দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেডেন্টারি লাইফস্টাইলে নিজেদের দিকে খেয়াল রাখার সময় কোথায় মহিলাদের! সংসার, কেরিয়ার, সন্তান সামলে নিজের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ জরায়ু বা ইউটেরাসের ব্যাপারেই উদাসীন মেয়েরা। শরীরচর্চা মানে শুধুই জিমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানো নয়, ডাক্তারের কাছে রুটিন চেকআপটাও জরুরি। ফাইব্রয়েড সিম্পটমের সঙ্গে যাঁরা লড়াই করছেন, তাঁরাই জানেন অনিয়মিত ও যন্ত্রণাদায়ক ঋতুস্রাব, পিঠের নীচে ক্রনিক ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য, তলপেটে যন্ত্রণা—এগুলো জরায়ুর সমস্যার অন্যতম লক্ষণ। নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং খেয়াল রেখে চললে জরায়ু বাদ দেওয়ার জটিল প্রক্রিয়া হিসটেরেকটমির (Histerectomy)মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না মেয়েদের। জরায়ু হারানোর যন্ত্রণাও অনেক কমে।
হিসটেরেকটমি সার্জারির নাম শুনলেই আঁতকে ওঠেন মহিলারা
হিসটেরেকটমির মাধ্যমে জরায়ু (Uterus)শরীর থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। এই অস্ত্রোপচারের অনেক প্রক্রিয়া আছে। কোনও ক্ষেত্রে একটি বা দু’টি ওভারিই বাদ দিয়ে দেওয়া হয় (oophorectomy/bilateral oophorectomy), অথবা ফ্যালোপিয়ান টিউব বাদ দিতে হয় (salpingectomy/bilateral salpingectomy)।
হিসটেরেকটমির ফল হয় বহুবিধ। যেমন রোগীর ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়, গর্ভধারণ করার ক্ষমতা থাকে না। বিনাইন (ক্যান্সার নয়) ফাইব্রয়েড টিউমারের কারণে জরায়ু বাদ দিতে হয় অনেকসময়। তা ছাড়া, এডিনোমাইসিস ও এন্ডোমেট্রিওসিস, ঋতুস্রাবের সময় অধিক রক্তপাত, ইউটেরিয়ান প্রলাপসের (Uterine Prolapse) কারণে জরায়ু যোনির কাছে নেমে এলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাদ দিতে হয়। জরায়ুতে অন্তঃক্ষরণ বা ক্যানসার কোষের আধিক্য হলেও জরায়ু অস্ত্রোপচার করে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয়।

জরায়ু বাদ দেওয়ার অনেকগুলো প্রক্রিয়া আছে—
ট্রান্স-অ্যাবডমিনাল হিসটেরেকটমি (Transabdominal hysterectomy (TAH) বা পেট কেটে জরায়ু বাদ দওয়া হয়।
ল্যাপারোস্কোপিক হিসটেরেকটমি (laparoscopic hysterectomy)। বর্তমানে রোবোটিক ল্যাপারোস্কোপিক হিসটেরেকটমি প্রক্রিয়ায় এই অস্ত্রোপচার করেন ডাক্তাররা।
ল্যাপারোস্কোপিক সুপারকার্ভিকাল হিসটেরেকটমি (Laparoscopic supracervical hysterectomy (LSH)
ভ্যাজাইনাল হিসটেরেকটমি (Vaginal Hysterectomy)
রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিচার করে তবেই হিসটেরেকটমির সিদ্ধান্ত নেন ডাক্তাররা। রোগীর বয়স যদি বেশি হয়, মেনোপজের দোরগোড়ায় চলে আসে, তাহলে ওভারি এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব দুটোই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়।

গাইনোকলজিস্টরা বলেন কম বয়সে যেমন হরমোন ইমব্যালান্সের সমস্যা বেশি হয় মেয়েদের। যার কারণে ওজন বেড়ে যাওয়া, অনিয়মিত পিরিয়ডস, ব্রণর সমস্যা, চুল পড়া বা অনিয়ন্ত্রিত হেয়ার গ্রোথের সমস্যা হয়। শুরু থেকেই যদি নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রসিডিওরের মধ্যে দিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে জরায়ু বাদ দেওয়ার দরকার পড়ে না। হিসটেরেকটমির ভয়ও চেপে বসে না। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমেই সমস্যা থাকে অনেক নিয়ন্ত্রণে।
এখন দেখে নেওয়া যাক কখন সতর্ক হতে হবে। কী কী উপসর্গ দেখলেই সাবধান হবেন মেয়েরা।
পলিসিস্টিক ওভারি--সাবধান হন বয়ঃসন্ধিতেই
পিসিও বা পলিসিস্টিক ওভারির সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১১ বছর থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত পিসিও-র প্রকোপ বেশ জাঁকিয়েই বসে মেয়েদের শরীরে। পিসিও থাকলে মেয়েদের শরীরে ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের ক্ষরণ বেশি হয়। অনিয়মিত পিরিয়ডস হলে সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের কাছে চেকআপ জরুরি। কারণ অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন থাকার কারণে ইউটেরাইন ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে।
এখনকার ছেলেমেয়েরা তেলমশলাদার খাবার, জাঙ্ক ফুডে বেশি অনুরক্ত। স্থূলত্বের কারণে পলিসিস্টিক ওভারির সম্ভাবনা আরও প্রবল হয়। তবে রোগাদেরও পিসিও হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্রেগন্যান্সির অনেক সমস্যাই আগাম বার্তা বয়ে আনে
প্রেগন্যান্সির সময় অনেক সময় জটিলতা দেখা যায়। কোনও মহিলার উচ্চরক্তচাপের সমস্যা বা ডায়াবেটিস থাকলে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কন্ট্রাসেপশন সম্পর্কে জানাটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে গর্ভপাত করান, তাতে সমস্যা আরও বাড়ে।
জরায়ুর ক্যানসার মারাত্মক
মেনোপজ এসে যাওয়ার পরেও যদি হঠাৎ কোনও কারণে পিরিয়ড শুরু হয়, তা হলে আজই সাবধান হোন। সাধারণত, জরায়ুর গায়ে জন্মানো টিউমার ফেটেই এই অকাল রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আর এই টিউমারের ঘা থেকেই ক্যানসার শুরু হয়। যাঁদের মেনোপজ শুরু হয়নি জরায়ুর ক্যানসারে অক্রান্ত হতে পারেন তাঁরাও। সে ক্ষেত্রে পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্ষক্ষরণ ও পেটে ভয়ানক ব্যথা হবে। এ ছাড়া জরায়ুর ক্যানসারের আর এক প্রাথমিক লক্ষণ হঠাৎই অতিরিক্ত পরিমাণে সাদা স্রাব শুরু হওয়া। ধীরে ধীরে পেটে ব্যথা, বমি ভাব, ক্ষুধামান্দ্য, তলপেটে চাপ লাগা, ওজন হ্রাস ইত্যাদি উপসর্গ এই অসুখের ক্ষেত্রে দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে দেরি না করেই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হওয়া প্রয়োজন।
আগে থেকে সতর্ক হলে ইউটেরাস এবং ওভারির সার্বিক সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব। কারণ হিসটেরেকটমির সমস্যা অনেক। এর কারণে শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি, সহবাসে অনীহা, নানারকম শারীরিক অস্থিরতা, হাত-পায়ে ব্যথা, বমিভাব ইত্যাদি অনেক রোগেরই প্রাদুর্ভাব হয়। অনেকক্ষেত্রে হরমোন রিপ্লেসমেন্টেরও প্রয়োজন হয়।