
শেষ আপডেট: 9 February 2024 12:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অন্ত্রের সঙ্গে ব্রেনের কি কোনও সম্পর্ক আছে?
পেট গরম হলে মাথা গরম হওয়া স্বাভাবিক, তবে পেটের সঙ্গে মন-মগজের মাখোমাখো সম্পর্ক আছে কিনা সে নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
ওই যে যত দোষ সব নাকি পেটের। ভেতো বাঙালি চোঁয়া ঢেকুর তুলেই বলে ‘পেটটা ভাল নেই’। তাই মনটাও ঠিক যুতসই নেই। পেট গুরুগুর করলে মনেও মেঘ জমে। সেদিনটা আর ফুরফুরে লাগে না। পেট খুশি, তো মনও খুশি। মগজেও ভাবনাচিন্তার হাওয়াবাতাস খেলে। স্ট্রেস বাপ বাপ করে পালায়।
পেটের সঙ্গে এই যে মন ও মাথার একটা সন্ধি তা কিন্তু নিছকই কথার কথা নয়। আদতে পেটে এমন কিছু জীব থুরি অনুজীবেরা আছে যারা অন্ত্রে গ্যাঁট হয়ে বসে মন ও মগজের ব্যালান্স নিয়ন্ত্রণ করে। এদের জন্যই মন খুশি খুশি থাকে, বুদ্ধিও চাঙ্গা থাকে। এই অনুজীবেরা না থাকলে বা এদের সংখ্যায় হেরফের হলে বুদ্ধির গোড়া নড়বড়ে হয়ে যাবে। স্নায়ুর কাজও থিতিয়ে যাবে। তখন ডিপ্রেশন, পারকিনসন্স, অটিজমের মতো মন ও মাথার অসুখ হবে।
‘নেচার মাইক্রোবায়োলজি’ সায়েন্স পত্রিকায় এই অণুজীবদের দিয়ে বিস্তর লেখালিখি হচ্ছে। আয়ারল্যান্ডের এপিসি মাইক্রোবায়োম রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানী ডা. নাথানিয়াল রিটজ বলছেন, এই অনুজীবেরা থাকে দল বেঁধে। এরা সমষ্টিতেই জন্মায়। এদের বলে গাট মাইক্রোব্যাকটেরিয়া বা মাইক্রোবস। এই গাট মাইক্রোবসদের সঙ্গে মন ও মাথার অসুখেরও সম্পর্ক আছে বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই মাইক্রোবসরা শরীরের ‘বন্ধু’। আমাদের অন্ত্রেই এদের ঠিকানা (Gut Bacteria)। ঠিকমতো পুষ্টি পেলে সংখ্যায় বাড়ে। তার ঋণও শোধ করে। এরা ‘দুষ্টু’ ব্যাকটেরিয়াদের মতো রোগ বাধায় না। অন্ত্রে খুঁচিয়ে ঘাও করে না। বরং এরা পুষ্টি পেয়ে বড় হলে মানব মস্তিষ্কের স্নায়ুদের ভাল রাখে। স্ট্রেস কমায়।
পেটের সঙ্গে মন-মগজের কানেকশন কী?
ডা. রিটজ বলছেন, এই গাট মাইক্রোবসদের 'মুড মাইক্রোবস' বা 'সাইকোবায়োটিকস' বলা হয়। এদের একসঙ্গে বলে মাইক্রোবায়োম। ভেগাস স্নায়ু পথে অন্ত্রের সঙ্গে মস্তিষ্কের যোগাযোগ রাখে এরা। হজমের সময় খাবারের ফাইবার ভেঙে ফেলে একধরনের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। শর্ট চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে যা চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
এক জন মানুষের শরীরে যতগুলি কোষ আছে, তার দশগুণ বেশি জীবাণু সে সব সময় বয়ে বেড়ায়। অন্ত্রপ্রণালীর ৯০ শতাংশ জুড়ে এরা বসবাস করে। ভ্রূণ অবস্থাতেই শরীরের ভিতরে জীবাণুদের প্রবেশ ঘটতে শুরু করে, এবং জন্মের পরে শিশুর অন্ত্রে জীবাণুর বৈচিত্র বাড়তে থাকে। মোটামুটি তিন বছর বয়স থেকে অন্ত্রপ্রণালীতে মাইক্রোবায়োমরা পাকাপাকি জায়গা করে নেয়। খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা ও ভৌগোলিক অবস্থানের পার্থক্যের কারণে প্রতি মানুষের মাইক্রোবায়োমের ধরন আলাদা হলেও, সুস্থ মন ও মস্তিষ্কের অধিকারীদের অন্ত্রে মাইক্রোবায়োমদের প্রকৃতি ও সংখ্যার অনুপাত একই। অন্ত্রে এদের সংখ্যা স্বাভাবিকের থেকে বদলে গেলে সেই অবস্থাকে ডিসবায়োসিস বলে। এই ডিসবায়োসিস হলে তখন নানা রকম মন ও মস্তিষ্কের অসুখ দেখা দিতে থাকে।
অটিজমে আক্রান্তদের অন্ত্রে গাট মাইক্রোবায়োমদের সংখ্যা ও প্রকৃতি সুস্থদের থেকে আলাদা। পারকিনসন্সে ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রেও তাই দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাইক্রোবায়োমরা জীবাণুরা খাবারে থাকা বিভিন্ন অণুকে ভেঙে নানা ধরনের জৈব-রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে, যেগুলি শরীরের উপর নানা রকম প্রভাব ফেলে। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, অ্যাসেটিক অ্যাসিড, প্রোপিয়নিক অ্যাসিড, বিউটিরিক অ্যাসিড প্রভৃতি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ফ্যাটি অ্যাসিড (শর্ট চেন ফ্যাটি অ্যাসিড বা এসসিএফএ)—সুস্বাস্থ্যের জন্য যাদের অবদান আছে। দেখা গেছে, প্রোপিয়নিক অ্যাসিড বেড়ে গেলে বিভিন্ন ধরনের নিউরোট্রান্সমিটারের স্বাভাবিক পরিমাণে পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে অটিজম দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খেলে তখন গাট ব্যাকটেরিয়াদের প্রকৃতিতে বদল আসে, ফলে এইসব জৈব-রাসায়নিক উপাদানের অনুপাতও বদলে যায়। তখন অসুখের উপসর্গ দেখা দিতে থাকে।
সেরোটোনিন, ডোপামিন, গামা অ্যামাইনো বিউটিরিক অ্যাসিড ইত্যাদি নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি করে, যা শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয়। সুতরাং, ডিসবায়োসিসের ফলে এগুলির পরিমাণের হেরফের হলে তার প্রভাব মস্তিষ্কের উপরেও পড়বে। তখন মনের নানা রোগ, ব্রেনের অসুখ দেখা দিতে থাকবে। তাই দুরূপ মাথার অসুখ সারাতে এই গাট ব্যাকটেরিয়াদের দিয়েই চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। এদের সংখ্যা বাড়িয়ে বা কমিয়ে অসুখের হিল্লে হয় কিনা তার পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে।