
শেষ আপডেট: 25 May 2019 12:19
ইয়ালুং- কাং ( কাঞ্চনজঙ্ঘা ওয়েস্ট )[/caption]
ছন্দা গায়েন[/caption]
ইয়ালুং কাং শৃঙ্গ ছোঁয়ার কিছু আগেই আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করে। ওঠে তুষারঝড়, ফেরার সিদ্ধান্ত নেন শেরপারা। ঠিক সেই মুহূর্তেই নামে বিশাল তুষারধস। যেটি এক লহমায় ছন্দা গায়েন ও দুই শেরপা, দার্জিলিংয়ের দাওয়া ওয়াংচুক ও নেপালের মিংমা তেম্বাকে নিয়ে নেমে যায় গভীর খাদে।
কিছুটা পিছনে থাকায় বেঁচে যান তাশি শেরপা। চিরতরে হারিয়ে যান ছন্দা, খুঁজে পাওয়া যায়নি তাঁর দেহ। অভিযানের নেশা! আরও একটা রেকর্ড! নাকি স্পনসরদের চাপ! কীসের টানে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ছুটেছিলেন ছন্দা, তা আজও জানা যায় নি।
[caption id="attachment_107565" align="aligncenter" width="768"]
ধৌলাগিরি[/caption]
রাজীব ভট্টাচার্য্য[/caption]
চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না রাজীব৷ এই অবস্থায় পাহাড় থেকে নামা মানে মৃত্যুকে ডেকে আনা। তবুও রাজীব হাতড়ে হাতড়ে নামার চেষ্টা করেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে যান বাঁচার। অক্সিজেন ফুরিয়ে আসে, অবসন্ন দেহে রাজীব এক সময় হাল ছেড়ে দেন। পড়ে থাকেন ধৌলাগিরি নির্জন তুষার সমুদ্রে। নির্মম মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। পরে উদ্ধারকারী দল ধৌলাগিরির ক্যাম্প-৩ থেকে কিছুটা ওপরে, প্রায় ৭৫০০ মিটার উচ্চতায় খুঁজে পান রাজীবের নিথর দেহ।
[caption id="attachment_107567" align="aligncenter" width="800"]
এভারেস্ট[/caption]
সুভাষ পাল[/caption]
এভারেস্টে আরোহণ ও অবরোহণ কালে, বিভিন্ন সময়ে একে একে চার পর্বতারোহীকেই বিপদে ফেলে চলে যান তাঁদের পাঁচ শেরপা। বিনা অক্সিজেনে নামতে শুরু করে উচ্চতাজনিত অসুস্থতার কবলে পড়েন পরেশ, গৌতম ও সুভাষ। এক সময় চলার শক্তি হারিয়ে সুভাষ পাল রয়ে যান জেনিভা স্পার এলাকায়। গৌতম ঘোষ নিজেকে অ্যাঙ্কর করে রয়ে যান ব্যালকনির কাছে ট্রায়াঙ্গুলার ফেস এলাকায়। ২১ মে রাতেই সম্ভবত মারা যান গৌতম ঘোষ। পরেশ নাথ সাউথ কলের কিছুটা ওপরে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে থাকেন। বহু অভিযাত্রী তাঁর পাশ দিয়ে ওঠা নামা করলেও কেউ সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসেননি।
২২ মে, সকালে আইএমজি দলের পর্বতারোহীরা সুভাষ পাল নামিয়ে আনেন সাউথ কলে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবী ছাড়েন সুভাষ। ২২ মে'তেই অবিশ্বাস্য ভাবে জীবিত কিন্তু মৃতপ্রায় পরেশকে এনসিসি টিম নামিয়ে আনেন সাউথ কলে। বিনা খাদ্যে, বিনা চিকিৎসায়, বিনা অক্সিজেনে ২৩ ঘন্টা বরফে পড়ে থাকা পরেশ আর লড়তে পারেননি। ২৩ মে সকালে মারা যান পরেশ। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে সুনীতা বেঁচে যান লেসলি জন বিনস নামে এক পর্বতারোহীর সহায়তায়।
[caption id="attachment_107521" align="aligncenter" width="494"]
গৌতম ঘোষ ও পরেশ নাথ[/caption]
বাংলার পর্বতপ্রেমী মানুষের মনে তীব্র অভিঘাত ফেলে এই তিনটি মৃত্যু। এবং এই দুর্ঘটনার পরে বিস্ময়কর ভাবেই দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় বাংলার পর্বতপ্রেমী মহল। অনেকে মনে করেছিলেন এই তিন সুদক্ষ পর্বতারোহীর মৃত্যু নিশ্চিত ভাবেই এড়ানো যেত। অন্য পক্ষের যুক্তি ছিল আট হাজার মিটারের শৃঙ্গ আরোহণের জন্যে তৈরি ছিলেন না মৃত তিন আরোহী।
পর্বতপ্রেমীদের প্রিয় মানুষগুলির মৃত্যু নিয়ে এক নির্মম এবং অসহনীয় পরিবেশ, জন্ম দিয়েছিল এক আন্দোলনের। যা আজও স্তিমিত হয়নি। তিনটি মৃত্যুর কারণ সন্ধানের এই আন্দোলন যুক্তি সঙ্গত বলে মনে করেন বাংলার বহু মানুষ। কারণ তিনটি মৃত্যু সংক্রান্ত ও অভিযান সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। সেই সব প্রশ্ন বরং রীতিমত সন্দেহের উদ্রেক করেছিল নেপাল সরকার, এজেন্সি ও বাংলার বেশ কিছু পর্বতারোহীর উদাসীনতা ও ভূমিকা ও কার্যকলাপ সম্পর্কে।
[caption id="attachment_107562" align="aligncenter" width="702"]
কাঞ্চনজঙ্ঘা[/caption]
বিপ্লব বৈদ্য ও কুন্তল কাঁড়ার[/caption]
অন্য দিকে সফল ভাবে শৃঙ্গ আরোহণ করে ফেরার পথে হাইপোথারমিয়া ও ফ্রস্ট বাইটে (তুষারক্ষত) আক্রান্ত হন বিপ্লব বৈদ্য। শৃঙ্গ আরোহণ করে নামার পথে কুন্তল ও বিপ্লবকে পড়ে থাকতে দেখে ক্যাম্প-৪ এ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেন ‘প্রজেক্ট পসিবল’ টিম লিডার ও বিখ্যাত স্পিড-ক্লাইম্বার নির্মল পূর্জা। তাঁকে সাহায্য করেন তাঁর সঙ্গী মিংমা ডেভিড শেরপা ও গেসমান তামাং।
বিপ্লব ও কুন্তল, দু’জনেরই বোতলের অক্সিজেন ফুরিয়ে গেছিল। নির্মল পূর্জা তাঁর কাছে থাকা অতিরিক্ত অক্সিজেন দুজনকে দিয়ে দিয়েছিলেন। প্রত্যেক ১৫-২০ মিনিট অন্তর, নির্মল পূর্জা রেডিও মারফত অক্সিজেন ও সাহায্য চেয়েছিলেন ক্যাম্প-৪ এ থাকা কুন্তলদের এজেন্সির ব্যাক-আপ টিমের কাছে। কিন্তু সে সাহায্য আর আসেনি।
এরপর হঠাৎই ‘প্রজেক্ট পসিবল’ টিমের সদস্যদের অক্সিজেনের অভাবে অসুস্থতা দেখা দেয়। গেসমান তামাং আর মিংমা ডেভিড শেরপা নীচে নেমে যান। এই সময় মারা যান কুন্তল কাঁড়ার। তবুও হাল ছাড়েন না নির্মল পূর্জা। তিনি আর দাওয়া শেরপা দু'জন মিলে বিপ্লব বৈদ্যকে নিচে নামাতে থাকেন। কিন্তু এক সময় মারা যান বিপ্লব বৈদ্যও। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ক্যাম্প-২ থেকে হেলি-রেস্কিউ করা হয় পালপোনারি ইডিমা ও স্নো ব্লাইন্ডনেসে আক্রান্ত রমেশ রায় ও ফ্রস্ট বাইটে গুরুতর আক্রান্ত রুদ্র প্রসাদ হালদারকে।
[caption id="attachment_107572" align="aligncenter" width="768"]
মাকালু[/caption]
দীপঙ্কর ঘোষ[/caption]
