কালাশরা। পাকিস্তান থেকে যখন শিখ, হিন্দু, খ্রিষ্টানদের বার করে দেওয়া হচ্ছে, তখন কালাশরা কী ভাবে লড়াই করে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছেন তা ভাবলেও আশ্চর্য হতে হয়। যদিও সংখ্যায় তাঁরা মাত্র ৪০০০।
যে তিনটি উপত্যকায় কালাশরা থাকেন, সেখানে সংঘর্ষের ছায়া পড়লেও পৌঁছতে পারেনি মৌলবাদ। এই মানুষরা পাকিস্তানের শাসন মানেন না। কারণ তাঁরা মনে করেন কালাশ উপজাতিরা গ্রীক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সৈন্যসামন্তের বংশধর। এঁরা লড়াকু জাতি। লড়াই করে বাঁচতে জানেন। তাঁরা জানেন মরলে লড়াই করেই মরতে হবে, কারওর অধীনে থেকে নয়।
[caption id="attachment_54998" align="aligncenter" width="702"]
কালাশ যুবতীরা[/caption]
কালাশ উপজাতির নেতারা[/caption]
কালাশদের ঘর বাড়ি[/caption]
কালাশ পুরুষরা পরেন উলের শার্ট,প্যান্ট, টুপি।মহিলারা পরেন এমব্রয়ডারি করা লম্বা কালো গাউনের মতো পোশাক। মহিলারা অনেকসময় মুখে ট্যাটু করেন। বাচ্চারা চুলে রঙচঙে পাথরের পুঁতি পরে। জীবনযাত্রার সব উপকরণ তাঁরা নিজেরাই বানিয়ে নেন। নিজেরাই পোশাক তৈরি করেন।
জীবনধারণের জন্য চাষ করেন। গ্রামে নারী-পুরুষের সমান অধিকার। এখানকার অনুষ্ঠানগুলির একটা বিশেষত্ব রয়েছে। পুরুষরা অনেক সময়েই মহিলাদের পোশাক পরে নাচেন, আর মহিলারা পরেন পুরুষদের পোশাক। পুরুষতন্ত্রের কোনও হুঙ্কার নেই। মহিলারা ঋতুমতী হলে বা সন্তান জন্মের সময় তাঁদের গ্রামের প্রান্তে বাশালেনি নামে একটা ঘরে থাকতে হয়।
[caption id="attachment_54966" align="aligncenter" width="640"]
কালাশদের জীবনযাত্রার সব কিছুতেই রঙের ছোঁয়া থাকে[/caption]
কালাশদের জীবনযাপন খুবই বৈচিত্র্যপূর্ণ। যখন কোনও ছেলে কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেয়, তাকে সারা গ্রীষ্মের জন্য ভেড়া নিয়ে উচুঁ পাহাড়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বেঁচে ফিরলে বাদুলাক উৎসব হয়। এই উৎসবে সে এক দিনের জন্য, গ্রামের যে কোনও বিবাহিত, অবিবাহিত ও কুমারী মেয়ের সঙ্গে থাকবে এবং সঙ্গম করবে বাধ্যতামূলক ভাবে। এর জন্য কেউ গর্ভবতী হলে সেটাকে আশীর্বাদ বলে মনে করবেন গ্রামের সবাই।
কালাশ নারীদের স্বামী নির্বাচনের স্বাধীনতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্বামী পরিবর্তন করার ক্ষমতাও। তবে আগের স্বামী যা দিয়েছেন, তাঁর দ্বিগুণ দ্বিতীয় স্বামীকে দিতে হবে। আগের স্বামী একটি গরু দিলে, দ্বিতীয় স্বামীকে দু'টি দিতে হবে। স্ত্রী ছিনতাইকে কালাশরা অপরাধ ভাবেন না।
এক গ্রামের কালাশ বধূকে 'ছিনতাই' করে নিয়ে যায় অন্য গ্রামের কালাশ পুরুষ( উভয়ের সম্মতিতেই)। একে ghōna dastūr বলা হয়। কালাশদের বিভিন্ন উৎসবে এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। অনেক সময় এই 'ছিনতাই'-এর ঘটনার কারণে গ্রামে গ্রামে লড়াই লেগে যায়।তখন দু'গ্রামের মাথারা মীমাংসা করে দেন। হেলেন অফ ট্রয়-এর ঘটনা এখানে আকছার।
