দ্য ওয়াল ব্যুরো: নধরকান্তি চেহারা কমাতে কতই না পরিশ্রম। জিমে গিয়ে ঘণ্টাখানেক ঘাম ঝরাও, না হলে বেশ কড়া রকমের একটা ডায়েট চার্ট রুটিনের মতো নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রাখো। জিমে যেতে আলসেমি হলে, বাড়িতেই যোগব্যায়াম-প্রাণায়াম ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এত দৌড়োদৌড়ি, হাঁপাহাঁপির পরে মেদ তো কমল, কিন্তু গেল কোথায়? ছুরি-কাঁচি চালিয়ে তো আর টেনে-হিঁচড়ে তাদের বের করে দেওয়া হয়নি, তাহলে এতদিনের বাস উঠিয়ে তাদের কী গতি হল? পেট-কোমরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি তো হল, কিন্তু সত্যিই ছেড়ে গেল কি?
না, মেদ হল ভাল বন্ধু। ছেড়ে যায় না। শুধু বাড়াবাড়ি হলেই তারা বেঁকে বসে। না হলে শরীরের উপকারেই লাগে। শক্তি জোগায়, পুষ্টি জোগায়। অতিরিক্ত মেদ বর্জ্যের সঙ্গেও বেরিয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বডি ফ্যাটের আসল কাজ কী। শরীর ঠিক কোন কোন কাজে লাগে।
যত্ন করে জমিয়ে রাখে কোষ, বাইরে বোঝা যায় না
শরীরকে দিনরাত খাটিয়ে কয়েক কিলোগ্রাম ওজন কমল। চকচকে ভুঁড়ির জায়গায় নির্মেদ হিলহিলে কোমর। থপথপে চর্বির উপর যেন বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার প্রশ্ন হল, এই বাড়তি মেদ পালিশ করে স্লিম-ট্রিম চেহারা তো হল, কিন্তু মেদগুলো কোথায় গেল? শরীরের সব জায়গায়ই টানটান, বাড়তি মেদের চিহ্ন নেই। উবে গেল নাকি?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত মেদ শরীর যত্ন করে জমিয়ে রাখে কয়েকটা জায়গায়। বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় না। কিছুটা জমা থাকে অ্যাডিপোজ কোষে। সেখানে তাদের নতুন রূপ হয় ট্রাইগ্লিসারাইড। এই মেদ ক্ষতিকর নয়, শরীরে এনার্জির জোগান দেয়। বাকিটা ভাগাভাগি করে লিভার ও পেশীতে গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা থাকে। এই গ্লাইকোজেনও শরীরে শক্তির চাহিদা মেটায়।
শক্তি দেয়, পুষ্টি দেয়, মেদের কী কম কাজ!
এবার প্রশ্ন আসতে পারে, কোন শক্তির কথা বলা হচ্ছে?
প্রথমত, আমরা যখন বিশ্রাম করি শরীর তো আর থেমে থাকে না। তার কাজ অনেক। হৃদপিণ্ডকে চালানো, ফুসফুসকে সচল রাখা, সারা শরীরে রক্ত পৌঁছে দেওয়া। সেই সঙ্গে আবার মস্তিষ্ককেও সজাগ রাখা। ব্রেন ঘুমিয়ে পড়লে গোটা শরীরই অকেজো হয়ে যাবে। তাই স্নায়ুদের চনমনে রাখাও জরুরি। এই সব কাজ সামলাতে সাহায্য করে মেদ। বাড়তি ফ্যাট যা শরীর জমিয়ে রাখে তাকেই নাড়াঘাঁটা করে শক্তি তৈরি হয়। এই শক্তিতেই রক্ত সঞ্চালন হয়, ধুকপুক করে হার্ট, চিন্তার হাওয়া খেলে মস্তিষ্কে।
দ্বিতীয়ত, আমরা যখন জেগে থাকি, কাজকর্ম করি তখন যে বিপুল পরিমাণ এনার্জির দরকার হয় সেটা আসে বডি ফ্যাট থেকেই। হাঁটাহাঁটি, দৌড়োদৌড়ির জন্য একটু বেশি চার্জ দিতে হয় শরীরকে। তার জোগান দেয় এই মেদ।
