কেয়া শেঠ
শীতের খসখসে ত্বকে নরম আর জেল্লাদার করার মতো একগাদা ক্রিম, জেল তখনও আসেনি। মনে পড়ে, বাজারচলতি বিদেশি ক্রিম বা তেলের বদলে ঘরোয়া উপকরণেই বেশি ভরসা রাখতেন মা, ঠাকুমারা। শীতের আগেই প্রাকৃতিক নির্যাসে রূপচর্চা শুরু হয়ে যেত। আয়োজন খুবই সামান্য। গোটা কয়েক কমলালেবুর খোসা পিষে তার রস ভাল করে মুখে-হাতে মেখে নাও। বাড়তি খোসা জমিয়ে রাখার অভ্যাসও ছিল। যতদিন তাকে টাটকা রেখে ব্যবহার করা যায়। তবে বেশিরভাগ খোসাই বেশিদিন রাখলে পচে, নষ্ট হয়ে যেত। সেখানেও বুদ্ধি করে নানারকম উপায় বের করতেন বাড়ির বড়রা। খোসা শুকিয়ে গুঁড়ো করে রেখে দেওয়া হত। পরে তার সঙ্গে চন্দন, মুসুর ডাল বাটা বা আরও নানা জিনিস মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে মুখে মাখলেই একেবারে ঝকঝকে ত্বক। টানটান। হিমেল হাওয়ায় চামড়া ফাটত না একেবারেই। প্রাকৃতিক নির্যাসই রূপচর্চার মূলমন্ত্র। শিখিয়েছিল প্রাচীন ভারতই। ফলের রসেও যে ডাক্তারি হয় ভারতীয় আয়ুর্বেদই তা বলে গিয়েছে। অ্যারোমাথেরাপির গোড়ার কথাও তো তাই-ই।

ফুল, ফলের রস, গাছের পাতা, শিকড়, ছাল নিংড়ে তার রস থেকেই তৈরি হবে রোগ সারানোর দাওয়াই। রূপচর্চার উপকরণও। কমলালেবুর খোসা পিষে রস বের করার যে প্রাচীন পদ্ধতি ভারতে শুধু নয়, অন্যান্য দেশেও প্রচলিত ছিল, সেটিই এখন নয়া আঙ্গিকে ‘অরেঞ্জ এসেনশিয়াল অয়েল’ হয়ে ফিরে এসেছে। কমলালেবুর মধ্যেই রয়েছে এমন এক প্রাকৃতিক তেল যা বহু গুণে গুনী। এই তেলকেই বিজ্ঞানসম্মত উপায় বের করে সংরক্ষণ করার পদ্ধতি রয়েছে অ্যারোমাথেরাপিতে। দীর্ঘদিন কমলালেবুর খোসা জমিয়ে রাখলে তা নষ্ট হয়ে যাবে, কাজেই এমন পদ্ধতিতে কমলার গুণগুলোকে ধরে রাখতে হবে যা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহারের উপযোগী থাকে। আর প্রকৃতির গুণাগুনও নষ্ট না হয়। অরেঞ্জ এসেনশিয়াল অয়েল বা অরেঞ্জ ক্রিমের উপকারিতা সেখানেই।

অনেকেরই ভুল ধারণা আছে কমলালেবু বুঝি পশ্চিমের ফল। এটা একেবারেই নয়। কমলালেবুর চাষের জন্য দরকার ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চল। তাই দক্ষিণ চিন, উত্তর-পূর্ব ভারত, মায়ানমারেই কমলালেবুর চাষ প্রথম শুরু হয়। কমলার উৎস বলতে গেলে চিন ও উত্তর-পূর্ব ভারতের নামই আগে আসে। আর বাংলার সঙ্গে কমলালেবুর রসায়নের কথা আলাদা করে বলার কিছু নেই। শীতকাল মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে কমলালেবুর ছড়াছড়ি। শীতের পিকনিক হোক বা ছোট্ট হাওয়াবদল, সঙ্গে কমলালেবু থাকবেই। বাঙালির কমলার প্রতি এই টান আরও ভালভাবে বোঝা যায় জীবনানন্দ দাশের কবিতায়,
“একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব
আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে?
আবার যেন ফিরে আসি
কোনো এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে
কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।“
পরিচিত রোগগ্রস্থ মানুষের পথ্য হয়ে ফিরে আসতে চেয়েছেন কবি। বাঙালির ঘরে কমলালেবু শুধু রূপচর্চার উপকরণ ছিল না, রোগ সারাতে, শরীর তাজা রাখতেও এই ফলের অনেক গুণ রয়েছে। নানা রোগের দাওয়াই কমলালেবু। ত্বকের কোনও সংক্রমণজনিত রোগ হলেও তার উপশমে কমলালেবুর রসের প্রয়োগ হয়ে থাকে।

এখন কমলালেবুর চাষ হয় বিশ্বের অনেক দেশেই। অরেঞ্জ হার্ভেস্টিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন বহু মানুষ। শুরুতে কিন্তু কমলালেবুর চাষের সঙ্গে পরিচয় ছিল গুটিকয়েক দেশেরই। যার মধ্যে চিন অন্যতম।
প্রাচ্যই কমলার উৎস, কলম্বাসের হাত ধরে কমলালেবুর বীজ পৌঁছয় পশ্চিমে
কমলালেবু পশ্চিমা ফল নয়। আদতে এশিয়াতেই কমলার চাষ শুরু হয় সর্বপ্রথম। দক্ষিণ-পূর্ব চিনের নাম সবচেয়ে আগে আসে। এরপরে মায়ানমার, উত্তর-পূর্ব ভারতের অসম। মধ্যপ্রাচ্যে কমলালেবু পৌঁছয় অনেক পরে। শোনা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ২৪০০ অব্দে চিনে কমলালেবুর ফলন শুরু হয়। প্রাচীন চৈনিক সাহিত্যে এর উল্লেখ আছে। আরবের বণিকরা পূর্ব আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে কমলালেবু নিয়ে যান খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় দু’হাজার বছর আগে। ১৫ শতকে পশ্চিম আফ্রিকা ও ইউরোপে কমলালেবু পৌঁছয় পর্তুগিজ পর্যটকদের হাত ধরে।
ইতিহাসবিদরা বলেন, ১৪৯৩-এ আমেরিকায় কমলালেবুর বীজ নিয়ে গিয়েছিলেন ইতালিয় নাবিক ও ঔপনিবেশিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস। সেখান থেকে কমলা পৌঁছয় হাইতি ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। পশ্চিমের দেশগুলিতে কমলালেবু পৌঁছয় পর্তুগিজ পর্যটকদের হাত ধরেই। চিন থেকে মিষ্টি কমলার বীজ নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। ১৫১৩ সালে স্প্যানিশ পর্যটক পোন্সে দে লিয়ন কমলালেবুর বীজ নিয়ে গিয়েছিলেন ফ্লোরিডায়। শোনা যায়, তারপর থেকেই ফ্লোরিডায় কমলার ফলন শুরু হয়।

ব্রিটেনে কমলালেবুর ফলন শুরু হয় ১৬ শতকের কাছাকাছি। মিষ্টি কমলালেবুর চাষই হত ইংল্যান্ডে। ইতিহাসবিদরা বলেন, ইংল্যান্ডে কমলালেবুর রস চিকিৎসার কাছে ব্যবহার করা হত। সিট্রাস জাতীয় ফল থেকে নানারকম ওষধি তৈরি করা হত। উচ্চবিত্তরাই কমলালেবুর চাষ করতেন। একরের পর একর জুড়ে নিজস্ব কমলার বাগান থাকত। সেখানে লেবুর চাষ, প্রাকৃতিক উপায় তেল নিষ্কাশনের কাজও চলত। ১৬৪৬ সাল নাগাদ গোটা ইউরোপেই কমলালেবুর ফলন শুরু হয়ে যায়। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের নাকি কমলালেবুর প্রতি আসক্তি ছিল। তিনি নিজের প্রাসাদে বিশাল কমলালেবুর বাগান বা রয়্যাল অরেঞ্জেরিস তৈরি করেছিলেন।
রেনেসাঁর সময় ইউরোপের অনেক চিত্রকলাতে কমলালেবুর ছবি দেখা গেছে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বিখ্যাত ‘দ্য লাস্ট সাপার’ ছবিতেও টেবিলের উপর কমলালেবু ফলের ছবি দেখা গেছে। বতিচেল্লি প্রিমেভেরা, ডমিনিকো বেনজিয়ানোর কালজয়ী অয়েল পেন্টিংগুলিতেও কমলালেবুর ছবি দেখা যায়।
[caption id="attachment_279776" align="aligncenter" width="1280"]

দ্য লাস্ট সাপার।[/caption]
১৫০০ শতকের মাঝামাঝি কমলালেবুর চাষ শুরু হয় দক্ষিণ আমেরিকা ও মেক্সিকোতে। ১৭১০ থেকে ১৭১০ সালের মধ্যে স্পেনের একাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কমলালেবুর চাষ শুরু হয়েছিল। অ্যারিজোনা থেকে বীজ আনানো হয়েছিল স্প্যানিশ মিশনারিজগুলির জন্য। শোনা যায়, ফরাসি পর্যটকদের হাত ধরে কমলালেবুর চাষ শুরু হয় ক্যালিফোর্নিয়াতে।
কমলালেবুর রসে প্রাকৃতিক চিকিৎসা চিন, ভারতে
ইতিহাস বলে, প্রাকৃতিকভাবেই কমলালেবু থেকে তেল বের করে নানা রোগ উপশমের টোটকা হিসেবে ব্যবহার করা হত প্রাচীন চিন, ভারতে। সর্দি-কাশি, জ্বর, ঠাণ্ডা লাগা থেকে শুরু করে ত্বকের সংক্রমণ, অবসাদ, মানসিক রোগের চিকিৎসাতেও ব্যবহার করা হত অরেঞ্জ অ্যারোমা অয়েল। চিন, ভারতের এই পদ্ধতিই পরে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
বিভিন্ন চৈনিক সাহিত্যে লেখা আছে, ট্রাডিশনাল মেডিসিনের কাজে লাগানো হত কমলালেবুকে। চিনেদের কাছে আবার কমলা ছিল সৌভাগ্যেরও প্রতীক। কমলার রস, খোসার দামও ছিল আকাশছোঁয়া। লেবুর শুকনো খোসা সংরক্ষণ করে রেখে ব্যবহারের রেওয়াজও ছিল চিনে।

১৯০০ সাল থেকে কীটনাশক হিসেবেও কমলালেবুর তেলের ব্যবহার শুরু হয়। ভারতে প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রে কমলালেবুর অনেক গুণের কথা বলা হয়েছে। জীবাণুনাশক, রোগ প্রতিরোধক, আবার রূপচর্চাতেও এর প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। মানসিক চাপ, স্ট্রেস, অবসাদের থেরাপিতেও কমলার প্রয়োগ হত প্রাচীন ভারতে। কমলালেবু থেকে নিষ্কাশিত তেলের সঙ্গে লেবুর রস, ল্যাভেন্ডার, গোলমরিচ, লবঙ্গ, এলাচ, আদা, চন্দন ইত্যাদি মিশিয়ে ওষধি তৈরি করা হত। মহারাষ্ট্রের নাগপুরকে বলা হয় কমলালেবুর শহর। এখান থেকে কমলা শ্রীলঙ্কা, কানাডা, ব্রিটেন, সৌদি আরবে রফতানি করা হয়। বাংলার পাহাড়ি এলাকায় কমলালেবুর চাষ হয়। দার্জিলিংয়ে কমলালেবুর ফলনের জন্য বিখ্যাত সিটং। একে কমলালেবুর দেশও বলা হয়। কমলালেবু চাষে বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয় পশ্চিমবঙ্গে।
অরেঞ্জ এসেনশিয়াল অয়েলের নানা ধরন, গুণও হরেক রকম
কমলালেবু উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয় ব্রাজিলে। ২০১৭ সালের পরিসংখ্যাণ বলছেন, সে বছরে ১ কোটি ৭০ লক্ষ টনের বেশি কমলার ফলন হয়েছিল। দু’নম্বরে ছিল চিন, বার্ষিক ফলন ৮০ লক্ষের বেশি। তৃতীয়ে ভারত, বার্ষিক ফলন ৭০ লাখের বেশি। এরপরে মেক্সিকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, মিশর। সুইট অরেঞ্জ বা মিষ্টি কমলালেবুর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি জুস ফ্যাক্টরিগুলিতে। অ্যারোমা তেল তৈরির জন্যও মিষ্টি কমলার ব্যবহার হয়। কমলালেবুর তেল নিষ্কাশনের নানা পদ্ধতি আছে। সাধারণত গোটা লেবুই পিষে তার রস বের করা হয়। এরপর সেই রস থেকে প্রাকৃতিক তেল আলাদা করা হয়। সেন্ট্রিফিউগেশন পদ্ধতিতে সেই তেল সংগ্রহ করা হয়। কোল্ড প্রসেসিং পদ্ধতিতে তেলের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ও অন্যান্য উপাদান সংরক্ষণ করা হয়, যাতে দীর্ঘসময় থাকলেও তেলের প্রাকৃতিক গুণাগুন নষ্ট না হয়ে যায়। অরেঞ্জ অয়েল বের করার আরও নানা পদ্ধতি আছে যেমন, সলভেন্ট এক্সট্রাকশন, সুপারক্রিটিকাল কার্বন-ডাই-অক্সাইড এক্সট্র্যাকশন, টার্বো ডিস্টিলেশন ইত্যাদি।