[caption id="attachment_54969" align="aligncenter" width="702"]
কালাশ দেবতার কাঠের প্রতিমা মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে[/caption]
কালাশদের মূল ধর্মীয় উৎসব তিনটি। মে মাসে হয় চিলাম জোশি ,শরৎকালে উচাউ, মধ্য শীতে হয় সেরা উৎসব কাউমুস। পাকিস্তান ইসলামে দীক্ষিত হলেও, এই কালাশ মানুষরা তাঁদের পৌত্তলিকতার সংস্কৃতি মেনে এখনও মন্দিরে প্রাচীন দেবতার পুজো করেন। ঈশ্বরের আবাসকে এঁরা ডেভালক (দেবলোক ?)বলেন। তাঁদের সবচেয়ে বড় উৎসব 'কাউমুস' হয় একটি 'টক'(Tok) গাছকে ঘিরে হয়। গ্রামের সেই জায়গাটার নাম ইন্দ্রাণকোট (ইন্দ্রকোট ?)।
এই উৎসবে তাঁরা সারা গ্রামকে ঘিরে মানব শৃঙ্খল তৈরি করেন। মূল মন্দিরে হয় পুজো। পুরোহিতরা জুনিপার গাছের পাতা চামরের মতো ভক্তদের গায়ে বুলিয়ে দেন। দিনের শেষে গ্রামের মাঝখানে চারসো নামে একটি জায়গায় সবাই নাচগান, খাওয়া দাওয়া করেন। এই উৎসবে ছাগল উৎসর্গ করেন।
কালাশরা বিশ্বাস করেন, এই সময়ে তাঁদের সবচেয়ে শ্রদ্ধার দেবতা বালোমেন নাকি উপত্যকায় ঘুরে সকলের প্রার্থনা শোনেন। পাহাড়ে পাহাড়ে বড় আগুন ও মশাল জ্বালানো হয় তাই দেবতাকে শ্রদ্ধা জানাতে। তারপর তাঁরা বৃত্তাকারে আগুনের চারদিকে গান গাইতে গাইতে নাচেন। বাঁশি বাজিয়ে, হাততালি দিয়ে, পাইন কাঠ দিয়ে তৈরি wãc নামের ড্রাম বাজিয়ে জমে ওঠে নাচ।
[caption id="attachment_54972" align="aligncenter" width="736"]
মন্দিরের দরজা খোলার অপেক্ষায়[/caption]
কালাশ ধর্মের প্রধান দেবতা বালুমেন ছাড়াও আছেন বালুমেন-এর ভাই গরু বাছুরের দেবতা ইনডর (indr- ইন্দ্র ?) এবং সরিযান( surizan- সূর্য্য?) গসিদাই (gossidai) মুনজেম মালিক ( munjem malék),মাহানদিও (mahandéo), দেজাউ (ḍezáw) জেস্টাক (jyeṣṭhāk ), ডেজলিক (ḍizálik) নামের দেবতারা।
বালুমেনের রুদ্ররূপ হলেন দেবতা জেস্টান(Jeṣṭan), যিনি সারমেয় রূপ ধরে পৃথিবীতে আসেন। কালাশরা পাহাড়ে থাকা কাল্পনিক পরীদের পেরি ( Peri) বলেন, পেরিদের পুরুষ সঙ্গীদের বলেন ভারোতি ( Varōti)। পেরি আর ভারোতিরা উচুঁ পর্বত যেমন তিরিচ মীর-এ বাস করেন, শরতে নেমে আসেন উপত্যকায়।
সত্যিই কালাশরা গ্রীক বীর আলেকজান্ডারের সৈন্যদের বংশধর!
শিশুগুলির শরীরে বইছে গ্রীক রক্ত[/caption]
অতঃপর
আফগানিস্তানের নুরিস্তানে থাকা বিশাল সংখ্যক কালাশ জনগণ তালিবানি অত্যাচারে ধর্ম পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানি কালাশরা এখনও তাঁদের হাজার হাজার বছর ধরে আঁকড়ে রাখা ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে লড়ে যাচ্ছেন। কারণ তাঁরা জানেন সুদূর গ্রিস থেকে লড়তে লড়তে এখানে এসেছিলেন তাঁদেরই রক্তের আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ও তাঁর সঙ্গীরা। স্বাধীনচেতা লড়াকু গ্রিক রক্তের সম্মান তাই এখন ৪,০০০ কালাশের হাতে।