
শেষ আপডেট: 7 June 2020 18:30
ভারত মহাসাগরের উপকূল বরাবর ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্টি জাঞ্জিবার। তানজানিয়া থেকে দূরত্ব ৩৬ কিলোমিটারের মতো। মূল দ্বীপ চারটি উনগুজা বা স্থানীয় ভাষায় আনগুজা, পেম্বা, লাথাম ও মাফিয়া দ্বীপ। উনগুজার চারদিকে আরও কিছু ছোট দ্বীপ জড়াজড়ি করে রয়েছে। বাওয়ে আইল্যান্ড, চাঙ্গু, চাপওয়ানি, দালোনি, মিউই পোপো ইত্যাদি।
উনগুজায় সমুদ্র আর পাহাড়ের মিলন হয়েছে। পর্যটকরা পাহাড়ি দ্বীপও বলে থাকেন। জাঞ্জিবারের দক্ষিণ ভাগ জুড়েই রয়েছে উনগুজা। তার একপাশে পেম্বা দ্বীপ, অন্যপাশে তানজানিয়ার মূল ভূখণ্ড। মাঝে একফালি জাঞ্জিবার চ্যানেল যেন বিভেদ তৈরি করে দিয়েছে।
জাঞ্জিবার দ্বীপপুঞ্জে গেলে উনগুজা ঘুরেই নজর টানে পেম্বার দিকে। এই পেম্বা দ্বীপের বৈশিষ্ট্য অনেক। পেম্বা হল নিসর্গ প্রকৃতি আর ইতিহাসের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। পর্যটকদের কাছে ‘গ্রিন আইল্যান্ড’ । উনগুজা থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তরে গেলেই পেম্বা। তানজানিয়ার মূল ভূখণ্ডে থেকে ৫০ কিলোমিটার পূর্বে পেম্বা চ্যানেল বরাবর এই দ্বীপ। উনগুজা নুড়ি-পাথুড়ে হলেও পেম্বা অনেক বেশি সবুজ। এখানে লবঙ্গের চাষ বেশি। ফসলের ফলনও ভাল। সিফুডের জন্যও নাম আছে পেম্বার।
জাঞ্জিবার আর্কিপেলাগোর যে জায়গাটা বিশেষভাবে পর্যটন মানচিত্রে উঠে এসেছে সেটা হল ‘স্টোন টাউন’ । উনগুজার পশ্চিম উপকূল বরাবর এই শহরে স্থাপত্য ও ইতিহাসের মেলবন্ধন। ২০০০ সালে ইউনেস্কো এই শহরকে ‘ওয়ার্লড হেরিটেজ সাইট’-এর তকমা দিয়েছে। পূর্ব আফ্রিকায় এই স্টোন সিটির বিশেষ গুরুত্ব আছে। আফ্রিকার সোয়াহিলি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে এখানে। একই সঙ্গে আরব, পার্সি, ভারতীয় ও ইউরোপীয় সভ্যতা ও ঐতিহ্যের মিলমিশ ঘটেছে সেই প্রাচীন কাল থেকেই। নানা ভাষা ও নানা সংস্কৃতির মানুষ রয়েছেন এখানে।
জাঞ্জিবারের ইতিহাসও বড় বিচিত্র। ১৯৬৪ সালে টাঙ্গানিকা ও জাঞ্জিবার মিলে গিয়ে তানজানিয়া তৈরি হয়। উত্তরে কেনিয়া ও উগান্ডা, পূর্বে ভারত মহাসাগর, দক্ষিণে মোজাম্বিক, মালাউই, জাম্বিয়া এবং পশ্চিমে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা। ১৫০৩ বা ১৫০৪ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ শাসনের শুরু হয় জাঞ্জিবারে। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পর্তুগিজদের অধীনস্থ ছিল জাঞ্জিবার। ১৬৯৮-এ ওমানদের অধীনে আসে জাঞ্জিবার। ১৯৬৪ সালে আরবীয় শাসক গোষ্ঠীর পরিবর্তন ঘটে। জাঞ্জিবার শব্দটা এসেছে দুই আরবীয় শব্দের মিশেলে। ‘জাঞ্জ’ মানে কালো এবং ‘বার’ মানে উপকূল। জাঞ্জিবারকে “কৃষ্ণাঙ্গদের ভূখন্ড” বা “দ্য ল্যান্ড অফ দ্য ব্ল্যাক” নামেও অভিহিত করা হয়।
জাঞ্জিবারের আরও একটা দ্বীপে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। সেটা হল মাফিয়া আইল্যান্ড। এই দ্বীপটি স্কুবাডাইভারদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। মাফিয়া আর্কিপেলাগো জাঞ্জিবারের একটি বড় দ্বীপ। অনেকগুলো ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। মূল শহর কিলিনদোনি। পর্যটকদের থাকার লজ সেখানেই। এই দ্বীপের ঐতিহাসিক গুরুত্বও আছে। ইতিহাস বলে মাফিয়া আইল্যান্ড হয়েই পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্যিক আদানপ্রদান চলত। ১৯৯৫ সালে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড এই দ্বীপেই মেরিন পার্ক তৈরির জন্য আর্থিক অনুদান দেয়। তানজানিয়ার প্রথম মেরিন পার্ক এখানেই তৈরি হয়।
জাঞ্জিবারের আরও অনেক দ্বীপ রয়েছে। হাতে সময় নিয়ে এলে সবকটি ছোট দ্বীপই ঘুরে দেখা যায়। বিশেষত প্রবাল দ্বীপের সৌন্দর্য অসাধারণ। বালুকাময় সৈকত, উপকূলীয় প্রবাল-প্রাচীর এবং একই সঙ্গে ইতিহাসের স্বাদ চাখতে হলে জাঞ্জিবার দ্বীপপুঞ্জে বারে বারেই আসতে হবে।