মিষ্টি কমলালেবু বা সিট্রাস সাইনেনসিস থেকে নিষ্কাশিত অ্যারোমা তেলের ব্যবহার বেশি ব্রাজিলে। টকজাতীয় কমলা সিট্রাস অর্যানটিয়াম থেকে নিষ্কাশিত তেল অরেঞ্জ বিটার (সিসিলি) এসেনশিয়ল অয়েল। তা ছাড়া ব্লাড অরেঞ্জ পাওয়া যায় ইতালিতে। তার থেকেও তেল নিষ্কাশন করা হয়। ভারতে কমলালেবুর ফলন এত বেশি যে বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রোডাক্টের বদলে দেশীয় প্রযুক্তিতে কমলালেবুকে নানা কাজে লাগানো যেতে পারে। অ্যারোমাথেরাপিতে কমলালেবুর তেল যেমন ত্বকের পরিচর্চায় ব্যবহার করা যেতে পারে তেমনি নানা রোগের দাওয়াই হিসেবেও এর প্রয়োগ চলতে পারে। সেক্ষেত্রে বিদেশ থেকে আমদানি করা দামি ক্রিম বা ময়শ্চারাইজারের বদলে দেশে তৈরি কমলার অ্যারোমা তেল অনেক বেশি উপযোগি হবে বলেই আশা রাখা হচ্ছে।
কমলালেবুর তেলের উপকারি উপাদান
কমলালেবুর তেলে যেসব রাসায়নিক উপাদান থাকে তার মধ্যে বেশি পরিমাণে থাকে
লিমোনিন। এই লিমোনিনের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট গুণ আছে। রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। তাছাড়া হজমশক্তি বাড়ায়, ডিটক্সিক্যান্ট অর্থাৎ শরীরের ক্ষতিকর টক্সিক উপাদান ছেঁকে বের করে দেয়।
বিটা-মাইক্রিন যা মূলত অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান। শরীরের যে কোনও প্রদাহজনিত রোগ সারাতে পারে। এর অ্যান্টিবায়োটিক গুণও আছে। বিটা-মাইক্রিন অ্যানালজেসিক অর্থাৎ এর বেদনানাশক গুণ রয়েছে।
আলফা-পাইনিন এই উপাদানও অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি। তাছাড়া কাটাছেঁড়া, জ্বালাপোড়া কমাতে ব্যবহার করা যায়। অ্যান্টিসেপটিক গুণ রয়েছে।