তৃতীয়ত, খাবার হজম করাও একটা বড় ব্যাপার। এতবড় খাদ্যনালীর দায়িত্ব সামলানো তো কম কথা নয়। খাবার পাকস্থলীতে যাবে, সেখানে তাকে নিংড়ে পুষ্টিরস বের হবে তারপর সেই পুষ্টি থেকে শক্তি তৈরি হবে, ছিবড়েগুলো আবার বর্জ্য হয়ে শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। এতবড় কর্মকাণ্ডের জন্য শক্তিও দরকার হয় অনেকটাই। সেটাও আসে ওই মেদ থেকেই।
ফ্যাট হজম
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুষ্টিকর খাবার খেলে তার থেকে যে ফ্যাট আসে সেটা শরীর হজম করে নেয়। বাকিটা বের করে দেয়। এখন এখানে দু’রকম ব্যাপার হয়। যদি কম খেয়ে ডায়েট করা হয় তাহলেই মুশকিল। অনেকেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না মেনে খুব কম খেয়ে রোগা হওয়ার চেষ্টা করেন। তাতে হিতে বিপরীত হয়। কারণ এনার্জির জন্য শরীরের দরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ ফ্যাট, সেটা না পেলে শরীর মেদ জমাতে শুরু করে। তাই দেখা যায় শরীরের যতটা ক্যালোরি দরকার তার থেকে কম পেলে বেশি মেদ জমতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একবারে ভারী খাবার না খেয়ে দিনে ছোট ছোট ৬টি মিল খেতে। তাহলেই ক্যালোরির পরিমাণে ভারসাম্য থাকে। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা বা খুব কম খাওয়ার কারণে বেশি ফ্যাট জমা হয় শরীরে।
এবার আসা যাক ডায়েটে। পুষ্টিকর খাবার থেকে ফ্যাট শুষে নিয়ে এনার্জি তৈরি করে শরীর। ভাল ফ্যাট হজম হয়ে যায়, বাকিটা টেনে নেয় ত্বক ও কিডনি। এই অতিরিক্ত মেদ গলে গিয়ে ঘাম হয়ে বের হয়ে যায় শরীর থেকে। আবার প্রস্রাবের সঙ্গেও এই মেদ বের করে দেয় কিডনি।
লিভারেরও ভূমিকা আছে। বাড়তি মেদ পুড়ে কার্বন-ডাই অক্সাইড হয়ে বেরিয়ে যায় শ্বাসের সঙ্গে।
শরীরকে খাটালেই পুড়বে মেদ
শরীরকে যত খাটানো যাবে ততই জ্বলেপুড়ে যাবে মেদ। বিশষজ্ঞরা বলছেন, দিনে আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা কার্ডিও এক্সারসাইজ করলে পেট, কোমর, তলপেট, হিপের মেদ পুড়তে শুরু করে। দিনে ২-৩ বার কার্ডিও করলেই মেদের দফারফা শুরু হয়। এক্সারসাইজই খারাপ ফ্যাটকে ভাল ফ্যাটে বদলে দিতে পারে। পেট-কোমরে শক্ত হয়ে জমে বসা মেদকে গলিয়ে পেশীতে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে এই মেদ শক্তি তৈরি করে। শরীরও টানটান হয় আবার হজমশক্তি, রক্ত সঞ্চালনও বাড়ে। অতিরিক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড বেরিয়ে যায়। ফলে শরীর টক্সিন-মুক্ত হতে থাকে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেদ ঝরানো ভাল কিন্তু ভারসাম্য রেখে। ঠিকমতো ডায়েট ও নিয়ম মেনে শরীরচর্চা দরকার। একবারে অনেকটা ফ্যাট-বার্ন করলে শরীরের ক্ষতি হয় বেশি। ক্যালোরির অভাব হয়, যার থেকে অপুষ্টি ও নানা রোগ বাসা বাঁধে। মহিলাদের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, স্বাভাবিক ঋতুস্রাবে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেই সঙ্গে মাথাব্যথা, ঝিমুনি, রক্তচাপের ওঠানামা, সবদিক দিয়েই নাজেহাল হতে পারে শরীর।