
শেষ আপডেট: 25 December 2020 14:02
কোম্পানির শাসনকাল থেকে ব্রিটিশ রাজশক্তির শাসন -২০০ বছরের পরাধীনতার ইতিহাসে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত কোলকাতাই ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। আর ব্রিটিশ শাসনের হাত ধরেই আরও অনেক কিছুর মতো এই কেক নামক খাবারটিও ঢুকে গেছে বাঙালির অন্দরমহলে। সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরী হিসেবে আজও এই শহরের বুকে সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে নাহুম’স, সালদানহা কিংবা আজমিরি বেকারির মতো সুপ্রাচীন কেকের দোকানগুলো৷ এখনও বড়দিনের আগে ক্রেতাদের ভিড় উপচে পড়ে সেখানে।
[caption id="attachment_290176" align="aligncenter" width="600"]
শতাব্দী প্রাচীন নাহুম, এখনও বড়দিনের আগে কেক কেনার লাইন পড়ে এই বেকারিতে[/caption]
শুনলে অবাক হবেন, কেক শব্দটার উৎপত্তি জড়িয়ে আছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ডাকাতদল ভাইকিংদের সঙ্গে। প্রাচীন নোরস শব্দ 'কাকা' থেকেই না কি এসেছে 'কেক' শব্দটি। সুইডিশ ভাষায় আবার 'কাকা' শব্দের অর্থ জমাট মিষ্টি। ১৩ শতকের মিডল ইংলিশ বেশ কিছু টেক্সটে এই 'কেক' শব্দটির আদি চেহারা এখনও ধরা আছে।
এ তো গেল নামের কথা। কিন্তু কেমন দেখতে ছিল সেই প্রাচীনকালের কেক? ইতিহাস বলছে, এখনকার কেকের থেকে স্বাদে আর চেহারায় অনেক আলাদা ছিল সেই প্রাচীন কেক। আজকের কেকের চারপাশে যে ক্রিমের আস্তরণ থাকে, সেসব বাহুল্য আগে একেবারেই ছিল না। মিষ্টির জন্য নানারকম মধুর ব্যবহার হত। মেশানো হত শুকনো ফল আর বাদাম জাতীয় জিনিসপত্রও।
একদম প্রথম দিককার চিজকেক তৈরির নিদর্শন পাওয়া গেছে প্রাচীন গ্রীস সভ্যতায়। অন্যদিকে রোমানরাই না কি নানারকম শুকনো ফল মিশিয়ে প্রথম ফ্রুটকেক তৈরি করার কৃতিত্বের দাবিদার। কেক নিয়ে ইউরোপীয়দের যতই উন্নাসিকতা থাকুক না কেন, আমাদের মতো বাদামি চামড়ার মানুষজনও তার কৃতিত্বের অনেকখানি দাবি করতেই পারি, কারণ খাবার বেক করার পদ্ধতি প্রথম আবিষ্কৃত হয় এই এশিয়া মহাদেশেরই এক প্রান্তে, প্রাচীন মিশরে।
[caption id="attachment_290188" align="aligncenter" width="600"]
মিশরের প্রাচীন ছবিতে সুপ্রাচীন বেকিং পদ্ধতি[/caption]
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যন্ত্রপাতির যত উন্নতি হয়েছে, এসেছে আধুনিক বেকারি, ততই কেক উৎপাদন বেড়েছে ইউরোপে। তাল মিলিয়ে বেড়েছে চাহিদাও। পুরোনো চেহারা ছেড়ে আরও আধুনিক সুন্দর ঝলমলে হয়ে উঠেছে সে। নিঁখুত গোলাকার আর তার উপরে আইসিংয়ের প্রলেপ আরও লোভনীয় আর অভিজাত করেছে কেকের চেহারা। একেবারে প্রথম দিকে চিনি গুঁড়ো করে, তার সঙ্গে ডিমের সাদা অংশ আর কিছু বিশেষ সুগন্ধী মিশিয়ে তৈরি হত কেক সাজানোর আইসিং। আর বেক করার আগে কেকের মিশ্রণের ভিতরে মিশিয়ে দেওয়া হল চেরিজাতীয় নানারকম শুকনো ফল আর লেবু বা সিট্রন।
এই কেকও আজকের কেকের তুলনায় সেকেলে। কেকের যে চেহারা আর স্বাদের সঙ্গে আমরা এখন পরিচিত , তা কিন্তু একেবারেই উনিশ শতকীয় কেক। ১৮৯২ এ ইলেক্ট্রনিক ওভেনের আবিষ্কার হয়। বেকিং পদ্ধতি সহজ হয়ে যাওয়ায় কেকের উৎপাদনেও চোখে পড়ার মতো বদল আসে এই উনিশ শতকে। যদিও কেকের মূল দুই উপাদান চিনি আর চকলেট, দুটিই মহার্ঘ হওয়ায় উনিশ শতকে কেককে বেশ দামি খাবার বা বড়লোকদের খাবার মনে করা হত। এই সময় থেকেই কেক তৈরিতে ধবধবে সাদা রিফাইন্ড ময়দা আর বেকিং পাউডারের ব্যবহার শুরু হয়। এই বেকিং পাউডার উনিশ শতকের এক গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। এর আগে কেক বেক করার জন্য মূলত ইস্ট ব্যবহার করা হত। সোজা কথায়, কেক তৈরির খাটনি অনেকটা কমিয়ে দিল এই একচুটকি ম্যাজিকাল বেকিং পাউডার।
[caption id="attachment_290198" align="aligncenter" width="600"]
প্রাচীন কেক[/caption]
কেক সাজাতেও পুরোনো চিনি ডিম গোলা ফুটিয়ে তৈরি আইসিংয়ের বদলে এল মাখন আর ক্রিম মেশানো নতুন অভিনব আইসিং। সব মিলিয়ে শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই একটু একটু করে পুরোনো ধুলো ঝেড়ে তার আধুনিক চেহারা গড়ে তুলছিল কেক, এক দেশের গণ্ডী ছাড়িয়ে সাম্রাজ্য বাড়াচ্ছিল অন্য দেশে- মহাদেশে।
শতাব্দী-প্রাচীন ইংলিশ ফ্রুটকেক[/caption]
আবার স্কটল্যান্ডে এই বড়দিনের সময় বিশেষ চল ছিল 'হুইস্কি ডান্ডি' ক্রিসমাস কেকের। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে, এই কেক তৈরিতে স্কচ হুইস্কির একটা বড় ভূমিকা ছিল। বেশ হালকা ঝুরঝুরে এই বিশেষ কেকে মেশানো হত চেরি, নানারকম কিশমিশ, এমনকি মিছরির মতো মোরব্বাও। বড়দিনে কেকের মতোই জনপ্রিয় ছিল আরও একটা খাবার, তার নাম 'ব্ল্যাক বান'। পাঁউরুটির মতো দেখতে এই বিশেষ খাবারটিও তৈরি করা হত কেকের উপাদান দিয়ে। আর এতেও মেশানো হত উৎকৃষ্টমানের স্কচ হুইস্কি। সঙ্গে থাকত বিশেষ উপাদান ক্যারাওয়ে বা শাহ জিরা।
[caption id="attachment_290191" align="aligncenter" width="545"]
ব্ল্যাক বান[/caption]
ক্যান্ডিড চেরি মেশানো গাঢ় বাদামি রঙের কেক ছাড়াও সবুজ রঙের কিছু বিশেষ কেক পাওয়া যেত এই ক্রিসমাসের মরশুমেই। তাদের নাম ছিল অ্যাঞ্জেলিকা। ইংল্যান্ডে যেরকম বড়দিনের কেকের সঙ্গে ' চকলেট লগ' নামে একধরণের কেক খাওয়ার চল ছিল, এখনও আছে। আবার ইতালি, অস্ট্রেলিয়া কিংবা লাতিন আমেরিকাতে এইসময় বেশ চলে 'প্যানেটোন' নামের টক-মিষ্টি ব্রেডকেক। প্রচুর পরিমানে কমলালেবু, সিট্রন, পাতিলেবুর পাল্প ও খোসা মেশানোর জন্যই একটা চনমনে টকস্বাদ থাকে এই কেকে। অন্যদিকে ইয়র্কশায়ারে বড়দিনের কেক মানেই ফ্রুটকেক। চিজ দিয়ে খাওয়া হয় এই বিশেষ মহার্ঘ কেক।
[caption id="attachment_290192" align="aligncenter" width="600"]
ইতালির ঐতিহ্যবাহী প্যানেটোন[/caption]
এ তো গেল ইউরোপের কথা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বড়দিনের সময় এই কেক-কালচার বেশ জনপ্রিয়। কানাডাতে ইউরোপীয় প্রাধান্যের জন্যই সম্ভবত বড়দিনে কেক নিয়ে বেশ হইচই হয়। তুলনায় কিছুটা হলেও অন্যরকম ছবি আমেরিকায়। সেখানেও বড়দিন উপলক্ষ্যে কেক-টেক উপহার দেওয়ার চল আছে ঠিকই, কিন্তু 'ক্রিসমাস কেক' বলে বিশেষ কিছু দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নেই। জার্মানিতে এই বড়দিনের সময় ফ্রুটকেকের মতোই শুকনো ফল মেশানো এক বিশেষ ধরণের বান বা পাঁউরুটি খাওয়ার চল আছে, এই রুটির নাম স্টোলেন। নানারকমের ড্রাইফ্রুট, মশলা, বাদাম মেশানো এই ব্রেডকেকের উপর গুঁড়ো গুঁড়ো বরফের মতো চিনির পাউডার ছড়ানো থাকে। সেটাই এর বিশেষত্ব।
[caption id="attachment_290193" align="aligncenter" width="600"]
্নানারকম শুকনো ফল, মশলা আর চিনির গুঁড়ো ছড়ানো স্টোলেন[/caption]
জাপানে আবার একেবারে ঐতিহ্য মেনে ক্রিসমাস কেক কাটা হয় বড়দিনে। স্ট্রবেরি আর ক্রিম দিয়ে সাজানো সাধারণ স্পঞ্জ কেকই, তবে তার উপর ছড়ানো থাকে বিশেষ ক্রিসমাস চকলেট আর কিশমিশ জাতীয় শুকনো ফল। শ্রীলঙ্কায় এই বড়দিনের সময়ে যে বিশেষ কেকগুলো তৈরি করা হয় চিনির বদলে ঝোলাগুড় আর ড্রাই ফ্রুটের আধিক্যের বদলে দারচিনি, গোলমরিচ আর জায়ফল মেশানো হয়। সেই মহার্ঘ মশলা কেক একবার খেলে ভোলা মুশকিল।
[caption id="attachment_290196" align="aligncenter" width="600"]
শ্রীলঙ্কার ঝোলাগুড় আর মশলার কেক[/caption]
দুশো বছরের শাসন মুছে স্বাধীনতা এলেও প্রাক্তন প্রভুদের অনুকরণে ক্রিসমাসে কেক কাটার প্রবণতা আমাদের দেশেও কম নয়। অসাধারণ স্বাদ-গন্ধের জন্য রাম বা ব্র্যান্ডি মেশানো এলাহাবাদি মশলা কেকের যেমন বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে এ দেশে, তেমনই গোলাপের গন্ধমাখা গোয়ানিজ কেক 'বাথ' বা 'বাথিকা'ও কম জনপ্রিয় নয়।
[caption id="attachment_290197" align="aligncenter" width="600"]
গোয়ান 'বাথ' কেক[/caption]
অন্যান্য উপাদানের পাশাপাশি সুজি আর নারকেলও দেওয়া হয় এই বিশেষ কেকে। আবার পণ্ডিচেরির 'ভিভিকাম' কেকে যেমন খাঁটি ঘি পড়বেই। নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের দেশে এভাবেই পাশ্চাত্য ঐতিহ্য আর পরম্পরা বদলে গেছে যিশুপুজোর ঐকান্তিকতায়।