
দাঁতের যত্ন নিন!
শেষ আপডেট: 2 July 2024 09:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারা দিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি। আমাদের এই ভাল হয়ে চলাটা সাধারণত শুরু হয় দাঁত মাজা বা ব্রাশ করা দিয়ে। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে, এমনকি মহাশূন্যে বাঁই বাঁই করে ঘুরতে থাকা আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে মহাকাশচারীদেরও ‘দিন’ শুরু হয় এইভাবে। কিন্তু দিনে কতবার ব্রাশ করা উচিত? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, ঠিক কখন ব্রাশ করা উচিত?
চিকিৎসকদের একাংশ কিন্তু বলছেন, রাতে ব্রাশ করে শুলে, সকালে ব্রাশ না করে, বরং প্রাতরাশ সেরে ব্রাশে মাজন লাগান!
শুনে কীরকম তাজ্জব লাগছে না? অনেকেই যেটা করেন, রাতে শোবার আগে একবার ব্রাশ করেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে আরেকবার করেন। সেটাই স্বাভাবিক। হয়ে থাকে। কিন্তু দাঁত না মেজে, বাসিমুখে ব্রেকফাস্ট সেরে তারপর মুখ ধোবো? এ’ কেমন কথা? বিশিষ্ট দন্তচিকিৎসক মুন চট্টোরাজ বলছেন, আদতে এটাই বিজ্ঞানসম্মত।
কথা হচ্ছিল সাদার্ন অ্যাভিনিউর ওপরে এএম মেডিক্যাল সেন্টারে বসে। নতুন বাংলা ছবি ‘অরণ্য’র প্রাচীন প্রবাদ’ উপলক্ষ্যে জমায়েত হয়েছিলেন পরিচালক দুলাল দে, অভিনেতা জীতু কমল ও রাফিয়াত রশিদ মিথিলা। সেখানেই প্রতিষ্ঠানের নির্দেশক তথা ‘প্রস্থোডন্টিস্ট’ ডাঃ চট্টোরাজ শোনালেন দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য নিয়ে নানা মজার তথ্য। বললেন, ‘দেখুন, দিনে দু’বার ব্রাশ করাটা একটা নিয়ম। এটা সব্বার মেনে চলা উচিত। এবার ভেবে দেখুন, আপনি যদি ডিনারের পরে, শোবার আগে দাঁত মেজে নেন, তাহলে আপনার মুখ পুরো সাফসুতরো। কোনও জীবাণুর সেখানে লাফালাফি করার গল্প নেই। সারারাত আপনি মুখ বন্ধ করে ঘুমোলেন। তাহলে মুখে কী রইল? কেবলমাত্র যেগুলো ভাল জীবাণু (গুড ব্যাকটেরিয়া), তারাই। অর্থাৎ, মুখবিবর তখন পরিষ্কার থাকে। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে স্রেফ মুখটুকু ধুয়ে নিলেই হবে।‘
কিন্তু তারপর জলখাবার খেলে? ডাঃ চট্টোরাজ বললেন, ‘ওই যে সমস্যার শুরু। যখনই আপনি সকালে খাওয়াদাওয়া করবেন, তার মানেই আবার ব্যাকটেরিয়ার দল হইহই করে ফেরত আসবে। তাই ব্রেকফাস্টের পরেই ভাল করে ব্রাশ করা উচিত। তাতে মুখের স্বাস্থ্য ভাল থাকে।
উপস্থিত কলাকুশলীরা তো তাজ্জব! জীতু প্রায় মাথা চুলকে বললেন, ‘এমনটা তো কখনও ভাবিনি। সকালে উঠে ব্রাশ করাটাই তো নিয়ম জানি।‘ ডাঃ চট্টোরাজ বললেন, ‘অবশ্যই সকালে উঠে ব্রাশ করবেন, কিন্তু যদি রাতে ব্রাশ করে নেন, তাহলে সকালে উঠে স্রেফ মুখ ধুয়ে নিলেই চলে।‘
রাতে ব্রাশ না করলে অবিশ্যি সকালে ভাল করে দাঁত মাজার কোনও বিকল্প নেই। কারণ সারারাত ধরে মুখের ভেতর ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকে। যে কারণে সকালে উঠে মুখে খানিক দুর্গন্ধ থাকে। দ্রুত ভাল টুথপেস্ট বা মাজন ব্যবহার করে সেসব ধুয়ে ফেলাই ভাল।
