দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুধু গ্রাম বা মফঃস্বল নয়, শহরেও পিরিয়ড নিয়ে সর্বসমক্ষে কথা বলতে লজ্জা পায় মেয়েরা। একুশ শতকেও প্রকাশ্যে 'পিরিয়ড' কথাটা উচ্চারণ করাই অনেকের কাছে বড় অন্যায়। অনেকের মানসিকতার পরিবর্তন হলেও এখনও সমাজের একটা বড় অংশের কাছে মাসিকের পাঁচদিন মেয়েরা একেবারে অচ্ছুত। পুজোর কাজ করতে পারবেন না, মন্দিরে ঢুকতে পারবেন না। 'না'-এর তালিকা অনেক লম্বা। এমনকি কখনও দেখা যায় দোকানে গিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার কথাটা ফিসফিস করে বলতে হয়, পাছে চারটে লোক বাঁকা নজরে দ্যাখে।
তবে এইসব সোশ্যাল ট্যাবু ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছেন ওড়িশার মলকনগিরি জেলার উপজাতি সম্প্রদায়ের ২৫ জন মেয়ে। গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে পিরিয়ড নিয়ে তাঁরা সচেতনতা অর্থাৎ মেন্সট্রুয়াল হাইজিনের বার্তা দিচ্ছেন গ্রামে গ্রামে। এই সংস্থার নাম 'বড়দিদি'। পিরিয়ড বা মাসিক চলাকালীন ঠিক কী কী সুরক্ষা নেওয়া উচিত, কতটা পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন থাকা উচিত সে ব্যাপারে গ্রামের মহিলাদের সচেতন করাই এই সংগঠনে মূল লক্ষ্য। তবে শুধু মুখে কথা বলেই থেমে থাকছেন না 'বড়দিদি'-রা। কখনও কখনও নিজেদের জমানো টাকা থেকে মেয়েদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনেও দিচ্ছেন। ২০১৯ সাল থেকে এই কাজ শুরু করেছে এই সংগঠন। এমন উদ্যোগে সরকার এবং জেলার ম্যাজিস্ট্রেটও তাঁদেরকে সাহায্য করছেন বলে জানিয়েছেন সংস্থার মেয়েরা।
পরজা, কোয়া, ভূমিয়া, কুই কান্ধা, বন্দা উপজাতি সম্প্রদায়ের মেয়েরা মিলে এই উদ্যোগ নিয়েছেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি পাওয়ার পর সেবাশ্রম স্কুলে মেয়েদের হস্টেলে গিয়ে প্রথম এই কাজ শুরু করেন তাঁরা। সেখানে বিভিন্ন ভিডিও, ছবি দেখিয়ে নানারকম আলোচনার মাধ্যমে মেয়েদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন মেন্সট্রুয়াল হাইজিন কতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাসিকের পাঁচদিন নিজেকে পরিষ্কার রাখার জন্য ঠিক কী কী করা প্রয়োজন, শরীর চাঙ্গা রাখতে কী ধরনের বা কী কী কাহাব্র খাওয়া প্রয়োজন, কাপড়ের বদলে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেন প্রয়োজন এইসবই শেখানোর চেষ্টা করেছেন বড়দিদিরা।
এই কাজে সরকার পক্ষ থেকে তাঁরা সাহায্য পেয়েছন। এমনকি ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন ফান্ডের আওতাতেও এসেছে ওড়িশার 'বড়দিদি' সংস্থা। কোয়া উপজাতির জয়ন্তি বুরুদা, 'বড়দিদি' গোষ্ঠীর একজন সদস্য। তাঁর কথায়, "প্রতিটা স্কুলে আমরা দু'বার করে যাচ্ছি। যাতে উপদেশ দেওয়ার পর মেয়েরা সেটা কতটা পালন করছে সেটা জানা যায়। গল্প-আড্ডায় জেনে নিচ্ছি ওদের সুবিধা অসুবিধা। সেইমতো ওদের আরও সাহায্য করার চেষ্টা করছি।"
যেহেতু 'বড়দিদি' সংগঠনের সকলেই উপজাতি সম্প্রদায়ের, তাই বিভিন্ন রীতিনীতি, রেওয়াজ, আচার-বিচার তাঁরাই সবথেকে ভালো জানেন। পরজা উপজাতির দীপারানি নায়ক বলেছেন, "মেয়েদের এই সময় নিজের বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয় না। দিনের বেলা ঘরের বাইরে অন্য কোথাও আর রাতের বেলায় বাড়ির বারান্দায় তাদের শুতে দেওয়া হয়। বাবা, ভাই, দাদা বাড়ির কোন পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে এইসময় তারা দেখাও করতে পারে না। মায়েরাই মেয়েদের শেখান যে মাসিক চলাকালীন তারা নাকি অশুদ্ধ। ফলে তাদের নাকি ছোঁয়াও যাবে না।"
মলকনগিরি, মৈথিলি, খৈরিপুট, করুকুন্দা ও ওড়িশার আরও অনেক অঞ্চলে কাজ করে এই সংগঠন। আগামী দিনে সংস্থার মেয়েরা বন্দা পাহাড় এবং তার আশেপাশের তিনটে পঞ্চায়েতে কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন। গাজলমামুরি, জদম্বা, রালিগরার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং চিত্রকোন্ডা ব্লকের স্বভিমান অঞ্চলে পৌঁছে পিরিয়ড সংক্রান্ত সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দেবেন তাঁরা।
ভূমিয়া উপজাতির রাধিকা মাজির কথায়, "পিরিয়ডের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাটা খুবই জরুরি। মেয়েরা এখনও অনেকেই স্যানিটারি ন্যাপকিনের বদলে কাপড় ব্যবহার করে। সেগুলো ঠিক ভাবে ধুয়ে পরিষ্কারও করা হয় না সবসময়। ওড়িশার এমন অনেক প্রত্যন্ত গ্রাম রয়েছে যেখানে মেয়েরা পিরিয়ড ব্যাপারটায় এতটাই লজ্জা পায় যে অন্যান্য জামাকাপড়ের তলায় পিরিয়ডের রক্তের দাগ লাগা কাপড় রেখে শুকায়। এর ফলে ব্যাকটেরিয়া আর ইনফেকশন ছড়ায় খুব বেশি মাত্রায়।"
কটকের এসসিবি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনোকলজির ডাক্তার ও অধ্যাপক সূর্য নারায়ণ দাস বলেছেন, "এই সময় হাইজিন অর্থাৎ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে মহিলাদের খুব সর্তক থাকা প্রয়োজন। সবার আগে কাপড়ের ব্যবহার একেবারেই বন্ধ করা প্রয়োজন। স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করাই উচিত। পিরিয়ড চলাকালীন ভ্যাজাইনাল এরিয়া ঠিক মতো পরিষ্কার না থাকলে মারাত্মক ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকে। জ্বরও আসে তার থেকে। কখনও কখনও ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লকও হয়ে যেতে পারে। এর থেকে প্রেগনেন্সির সময় নানা সমস্যা দেখা দেয়। পরবর্তীকালে মহিলাদের মাতৃত্বকালীন সময়ে কিংবা গর্ববতী হওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা যেতে পারে। মা হওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন হতে পারেন মেয়েরা"
অতএব এইসব সমস্যা এড়িয়ে মহিলারা যাতে সুস্থ থাকেন সে জন্যই নিরলস পরিশ্রম করে চলেছে ওড়িশার 'বড়দিদি'-রা।