দ্য ওয়াল ব্যুরো: সারাদিন দৌড়ঝাঁপ করে কাজ করেন যে মহিলারা, দিনের বেশিটা সময় কাটাতে হয় বাড়ির বাইরে, তাঁদের স্তন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি কম। ৫০ বছরের নীচে মহিলাদের ওপর দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়ে এই তথ্য সামনে এনেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের যুক্তি, অন্দরবাসে না থেকে যদি গায়ে একটু রোদ লাগে তাহলে ক্যানসার কেন অনেক মারণ রোগের হাত থেকেই রেহাই পাওয়া যায়। কারণটা হতেই পারে ভিটামিন ডি। এই ভিটামিনের সঙ্গে সরাসরি স্তন ক্যানসারের যোগসূত্র কতটা সেটা নিশ্চিত করে না বলতে পারলেও, বিজ্ঞানীদের ধারণা ভিটামিন ডি শরীরে ঢুকলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি অন্তত ৫০ শতাংশ কমে যায়।
‘অকুপেশনাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল মেডিসিন’ জার্নালে এই নতুন গবেষণার খবর সামনে এনেছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, কর্মরতা মহিলারা অনেক বেশি সূর্যের আলো পান। তাই তাঁদের শরীরে ভিটামিন ডি বেশি তৈরি হয়। এই ভিটামিন অনিয়ন্ত্রিত কোষের বৃদ্ধি রুখতে পারে। এমনও দেখা গেছে, সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টের মধ্যে যে মহিলারা বাইরে কাজকর্ম বেশি করেন তাঁদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। ৭০ বছরের নীচে ৩৮,৩৭৫ জন মহিলার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এই তথ্য দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
সোনারোদ লাগুক গায়ে
ভিটামিন ডি-এর অভাবও যে স্তন ক্যানসারের বড় কারণ হতে পারে তা স্বীকার করছেন গবেষকরাও। এই নিয়ে নানা মতামত আছে বিজ্ঞানীমহলে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছেন, ভিটামিন ডি বা ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্টের অভাব হলে নানারকম শারীরিক সমস্যা হতে পারে। গাঁটে গাঁটে যন্ত্রণা, হঠাৎ হঠাৎ মুড পরিবর্তন, এইসব তো আছেই, বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, পেশি নাড়াচাড়া করতেও প্রয়োজন হয় এই ভিটামিনের। এর সাহায্য ছাড়া মস্তিষ্ক থেকে সারা শরীরে বার্তা পাঠাতে পারে না স্নায়ু। রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও এই ভিটামিনটি ছাড়া যে প্যাথোজেনের সংক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব নয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভিটামিন ডি ঠিক মতো তৈরি না হলে ক্যালসিয়াম কাজ করতে পারে না। ফলে ছোটদের রিকেট ও বড়দের অস্টিওম্যালশিয়া, অস্টিওপোরেসিসের মতো রোগ দেখা দেয়। অনেক সময় কোলন ক্যানসার, স্তন বা প্রস্টেট ক্যানসারের মতো মারণ রোগ প্রতিরোধেও কাজ করে ভিটামিন ডি।
কেন মাথা চাড়া দিচ্ছে স্তন ক্যানসার?
গবেষকদের মতে, অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সীদের মধ্যে থাবা বসাচ্ছে এই রোগ। যাঁদের বয়স ২৫-৫০। বর্তমান লাইস্টাইল, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, অতিরিক্ত নেশার প্রকোপ নানা করণেই ক্যানসারের প্রচলিত ওষুধ অনেক ক্ষেত্রেই কার্যহীন হয়ে পড়ছে। এমনও দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লেও কয়েক মাসের মধ্যে হু হু করে সেটা বেড়ে গিয়ে স্টেজ-ফোরে পৌঁছে যাচ্ছে। উন্নত মানের কেমোথেরাপিও রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এক বার রোগ সেরে যাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার ক্যানসারের কবলে পড়েছেন এমন উদাহরণ অজস্র।

সুতরাং, প্রথম স্টেজে ধরা পড়লে স্তন ক্যানসার সম্পূর্ণ সেরে যাবে, এই ধারণাও সব সব সঠিক প্রমাণিত হচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সাম্প্রতিকতম তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ৭-৮ বছর আগেও এই ধরনের স্তন ক্যানসার হতো মোট স্তন ক্যানসার-আক্রান্তদের ১০-১৫ শতাংশের। এখন যা দাঁড়িয়েছে ৩১-৪০ শতাংশ। চিকিৎসাশাস্ত্রে এর নাম
‘ট্রিপল নেগেটিভ ব্রেস্ট ক্যানসার।’
স্তন ক্যানসারের লক্ষণ চিনবেন কীভাবে?