আবহাওয়া একটু ভাল হলে সবাই ক্যাম্প-৪ ফিরে এলেও, দীপঙ্কর ফেরেননি। তিনি কোনও তুষারধসে পড়েছিলেন বলে অনুমান করেছিলেন সকলে। ১৭ তারিখ সকালে দলের শেরপা ও বাকি সদস্যরা দীপঙ্কর ঘোষের খোঁজ করতে থাকেন। কিন্তু তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর ক্যাম্প-২ থেকে শানু শেরপাকে এজেন্সি পাঠায় দীপঙ্কর ঘোষকে খোঁজার জন্য। শানু শেরপা ক্যাম্প-৩ থেকে অক্সিজেন নিয়ে ক্যাম্প-৪ পৌঁছন। সেখানে তিনি বহু খুঁজেও দীপঙ্কর ঘোষের হদিস পাননি।
এরপর আবহাওয়া ভাল হলে,পাঠানো হয় হেলিকপ্টার। ক্যাম্প-৪ এর ওপরে সাদা বরফের মধ্যে একটি কালো স্পট দেখতে পায় কপ্টার। উদ্ধারকারী দলের অনুমান, ওই কালো স্পটটিই হয়ত দীপঙ্কর! তাই সাত শেরপার একটি অভিজ্ঞ দলকে ২১ মে স্পটে পাঠানো হয় এজেন্সির তরফে। সাত শেরপার উদ্ধারকারী দল ২২ মে মাকালুর ক্যাম্প-৪ এর কাছ থেকে উদ্ধার করে দীপঙ্কর ঘোষের নিথর দেহ।
প্রতি পদে মৃত্যুর,ফাঁদ, তবুও আকর্ষণ যে দূর্নিবার[/caption]
বাধ্য হন নিম্নমানের খাবার, ইকুইপমেন্ট ও শেরপা নিতে। ফলে হিমালয়ের অধিক উচ্চতায় আরোহণের সময় বিপদে পড়েন। আবার, খরচ কমিয়ে সামিট করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে শেরপাদের কথা শোনেন না পর্বতারোহীরা। কখনও কখনও সেটাও চরম বিপদ ডেকে আনে।
●নেপালের বিভিন্ন এজেন্সির বাংলার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরেরা তো বটেই, এমনকি অভিযান থেকে বরাত জোরে বেঁচে ফিরে আসা বাংলার পর্বতারোহীরা ভুলেও মুখ খোলেন না, নেপালের এজেন্সিদের বিরুদ্ধে। তাহলে নেপালে ঢোকা বন্ধ করে দেবে এজেন্সির মাফিয়ারা। তাদের ক্ষমতা অসীম। ২০১৬ এভারেস্ট দূর্ঘটনার অন্যতম সাক্ষী বীরবাহাদুর গুরুঙ্গকে বিশ্বের মিডিয়া তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও, আজ তিন বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছে তারা। কারণ সে সামনে এলেই নেপালের পর্যটন দপ্তর এবং নেপালের এজেন্সিগুলির মুখোশ খুলে পড়বে।
ঠিক যেমন বাংলার বেশ কিছু বিখ্যাত পর্বতারোহীরা মুখ খোলেন না পুরুলিয়া জেলার বেড়ো পাহাড় কেটে পাথর বের করে নেওয়ার ব্যাবসায়িক চক্রান্ত রুখতে। প্রয়োজন মনে করেন না পাহাড় বাঁচানোর আন্দোলনে যাঁরা নেমেছেন তাঁদের পাশে এসে দাঁড়াবার। বরং সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে নিজেদের রেকর্ডকে আরও উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যান। নিজেদের নিরাপদে রেখে পরিবেশ ও পাহাড়কে বিপদে ফেলেন। চেষ্টা করেন বাংলার পর্বতপ্রেমীদের মধ্যে বিভেদ জিইয়ে রাখতে।
তাইতো এই দশক এতগুলি মৃত্যু দেখলেও, কারও সময় হয়না সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে বসে মর্মান্তিক সমস্যাটার সমাধান খোঁজার। সুতরাং, ছন্দা গায়েন থেকে দীপঙ্কর ঘোষ, নেপালে বাংলার পর্বতারোহীদের মৃত্যু মিছিল চলছে। চলবে আগামী দিনেও।