Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ইরানের সব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে‌ দেওয়া হয়েছে, দাবি আমেরিকার, চিন্তা ইরানি ল্যান্ডমাইনও Poila Baisakh: দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাট, নববর্ষে অগণিত ভক্তের ভিড়, পুজো দিতে লম্বা লাইনপয়লা বৈশাখেই কালবৈশাখীর দুর্যোগ! মাটি হতে পারে বেরনোর প্ল্যান, কোন কোন জেলায় বৃষ্টির পূর্বাভাসমেয়েকে শ্বাসরোধ করে মেরে আত্মঘাতী মহিলা! বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে জোড়া মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত রহস্য UCL: চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ চারে পিএসজি-আতলেতিকো, ছিটকে গেল বার্সা-লিভারপুল‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?১৮০ নাবালিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোষণ! মোবাইলে মিলল ৩৫০ অশ্লীল ভিডিও, ধৃতের রয়েছে রাজনৈতিক যোগ ৩৩ বছর পর মুখোমুখি ইজরায়েল-লেবানন! ওয়াশিংটনের বৈঠকে কি মিলবে যুদ্ধবিরতির সমাধান?ইউরোপের আদালতে ‘গোপনীয়তা’ কবচ পেলেন নীরব মোদী, জটিল হচ্ছে পলাতক ব্যবসায়ীর প্রত্যর্পণ-লড়াইইরানের সঙ্গে সংঘাত এবার শেষের পথে? ইঙ্গিত ভ্যান্সের কথায়, দ্বিতীয় বৈঠকের আগে বড় দাবি ট্রাম্পেরও

অ্যাঞ্জেলিনা জোলির পথে মেদিনীপুরের মৌসুমী, ব্রেস্ট সার্জারির বেনজির সাফল্য কলকাতায়

তিয়াষ মুখোপাধ্যায় জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখে ডানদিকের স্তনে একটা ছোট লাম্প হয়েছে বলে বুঝেছিলেন ৩৭ বছরের মৌসুমী রায়। আকাশ ভেঙে পড়েছিল মাথায়। তার কারণও ছিল। মৌসুমীর যখন সাত বছর বয়স, তখন তাঁর মা মারা গিয়েছিলেন স্তন ক্যানসারে। কয়েক বছর আগে মৌসুম

অ্যাঞ্জেলিনা জোলির পথে মেদিনীপুরের মৌসুমী, ব্রেস্ট সার্জারির বেনজির সাফল্য কলকাতায়

শেষ আপডেট: 4 February 2021 15:50

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখে ডানদিকের স্তনে একটা ছোট লাম্প হয়েছে বলে বুঝেছিলেন ৩৭ বছরের মৌসুমী রায়। আকাশ ভেঙে পড়েছিল মাথায়। তার কারণও ছিল। মৌসুমীর যখন সাত বছর বয়স, তখন তাঁর মা মারা গিয়েছিলেন স্তন ক্যানসারে। কয়েক বছর আগে মৌসুমীর মাসিও মারা যান। স্তন ক্যানসারেই। ফলে ওই ছোট্ট লাম্প যে অনেক বড় কিছুর ইঙ্গিত হতে পারে, তা বুঝতে সময় লাগেনি মৌসুমীর। অ্যাঞ্জেলিনা জোলির কথা মনে পড়ে? ২০১৩ সালে আমেরিকার লেনক্স হিল হাসপাতালে ম্যাস্টেক্টমি করিয়ে সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন এই হলিউড অভিনেত্রী। তিনিও পারিবারিক ভাবে বহন করছিলেন ক্যানসারের জিন। তাই ঝুঁকি না নিয়ে, কোনও সম্ভাবনা না রেখে, অস্ত্রোপচার করিয়ে বাদ দেন নিজের দুটি স্তন। এই অস্ত্রোপচারের নামই ম্যাস্টেক্টমি। সেই সঙ্গেই বাদ দেন দুটি ওভারি এবং ফ্যালপিয়ান টিউব।