- স্তনের স্বাভাবিক আকার বা গঠন বদলে যায়।
- স্তনবৃন্তের আকারে পরিবর্তন।
- স্তনে লাম্প তৈরি হওয়া স্তন ক্যানসারের কারণ হতে পারে।
- স্তনবৃন্তের চারপাশে বা স্তনের ত্বকে র্যাশ দেখা যায়।
- আঙুল দিয়ে চাপ দিলেই স্তনের ত্বক বসে যাওয়া।
- স্তন বা আর্মপিটে যন্ত্রণা এবং কোনও রকম চাপ ছাড়াই অস্বাভাবিক ক্ষরণ।
- স্তন বৃন্ত লাল হয়ে যাওয়া এবং চারপাশের ত্বকের কোষ মোটা হয়ে যাওয়া, অনেক সময় লাল-কমলা ছাপও দেখা যায় স্তনের চারধারে।
- স্তনে ব্যথাহীন শক্ত টিউমার হতে পারে। ব্যথা নেই বলে ডাক্তারকে দেখাতে দেরি করবেন না। তবে স্তনে টিউমার মানেই কিন্তু ক্যানসার নয়। ৮৫% ব্রেস্ট টিউমর ম্যালিগন্যান্ট হয় না। তবুও ব্যথা হোক বা না হোক, স্তনে কোনও শক্ত ভাব দেখা দিলে তখনই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার।
- ব্রেস্টে ক্যানসার হলেও তার লক্ষণ বাহুমূলেও ফুটে উঠতে পারে। তাই এই অংশে বড় বড় গ্ল্যান্ড ফুলে উঠলেও সাবধান হতে হবে।
অজ্ঞানতার অন্ধকার কাটুক
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞদের হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ১৪ লক্ষ মহিলা নতুন করে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ৪,৫৮,০০০ জন মারা যাচ্ছেন। এ দেশে মা বোনেরা লজ্জা ও সঙ্কোচের কারণে ডাক্তারের কাছে যেতেই ভয় পান। সমীক্ষা বলছে, আমাদের দেশে প্রতি ২ জন স্তন ক্যানসারে আক্রান্তের মধ্যে ১ জন মারা যান। এর অন্যতম কারণ অসুখটা যখন ডালপালা বিস্তার করে শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বেশিরভাগ মেয়ের তখনই হুঁশ হয়। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরে দেখা যায় অনেক দেরি হয়ে গেছে। আবার অনেকে তো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতেই সঙ্কোচবোধ করেন।
গবেষকরা বলছেন, নিজের স্তনের গঠন এবং তাতে ক্রমাগত হয়ে চলা পরিবর্তন লক্ষ্য রাখেন ক’জন মহিলা? শরীরের এই বিশেষ অঙ্গটির পরিচর্যার দিকে নজর রাখেন না অনেকেই। আবার নজরে পড়লেও লজ্জা ও সংকোচের জন্য সেটা লুকিয়ে যান অধিকাংশ মহিলা। স্তন ক্যানসার সম্পর্কে অজ্ঞতা, স্তন নিয়ে অহেতুক স্পর্শকাতর হওয়া, লজ্জা পাওয়া এবং ‘সেল্ফ এগজামিনেশন’ বা নিজেই নিজের স্তন কী ভাবে পরীক্ষা করা যায়, সে সম্পর্কে ধারণা না-থাকার জন্য এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ১৮ বছরের পর থেকে প্রত্যেক মহিলাকেই মাসে অন্তত একদিন সেল্ফ একজামিনেশন করতে বলেন চিকিৎসকেরা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করাটা একান্তই বাঞ্ছনীয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে স্তন ক্যানসার নিরাময় সম্ভব বলে জানিয়েছেন ডাক্তাররা। কিন্তু বেশির ভাগ মহিলাই তা করেন না। ফলে ক্যানসার ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।
পরিসংখ্যান বলছে, ৬৪ শতাংশ মহিলা নানা ধরনের স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা সম্পর্কে অবগতই নন। ৬৬ শতাংশ জানেনই না চিকিৎসার ব্যয়ভার কত হতে পারে! এ দিকে ৪৯ শতাংশ মহিলা মনে করেন, তাঁদের শরীরে বাসা বাঁধছে স্তন ক্যানসার। তবু পরীক্ষা করাতে লজ্জা পান।
স্তন ক্যানসার দ্রুত চিহ্নিত করার জন্য আল্ট্রাসোনোগ্রাফি বা ম্যামোগ্রাফির মতো পদ্ধতি রয়েছে। এতে স্তনের স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়া ধরা পড়বে যা স্তন ক্যানসারের অন্যতম ইঙ্গিতবাহী। অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন বা টার্গেটেড থেরাপির মতো চিকিৎসাও আছে। তবে যে কোনও রোগেরই আগাম সতর্কতা এবং প্রয়োজনীয় সচেতনতা দরকার, যেটা অধিকাংশেরই নেই।