
সঞ্জীব সান্যাল এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী - দ্য ওয়াল ফাইল।
শেষ আপডেট: 28 March 2024 20:12
তিনি প্রধানমন্ত্রীর দফতরের আর্থিক উপদেষ্টা। কলকাতায় বড় হওয়া, সেন্ট জেভিয়ার্স ও পরে দিল্লির শ্রীরাম কলেজ অফ কমার্সে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করা সঞ্জীব সান্যাল এই মুহূর্তে অর্থনীতির পাশাপাশি জনপরিসরেও বুদ্ধিজীবী হিসেবে বেশ পরিচিত মুখ। তবে অর্থনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাপারে, বিশেষত ভারতীয় ইতিহাস নিয়ে তাঁর নানা মন্তব্যে মাঝেমধ্যে বিতর্ক হয়। এবার এক সাক্ষাৎকারে বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর কিছু মন্তব্যে নতুন করে অসন্তোষ জানাতে শুরু করেছেন নেটনাগরিকরা।
সাক্ষাৎকারে সঞ্জীব সান্যাল বাঙালির উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব ও আড্ডার সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করেন। বলেন, 'একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল আকাঙ্ক্ষার বা চাহিদার দারিদ্র্য। যদি তোমার সমাজ ভাবে, জীবনের সর্বোচ্চ পর্যায় হল সংগঠনের (ইউনিয়নের) নেতা হওয়া বা আড্ডার বুদ্ধিজীবী বা কলকাতায় যাকে বলে 'আঁতেল', সেরকম কেউ হওয়া, তাহলে তো আর কিছু করার নেই। তুমি যদি ভাবো, তুমি নিজে কিছু করার চাইতে সারাদিন পানীয় বা ধূমপান করতে করতে পৃথিবীর যাবতীয় ঘটনা নিয়ে নিজের বক্তব্য রাখবে; বা যেমন মৃণাল সেনের ছবিতে দেখানো হয়, সেটাই যদি সমাজের চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা হয়, তাহলে তুমি তো সেটাই পাবে। তাহলে আর অভিযোগ করা কেন?'
This is Sanjeev Sanyal, Economic Advisor of the PMO. I was quite shocked and aghast to see the kind of tirade of condescension he has passed on to portray Bengal's society at large. The implied sense here is the society is steeped in debauchery and alcoholism.
— Snehasis Mukhopadhyay (@SnehasisMukhop4) March 27, 2024
1/ pic.twitter.com/6ZWUG13nIa
সঞ্জীববাবু মৃণাল সেনের কোন ছবির কথা বলতে চেয়েছেন তা অবশ্য খোলসা করেননি। কিন্তু বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী, ভগৎ সিংহের সহযোগী শচীন্দ্রনাথ সান্যালের পরিবারের উত্তরসূরি, পরে 'রোডস স্কলার' হিসেবে অক্সফোর্ডের তুখোড় ছাত্র সঞ্জীব সান্যালের মন্তব্যে বেশ চটেছেন নেটনাগরিকরা। একজন লিখেছেন, 'শেষে নিজের মতামত জানানোর জন্য মৃণাল সেনকেও টেনে নামাতে হল? এত ক্ষোভ কীসের?' আর একজন লিখেছেন, 'বাঙালি কি আদৌ এর প্রতিবাদ করবে?' একজন মনে করিয়ে দিয়েছেন, 'এই যে উনি পডকাস্টে বসে এত কিছু বলছেন, এটাই তো একটা আড্ডা! স্রেফ ক্যামেরার সামনে, এই যা ফারাক!' কেউ কেউ অবশ্য পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, 'ঠিকই তো বলেছেন, তেঁতো সত্যি মানতে সমস্যা কোথায়?'
সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্ত বিষয়টি শুনে বললেন, 'কে কোথায় কী বলেছেন, আমি সরাসরি শুনিনি। বাঙালি তো শুধু বাংলা বা দেশের নয়, সারা বিশ্বের গর্ব। বাঙালি যেমন মাছে-ভাতে সুখে থাকতে চায়, তেমনই অন্যের দুঃখ ভাগ করে নিতে চায়। বাঙালি শুধু আমোদে-প্রমোদে ঢালিয়া দিনু প্রাণ নয়। নবজাগরণের সময় বাঙালি মনীষীরা কুৎসিত নানা সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সে তো মানব সভ্যতার গর্ব। আমি নিজে বাঙালি হিসেবে গর্ববোধ করি। মৃণাল সেন চলচ্চিত্রে যে বিদ্রোহ, বিপ্লব, প্রতিবাদের কথা বলেছেন, ঋত্বিক ঘটক যে উদ্বাস্তু সমস্যার কথা বলেছেন, তা আমাদের মর্ম কাঁপিয়ে দিতে পেরেছে। প্রেম, ভালবাসা, আনন্দের কথাও বহু পরিচালক বলেছেন। ফলে এই নিয়ে আলোচনা নিরর্থক। আমি বরং বলব, আমরা বাঙালি হিসেবে যেন চেষ্টা করি, সেই উত্তরাধিকার যেন আমরা বহন করতে পারি।'
বিশিষ্ট অভিনেতা ও নাট্যকর্মী কৌশিক সেন আবার আমল দিতেই চাইলেন না। ফোনে দ্য ওয়ালকে বললেন, 'আমার মনে হয় উনি যা বলেছেন আপনারা সেটাই ভাল করে প্রকাশ করুন। এরপরে আর বাড়তি কথা বলারই কোনও দরকার পড়বে না। তাহলে বিষয়টি আরও গুলিয়ে যাবে। বোঝাই যাচ্ছে উনি বিশেষ কিছু রাজনৈতিক 'অ্যাজেন্ডা' থেকে বলেছেন, সেটা যে কতটা অন্তঃসারশূন্য, সেটা আমার মনে হয় স্রেফ ওঁর মন্তব্যটুকু পড়লেই বোঝা যাবে। এর বেশি আমার আর কিছু বলার নেই, সব বিষয়েই যে মন্তব্য করতে হবে, এমন কোনও মানেও হয় না।'
সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় যদিও একেবারে কথাটাকে উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নন। 'দেখুন, উনি যে খুব একটা ভুল বলেছেন তা তো নয়। বাঙালিদের মধ্যে একটা আলসেমি, আড্ডা-প্রবণতা এবং মুখেই মারিতং জগৎ দৃষ্টিভঙ্গি তো আছেই। সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এখন হয়ত জীবনসংগ্রামের তীব্রতায় সেটা খানিক কমেছে। স্টার্ট-আপের মত অনেক নতুন পথও অনেকে নিচ্ছেন। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা হয়ত সত্যিই কম। তবে হ্যাঁ, সবটা ঠিক বলেননি, একটু বাড়াবাড়ি করেছেন বটে। বিশেষ করে মৃণাল সেনের ছবি উনি কতটা দেখেছেন জানা নেই। মৃণাল সেনের সব ছবি তো ওরকম নয়। ফলে খানিকটা তো ভুল রয়েছেই', দ্য ওয়ালকে জানালেন প্রবীণ এই সাহিত্যিক।
অভিনেতা ও বিজেপি নেতা রুদ্রনীল ঘোষ আবার সঞ্জীব সান্যালের পাশে দাঁড়িয়ে সব দায় বাম ও তৃণমূল সরকারের ওপর চাপিয়েছেন। দ্য ওয়ালকে ফোনে জানালেন, 'তিনি শিক্ষিত-সচেতন মানুষ, বাংলার বাইরে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গে বিগত কয়েক দশকে যেভাবে সমাজকে পরিচালনা করা হয়েছে, তাতে একপ্রকার নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল তুলে রাখা হয়েছে। বামপন্থীরা সেটা একরকমভাবে করতেন। তৃণমূল আসার পাঁচ বছর পরে আবার অন্যরকম একটা রাজনৈতিক চশমা পরিয়ে রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এই দুটো সরকারের জন্যই আমাদের জীবনে যে প্রাপ্তি বা সন্তুষ্টিগুলো রয়েছে, তারও একটা পরিবর্তন হয়েছে। দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের বাম ঘরানায় যে লেফট ইকোসিস্টেম তাঁরা তৈরি করেছিলেন, তাতে বলা হত, যে কোনও বিষয়ে প্রতিবাদ করতে হবে। কেউ যদি সচ্ছ্বলভাবে জীবনযাপন করেন, তাহলে বামেরা বলতেন, সচ্ছ্বল হওয়াটা অন্যায়, বরং তার গায়ের জামা খুলে অন্যদের পরিয়ে দিতে হবে। এমনিতে সামাজিক সমতা বা বিন্যাসের কথা তো ভারতের সংবিধানেই রয়েছে। কিন্তু অকারণে যে কোনও বিষয়ে তর্ক করার এই অভ্যেস আর্থসামাজিক দিক দিয়ে একটা জাতিকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছে। তারপর, এই শেষ আট বছর ধরে লাগাতার তৃণমূল সরকার দেখিয়েছে, জীবন-জীবিকার প্রয়োজন নেই, সিন্ডিকেট বা চুরি-জোচ্চুরি করো। ছেলেমেয়েরা রাস্তায় বসে রয়েছে, বয়স্ক নেতার বান্ধবীর খাটের তলা থেকে কোটি কোটি টাকা বেরোচ্ছে। ফলত, এই দুটো সত্যিকে অস্বীকার করার সত্যিই কোনও উপায় নেই।' বললেন রুদ্রনীল।
সঙ্গে যোগ করেন, 'এই যে কথাগুলো উনি (সঞ্জীববাবু) বলছেন, উনি কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গিয়ে বলছেন। হতেই পারে যে, মৃণাল সেনের পর উনি হয়ত কারোর ছবি দেখার অবকাশ পাননি। আমার মনে হয় উনিও বাম ইকোসিস্টেমেরই ফসল। ফলে যে মতামত উনি দিচ্ছেন, সেটা পশ্চিমবঙ্গকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে উনি যে অবস্থায় দেখেছেন, তারই প্রতিফলন। দেখুন, বাম সরকার তো আমাদের একভাবে দেখতে শিখিয়েছিল। আমরা সমর্থক থাকি বা না থাকি, আমরাও ওইভাবেই দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। ফলে এখন উনি যে সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন, সেটা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বেরিয়ে একটা সুস্থির জীবনে থেকে বলতে পারছেন।' যদিও ঘটনা হচ্ছে, সঞ্জীববাবুর উচ্চশিক্ষার সবটাই দিল্লি ও অক্সফোর্ডে।
ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (ইউপিএসসি) শীর্ষ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা নিয়ে সঞ্জীববাবুর মন্তব্যে বিস্তর আপত্তি উঠেছে। তিনি বলেছেন, 'লক্ষ লক্ষ তরতাজা তরুণ ছেলেমেয়ে সাত-আট বছর ধরে একই পরীক্ষার প্রস্ততি চালিয়ে যাচ্ছে, অথচ বেশিরভাগই সফল হচ্ছে না, এটা একটা সম্পূর্ণ শ্রমের অপচয়। যদি তুমি সত্যিই প্রশাসক হতে চাও, তাহলে প্রস্তুতি নাও। না হলে ইউপিএসসির জন্য সময় নষ্ট করার মানে হয় না।' যা নিয়ে বেশ আপত্তি জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত আমলারা। সঞ্জীববাবু অবশ্য বলেছেন, 'সবটাই হল ঝুঁকি নিতে চাওয়া। যদি তুমি আরামে থাকতে চাও, নিজের 'কমফোর্ট জোন'-এর বাইরে যেতে না চাও, অসুবিধে নেই। কিন্তু এই বয়সেই তো ঝুঁকি নিতে হবে। নইলে বৃহত্তর দুনিয়াকে জানবে কীভাবে?'