
শেষ আপডেট: 10 September 2021 09:57
বান্দারবানের অপরূপ নিসর্গ[/caption]
মুরং জনগোষ্ঠীর ছেলে মেনলে। মুরং একটি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী। মুরং উপজাতিরা, ম্রু ও ম্রো নামেও পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর বাস। তোইন, মঙ্গু, তৈনফা, লুলোইং, উত্তরহানগড়, দক্ষিণ হানগড়, তঙ্কাবতী, হরিণঝুড়ি, টেকের পানছড়ি, রেনিখ্যং, পানতলা, থানখ্যং, সোয়ালক, তিনডো, সিংপা, আলীখং এবং ভারিয়াতালি অঞ্চলে এই জনগোষ্ঠীর মানুষরা থাকেন।
বাদ্যযন্ত্র নিয়েমুরং উপজাতির পুরুষ [/caption]
মেনলের জীবনে আশার আলো এল ১৯৮১ সাল। তার বয়স তখন ১৫ বছর। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়নে তৈরি হলো 'ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়'। মেনলে স্কুলে পড়ার জন্য ছুটে গেলেও স্কুল তাকে নিল না। কারণ, প্রাথমিক স্তরে পড়ার বয়স তার আর নেই। স্কুলের সামনেই অনশন শুরু করল নাছোড়বান্দা মেনলে। প্রধান শিক্ষক টি এন মং, মেনলের জেদের কাছে হার মানলেন। স্কুলে ভর্তি হলো সে।
মুরং পরিবার[/caption]
গ্রামে ফিরে ক্রমশ পাল্টে যেতে শুরু করেছিল মেনলে। তার মনে হচ্ছিল, এ পৃথিবী তার নিজের পৃথিবী । মুরং উপজাতি তার নিজের জাতি। কিন্তু তারা কতো পিছিয়ে আছে। কারও কোনও চিন্তা নেই। না আছে শিক্ষা, না আছে ধর্ম, না আছে ধর্মগ্রন্থ, না আছে উপাসনা গৃহ। ১৯৮৫ সালে মেনলে একার চেষ্টায় আবিস্কার করে ফেললেন ম্রো বর্ণমালা।
তার বর্ণমালায় ছিল ৩১টি বর্ণ। যুবক মেনলে সারা দিন গুহায়, বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতো। নিজের মনে বিড়বিড় করতো। পাহাড়ি গুল্মের রস দিয়ে রঙ তৈরি করে ছবি আঁকতো যেখানে সেখানে। ১৯৮৬ সালের ৫ এপ্রিল। পাঁচ হাজার গ্রামবাসীর সামনে মেনলে প্রকাশ করল তার আবিস্কৃত 'ক্রামা' বা 'ম্রো' বর্ণমালা।
সেই দিনই মেনলে মুরং উপজাতিদের উপহার দিল এক নতুন ধর্ম । ধর্মের নামও 'ক্রামা'। সে দিন হাজার হাজার গ্রামবাসী মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিলেন মেনলে ম্রো-এর 'ক্রামা' ধর্মের নীতিকথা। মুরং উপজাতির হাজার হাজার নরনারী, সেই বৃষ্টিভেজা দিনে চিৎকার করে কেঁদেছিল আর বলেছিল , ‘মেনলে তুমি মানুষ নও। তুমি হলে আমাদের ঈশ্বর 'ক্রামাদি'। তুমি স্বর্গের দেবদূত। তুমি সৃষ্টি করেছে বর্ণমালা। তাই তুমি ঈশ্বর-পুত্র। ’
[caption id="attachment_46871" align="aligncenter" width="945"]
মুরং নববর্ষ উৎসব[/caption]
ক্রামাদি মেনলে ম্রো-এর একমাত্র ছবি[/caption]
সবই হচ্ছে, শুধু তিনিই নেই। কেউ জানে না তিনি কোথায়। আদৌ জীবিত আছেন কি না। কিন্তু তাঁর তো পৃথিবী ছাড়ার বয়স হয়নি, তাঁর বয়েস এখন মাত্র বাহান্ন। তাই মুরং উপজাতি এখনও তাঁর পথ চেয়ে আছে। তাঁরা মনে করেন, একদিন সাদা ঘোড়ায় চেপে পূর্ব দিক থেকে ফিরে আসবেন তাঁদের ঈশ্বর 'ক্রামাদি' । রোজ সকালে পূর্বদিকে তাকিয়ে 'ক্রামা' ধর্মের উপাসকরা বলেন, ‘আমাদের জন্য সুসংবাদ নিয়ে ওই যে তিনি আসছেন। ’
বিশ্বের ৯৯.৯৯ শতাংশ মানুষ ক্রামাদি মেনলে ম্রো-এর নামই শোনেননি। কিন্তু সারা বিশ্বে তিনি ছাড়া আর একটি মানুষ নেই, যিনি একটি জাতিকে একই সঙ্গে ধর্ম এবং বর্ণমালা উপহার দিয়েছেন। তাই তো তাঁকে ভোলেননি মুরং উপজাতিরা, ভোলেননি 'ক্রামা' ধর্মের অনুগামীরা। ভোলেনি হাজার হাজার স্কুলপড়ুয়া মুরং শিশু। তবুও মনে প্রশ্ন জাগে, আশৈশবের প্রিয় গ্রাম আর প্রিয় মানুষদের ছেড়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে কেন হারিয়ে গেলেন মেনলে ! বান্দরবানের আকাশে পুবের সূর্য উল্টে আমাকেই জিজ্ঞেস করে, ভগবান বুদ্ধ আর ভগবান শ্রী চৈতন্য কীসের টানে ঘর ছেড়েছিলেন?