The pros and cons of having a preventive mastectomy | KUTV

মৌসুমীর ক্ষেত্রেও ইঙ্গিত সত্যি হয়। ক্যানসার ধরা পড়ে তাঁর। শুধু তাই নয়, ডান দিকের ব্রেস্টের খানিকটা অংশ সার্জারি করে বাদ দেওয়ার পরে দেখা যায়, বিআরসিএ জিন সক্রিয় রয়েছে তাঁর শরীরে। এ আশঙ্কা ছিলই, কারণ জেনেটিক্যালি তিনি শরীরে বহন করছেন ক্যানসারের সম্ভাবনা। ফলে এর পরে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে ম্যাসটেক্টমি করা হয় তাঁর। অর্থাৎ ক্যানসারের সম্ভাবনা নির্মূল করতে বাদ যায় ওভারি, ফ্যালপিয়ান টিউব এবং বাঁ দিকের ব্রেস্টও। তবে হলিউড অভিনেত্রীর পক্ষে যেটা করা সম্ভব, যেভাবে সারা দুনিয়ায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব, ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে মেদিনীপুরের গোদাপিয়াশাল এলাকার কুইকোটার বাসিন্দা, মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ মৌসুমী রায়ের পক্ষে তা অনেকটাই কঠিন ছিল, বলাই বাহুল্য। কিন্তু সেই কঠিনকেই সহজ করে তোলেন অ্যাপোলোর চিকিৎসক ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী। তাঁর নেতৃত্বেই পূর্ব ভারতে ম্যাসটেক্টমির দুর্দান্ত এক নিদর্শন তৈরি হয়েছে। এখন মৌসুমী সুস্থ সবরকম ভাবেই। তবে এই জার্নিটা মোটেও সহজ ছিল না। জানুয়ারি মাসেই ব্রেস্টে অসঙ্গতি মেলার পরে স্বামী সৌম্যদীপ রায়ের সঙ্গে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ নেন মৌসুমী। তিনি ম্যামোগ্রাফি করার মতামত দেন। সেই রিপোর্ট প্রাথমিক ভাবে খুব একটা ইতিবাচক চোখে দেখেননি চিকিৎসক। তাই কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালে রেফার করেন তিনি। সেখানেই ট্রু-কাট বায়পসি করা হয় মৌসুমীর স্তনে এবং আশঙ্কা সত্যি করে দেখা যায়, তিনি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত। শুধু তাই নয়, এই ক্যানসারের ধরনটিও যথেষ্ট অ্যাগ্রেসিভ ছিল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ফলে দ্রুতগতিতে শুরু হয় চিকিৎসা। মৌসুমীর স্বামী সৌম্যদীপ জানালেন, মৌসুমীর বাড়িতে মা ও মাসির স্তন ক্যানসারে মৃত্যু হয়েছিল সেটা মাথায় রেখেই চিকিৎসকদের পরামার্শে জেনেটিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রস্তুতিও সেরে ফেলা হয়। এর পরে সিদ্ধান্ত হয় ব্রেস্ট কনজারভেশন সার্জারির (বিসিএস)। অ্যাপোলোর অঙ্কোসার্জেন ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে অস্ত্রোপচার নির্ধারিত হয়। সেই মতোই জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখে বিসিএস করা হয় মৌসুমীর। ডান দিকের ব্রেস্টের খানিকটা অংশ কেটে বাদ দেওয়া হয়।

