সঞ্জীব আচার্য
কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস
সামান্য একটা হাঁচলেও অ্যান্টিবায়োটিক ঘপাৎ করে গিলে ফেলেন অনেকে। জ্বর হলে তো কথাই নেই। পেট খারাপ হয়েছে কি, হয়নি সঙ্গে

সঙ্গেই মুঠো মুঠো অ্যান্টিবায়োটিক। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস না করে নিজেই ডাক্তারি করতে ভালোবাসেন বেশিরভাগই। ফলে যা হওয়ার তাই হয়। ওষুধের কোর্স শেষের আগেই ডোজ বন্ধ। কয়েকটা ওষুধ খেয়ে রোগ সেরে গেলেই ব্যস, আর চিন্তা কি! এর ফল যে কতটা মারাত্মক হচ্ছে তার আঁচও পাচ্ছেন না মানুষজন। যথেচ্ছ ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিকই ক্রমে ‘অ্যান্টি’ হয়ে যাচ্ছে।
মুঠো মুঠো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার বিপদ খুব ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিতে পারে আগামী দিনে, এমন সম্ভাবনার কথাই বলছেন বিজ্ঞানী থেকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এমন একটা সময় আসবে যখন ওষুধে আর কাজ দেবে না। কারণ ওষুধের ক্ষমতাকে জয় করার শক্তি পেয়ে যাবে ব্যাকটেরিয়া-প্যাথোজেনরা। অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধেই নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলবে। ফলে রোগ সারানোর দাওয়াই আর বিশেষ কাজ করবে না। ডাক্তারি ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ (Antibiotic Resistance) ।
ঘন ঘন ওষুধ খাওয়ার বিপদ
জ্বর হোক বা পেটের গোলমাল, ওষুধ তো জানাই আছে, খেয়ে ফেললেই ব্যস। সর্দিতে কয়েকটা চেনা ওষুধ তো বাড়িতেই থাকে। সামান্য হাঁচি-কাশি হলে নিজে নিজেই অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স করে নিলেই ল্যাঠা চুকে গেল।

জটিল রোগ না হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ভুলতেই বসেছি আমরা। ঘরের চেনা ওষুধেই কাজ চলে যাচ্ছে। বয়স যাই হোক, শরীরের ওজন যতটাই হোক, সেসব ভাবার সময় নেই। চেনা নামের ওষুধ খেয়ে ফেললেই হল। কীভাবে খেতে হবে জানা আছে, তাই আর ডাক্তারের কথা মাথায় থাকে না। কয়েকটা ওষুধ খেয়ে রোগ সেরে গেলেই আর সম্পূর্ণ কোর্স করার কথা মনেও থাকে না। ওষুধের পাতাগুলো আবার বাক্সবন্দি হয়ে যায়। পরের বার একই রকম সমস্যা হলে আবার সেই ওষুধ, এবারেও অসম্পূর্ণ ডোজ। ডাক্তার, গবেষকরা বলছেন, এত ঘন ঘন ওষুধ খাওয়ার অভ্যাসে বিপদ ঘনাচ্ছে। যে রোগ সারাতে ওষুধ খাওয়া হচ্ছে তাই ধীরে ধীরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। রোগের জীবাণু বিবর্তিত হয়ে বা জিনের গঠন বিন্যাস বদলে ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে বিশ্ব
বিপদের নাম অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স। ওই যে জীবাণু মারতে ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রবণতা, তার জেরেই অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা কমছে। রেসিস্ট্যান্ট হয়ে উঠছে ব্যাকটেরিয়ারা। একটা সময় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে মৃত্যু ছিল অবধারিত। অ্যান্টিবায়োটিক বের হওয়ার পরে মানুষের প্রাণ বাঁচে। কিন্তু এর অপরিকল্পিত ব্যবহারে ভালর থেকে খারাপ হচ্ছে বেশি।

সেটা কীভাবে? ধরা যাক, জ্বর বা সর্দি হয়েছে অথবা ডায়ারিয়া, অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স শুরু করার পরে শরীর অনেকটা সুস্থ বোধ হলে অনেকে মাঝপথে ওষুধ থামিয়ে দেন। নিজে ডাক্তারি করলে তো কথাই নেই. ডাক্তারবাবুরা বললেও তা মেনে চলেন না অনেকেই। হয়তো ৮টি ওষুধ খাওয়ার কথা, রোগী চারটি ওষুধ খেয়ে সুস্থ বোধ করলে বাকি চারটি আর মুখেই তোলেন না। এটাই মারাত্মক ভুল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সবসময় শেষ করতে হবে। তা না-হলে পরবর্তীকালে কোনও রোগে ওই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে তাঁর শরীরে প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সেই ওষুধ আর কাজ করবে না।
চরিত্র বদলাচ্ছে ‘সুপারবাগ’
এখন কথা হচ্ছে এই সুপারবাগ কী? যে কোনও মেডিক্যাল জার্নালে এখন সুপারবাগ নিয়ে নানা গবেষণাপত্র ছাপা হচ্ছে। শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী শক্তি নিয়ে হানা দিচ্ছে যে সব ব্যাকটিরিয়া, ‘ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল’ (ইসিডিসি)-এর গবেষকরা তাদের নাম দিয়েছেন ‘সুপারবাগ’! ইউরোপে সুপারবাগের প্রকোপে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষ মারা যান।
করোনাভাইরাস যেমন তার চরিত্র বদলাতে পারে, তেমনি ব্যাকটেরিয়ারাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই বিবর্তি হয়। অ্যান্টিবায়োটিকের কাজ হল ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যায় বাড়ার ক্ষমতাকে রোধ করা। কিন্তু শরীরে যদি মুঠো মুঠো অ্যান্টিবায়োটিক থাকে, তাহলে ব্যাকটেরিয়ারা ক্রমেই তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে থাকে। জিনের গঠন এমনভাবে বদলে ফেলে যাতে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকে কোনও কাজ না হয়। ফলে ব্যাকটেরিয়ারা হয়ে ওঠে আরও শক্তিশালী ও সংক্রামক। এক শরীর থেকে দ্রুত অন্য শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। তখন তাদেরই বলে সুপারবাগ।

সোজা কথায় ব্যাখ্যা করলে বলা যায়, অবৈজ্ঞানিক ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে জীবাণুর সঙ্গে যুঝে যাওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে শরীর। তাই আজকাল ভাইরাল ফিভার থেকে শুরু করে একটু অচেনা ব্যাকটিরিয়ার হানাতেই দুর্বল হয়ে পড়ছে শরীর। অজানা জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুও।
ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ছে, সচেতনতা দরকার
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক আগেই বলেছে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট) ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে শুধু ‘ই কোলাই’ প্রায় ৩০%। মূত্রনালির অন্যান্য সংক্রমণ, ডায়ারিয়া, নিউমোনিয়া,ন ভেন্টিলেটর অ্যাসোসিয়েটেড নিউমোনিয়া এবং রক্ত বা স্যালাইনের চ্যানেল থেকে ছড়ানো সংক্রমণও কম কিছু নয়। শিশু চিকিৎসকরাও বলছেন, ভয়াবহ সংক্রমণ নিয়ে বহু বাচ্চা তাঁদের কাছে আসছে। কোনও ওষুধে সুস্থ করা যাচ্ছে না। এরও কারণ সেই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স। দেখা যাচ্ছে, মূত্রনালীর সংক্রমণে ভুগে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া রোগী পরবর্তী সময়ে ওষুধে তেমন সাড়া দিচ্ছেন না। কারণ, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই তাঁরা অল্প সময়ের ব্যবধানে এত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে রোগ সারানোর চেষ্টা করেছেন যে, শরীরের সাধারণ প্রতিরোধ ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে অল্পেই যে রোগ সারে তাও দুরারোগ্য হয়ে উঠছে।

এর আরও একটা খারাপ দিক আছে, ভাল-মন্দ নির্বিশেষে শরীরের যে সব ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যাপারে স্পর্শকাতর সেগুলিকে অ্যান্টিবায়োটিক ধ্বংস করে দিতে পারে। এই ভাবে শরীরে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পরে পেট খারাপ, ডায়েরিয়া, মুখের স্বাদ কমে যাওয়া, দুর্বলতা, মেয়েদের জননাঙ্গে সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। অল্প বয়সে বেশি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার স্থূলতাও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
উপায় কী!
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক একেবারেই চলবে না। প্রাকৃতিক উপায়ে খাওয়াদাওয়ার প্রতি নজর দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। রোগ যতই সামান্য হোক, ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের মতামত নিতে হবে। বয়স, শরীরের ওজন, অন্যান্য রোগ কী আছে ইত্যাদি নানা বিষয়ের ওপর ডোজ নির্ভর করে। তাই নিজে নিজে ডাক্তারি করলে ফল মারাত্মক হবে। পুষ্টিকর খাবার খাওয়ায় জোর দিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক একেবারেই চলবে না। প্রাকৃতিক উপায়ে খাওয়াদাওয়ার প্রতি নজর দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে।