
শেষ আপডেট: 1 August 2019 11:59
যদি হই চোর কাঁটা ওই শাড়ির ভাঁজে[/caption]
তাঁর নাম নির্মল ভট্টাচার্য্য। ধাত্রীগ্রামের সবাই যাঁকে চেনেন নির্মল ঠাকুর নামে। তৎকালীন বাংলায় সিনেমায় এমন নায়িকা ছিলেন না যিনি তাঁর শাড়ি পরেননি।
সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, সাবিত্রী, সুব্রতা থেকে শুরু করে হিন্দি ছবির হার্ট থ্রব শর্মিলা ঠাকুর, কিংবদন্তী নায়িকা বৈজয়ন্তীমালাও পর্দায় ও পর্দার বাইরে পরতেন নির্মল বাবুর শাড়ি।
যাঁর ধাক্কা-পাড়ের ধুতি পরে পর্দায় দেখা দিতেন মহানায়ক উত্তম কুমার, সৌমিত্র, কালী ব্যানার্জি, তরুণ কুমার, রঞ্জিত মল্লিক থেকে মুম্বাইয়ের গায়ক নায়ক বিশ্বজিৎও। তাঁর কাছ থেকে সিনেমার দৃশ্যে ব্যবহার করার জন্য শাড়ি কিনতেন সুখেন দাস থেকে সত্যজিৎ রায়।
[caption id="attachment_128607" align="aligncenter" width="716"]
নির্মল ভট্টাচার্য[/caption]
নিজের হাতে শাড়ি বুনতে গিয়ে দেখেছিলেন, এলাকায় শাড়ি বিক্রি করে দাম পাবেন না। দাম পেতে গেলে ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইলকে সর্বভারতীয় স্তরে জনপ্রিয় করতে হবে। তাই একদিন ১৭টি শাড়ি নিয়ে নির্মল বাবু পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়।
দিনের বেলা বাড়ি বাড়ি, অফিসে অফিসে ঘুরে শাড়ি বিক্রির চেষ্টা করতেন। রাতে ম্যাডক্স স্কোয়ারে শুয়ে থাকতেন ছাতু খেয়ে। তখন নকশাল আমল। অবিবাহিত পুরুষদের কেউ বাড়ি ভাড়া দিতেন না।
শ্যামবাজারের এক প্রেসে নির্মলবাবুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসের স্ত্রী লাবণ্যপ্রভার। বাবা মণীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় সূত্রে। লাবণ্যপ্রভা দেবী লেক টেরেসে যেখানে থাকতেন, সেই বাড়িতেই নির্মলবাবুর ভাড়া থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ভাড়াবাড়িতেই নির্মলবাবু তৈরি করেছিলেন তাঁর নিজের শো রুম 'উপহার'।
টাঙ্গাইল শাড়িতে দক্ষিণ ভারতের পাটলি-পাল্লু ডিজাইন আনার মূল কৃতিত্ব কিন্তু নির্মল বাবুর। এই শাড়িগুলির কুঁচি ও আঁচল ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের হত।
আরেকটি অসামান্য কৃতিত্ব আছে নির্মল বাবুর। তাঁতের শাড়ি যে একশো টাকার বেশি দামে বিক্রি করা যায়, পশ্চিমবঙ্গে তিনিই সেটা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইল শাড়িকে বিখ্যাত করে দিয়েছিলেন রুপালী পর্দায় এনে।
পুলিশকে বলেছিলেন, উত্তমকুমারের সর্বক্ষণের সঙ্গী বংশীকে একবার ডেকে দিতে। বংশী এসে বলেছিলেন কামরায় উঠতে দেবে না পুলিশ। নিজের কামরায় ফিরে এসেছিলেন নির্মল বাবু। কয়েক স্টেশন পরে আবার বংশীই এসে হাজির তাঁর কম্পার্টমেন্টে । উত্তম কুমার ডাকছেন। নির্মলকে দেখে উত্তম অবাক হয়ে বলেছিলেন,
-কিরে নির্মল, তুই এই ট্রেনে ?
-এ তো আমার রোজের কাহিনী দাদা।
-এত কষ্ট করিস তুই!
অবাক বিস্ময়ে নির্মল বাবুর দিকে তাকিয়েছিলেন মহানায়ক। পাশাপাশি বসে দুজনে ধাত্রীগ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিলেন। ধাত্রীগ্রাম স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগে নির্মল বাবু উত্তমকুমারকে অনুরোধ করেছিলেন, " দাদা একবার ধাত্রীগ্রামের মাটিতে পায়ের ধুলো দিন।" কথা রেখেছিলেন উত্তমকুমার। ধাত্রীগ্রাম স্টেশনে নেমে ছিলেন মহানায়ক, কয়েক মিনিটের জন্য।
বেঙ্গল হোম ইন্ড্রাস্ট্রিজে নির্মল বাবু গিয়েছিলেন শাড়ির গাঁট নিয়ে। সেখানকার ম্যানেজার তাঁর যাওয়ার খবর পেয়ে বলেছিলেন, "নির্মল, শাড়িগুলো নিয়ে ভেতরে এসো।" ম্যানেজার মহিলার ঘরের ভেতরে বসে আরেকজন মহিলা শাড়ি দেখছিলেন।
'নির্মল' নামটি শুনে বাঙলির হৃদয় তোলপাড় করা ভঙ্গিতে ঘাড় ঘুরিয়েছিলেন 'ম্যাডাম'। অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন "তুমি এখানে নির্মল?" মহানায়িকা সুচিত্রা সেন জেনে অবাক হয়েছিলেন, নির্মলের শাড়িগুলিই তিনি এখান থেকে বেছে এতদিন কিনে নিয়ে যেতেন।
[caption id="attachment_128616" align="aligncenter" width="702"]
'হাটেবাজারে' ছবির লোকেশনে বৈজয়ন্তীমালাকে শাড়ি দেখাচ্ছেন নির্মলবাবু। ছবিতে আছেন ডঃ বালিও[/caption]
বৈজয়ন্তীমালার ভগ্নিপতির বেলভেডিয়া রোডের বাড়িতেই দেখা হয়েছিল বলিউড ফিল্মের মহানায়িকা বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে। তিনি ও তাঁর স্বামী ডঃ বালি খুবই পছন্দ করতেন নির্মল বাবুকে। বৈজয়ন্তীমালা পছন্দ করতেন, গিলা ও কাঁকড়া বুটির টাঙ্গাইল শাড়ি। সে শাড়ি কোঠারি মিলের ২২০০ সানা, ১০০/২ কাউন্টের বিশেষ সুতো দিয়ে বোনা হত।
মুম্বাইতে বৈজয়ন্তীমালার বাড়িতে স্ত্রী সুচিত্রা ও শিশুপুত্র সুকান্তকে নিয়ে গিয়েছিলেন নির্মল বাবু। দিনটি ছিল পঁচিশে ডিসেম্বর। সবাইকে নিজের হাতে কেক খাইয়েছিলেন বৈজয়ন্তীমালা।
রাজ্য সরকারের তন্তুজ, তন্তুশ্রী এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বেঙ্গল হোম ইন্ডাস্ট্রিজ, মঞ্জুষা ইত্যাদি সংস্থায় ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইল শাড়ি বিক্রির নেপথ্যে ছিলেন এই মানুষটি। ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইল শাড়ি শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এই অক্লান্ত মানুষটির হাত ধরে।
নির্মলবাবুর সঙ্গে স্ত্রী সুচিত্রা ভট্টাচার্য[/caption]
রুপোলী পর্দার কত বিখ্যাত নায়ক নায়িকার সঙ্গে দেখা হয়েছে, কিন্তু একটার বেশি ছবি ধরে রাখতে পারেননি কেন? প্রশ্নটি শুনে ম্লান হেসেছিলেন নির্মল বাবু, বলেছিলেন, "আমার তখন ক্যামেরা ছিল না বা ছবি তোলার মানসিকতাও ছিলো না। আমার মূল লক্ষ্য ছিল ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইল শাড়ি জনপ্রিয় করা। কারণ আমার ওপর নির্ভর করেছিলেন ধাত্রীগ্রামের অনেক মানুষ ও তাঁদের পরিবার।"
উঠে আসার আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোনও আশা অপূর্ণ আছে নির্মল বাবু ?
আমার দিকে একবার তাকিয়ে খাট থেকে নেমে ক্রাচ নিয়ে আস্তে আস্তে জানলার কাছে গেলেন নির্মল ঠাকুর। জানলার গ্রিল ধরে অস্ফূটে বলেছিলেন, "আমার কিছুই চাই না, শুধু ওপারের টাঙ্গাইল বাঁচুক এপারেও।"
তারপর খোলা জানালাটার বাইরে চোখ মেলেছিলেন। বুঝতে পারছিলাম, ফিকে হয়ে যাওয়া স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠছিল বিচ্ছিন্ন শব্দের দল। উত্তম..সুচিত্রা... সুপ্রিয়া.. সাবিত্রী.. সৌমিত্র....বনপলাশের পদাবলী...মৌচাক... অমানুষ....অরণ্যের দিনরাত্রি....সত্যজিৎ..... গিলাবুটি...মুগা ডুরে...বাংলাদেশ... আরও কত। বুঝতে পারছিলাম নির্মল বাবুর চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। যেমন ঝাপসা হয়ে আসছিল জানলার বাইরেটাও, শ্রাবণের অঝোর ধারায়।