আবার ব্রাশ করতে গেলে যে সবসময় মাজন বা টুথপেস্ট ব্যবহার করতেই হবে, এমনটা নয় কিন্তু। অনেক সময় কোনও রকম টুথপেস্ট ব্যবহার না করেও দাঁত মেজে নেওয়া যায়। যদি অন্তত তিন মিনিট ধরে ভাল করে দাঁত মাজা যায়। ডাঃ চট্টোরাজ বললেন, ‘টুথপেস্ট কেন ব্যবহার করা হয়? যাতে সময় বাঁচানো যায়। বেশিক্ষণ ধরে ঘষাঘষি করার সময় নেই, যাতে ব্রাশের কাজ কমিয়ে দেওয়া যায়, সেইজন্যই টুথপেস্ট ব্যবহার করা। কিন্তু টুথপেস্ট মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে খুবই বিপজ্জনক হতে পারে। কেবলমাত্র একটা পিনাট বা বাদামের মত অল্প পরিমাণ মাজনই নেওয়া উচিত। কিন্তু তিন মিনিট ধরে ব্রাশ করলে মাজন ব্যবহার না করেই সুন্দরভাবে দাঁত পরিষ্কার রাখা যায়।‘
নানা রকম মাউথওয়াশ ব্যবহার করেন অনেকে। ডাঃ চট্টোরাজ সেসব নিয়েও সতর্ক করলেন। বললেন, ‘মাউথওয়াশে গ্লিসারিন থাকে। ওটা দাঁতে স্টেইন বা দাগ ফেলে দেয় অনেক সময়। খুব বেশি গ্লিসারিন বেশি ইউজ করেন, দেখবেন, দাঁতের ফাঁকে কালো দাগ হয়ে যাচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট, দাঁতে স্টেইন পড়া নানা কারণে হতে পারে। যেমন সিগারেট খেলে বা এমনকি কফি খেলেও হতে পারে!’ সিগারেটের দাগ মোটামুটি আমরা চিনি। ওটা মুখ্যত নিকোটিন থেকে আসে। কফিতেও থাকে ক্যাফিন। যা একইরকমভাবে দাঁতে ছোপ ফেলতে পারে।
জিজ্ঞেস করা গেল, দাঁতের স্বাস্থ্য ভাল রাখার ক্ষেত্রে ভাল মানের টুথপেস্ট বেছে নেওয়া কতটা জরুরি? ডাঃ চট্টোরাজ বললেন, ‘এমন টুথপেস্ট ব্যবহার করা উচিত, যাতে জেল কম থাকে। জেল খুব প্রতিক্রিয়া করে। ওটা কম থাকলেই ভাল!’ বিভিন্ন সময় দাঁতের ডাক্তাররা মাউথওয়াশ ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে কোনও অস্ত্রোপচার বা রুট ক্যানাল প্রক্রিয়ার পরে। কিন্তু ডাঃ চট্টোরাজ সতর্ক করলেন, ওরকম মাউথওয়াশও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই ব্যবহার করা ভাল। নয়ত হিতে বিপরীত হতে পারে।
আরও একটা সাধারণ ব্যাপার নিয়ে সতর্ক করলেন ডাঃ চট্টোরাজ। ফেলুদার গল্পে লালমোহনবাবু যার নাম করেছিলেন ‘দাঁত-খড়কে’। অর্থাৎ, টুথপিক। প্রায়ই দাঁতে কিছু আটকে গেলে আমরা সরু সূচলো টুথপিক দিয়ে খুঁচিয়ে সেসব বের করে আনার চেষ্টা করি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানবাড়িতে কাবাব ইত্যাদি পরিবেশন করা হয় টুথপিক সমেত। কিন্তু তা আদৌ দাঁতের জন্য ভাল নয়। ডাঃ চট্টোরাজের মতে, ‘ওতে বিপদের সম্ভাবনাই বেশি থাকে। আপনাদের অজান্তে আপনারা মাড়ির ক্ষতি করে ফেলেন। দেখুন, দাঁতের ভেতরের অংশে যাওয়ার জন্য পেশাদার চিকিৎসকের তালিম থাকা দরকার। আমজনতা তো বুঝবেন না, কীভাবে সেটা করা উচিত। ফলে টুথপিকে অযথা খোঁচাখুঁচি হয়, সেখান থেকে মাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গেলে তা থেকে সংক্রমণও হয়ে যেতে পারে। তার চাইতে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই ভাল।