Mastectomy and Breast Cancer: What You Should Know | Medanta

এর পরে ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ তারিখে জেনেটিক টেস্টের (বিআরসিএ জিনের টেস্ট) জন্য রক্তের নমুনা জমা করেন মৌসুমী। মাস দেড়েক সময় লাগে এই টেস্টের রিপোর্ট পেতে। এই সময়কালে পরিকল্পনা অনুযায়ীই ডক্টর ইন্দ্রনীল ঘোষের আন্ডারে কেমোথেরাপি ও ডক্টর তনভীর শহিদের আন্ডারে রেডিওথেরাপি চলে মৌসুমীর। থেরাপির পরে অস্ত্রোপচারের আশপাশের কয়েক মিলিমিটার এলাকা পরীক্ষা করে দেখা যায়, পুরোপুরি ভাবে নির্মূল হয়েছে ক্যানসারের কোষ। কিন্তু এসবের মধ্যেই করোনার সংক্রমণে দেশজুড়ে লকডাউন হয়ে যায়, ফলে বিআরসিএ  জিনের টেস্ট রিপোর্টটি আসতেও খানিক দেরি হয়। শুধু দেরি নয়, এপ্রিল মাসে আসা রিপোর্টে দেখা গেল, মৌসুমীর বিআরসিএ জিনটি প্যাথোজেনিক! অর্থাৎ এই জিনের সক্রিয়তার কারণে ফের ব্রেস্ট বা ওভারিতে ক্যানসার ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়ে গেছে মৌসুমীর শরীরে। তাঁর মা-মাসির পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী অবশ্য এই ঝুঁকি ছিলই। এর পরেই ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী পরামর্শ দেন, মৌসুমীর ম্যাসটেক্টমি করার। অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির কথা তাঁদের বলেন ডাক্তারবাবু। জোলিরও মায়ের ও দিদিমার ব্রেস্ট ক্যানসারে মৃত্যু হয়েছিল এবং তাঁর নিজের শরীরে বিআরসিএ জিন সক্রিয় ছিল। তাই ২০১৩ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ম্যাসটেক্টমির। অর্থাৎ দুটি ব্রেস্ট, ওভারি, ফ্যালপিয়ান টিউব অস্ত্রোপচার করে বাদ দিয়ে দেওয়ার। এটাকে বলা যেতে পারে চূড়ান্ত সতর্কতামূলক আগাম ব্যবস্থা। যাতে বিআরসিএ জিনের কারণে কোনও ভাবেই ভবিষ্যতে আর থাবা বসাতে না পারে ক্যানসার। [caption id="attachment_273592" align="aligncenter" width="600"] সৌম্যদীপ ও মৌসুমী।[/caption] অ্যাঞ্জেলিনা জোলির কথা অবশ্য আগেই জানতেন সৌম্যদীপ। তাই ডাক্তারবাবু বলার পরে আরও ভাল করে বিষয়টি সম্পর্কে জেনে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এই অস্ত্রোপচারটি করানোর। যদিও পাশ্চাত্যের মতো এ দেশে ম্যাসটেক্টমি এত বেশি জনপ্রিয় নয়, অনেকেই রাজি হন না এই অস্ত্রোপচারে, বিশেষ করে কম বয়সে। কিন্তু মৌসুমীর ক্ষেত্রে এরকম কোনও বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি ডক্টর চক্রবর্তীকে। ডান দিকের ব্রেস্টে কনজারভেশন সার্জারি আগেই হয়েছিল মৌসুমীর। সার্জারির পরে কেমো এবং রেডিওথেরাপি দুইই হয়েছিল। তাই সেখানে ক্যানসার ফিরে আসার সম্ভাবনা অনেকটাই কম, এমনটাই মত দিয়েছিলেন ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী। তাই বাঁ দিকের ব্রেস্ট এবং ওভারি ও ফ্যালপিয়ান টিউব বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। দেখুন, কী বললেন ডক্টর চক্রবর্তী। https://youtu.be/zqPulMPnLLs ২৮ অগাস্ট। সকাল সাড়ে দশটা থেকে সন্ধে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত একটানা অস্ত্রোপচার চলে মৌসুমীর। তিন জন চিকিৎসকের টিম অস্ত্রোপচার সফল করেন। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সার্জেন ডক্টর রমনা বন্দ্যোপাধ্যায় ওভারি ও ফ্যালপিয়ান টিউব বাদ দেন। ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী বাদ দেন মৌসুমীর বাঁ দিকের ব্রেস্ট। তবে স্তনের বাইরের চামড়াটা ও স্তনবৃন্ত আগের মতোই থাকে, বাদ যায় ভিতরের ব্রেস্ট টিস্যু। এ সার্জারির নাম 'নিপল স্প্যারিং ম্যাসটেক্টমি'। এর পরে ডক্টর সপ্তর্ষি ভট্টাচার্য ব্রেস্টে সিলিকন ইমপ্ল্যান্ট করে রিকনস্ট্রাকশন সার্জারি করেন মৌসুমীর। সবশেষে ব্রেস্টের বাদ যাওয়া টিস্যু, ওভারি ও ফ্যালপিয়ান টিউবের ফের বায়পসি করে সব রিপোর্ট নেগেটিভ পাওয়া যায়। নিশ্চিন্ত হন সকলে। বছর নয়েক আগে বিয়ে হয়  সৌম্যদীপ ও মৌসুমীর। ইউনিভার্সিটির সহপাঠী ছিলেন তাঁরা। ৩৭ বছরের মৌসুমী যখন প্রথম বোঝেন এই মারণ অসুখের ইঙ্গিত, তখন স্বাভাবিক ভাবেই আতঙ্ক ছেয়ে আসে গোটা পরিবারে। সৌম্যদীপ নিজেই জানালেন, “আমি মনের দিক থেকে খুবই ভেঙে পড়েছিলাম। সাত বছরের মেয়েটার কী হবে, এই চিন্তা পর্যন্ত চলে এসেছিল আমার মনে। ওর মা আর মাসির মৃত্যু আমায় তাড়া করছিল। কিন্তু মৌসুমী প্রথমে একটু ভয় পেলেও, পরে ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী এত ভাল করে বোঝান, সাহস দেন, যে ও খুবই স্ট্রং হয়ে যায় মানসিক ভাবে।” শুধু তাই নয়, মেদিনীপুরের গোদাপিয়াশাল এলাকায় প্রাথমিক স্কুলশিক্ষকের মধ্যবিত্ত পরিবারে এমন অসুখ, এমন অস্ত্রোপচার খুব একটা সহজ ও স্বাভাবিক কখনওই নয়। কিন্তু মৌসুমীর পরিবার, কী বাপেরবাড়ি বা শ্বশুরবাড়ি—সক্কলে পাশে থেকেছেন পুরোপুরি ভাবে। চিকিৎসা চলার পুরো সময়টা মৌসুমী ও সৌম্যদীপের মেয়েকে তাঁরাই দেখাশোনা করেছেন। এই কোভিড পরিস্থিতিতে গোটা পর্বটা মোটেই সহজ ছিল না। কিন্তু সকলের ইতিবাচক মানসিকতা সব কিছু বদলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমা থাকায় চিকিৎসার খরচও অনেকটাই সামাল দেওয়া গেছে। ডক্টর চক্রবর্তীও ঠিক এই কথাটাই বলছেন। তাঁর কথায়, “ব্রেস্ট ক্যানসার মানে শুধুই একটি অসুখ ও তার চিকিৎসা নয়। এই লড়াইটা সকলের। রোগীর, পরিবারের, সমাজের। মৌসুমীদেবী এই সাপোর্টটা পেয়েছিলেন বলেই আমরাও সহজে করতে পেরেছি এত জটিল চিকিসা। উনি সাড়া দিয়েছেন, সুস্থ হয়ে উঠেছেন।” শুধু তাই নয়। ডক্টর চক্রবর্তী মনে করেন, সেই জ্ঞান এবং ধারণা থেকে কোনও লাভ নেই, যদি না তার প্রয়োগ করা যায়। তাঁর কথায়, "ব্রেস্ট ক্যানসারের জেনেটিক সমস্যা, সার্জারি, ম্যাস্টেক্টমি-- এসব নিয়ে চিকিৎসাশাস্ত্র অনেকটাই এগিয়ে গেছে। আমরাও প্রতিনিয়ত পড়ছি, জানছি, শিখছি, নিজেদের আরও দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করছি। তবে সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে, হাতেকলমে সার্জারি করে কাউকে ভাল করে তুলতে না পারলে, সে দক্ষতা অর্থহীন।" অ্যাপোলো হাসপাতালের পূর্বাঞ্চলীয় সিইও রানা দাশগুপ্ত এ প্রসঙ্গে বলেন, “মৌসুমীর জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। অত্যাধুনিক চিকিৎসা সাজিয়ে দিয়েছে অ্যাপোলো। আমাদের বিশ্বাস করার জন্য ভরসা রাখার জন্য তাঁকে আলাদা করে ধন্যবাদ। এ সাফল্য আমাদের মুকুটেও নতুন পালক যোগ করল।”

```