সিট্রোনেলল একই সঙ্গে অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, অ্যান্টিকনভালসান্ট এবং সিডেটিভ। জীবাণুনাশক, রোগ প্রতিরোধ বাড়ায় এবং যে কোনও ভাইরাল প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি বাড়াতে পারে।
জেরানিওল, এই উপাদানেরও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, অ্যান্টিসেপটিক ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ আছে।
লিনালল উপাদান উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। অ্যান্টিঅ্যাংজাইটি এবং অ্যান্টি-এপিলেপটিক গুণও আছে।
ভিটামিন সি ভরপুর, শীতের ত্বকের সুরক্ষা কবচ, রোগও সারায় কমলা
উত্তুরে হাওয়ায় নিষ্প্রাণ হয়ে যায় ত্বক। শুষ্ক, খসখসে ত্বকের যত্ন নিতে কমলালেবুর থেকে ভাল কিছু হয় না। ত্বকে তেলের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ত্বককে মসৃণ, নরম করে তুলতে কমলালেবুর খোসার কোনও বিকল্প নেই। তবে সরাসরি কমলালেবুর খোসা ব্যবহার না করে এর অ্যারোমা তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। অরেঞ্জ এসেনশিয়াল অয়েল ত্বকে তেলের ভারসাম্য বজায় রাখে। কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায়। ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় ফলে ত্বক অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দাগছোপ কমাতেও কমলার তেলে খুবই উপকারি। কোনও কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদান না থাকায় ত্বকের ক্ষতি করে। বরং অ্যান্টি-এজিং হিসেবে কাজ করে, অ্যাকনে ও র্যাশের সমস্যাও দূর করে।

ট্যান তুলে ত্বক উজ্জ্বল করতে কমলালেবুর তুলনা হয় না। শীতকালে ড্রাই, অয়েলি সবরকম স্কিনের জন্যই উপকারি। বাজারচলতি ফেসপ্যাকের বদলে কমলার তেলে তৈরি ক্রিম ত্বককে আরও বেশি তরতাজা করে তোলে। ত্বকের সুরক্ষা দেয়। এর সঙ্গেই দিনে অন্তত দু’বার স্কিন হাইড্রেটিং অরেঞ্জ টোনার ব্যবহার করলে আরও গ্লোয়িং স্কিন পাওয়া যায়। ত্বকে জমে থাকা ময়লা টেনে বের করে পরিষ্কার, ঝকঝকে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ত্বক এনে দেয়। এতে থাকে পিওর অরেঞ্জ এসেনশিয়াল অয়েল যা ত্বককে ময়শ্চারাইজ ও টোন করে।
একটি মাঝারি আকারের কমলালেবুতে ৩ গ্রাম ফাইবার থাকে। ফলে ইনসুলিনের পরিমাণ বেড়ে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কমলালেবু। এতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি যা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে। হার্টের স্বাস্থ্য ভাল রাখে কমলালেবু।

কমলালেবুর খোসাতে থাকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি ও অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান। ত্বকের যে কোনও সংক্রমণ রুখতে পারে কমলালেবুর তেল। ত্বকের মৃত কোষ সরিয়ে আরও সতেজ করে তোলে অরেঞ্জ স্কিন ইরেজার। এতেও আছে অরেঞ্জ এসেনশিয়াল অয়েল এবং অরেঞ্জ পিল।
শীত মানেই অলিভ অয়েল কেনার হিড়িক পড়ে যায়। বিজ্ঞাপনী চমকে ভুলে সঠিক উপাদান না দেখেই অলিভ অয়েল কেনেন বেশিরভাগ মানুষই। দামি বিদেশি তেলেও ঘর ভরে যায়। অথচ আমাদের দেশেই তৈরি কমলালেবুর তেল শীতের ত্বকের জন্য সবচেয়ে ভাল। অরেঞ্জ এসেনশিয়াল অয়েল দিয়ে তৈরি বডি অয়েলের অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণ আছে। চুলকানি, র্যাশ, যে কোনও স্কিন ইচিং কমাতে পারে। শীতে ঠোঁট ফাটা কমাতে সাহায্য করে অরেঞ্জ লিপ জেলি। কমলালেবুর নির্যাসে তৈরি লিপ জেলি ঠোঁট নরম রাখে।

কমলালেবুর আরও অনেক গুণ। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও কমলালেবুর সোডিয়াম, পটাসিয়াম সাহায্য করে। তাই উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ডায়েটে রাখা হয় কমলালেবু। এর ভিটামিন সি চুলের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।