
শেষ আপডেট: 21 December 2018 10:01
গোল গাছের বৈশিষ্ট্য
দুই বাংলায় একসময় বহুল পরিচিত এই গোল গাছের ইংরেজি নাম Nypa palm এবং বৈজ্ঞানিক নাম fruticans (family-palmae)। গাছটির কান্ড খুব ছোট,তবুও গাছটি উচ্চতায় ১৫ থেকে ২০ ফুটের বেশি হয়। এর ফুল হলুদ এবং লাল রঙের। ফুল থেকে বীজ (গাবনা) হয়ে পাকার পর সেটি তালশাঁসের মতো কেটে খাওয়া যায়। খেতে খুবই সুস্বাদু। এই গোল গাছ সাধারণত লবণাক্ত পলি মাটিতে ভালো জন্মায়। নোনাজলে জন্ম, তাই গোল গাছের সর্বাঙ্গ নোনা। কিন্তু গোল গাছের ডগা (ডাণ্ডি) থেকে বেরিয়ে আসে সুমিষ্ট রস। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় মিঠা। যাকে আমরা বলি গুড়। গোটা বাংলাদেশে সুস্বাদু এই গোল গুড়-এর চাহিদা প্রচুর।
কোথায় হয় গোলগাছ
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবন-সহ উপকূলবর্তী বিভিন্ন স্থানে গোলগাছ দেখতে পাওয়া যায়। উপকূলবর্তী এলাকার গোল গাছের বনগুলি প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো। তবে উপকূলবর্তী বরগুনার আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা, ভোলা এলাকা, পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া, কুয়াকাটা, রাঙ্গাবালি, গলাচিপা, দশমিনা, বাউফল এলাকা ও খুলনা জেলার বিস্তীর্ণ নদীর চরে গোল চাষীদের গোল বাগান আছে। গোল বাগানকে এঁরা বলেন বহর। গোলগাছের চাষ অত্যন্ত লাভজনক এবং সহজসাধ্য। এই চাষে চাষীর খরচ পড়ে নগণ্য। গোল চাষে ব্যয়ের চেয়ে চাষীর আয় অনেকগুণ বেশি হয়। এর বড় কারণ এই চাষে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। এতে কোনও পরিচর্যা করতে হয় না। গোলগাছের বীজ (গাবনা) সংরক্ষণ করে তা নোনা জমিতে পুঁতে দিলেই চারা গজায়। একটি গোল ছড়ায় একশ থেকে দেড়শটি বীজ থাকে। মানে একটা ছড়া থেকে দেড়শো গোল গাছ জন্ম নেয়। অনেক গোল চাষী গোলবাগান বর্গা নিয়ে চাষ করেন।
গোল গাছের রস ও গুড়ের প্রস্তুতির উপাখ্যান
আষাঢ় মাসে গোল গাছের ডাণ্ডিতে, গাবনা (বীজ) ফল হয়। পৌষ মাসে ফল-সহ ডাণ্ডিটিকে নুইয়ে মাটি চাপা দিয়ে দেওয়া হয়। অঘ্রাণ মাসে গোল চাষীরা ডাণ্ডিটি পা দিয়ে চেপে চেপে ( দোয়ানো) ডান্ডির মধ্যে রসের পরিমাণ বাড়াতে থাকেন। দোয়ানো চলে ১৫ দিন। তারপর ডান্ডির ডগা থেকে গাবনা ফলের থোকা ধারালো দা দিয়ে এক কোপে কেটে ফেলা হয়। ডান্ডির ডগার কাটা অংশ তিন দিন শুকিয়ে নেওয়া হয়। পরের ১৫ দিন, রোজ দু’বেলা ডান্ডির ডগা পাতলা করে চেঁছে ফেলা হয়। তারপর রোজ বিকেলে ডান্ডির মাথার অংশ চেঁছে সেখানে একটি কলসী ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
প্রতিদিন খুব ভোরে রস সংগ্রহ করা হয়। প্রতি বছর পৌষ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত গোল চাষীরা রস সংগ্রহ করেন। গোল গাছের প্রতিটি ডাণ্ডি থেকে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত রস পাওয়া যায়। একটা গোল গাছে ৭-৮টি ডান্ডি থাকে। প্রতিটি গোল গাছ গড়ে ৪ কলসি রস দেয়। এভাবে ১০০টি গোল গাছের বাগান থেকে পাওয়া রস দিয়ে প্রতিদিন ১১-১২ কেজি গুড় তৈরি করা হয়। বাড়ির উঠানে শুরু হয় সংগৃহীত রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির কাজ।
গোল গুড় বা মিঠা বিক্রি
গোল গুড় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন গোল চাষীরা। প্রতিকেজি গোল গুড় বাজারে ৮০-১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়। বেশীরভাগ গোল চাষী এভাবে সাড়ে তিন মাসের সিজনে, গুড় বিক্রি করে লাখ খানেক টাকার বেশী আয় করেন। গোলপাতা বিক্রি করে এঁদের আরো ২০ হাজার টাকা আয় হয়। আগে বাজারে গিয়ে গুড় বিক্রি করতে হতো, এখন ফড়েরা বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। ন্যায্য দামেই। গোল গাছের তিন-চার ফুট লম্বা পাতা ঘরের ছাউনির কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই প্রতি ১০০ ছাউনির গোলপাতা বিক্রি করা হয় ৬০০ টাকা দরে। গোলবাগানের মরে যাওয়া মুথা (ডাঁটা) জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই মুথা দিয়েই গোল চাষীদের সংসারে রান্নার কাজ চলে, পুরো বছর।
গোল গুড়ের স্বাদ ও ঔষধি মূল্য
স্বাদে ও গন্ধে গোল গুড় অতুলনীয়। স্বাদের দিক থেকে নলেন গুড়ের চেয়ে কিছুটা পার্থক্য আছে গোল গুড়ের। অভিজ্ঞরা সেটা সহজেই বুঝতে পারেন। গোলের রসের গুড়ের তৈরি পাটালি, মিষ্টি, পিঠে ও পায়েস খুব সুস্বাদু। এই রস গরম লুচি, রুটি দিয়ে বা মুড়ি দিয়ে খেতে খুব ভালো লাগে। কবিরাজরা বলেন, গোল গাছের মিষ্টি রস খেলে কৃমি নাশ হয়। ডিহাইড্রেশন দূর করে গোল রস, অসুস্থ্য শরীরে দ্রুত শক্তি আনে।
বাংলাদেশের বনবিভাগ পরীক্ষামূলকভাবে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী বিভিন্ন স্থানে গোলগাছের বীজ রোপন করেছে। এতে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। কারণ গোল গাছ শুধু রস বা গুড়ই দেয় না,গাছগুলি উপকূলবর্তী এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে। আমাদের দেশে সে প্রচেষ্টা এখনও আঁধারে। বাংলাতেও সরকারি উদ্যোগে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন নদীর তীর ও খালের চরে গোলগাছের বাগান তৈরি করা হলে, এ পার বাংলার সুন্দরবনের মানুষের জীবন আর একটু সুন্দর হত বলাই বাহূল্য।