
শেষ আপডেট: 11 January 2021 08:58
অনেক মানুষের বাড়িতেই একটা করে ওষুধের বাক্স থাকে। দরকারে অদরকারে লাগতে পারে ভেবে কত ওষুধই যে জমা হয় সেখানে! তারপর অব্যবহার্য অবস্থাতেই একসময় পেরিয়ে যায় এক্সপায়ারি ডেট। কারও উপকারে লাগার আগেই ফেলে দিতে হয় সেসব ওষুধ। আবার উলটো ছবিও দেখা যায় পথে ঘাটে, হাসপাতালের করিডোরগুলোয়৷ ওষুধের দাম দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় কত মানুষের চিকিৎসা যে অসম্পূর্ণ থেকে যায় এ দেশে! সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধের ডোজ না মেলায় অসময়ে মারা যান কত মানুষ। একজনের ভাঁড়ারে জমে থাকা অব্যবহার্য কিছু ওষুধই হয়তো পারত আরেকটা জীবন বাঁচিয়ে দিতে।
একই সমাজের এই দুই পরস্পরবিরোধী ছবিই একদিন ভাবিয়ে তুলেছিল নয়ডার কৈলাশ হাসপাতালের ব্লাড-ব্যাংকে কর্মরত ওঁকারনাথ শর্মাকে। সেটা ২০০৮ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি৷ দিল্লির লক্সমিনগরের কাছে নির্মীয়মাণ মেট্রো স্টেশনের সামনের ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ে আচমকা। শ্রমিকেরা কাজ করছিল সেসময়। তাদের মধ্যে জনা দুই শ্রমিক মারা যায় ঘটনাস্থলেই। আহত হন অন্তত জনা ৫০। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া সেই গুরুতর আহত মানুষগুলোর পরিবারের লোকেদের ডাক্তারেরা ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন এই বলে যে, ওষুধ নেই, দোকান থেকে কিনে আনতে হবে।
বস্তুত ফার্স্ট-এড করে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া প্রায় আর কিছুই করে উঠতে পারছিলেন না সরকারি ডাক্তারেরা। সরকারি হাসপাতালের সেই রুগ্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মধ্যে দাঁড়িয়ে দিন আনি দিন খাই মানুষগুলোর অনেকেরই সাধ্য ছিল না দোকান থেকে দামি ওষুধ কিনে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার! সামান্য ওষুধের জন্য মানুষের সেই দুরবস্থা আর অসহায়তা দেখে সেদিন ভয়ঙ্কর কষ্ট পেয়েছিলেন ওঁকারনাথ জি'। আর ঠিক করে ফেলেছিলেন এত সহজে মরতে দেবেন না মানুষকে, তার জন্য বাকি জীবনটা দরকার হলে আর্তদের জন্য দরজায় দরজায় হাত পাতবেন।
দিল্লির প্রতিটি কমপ্লেক্সে ঘুরে ঘুরে শুরু হল অব্যবহৃত ওষুধ সংগ্রহের মহাযজ্ঞ। লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে জোগাড় হওয়া এইসব ওষুধ তারপর গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে শুরু করলেন তিনি। নিজের মুখেই বলেন, 'ভিক্ষে চাইতে লজ্জা কীসের! আমি হাত পাতলে যদি দুটো মানুষের প্রাণ বাঁচে, ক্ষতি কী!' দিল্লির অনেক বাড়িতেই অদরকারি ওষুধ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। তিনি মানুষের বাড়ি গিয়ে অনুরোধ করেন, ডাস্টবিনে না ফেলে বাড়তি ওষুধগুলো যেন তাঁকে দান করা হয়। সে ওষুধই হয়তো বাঁচিয়ে দেবে আরেকটা জীবন। এভাবে দিনের পর দিন গলি-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে ওষুধ ভিক্ষে করতে করতে বয়স বেড়েছে, তার পাশাপাশি কবে যেন নিজের পরিচয়টাই হারিয়ে ফেলেছেন এই বৃদ্ধ। হয়ে উঠেছেন সবার অতি-প্রিয় 'মেডিসিন বাবা'। তিনি বলেন 'ওষুধ নয়, আমি আসলে দোরে দোরে ঘুরে মানুষের জীবন ভিক্ষে করি'। এমন মানব জনম আর হবে না যে।
এখনও ভারতের গ্রামেগঞ্জে কত মানুষ আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ পান না। সরকারি হিসাবে সেই সংখ্যাটা মোট জনসংখ্যার ৪০% এর আশেপাশে। এমনকি সরকারি হাসপাতালেও জোটে না দরকারি দামি ওষুধ। বাইরের দোকান থেকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে জীবনদায়ী ওষুধ কেনার সামর্থ্য আর ক'জনের আছে? দেশের ভিতরের ছবিটা যখন এরকম, তারই মধ্যে প্রতি বছর ভারত থেকে বাইরের দেশ গুলিতে প্রায় ১.৬ লক্ষ কোটি টাকার ওষুধ রফতানি করা হয়। খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থানের মতো সঠিক চিকিৎসাও যে দেশের প্রতিটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে সেকথা ভুলতে বসেছে সরকার। গদি বদলায়, রঙ বদলায়, শুধু পরিবর্তন আসে না গরিবগুর্বো মানুষের জীবনে। সরকারী অবহেলার এই বদ্ধ গুমোট প্রেক্ষিতে খানিকটা হলেও দখিনা হাওয়া নিয়ে আসেন 'মেডিসিন বাবা'র মতো মানুষজনেরাই। দিন আনি দিন খাই মানুষগুলোর কাছে তাই 'মেডিসিন বাবা' সাক্ষাৎ দেবতা।
সাতসকালে বেড়িয়ে পড়েন 'মেডিসিন বাবা'...বেশ কিছ বছর আগে একটা দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। দুই পায়ের হাড়ই সরে যায়। তবু সেই পা নিয়েই দিল্লি, গুরগাঁও, ফরিদাবাদ কোথায় না যান তিনি! পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে হাঁক দেন, কারও কাছে 'বেকার দাওয়াই' থাকলে যেন দান করে 'মেডিসিন বাবা'কে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা এই তাঁর প্রতিদিনের রুটিন। কেউ কেউ ফিরিয়ে দেয়। কেউ ফেরায়ও না। এইভাবে চেয়েচিন্তে মাসে লক্ষাধিক টাকার ওষুধ জোগাড় হয়। সেসব ওষুধ মাসের শেষে বিনামূল্যে দাতব্য করেন গরীব দুঃখীদের মধ্যে। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে খবর নেন নিডি পেশেন্টদের। তারপর তাদের হাতে তুলে দেন কুড়িয়ে-বাড়িয়ে আনা বিনামূল্যের ওষুধ।
প্রথম প্রথম ব্যাপারটা এত সোজা ছিল না। ওষুধ চাইতে গেলে মানুষ সন্দেহ করত। মনে করত নির্ঘাৎ কোনও কুমতলব আছে! হয়তো চোরাই বাজারে ওষুধ বিক্রি করবেন ওঁকারনাথ! খারাপ কথা, অপমান, ব্যঙ্গ- হ্যাঁ, সেসবও জুটেছে। কিন্তু হার মানেননি 'মেডিসিন বাবা'।
তিনি জানতেন, কিছু মানুষ সমালোচনা করবেই। তিক্ত অভিজ্ঞতাও হবে। কিন্তু যে পথে তিনি পা বাড়িয়েছেন, সেখানে নেগেটিভিটির কোনও জায়গা নেই। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে বরাবর নিন্দা, ব্যঙ্গ, অপমানকে ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। আর দাঁড়িয়েছেন বলেই আজ দিল্লির মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করে 'মেডিসিন বাবা' হিসাবে।
তাঁকে নিয়ে একাধিক খবর হয়েছে নানান আন্তর্জাতিক আর সর্বভারতীয় মাধ্যমে। লেখালিখিও হয়েছে বিস্তর। ২০১৬ তে পেয়েছেন 'দিল্লি গৌরব' সম্মান। ২০১৭ সালে 'শূরবীর' সম্মান। কিন্তু সেসব নিয়ে মাথা ঘামান না 'মেডিসিন বাবা'। এ পথে আত্মসন্তুষ্টির জায়গা নেই যে৷ এখন তিনি নিজেই এক সচল ওষুধের দোকান, মানবতা আর দয়ার প্রতিমূর্তি। সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেও নিজের অসাধারণত্বে তিনি আজ সকলেরই বাবা, 'মেডিসিন বাবা'।