
শেষ আপডেট: 6 September 2019 14:08
জন্মের সময় কানে মধু দিলে নাকি লোকে মিষ্টি কথা শোনে। কিন্তু কথা মিষ্টি, না রূঢ়, তা বিচারের জন্য তো আগে শুনতে হবে। আর সেই শোনার ক্ষেত্রে যদি নানা সমস্যা আসে, কানের ব্যথা, কান থেকে পুঁজ বেরোনো, ভোঁ-ভোঁ শব্দ হওয়া ইত্যাদি থাকে, তাহলে? এমন অনেক সমস্যায় আমরা অনেকেই পড়ি। শিশুদেরও এক্ষেত্রে রেহাই মেলে না। তবে তারা বুঝিয়ে বলতে পারে না তাদের কষ্টটা। তাই চিকিৎসা শুরু করতেও বেশ কিছুটা দেরি হয়ে যায়। আর সেই সুযোগে রোগ বেশ কিছুটা জাঁকিয়েই বসে। কানের সংক্রমণ বা ডাক্তারি পরিভাষায় ওটিটিস মিডিয়া, আসলে কী? তা নিয়ে আমাদের কতটা সচেতনই বা হওয়া দরকার, সব নিয়েই কথা বললেন ইএনটি বিশেষজ্ঞ আদিত্য ঘোষ রায়। জানুন কী বললেন ডাক্তারবাবু....
দ্য ওয়াল: কানের সংক্রমণ বা ইনফেকশন (ওটিটিস মিডিয়া) কী? কানের সংক্রমণ বলতে কী বোঝায়? ডঃ ঘোষ রায়: আমাদের কানের তিনটি ভাগ। বহির্কর্ণ, মধ্যকর্ণ, অন্তর্কর্ণ। বহির্কর্ণে কর্ণছত্র , কর্ণকুহর ও কর্ণপটহ থাকে। এদের কাজ শব্দতরঙ্গকে বাইরের থেকে মধ্যকর্ণে পাঠানো। মধ্যকর্ণ মেলিয়াস, ইনকাস ও স্টেপিস এই তিনটি অস্থি নিয়ে গঠিত। এদের কাজ শব্দতরঙ্গকে কর্ণপটহ থেকে অন্তর্কর্ণে পাঠানো। স্টেপিস মানবদেহের সবচেয়ে ছোট ত্রিকোণাকার অস্থি। অন্তর্কর্ণ ককলিয়া ও ভেস্টিবিউলার যন্ত্র দিয়ে তৈরি। ককলিয়ার মধ্যেই শ্রুতি-যন্ত্র থাকে। তাই আমরা শুনতে পাই। কানের ভেতরে বা বাইরে যে কোনও অংশে সংক্রমণজনিত প্রদাহকে ওটিটিস বলে। মধ্যকর্ণে সংক্রমণজনিত প্রদাহকে বলা হয় ওটিটিস মিডিয়া বা মধ্যবর্তী কানের সংক্রমণ। ওটিটিস মিডিয়া দুরকম হতে পারে (১) স্বল্পস্থায়ী ও (২) দীর্ঘস্থায়ী। ওটিটিস মিডিয়া মূলত শিশুদের শ্বাসনালির উপরের অংশের সংক্রমণজনিত একটি অসুখ।দ্য ওয়াল: কেন হয়? ডঃ ঘোষ রায়: ওটিটিস মিডিয়ার কারণগুলি বিশ্লেষণে দেখা যায় প্রধানত ইউস্টেচিয়ান টিউব বা নালী বিকল হয়ে পড়ে। মধ্যকর্ণে ইউস্টেচিয়ান নালী থাকে। এটা মধ্যকর্ণের নীচের দিক থেকে গলবিল পর্যন্ত বিস্তৃত। ইউস্টেচিয়ান টিউবটি নাক, গলা এবং কানের সংযোগকারী একটি নালী। এটি খুব বেশি ঠাণ্ডা লাগলে, টনসিলে সংক্রমণ হলে তা থেকে হয় অনেক সময়ে। নলটি ব্লক হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মাঝের কানে কম বাতাস যায় এবং টিমপ্যানিক ঝিল্লিতে তার প্রভাব পড়ে, মধ্যকানে তরল জমা হতে থাকে। সমস্যা বাড়তে থাকে।
দ্য ওয়াল: এর লক্ষণগুলো কী? ডঃ ঘোষ রায়: কান চুলকোনো, অতিরিক্ত কান্নাকাটি, লোকজনকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলা, বারবার ঘুম থেকে উঠে পড়া, হাই ফিভার, প্রচন্ড মাথাব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, কাশি, নাক দিয়ে জল পড়া, কান ব্যথা ও কানে চাপ অনুভব করা , কান ভোঁ ভোঁ করা বা গুন-গুন শব্দ শোনা, বমি বা ডায়ারিয়া ইত্যাদি। এই লক্ষণগুলোই মূলত এক বা একাধিক হয় শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক সকলের ক্ষেত্রেই। সমস্যা খুব বেশি মাত্রায় হলে অনেক সময়ে কানের পর্দা ফেটে একধরনের হাল্কা হলদেটে তরল কান থেকে বেরিয়ে আসে। দেহের ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা হয় তখন, কানে শোনার ক্ষমতাও কমে যায় আস্তে আস্তে।
দ্য ওয়াল: বড়দের চেয়ে কি বাচ্চাদের এই সমস্যা বেশি হয়? কেন? ডঃ ঘোষ রায়: হ্যাঁ, কারণ বড়দের ইউস্টেচিয়ান নালীটা তুলনামূলকভাবে মোটা আর বাঁকানো হয়। ছোটদের সোজা আর পাতলা হয়। তাতে সংক্রমণ অনেক তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে যায় এবং প্রভাব ফেলে। মূলত শিশুদের বধিরতা বা কানে একেবারে শুনতে না পাওয়ার যে ঘটনাগুলো ঘটে, সেগুলোয় এই সমস্যা শুরু থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলেই হয়। দ্য ওয়াল: কী ভাবে এই সংক্রমণ নির্ণয় করা হয়? ডঃ ঘোষ রায়: সংক্রমণের লক্ষণ যেমন কানে ব্যথা, কম শোনা, কানে শোঁ শোঁ করা, মাথা ঘোরা, বমি হওয়া, কান থেকে জল পড়া, পুঁজ বা রক্ত পড়া, কান চুলকোনো, কানের ভেতরে ফোড়া হলে ফুলে যাওয়া ইত্যাদি অটোস্কোপের মাধ্যমে পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা হয়। খুব বেশি জটিলতা থাকলে আরও গভীরে গিয়ে পরীক্ষার জন্য টিমপ্যানোমেট্রি, অডিওমেট্রি, এমআরআই স্ক্যান করা হয়। দ্য ওয়াল: ব্যাকটিরিয়া এবং ফাঙ্গাস থেকে আলাদা আলাদা করে সংক্রমণ হলে তার উপসর্গও কি আলাদা হয়? ডঃ ঘোষ রায়: ছত্রাকজনিত সংক্রমণ বহির্কর্ণ ও মধ্যকর্ণে হয়। কান চুলকোনো যার প্রধান লক্ষণ। ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে কান থেকে পুঁজ ও জল পড়তে থাকে অনবরত , কানে কম শোনাও এক্ষেত্রে প্রধান লক্ষণ। দ্য ওয়াল: অটোমাইকোসিস কী? ডঃ ঘোষ রায়: কানের ভিতরে ছত্রাক সংক্রমিত হওয়াকে অটোমাইকোসিস বলা হয়ে থাকে। সাধারণত বর্ষা বা ভ্যাপসা গরমে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। কান পরিষ্কার করলে অটোমাইকোসিস হয়। হ্যাঁ, কান পরিষ্কার করা খুব খারাপ অভ্যাস। কানের ভিতরে ময়লা নিজে থেকেই বেরিয়ে আসে। কাউকে বাড দিয়ে আলাদা করে পরিষ্কার করতে হয় না। কটনবাড কানে ওষুধ দেয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল, কান পরিষ্কারের জন্য নয়। দ্য ওয়াল: কানের সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায় কী? ডঃ ঘোষ রায়: ওটিটিস মিডিয়া যেহেতু শিশুদের অসুখ হিসেবে পরিচিত । এই রোগে আক্রান্ত হলে ধূমপান এড়িয়ে চলতে হবে (নিজের ক্ষেত্রে) , শিশুকে ধূমপানের কাছাকাছি রাখা যাবে না। ধুলো-ধোঁয়া আছে এমন জায়গা থেকেও দূরে থাকতে হবে। এক বছর বা তারও বেশি সময় পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে, এতে প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে। বোতলে দুধ খাওয়াতে হলে শিশুকে শুইয়ে খাওয়ানো যাবে না। বসিয়ে বা লম্বা করে কোলে নিয়ে খাওয়াতে হবে। কানের পাশে সেঁক দিতে হবে । খুব দেরি না করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।আরও শুনুন এ নিয়ে কী বললেন ডাক্তারবাবু
https://www.youtube.com/watch?v=9OV2BD3vMTs দ্য ওয়াল: প্রতিকারের রাস্তাই বা কী? ডঃ ঘোষ রায়: মধ্যকর্ণের সংক্রমণ হলেই কানের পর্দা ফুটো হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক, কানের ড্রপ হিসেবে ব্যবহার না করলে কানের সংক্রমণ ভালো হবে না। পরিমাণ, ডোজ ও ডিউরেশন ঠিক রেখে ওষুধ ব্যবহার করা নিরাপদ। ডাক্তারের মত ছাড়া কোনও ওষুধ না দেওয়াই ভালো। কান থেকে রস পড়া ইত্যাদি আটকে প্রথমে সেই অবস্থা থেকে কান শুকোনোর জন্য প্রথমে চিকিত্সা করা প্রয়োজন। যদি পর্দার ফুটো বড় হয় এবং এমনকি ওষুধেও তাতে কোনও তফাত না হয়, অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। শ্রবণ পরীক্ষা এবং টেম্পোরাল হাড়ের ইমেজিং সহ রোগীর যথাযথ কাজ করার পরে অপারেশন করা হয়।দ্য ওয়াল: কানের সমস্যায় শুধু ওষুধে সারতে পারে কি, অপারেশনের প্রয়োজন হয়? তাতে পুরোটা সারে এই সমস্যা? ডঃ ঘোষ রায়: পুরোটাই সারা সম্ভব। ফুটো পর্দায় ফরেনবডি পর্দা সংযোজন করে, বারবার খোঁচাখুঁচি করে কান পরিষ্কার না করে, কানে জল ঢুকতে না দিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চললে সমস্যা মিটতে পারে। ওষুধে সারানো না গেলে অপারেশন করা হয়। ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সাফল্য আসে। দ্য ওয়াল: দীর্ঘস্থায়ী যদি হয় এই সমস্যা, তাহলে কি ব্রেনে কোনও প্রভাব ফেলতে পারে? ডঃ ঘোষ রায়: অবশ্যই ফেলতে পারে। কারণ ইউস্টেচিয়ান নালীটা গলা নাক কানের সংযোগসূত্র। এবার তাতে সংক্রমণ হয়ে, কানের পর্দা যত পাতলা হয়ে ক্ষয়ে যেতে থাকে, তত ব্রেনের কাছাকাছি সহজেই পৌঁছে যায় সংক্রমণ। তাই খুব তাড়াতাড়ি এই সমস্যার সমাধান খুঁজে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া দরকার।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়